সাইন্যাপস্ ধারাবাহিক কলাম
সাইন্যাপস্ ধারাবাহিক
আত্মকূটকথা।। শ্যামলজিৎ সাহা
সারে চার দশক ধরে চুঁচুড়ার কবি শ্যামলজিৎ সাহা কবিতা-জীবন যাপন করে চলেছেন। জন্ম ১৯৫৯; ম্যনেজমেন্ট পঠনের পরে কেন্দ্রীয় সরকারি চাকরি এবং পরে ব্যাঙ্কে কর্মজীবন। আশির দশক থেকে নিরবিচ্ছিন্ন কবিতাচর্চা। প্রথম কাব্যসংকলন ‘মুগ্ধকথা’(১৯৯২)। পরের কাব্যসংকলনগুলি — ‘বীজাক্ষর’(২০০৮), ‘সময়ের সান্ধ্যপাঠ’(২০১৬), ‘অন্তর্নিহিত’(২০২৫)।একদা কবিতা লেখার পাশাপাশি লিটল ম্যাগাজিন সম্পাদনা — ‘শায়ক’। নৈহাটির আজকাল/আজকাল টাইটোনিডির কবিগোষ্ঠীর সঙ্গে যুক্ত থেকেছেন। নিবন্ধ রচনা ও পুস্তক আলোচনা কবির প্রিয় বিষয়।
পর্ব এক।। কবিতা নিয়ে ভাবনা : কবিতা নিয়ে তাগিদ
বাল্যকালে একদা মা-র কাছে তাঁর পিসিমার লেখা একটি হলুদ পাতা
চোখে পড়েছিল। তাতে সেই
পিসিমার লেখা একটি দীর্ঘ নিখুঁত ছন্দের কবিতা পড়ে ছিলাম। কবিতাটির বিষয়বস্তু এখন আর মনে নেই; এবং পরিতাপের বিষয় তা সংরক্ষণ করার
সুযোগও হয়নি। এ যাবৎ কাল সেই
কবিতাটি আমি এখনও খুঁজে চলেছি কিন্তু এখনও তার হদিশ পাইনি। একাদশ শ্রেণীতে পড়তে পড়তে পাঠ্য বইয়ের কিছু
কবিতা মনের ভেতরে কোথাও যেন একটা ছবি ছন্দ দোলায়মানতা তৈরি করে দিয়েছিল। চেষ্টা করতে থাকি কিছু
লিখে ফেলবার, সেই
বয়ঃসন্ধির সময় এমন কিছু কথা যা সহজে কাউকে বলা যায় না তাই যেন ভালোবাসার রূপকে
কবিতার মতো কিছু একটা হয় — এই হলো শুরুর কথা। এ সময়ে কিছু সমমনস্ক বন্ধুবান্ধব ও মাস্টারমশাইয়ের উৎসাহে
একটি পত্রিকাও বের করে ফেলি। পরে পরে সেই
পত্রিকার সূত্রপাতে আরো সম্পাদক ও কবিবন্ধু জড়ো হয়। আমি ক্রমে নৈহাটির একটি পত্রিকাগোষ্ঠীতে আড্ডায়, কবিতাপাঠে এবং কবিতার বইয়ের সন্ধানে মেতে
উঠি। এইভাবে মনের
ভেতরের একটি গোপন স্রোত ক্রমে কবিতার খাতায় প্রবহমান হয়ে ওঠে।
কবিতাযাপনের সেই শুরু যা আজ প্রায় সারে চার দশক ধরে আমাকে
নিবিড় বন্ধনে জড়িয়ে রেখেছে। লিখতে
না পারলে বিপদ আবার লিখলেও বিপদ এক অদ্ভুত জীবন, যেচে
নেওয়া কষ্ট যা অব্যক্ত, অশান্ত, অজানিত। এর কোনো বিরাম
নেই; অন্তত চিন্তার
কোষে হৃদয়ের রক্ত প্রাবাল্যে। সেই যে কবি
বলেছিলেন না ‘কাগজ কলম নিয়ে চুপচাপ বসে থাকা আজ’। বসে থাকি, খোলা জানালার দিকে, নির্নিমেষ, সাড়হীন, কলম নড়ছেনা কোথাও। কিংকর্তব্যবিমূঢ়
দিশাহীন — যেমন গত তিনমাস না লেখার ভেতরে এক
নিদারুণ সময় চলেছে। তবু ভাবনার
আহ্বান এড়াতে পারিনা — বিষয়ের শেষ নেই। তোমার সামনে — তোমার পেছনে; শুধু খুঁজে নিতে হয় এটাই সারাৎসার।
পালানোর উপায় নেই, এই ফাঁদে যে
একবার পা দিয়েছে তার পালানোর উপায় নেই।
তবে অনেক হয়েছে প্রেমের কবিতা লেখা, বৃষ্টির কবিতা লেখা, অবদমনের কবিতা লেখা। কলমই তো সেই শক্তি যা তরবারির থেকেও সময় সময় ধারালো হতে
পারে। কবিতা
তো হৃদয়বৃত্তির কথা বলে, সেখানে কোনো সাজানো পটভূমি
নেই; একমাত্র
পটভূমি যা তোমার রচনা দিয়েই তৈরি করে নিতে হয়। যেন এক গোপন অস্ত্র যা তোমার জীবনযাপন, সোজাসুজি দেখা পথ, আর সত্যকে নিয়ে চালিত হয়। সত্য ছাড়া জীবন
হয়না, অহর্নিশ সত্য
এবং তাকে যেভাবে দেখলাম তাই যেন কবিতার শরীর মেলে ধরে। একজন কবির জীবন সেইরকমের ভাবনার মতই হবে যা নিজচক্ষে অবলোকন
করিলাম তাহাই লিখিব। কোনো বানানোর
কথা তাতে লিপিবদ্ধ হবেনা, জীবনের প্রতিটি
মুহূর্ত হতে হবে বিবেকতাড়িত, কোনো মিথ্যে সেখানে নেই; কোনো লুকোচুরি নেই; রাজনীতি সে তো অনেক দূরের ব্যাপার।
আজকাল দেখি কবিতা পত্রিকা প্রকাশ নিয়ে খুব প্যাঁচপয়জার চলে। একটু চক্ষু প্রসারিত করলেই সব বোঝা যায়। প্রচারের সবিশেষ টান, মোহগ্রস্ততা আর মাথা নীচু করে নিজের পরিব্যপ্তি বাড়ানো। এ
এক নিম্নমানের অভিরুচি, কবিরাই হবেন
সমাজের সব থেকে সম্মানীয় ব্যক্তি, তবে তার কেন এই মোহমুদগার স্রোতে নিজেকে ভাসিয়ে দেওয়া? আপনি সম্মানিত একমাত্র
আপনার কবিতার ব্যাঞ্জনায় সেখানে অন্য কোনো তৎপরতা নিছক আত্মপ্রসাদ। অতীতের দিকে তাকালেই বোঝা যাবে কেন জীবনানন্দ দাশ থেকে
প্রণবেন্দু দাশগুপ্ত পর্যন্ত এখনও আমাদের আদর্শ উদাহরণ। প্রকