।।।। কমিকস্ ।।।।
![]() |
| ছবি ও লেখায় ।। শ্রীপর্ণা ঘোষ |
।।। । কবিতা ও ছড়া ।।। ।
এসো এসো তুমি নতুন বছর
রতনতনু ঘাটী
নতুন বছর, এটাই তোমার নতুন কুটুমবাড়ি
শুধু হাতে তুমি আসবে না জানি করে দেব তবে আড়ি!
আমার জন্যে কী কী যে আনবে তালিকা দিচ্ছি লিখে
মেঘেদের খামে পাঠাতে ভুলো না পৃথিবীর চারদিকে।
শুকনো মুখের ছেলেমেয়ে যারা দাঁড়িয়ে চুপটি করে
অভাবি তাদের যত খুশি দিও দু’ হাতে আঁজলা ভরে।
নতুন ফুলের কুঁড়ি এনো আট-দশ কি বারো
পকেট উপচে ততখানি এনো, যতটা আনতে পারো!
বর্ণচোরা আম এনো, আর ক’টা সিঁদুরকোটো আম
মধুমালতীর গুচ্ছে তাই তো রঙ লিখে পাঠালাম।
নতুন ক্লাসের বই এনে দিও বিনোদ দুলের হাতে
দুধেল গোরুর দুধ ঢেলে দিও তারই শুকনো ভাতে!
সুনয়নী টুডু চোখে তো দ্যাখে না টুকু আলো হলে সই--
অঙ্কে যে কাঁচা তার হাতে দিও লাল ধারাপাত বই!
ঈশান কোণের আনমনা মেঘ পলক পড়ে না তার
একলা বোনের কোলে এনে দিও ভাইয়ের সংসার!
নতুন বছর তোমার দু’ হাতে রাখছি আমার হাত
মলিন মায়ের শূন্য হাঁড়িতে ফুটুক নতুন ভাত!
![]() |
| রতনতনু ঘাটী |
এই গরমে
প্রবাহনীল দাস
দ্বাদশ শ্রেণি, বিদ্যাসাগর শিশু নিকেতন
রাঙামাটি, মেদিনীপুর
প্রখর রোদে ঘামছে মাথা? জল ঢেলে হও ঠাণ্ডা,
চামড়া পুড়ে হচ্ছে কালো,
জল ছেড়ে তাই বরফ ঢালো।
ঘাম বসিয়ে ভুগছ জ্বরে?
বন্দি থেকো বন্ধ ঘরে।
রাস্তা ঘাটে ঘুরলে খাবে রোদ-পুলিশের ডাণ্ডা।
সানস্ক্রিনে আর হচ্ছে না কাজ, লাগাও কিছু অন্য,
রোদের তাপে গলছে গাড়ি,
শহর জুড়ে ‘কারফু’ জারি।
সাবধানে যাও বাজার দোকান,
প্যাকেট ফেটে ডিম খানখান –
পিচ রাস্তায় অমলেট হলে করবে লোকে ধন্য!
![]() |
| প্রবাহনীল দাস |
পয়লা বোশেখে
সবিতা রায় বিশ্বাস
পয়লা বোশেখে নতুন আলোকে
বেলি জুঁই ফোটে শুভ্র হাসি ঠোঁটে
কুহু কুহু ডাকে বকুলের শাখে
পাতার আড়ালে মুখটি বাড়ালে
গুন গুন মন বর্ষবরণ
আলপনা আঁকি ডানা মেলা পাখি
আমপাতা দোলে দরজার কোলে
ভগবতী পুজো পাঁজি পুঁথি খুঁজো
দুধ উথলায় কানায় কানায়
ভরে সংসার স্নেহ সুধা আর
মিলন মধুর আনন্দ সুর
সারাদিন গান পেতে রাখি কান
বৈশাখে ডাকি একসাথে থাকি
মুখখানি ম্লান হোক অবসান
কেটে যাক গ্লানি নয় হানাহানি
হাত রেখে হাতে যিশু বিশু সাথে
গাজন মেলায় চরকি খেলায়
আমিনা মালতী জরিনা তপতী
ঝন ঝন চুড়ি ঝাল ঝাল মুড়ি
তেঁতুলের জল মেলামাঠে চল
পয়লা বোশেখে রবির আলোকে
মিলে মিশে গাই খুশি মন চাই
শপথের ঢেউ ভুলবোনা কেউ
হবে হবে জয় চলো নির্ভয়।![]() |
| সবিতা রায় বিশ্বাস |
।।। । গল্প ।।। ।
কাঁদনের গল্প ।। এই যাঃ
শতদ্রু মজুমদার
কাঁদন পরামানিক একটা গাছ চুরি করেছে। কী গাছ সে জানেনা। ফলের না ফুলের তাও অজানা। ওই যে গানে আছে না, মন বলে আমি মনের কথা জানিনা। তা না হলে যে লোকটা এত কাল লোকের সাইকেল, বাচ্চার হাতের সোনার বালা, মন্দির থেকে নতুন জুতো, গাছের ফল পাকুর, মায় পুকুরের মাছ পর্যন্ত চুরি করেছে, সে কিনা একটা গাছ চুরি করে ফেলল। গ্রামের এক মাস্টার মশাই বললেন, কাঁদনের বোধোদয় হয়েছে। সাধারণ মানুষ বলাবলি করতে লাগল, গাছ নিমিত্ত মাত্র। এর পিছনে অন্য রহস্য আছে। থাকতে পারে। কিন্তু রহস্যের জাল ছিন্ন করতে পাবলিকের বয়ে গেছে।
কাঁদনের বউ বলল, এটা কি গাছ ?
কাঁদন বলল, জানিনা।
কী করতে এনেছো?
এমনি।
বয়সকালে মানুষের ভীমরতি হয়। কাঁদন পরামানিকের তাই হয়েছে। এটা ভেবে তার বউ আর কোনো কথাই বলল না।
উঠোনের মাঝ মধ্যিখানে গাছটা তরতর করে বেড়ে উঠল। একদিন পঞ্চায়েত অফিসের লোকজন এসে গাছটা দেখে কী সব বলাবলি করল। তারপর সবুজ রঙের সুন্দর লোহার বেড়া দিল চারপাশে।এসব দেখে কাঁদনের বউ ভাবল, নিশ্চয়ই দামি গাছ, নিশ্চয়ই দামি ফল দেবে , তাই সে রোজ দু’বেলা জল দিতে লাগল।
এই খবর গেল জেলা পরিষদ অফিসে। বনবিভাগ থেকে পঞ্চায়েত প্রধানকে পুরস্কৃত করা হল। কারণ বহুবার জেল খাটা একটা দাগি চোরকে দিয়ে বৃক্ষরোপণ করাতে পেরেছে, এটাই অঞ্চল প্রধানের বিরাট কৃতিত্ব।
দু’একজন বেয়াদব লোক কাঁদন পরামানিককে খেপিয়ে দিল, পেরাইজটা তো তোর পাওয়ার কথা।
হক কথা। কিন্তু কাঁদন ভাবছে অন্য,জীবনে এই প্রথম কবুল করা সত্ত্বেও কেউ বিশ্বাস করছে না যে সে গাছটা চুরি করেছে। এমনকি মনসা দারোগা পর্যন্ত চুপ!
মাঝখান থেকে নেপোয় দই মেরে চলে গেল।
![]() |
| শতদ্রু মজুমদার |
দাদু ও তাঁর পোষ্য
সৃঞ্জয় মৌলিক
(ষষ্ঠ শ্রেণী, গার্ডেন হাই স্কুল, কলকাতা)
আমার পরীক্ষা শেষ হওয়ার পর আমি একটি গ্রামে আমার একজন দাদুর বাড়ি বেড়াতে গিয়েছিলাম। ওনার বাড়ির সামনে একটি সুন্দর উঠোন ছিল। বাড়ির একদিকে ছিল ধানক্ষেত আর অন্যদিকে অনেক গাছপালা। কী সুন্দর দৃশ্য!
ওখানে সবার সঙ্গে পরিচয় হয়ে আমার খুব ভালো লাগল। দাদুর অনেক বয়স। তাঁর চুল অর্ধেকের বেশি পাকা। তিনি আমাকে ডেকে অনেক গল্প শোনাতেন। আমারও দাদুকে খুব পছন্দ হয়েছিল। পরদিন সকালে দাদু আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন, "দাদুভাই, বেড়াতে যাবে না কি?"
"অবশ্যই যাব। কোথায় নিয়ে যাবে?"
"আমাদের গ্রামে একটি ছোট নদী আছে। চল, তোমাকে সেখানে নিয়ে যাব।"
আমি খুব খুশি হয়ে বললাম, "যাব যাব, এখুনি চল।"
উনি একটি ছোট গামছা সঙ্গে নিয়ে আমার হাত ধরে চললেন। কিছুক্ষণ হাঁটার পর আমরা নদীর পাড়ে এসে পৌঁছলাম। সেখানে এসে আমার খুব আনন্দ হল। নদীতে অনেক নৌকা ভাসছে। নৌকা করে জেলেরা মাছ ধরছে। আমি দাদুকে জিজ্ঞাসা করলাম,"দাদু, এই নদীটির নাম কী?"
"এই নদীটির নামকরণ আমরাই করেছি। ঝিলমিল", দাদু বললেন।
আমরা কিছুক্ষণ ব'সে গল্প করলাম। তারপর ঘুরতে ঘুরতে এসে পড়লাম একটি পুকুর পাড়ে। পুকুরে বেশি জল নেই। পুকুরের পাশে রাখা ছিল ঢাকা দেওয়া একটি পাত্র। দাদু হঠাৎই ওই পাত্র থেকে একটি রুইমাছ বের করে কাঠ দিয়ে ওটির মাথায় আঘাত করলেন। মাছটি মারা গেল। তারপর দাদু সেই মাছটিকে পুকুরে ছুড়ে দিলেন। এরপরের ঘটনাটি যতবারই ভাবি, ততবারই ভয়ে আমার গা-এর লোম খাড়া হয়ে যায়। আমাকে অবাক করে দিয়ে জলের ভিতর থেকে একটি প্রকাণ্ড কুমির এসে খপাৎ করে গিলে নিল মাছটিকে। এই দৃশ্য দেখে আমার তো চোখ ছানাবড়া হয়ে গেল।
এরপরের ঘটনাটি আরও রোমাঞ্চকর। পুকুরের ভিতর থেকে হঠাৎ কে যেন ডেকে উঠলো, "দাদুভাই!" অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে দেখলাম, দাদু কাঁধের গামছাটি প'রে পুকুরে নেমে পড়েছেন। আমি ভয়ে চিৎকার করে উঠলাম, "একি, কী করছ? জলদি উঠে পড়ো। কুমির খেয়ে ফেলবে তোমাকে।"
"দেখো না দাঁড়িয়ে, আর কী কী হয়!", বলতে বলতে একলাফে দাদু উঠে পড়ল কুমিরের পিঠে। তারপর সারা পুকুর দু-তিন পাক ঘুরে কুমিরটিকে জড়িয়ে একটু আদর করে দাদু পাড়ে উঠে এলেন। কুমিরটিও আনন্দে একটি ভল্ট দিয়ে জলের নীচে চ'লে গেল। আমি কাঁপতে কাঁপতে দাদুকে জিজ্ঞাসা করলাম, "ও তোমাকে কিছু করল না কেন?"
দাদু হাসতে হাসতে আমার মাথায় হাত রেখে বললেন, "ও যে আমার পোষা!"
![]() |
| সৃঞ্জয় মৌলিক |
ছক্কুমামার গল্প ।। আবার ছক্কুমামা
অমিতাভ দাস
এ কী মামা ! মাথা নিচে ,পা ওপরে ! এই বয়সে —
ওভাবেই ছক্কুমামা বললে, ইদানীং যোগা করছি — ব্যায়াম, প্রাণায়াম...আর কত ওষুধ খাবো। বয়স তো অনেক হল। তাই ভাবছি একটু যোগা-টোগা করে দেখি...
বেশ তো। ভালো ভালো। দেখো সাবধানে। এই বয়সে ঘাড়টা ভেঙো না যেন...সব ব্যায়াম সবার জন্য নয় মামা।
মামা বললে, নে পা-টা একটু ধর, আস্তে করে ধরে নামা...
এবার মামা উঠে বসলেন। তারপর নাকের ওপর ডানহাতের বুড়ো আঙুল চেপে অনুলোম-বিলোম প্রাণামায় করতে থাকেন। কয়েক মিনিট পর বললেন, এসব এখন থেকেই কর। শরীর সুস্থ থাকবে। হার্টের সব ব্লকেজ খুলে যাবে।
বললাম, সময় হলে করব। এখন আমার হাতে অতো সময় নেই।
ব্যায়াম পর্ব শেষ করে মামা সোফাতে এসে বসলেন। বিশুদ্ধ তুলসীপাতা সমৃদ্ধ চা চলে এল। আমি আবার উৎকট গন্ধ যুক্ত এই চা- টা খেতে পারি না। তাই আমার জন্য ব্ল্যাক কফি এল।
বললাম, এখন তোমার শরীর ঠিক আছে? কোমরের ব্যথাটা...নাকি পেন কিলার খাচ্ছো আবার ব্যায়ামও করছ।
আরে সে কথাটাই তো বলবো বলে তোকে ডেকে আনা। ব্যাঙ্গালোর যাওয়া বাতিল। টিকিট ক্যানসেল কর। আমার যেতে ইচ্ছে করছে না।
সে কী? কেন? সে অনেক ঘটনা, বলে ছক্কুমামা বলা শুরু করলেন : সেদিন এক ভালো সাধক মানুষ এসেছিলেন আমাদের বাড়িতে। ভদ্রলোক জ্যোতিষী। কালীসাধক। বেনারস থাকেন। তন্ত্রচর্চাও করেন। আশ্রম আছে একটা। আমাকে দেখেই বললেন , তুই বাড়িতে শিবকে প্রতিষ্ঠা কর। দুর্গাপুজো করিস আর শিব প্রতিষ্ঠা করিসনি? সমস্যা সব কেটে যাবে। তিনি তোর বাড়ি আসতে চাইছেন। আমি তেমন আমল দেইনি । মৃদু হেসে বললাম, হাতে দেখলেন বুঝি?
আমার কথা বিশ্বাস করলি না, একদিন করতে হবে। এই বলে গেলাম।
একটু বিরক্তি নিয়েই তিনি চলে গেলেন।
ক'দিন পর, এবার দুর্গাপুজোর সময় বাড়ির পুরোহিতমশাইও ওই একই কথা বললেন। তারপরেও না করেছিলাম। হঠাৎ গত সপ্তাহে তিনি একটা শিবলিঙ্গ এনে হাজির। বললে, আমি নর্মদা পরিক্রমা করে ফিরলাম। সেখান থেকেই আপনার জন্যে এই শিবকে নিয়ে এসেছি। নিন এবার বাবার পুজো করুন। আমি পুরোহিতমশাইকে খুব বিশ্বাস করি। বললাম, এনেছেন যখন ,প্রতিষ্ঠা করে দিন। পুরোহিতমশাই বললেন, শিব আপনার কাছে থাকতে চেয়েছেন, তাই চলে এলেন। আমি ছোট্ট এক মাধ্যম মাত্র।
আর কোনো কথা চলে না। যথাসময়ে প্রতিষ্ঠা হলো শিব। আমি উপোস করে পুজো ও অঞ্জলি দিলাম। তুই তখন তোর মাকে নিয়ে বৃন্দাবন গিয়েছিলি। ঘটনা তো জানিস।
হ্যাঁ, মায়ের মুখে শুনেছি। তবে এখনো গল্পটা এলো না। ওটার অপেক্ষায় আছি। বললাম মুচকি হেসে।
না এটা গাঁজাখুরি গল্প নয়। আগে শোন।
তারপর আর কী! একটা মিরাকেল ঘটে গেল। তোমার কোমরের ব্যথাটা কমে গেল। তাইতো? বললাম আমি।
হাসি মুখে মামা বললেন ,আরে ঠিক বলেছিস। কী করে বুঝলি! বাড়িতে তিনি আসার সাত-আটদিন পর থেকেই ব্যথা আর নেই। পেন কিলার ফেলে দিয়েছি। পুরোহিতমশাই বলেছেন, কেবল যোগা করুন।
বললাম, এটা বুঝব না, এতকাল মিশছি তোমার সঙ্গে। বাঘের পঁচিশ হাত লম্বা লেজের গল্পের মতো এই কাহিনির শেষটা কোথায়, আমার জানা। আফটার অল আমি একজন সাহিত্যিক। আর কত গুল দেবে মামা!
মামা রীতিমত রাগত স্বরে বললেন, এটা গুল নয়। সত্য। সাত-আট দিন পর থেকে আর ব্যাথা হয়নি ,বিশ্বাস কর। দিব্য ভালোই তো আছি।
আমিও সুযোগ পেয়ে বললাম , এবার থেকে যার যার কোমরে ব্যথা হবে তাহলে তোমার কাছে পাঠিয়ে দেব। কী বল !!
ছক্কুমামা রাগ করে সোফা ছেড়ে উঠে ঘরের বাইরে গেলেন। কলঘরে যেতে যেতে বললেন, টিকিটটা ক্যান্সেল করিস। আর হ্যাঁ, আমি কাশী যাবো বাবা বিশ্বনাথ ডেকেছেন। তুই সঙ্গে গেলে তোর টিকিটটাও কেটে নিস।
বললাম, মামা কীভাবে তিনি ডেকেছেন? ফোনে, স্বপ্নে নাকি সরাসরি?
চোখ কটমট করে মামা বললেন, স্বপ্নে।
![]() |
| অমিতাভ দাস |
।। । । শৈশব স্মৃতি।।। ।
গ্রীষ্মদুপুরের সেই দুষ্টুমিগুলো
মানসী গাঙ্গুলী
'ঠিক দুপুর বেলা ভূতে মারে ঢেলা।'
ছোট্টবেলার দুপুরগুলো ছিল এমনই নিঝুম নিঝুম, বেশ একটা থমথমে ভাব। মাঝেমধ্যে বাগানে এক আধটা পাতা পড়ার খস্-খর শব্দ অথবা ছাদের কার্নিশের নিচের ঘুলঘুলিতে বাসা করা ঘুঘুঘ ঘুউউ, ঘুঘুঘ ঘুউউ, ঘুঘু পাখির উদাস করা ডাক মাঝে মাঝে নৈঃশব্দকে খানখান করে দিত। দূরে কৃষ্ণচূড়া গাছটা লালে লাল হয়ে যেন আগুন ছড়াত নিঃশব্দে। বাগানের কনকচাঁপা ফুলেরা সুবাস ছড়াতে কার্পণ্য করত না প্রখর ঐ তাপেও।
ছোটবেলার সেই চিত্রগুলো হয়তো আর তেমন নেই। কাল বদলের সঙ্গে সঙ্গে রঙ বদলেছে তারাও। তবে অবসরে সেই ছোট্টবেলার দুপুরে ঘুরে আসাটা এখনও বেশ রোমাঞ্চ জাগায় মনে। সেই খাঁ খাঁ দুপুর, মা ঠাকুমার বিশ্রামের সময়, প্রচণ্ড দাবদাহের মধ্যেই ছিল আমাদের যত রকমের দুষ্টুমি।
গরমের ছুটি ছিল বেশ দীর্ঘ, আর এই ছুটির দুপুরগুলো দুষ্টুমি ছাড়া আর কী-ই বা করার থাকে? তবে হ্যাঁ, ঠাকুমার গোটা কতক পাকা চুল তুলে দিয়ে তবেই দুষ্টুমি শুরু। আমি, দিদি পিঠোপিঠি দুই বোন, বাড়ির নিচের তলার সমবয়সী পাঁচ-ছ জন, পাশের বাড়ির দু-তিনজন মিলে কত কাণ্ডই যে চলত ওই নিঝুম নিস্তব্ধ দুপুরে।
কখনও 'খেলনাবাটি' খেলা, কখনও বা আচার খাওয়া, কখনও নাচ -গান -নাটক, নিজেরাই নিজেদের নিয়ে মত্ত। বাড়ি থেকে বেরোবো না জানতেন, তাই মা ঠাকুমা নিশ্চিন্তে বিশ্রাম নিতেন। বেরোবো কী, ছেলেধরার ভয় ছিল না! সেই খাটো ধুতি, গায়ে গেঞ্জি, মাথায় পাগড়ি, গালে গালপাট্টা, কপালে ইয়াব্বড় সিঁদুরের টিপ, রক্তবর্ণ দুটো চোখ, বইয়ে পড়ে, ছবি দেখেই হাড় হিম। দুপুরের সেই জমায়েতে তাদের নিয়েই কি কম আলোচনা ছিল নাকি!
'খেলনাবাটি' চলত আলুর ঘরে, ঠাকুমার কুটনো কাটার ঘরে, শোবার ঘর থেকে অনেকটা দূরে। সমস্ত 'খেলনাবাটি'র সরঞ্জাম সেই ঘরে। সেখানেই চলত রান্নাবান্না, স্কুল, অফিস, সিনেমা ঘরের কোণে কোণে। আগের রাতে নারকেলের মালায় ভিজিয়ে রাখা চালের খুদ কোন ম্যাজিকে যেন ভাত হয়ে যেত। সেই ভাত দিয়ে আবার পায়েসও রান্না হত আমাদের খেলাবাটিতে। পায়েসের জন্য দুধ চাই, তো চললাম নারকেলের একটা মালা নিয়ে বাগান পেরিয়ে গোয়াল ঘরে। নারকেলের মালা ভর্তি করে গরুর দুধ দুয়ে নিয়ে চলে আসতাম। কিচ্ছুটি বলতো না তারা। পরনে থাকত ছোট ছোট শাড়ি ঠাকুমার কিনে দেওয়া। ঘরকন্না করবার জন্য তা পরে, ছোট্ট করে মাথায় ঘোমটাও দিতাম। আমার বর হত দিদি, ছোট শাড়িটা ধুতির মত করে পরে ফেলত। কাঠের আলমারি থেকে মায়ের ভ্যানিটি ব্যাগ বার করে আনতাম বরের সঙ্গে মিছিমিছি সিনেমা যাবো বলে। সে আমাদের হৈচৈ-এর সংসার ছিল।
ছিল পুতুলখেলা, তাদের কাপড় পরানো, খাওয়ানো, শোয়ানো, স্কুলে পাঠানো, চান করানো সবই চলত। ছোট ছোট খাট, আলমারি, ড্রেসিং টেবিল সব ছিল সেই পুতুলের সংসারে। কখনও আবার ঘরে বসেই আগডুম বাগডুম, ইকির-মিকির বা কলাগাছ কিংবা কাটাকুটি বা চোর পুলিশ অথবা লুডো খেলা সবরকমই চলত। গ্রীষ্মের সেসব দুপুর, প্রখর দারুণ তাপে দগ্ধ যখন, ছিল আমাদের আমছেঁচা খাওয়া। বাড়িতে দাদুদের আমলের তিন হাত লম্বা শিল পাতাই থাকত একটা ঘরে, তার একদিকে গর্ত বলে দেয় কত যুগ যুগ ধরে নোড়া দিয়ে ঘর্ষণ হয়েছে এতে। সেই শিলে ছেঁচা হত আম। কেউ হয়তো জোগাড় করে আনত পুকুরের ঝিনুক, তাকে ঘষে ঘষে মাঝখানে ফুটো করা হতো আর সেই ফুটোতে হতো খুরের মত ধার। সেটি আমের গায়ে বসিয়ে তার খোসা ছাড়ানো হত দিব্যি। তারপর ঠুকঠুক করে শিলে আমছেঁচা, ৪-৫জন শিল ঘিরে বসে, সে কী উত্তেজনা। পাল্টাপাল্টি করে হাত লাগাত সবাই, নোড়ার বাড়িও খেতাম সবাই, তাও দমে যাবার পাত্রী নই কেউ। এরপর রান্নাঘর থেকে নুন, তেল, চিনি সরষে-লঙ্কাবাটা থাকতই একতাল, সব মাখিয়ে তৈরি আচার। এ ব্যাপারে আমি ওস্তাদ, একটু করে মাখি আর চাখি। বেশ খানিকটা সাবাড় তাতেই, তারপর ভাগাভাগি। বাগানে তখন সবকটা হাজির, গাছ থেকে কলাপাতা ছিঁড়ে, সেসব ধোয়ার বালাই ছিল না তখন মোটে, সবাই চোঙের মতো ঠোঙ্গা বানিয়ে ধরে থাকত, আর আমি ভাগ করতাম। দেবার সাথে সাথেই সব সেই ঠোঙার নিচে মুখ দিয়ে কাঁচা আমের ঝোল চুষে চুষে মুখে চাকুম চুকুম আওয়াজ তুলে ভাললাগা প্রকাশ করত। আহা লিখতে লিখতেই জিভে জল চলে এল। কখনও বা আম দরজায় ফাটিয়ে নুন দিয়েই কচর মচর। আবার কখনও ঠাকুর ঘরের মাটির হাঁড়ি থেকে এক তাল পাকা তেঁতুল বার করে নুন, তেল, গুড়, কাঁচা লঙ্কা রগড়ে হত আচার। সবাই একদলা করে পেত। বুড়ো আঙ্গুল দিয়ে একটু করে নিয়ে মুখে দিয়ে টকাস টকাস আওয়াজ তোলার সেসব আনন্দের দিনগুলো হারিয়ে গেল।
এছাড়া ছিল নাচ, গান, নাটকের মহড়া। প্রখর দারুণ সেই দীর্ঘ দগ্ধ দুপুরে মানুষ ঝলসে যাচ্ছে যখন আমাদের বিরাট ফরাস পাতা বৈঠকখানায় তখন খরবায়ু বইত, অথবা পৌষ এসে হাজির হত। সবাই সবার কোমর জড়িয়ে সমস্বরে গান ও নাচ, চলত নাটকের মহড়াও, বিকালে উঠোনে তা মঞ্চস্থ হত। কখনও রানা প্রতাপ, কখনও বা বুদ্ধং শরণং গচ্ছামি, যেখানে আমি হতাম শ্রীমতি। আবার কখনও আনন্দনাড়ু, মায়ের শেখানো, ভারী মিষ্টি গল্প। সেখানে আমি সাদা শাড়ি পরা মিতালী সুন্দরী, কালো শাড়ি পরা হিংসুটি সুন্দরী আর লাল শাড়ি পরা ঝগড়াটে সুন্দরীকে আনন্দ নাড়ু খাইয়ে মিল করিয়ে দিতাম। আহা চিরকাল যেন এমন মিতালী সুন্দরী হয়েই থাকতে পারি।
আর 'রানা প্রতাপ' নাটকের জন্য কত প্রস্তুতি। বৈঠকখানা ঘরটা ছিল আমাদের রোজকার স্টেজ, সেখানেই রিহার্সাল হতো। শত্রুরা এসে পড়লে বৈঠকখানার পাঁচ ছটা কুলুঙ্গি থেকে ঝুপ ঝুপ করে সেনারা লাফিয়ে পড়ত হাতে তরোয়াল নিয়ে। সে তরোয়াল তৈরি করে দিত আমাদের দাশু, কত আবদার সহ্য করত সে আমাদের। দাশু ছিল সাঁওতাল, হাতের কাজ ছিল তার খুব পরিষ্কার। বাঁশ ফালা করে কেটে এমনভাবে চাঁচতো তাতে একটাও চোঁচ থাকত না, যাতে কোনোভাবে আমাদের ছোট ছোট নরম হাতে ফুটে না যায়। তাই দিয়ে ছোট ছোট তরোয়াল বানিয়ে মায়ের কাছ থেকে আলতা চেয়ে তার ডগাগুলো লাল করে দিত, যেন আমরা শত্রুকে মারলাম আর রক্ত বেরিয়ে গেল। আমরা সেই রক্তমাখা তরোয়াল শত্রুর বুকে বসিয়ে দিতাম আর সে জিভ বার করে উল্টে পড়ে যেত যেন তরোয়ালের আঘাতে মরে গেছে। আর এসব নাটক উঠোনে মঞ্চস্থ হলে পাড়ার যত ছেলেপুলেদের ভিড়ে ও হাততালিতে মুখর হয়ে উঠত উঠোন প্রাঙ্গণ। কিন্তু মায়ের আমার পিওর সিল্কের শাড়িগুলো আর পরার অবস্থায় থাকত না। উঠোনে কাপড় শুকোতে দেবার তারের ওপর দিয়ে মায়ের শাড়ি টাঙ্গিয়ে তৈরি হত মঞ্চ সেই দুপুরবেলায়।
আবার মাঝে মাঝে সঙ্গীর অভাবে দিদির সঙ্গে মারামারিতেই কাটত সে দুপুর। ছুটি পড়লেই ঠাকুমা ভদ্রেশ্বরের মেলা থেকে কাঁচের চুড়ি পরিয়ে দিতেন সব বোনেদের কিন্তু তখন ঝগড়া মারামারির সময় দুজনের টার্গেটই হত দুজনের চুড়ি। শেষে দালানময় কাঁচের টুকরো ছত্রাকার।
গরমের ছুটির কিছুদিন আবার মামার বাড়িতে কাটত আমার আর দিদির। বড়ই আদর ছিল আমাদের সেখানে। দিদিমা নানারকম আচার করে রাখতেন আর সারাদুপুর আমরা সেসবের সদ্ব্যবহার করতাম। ইজেরের পকেটে খানিক পুরে খেতে খেতে চলে যেতাম বাড়ি থেকে দূরে যেখানে বাড়ির চাকর ধম্মা গরু চড়াতে নিয়ে যেত। আরও অন্যান্য বাড়ির চাকরেরাও গরু নিয়ে যেত সেই মাঠে। সেখানে কিছু সময় থাকার পর গরম লাগলে পালিয়ে আসতাম দুইবোনে। কিন্তু এতবড় দুপুরটায় করি কী! বাড়ির উল্টোদিকে ছিল মামাদের গোয়ালবাড়ি, সেখানে টিনের চাল দেওয়া ঘর, বারান্দা, ছিল ঢেঁকি, কাজের মানুষরা দুপুরে ধান কুটত সেখানে। সেখানে গিয়ে উৎপাত করতাম আমরা। আমিই বেশি, সেই ঢেঁকি চালানো শিখিয়ে দিতে হত আমায়। আরও যে কত কী, কত আর বলি!
বড় হবার সঙ্গে সঙ্গে গ্রীষ্মের দুপুরের রঙ বদলাতে লাগল, কিন্তু সেই ছোট্টবেলার দুপুরগুলো আর ফিরে এল না কোনোদিন। তাই সেই ছোট্টবেলায় যখন তখন ডুব দিই আমি সেই অনাবিল সুখের খোঁজে।
![]() |
| মানসী গাঙ্গুলী |
।। । । ছবির পাতা।।। ।
![]() |
|
জয়দীপ সাহা, দশম শ্রেণি, সোদপুর হাই স্কুল, উত্তর ২৪ পরগণা
|
![]() | ||
|
শ্রেয়সী ঘোষ। সপ্তম শ্রেণি ঝাপানডাঙ্গা সাবিত্রী দেবী বালিকা বিদ্যালয়, পূর্ব বর্ধমান |
সাইন্যাপস্ বিজ্ঞাপণ---------------------------
.png)

.jpeg)


















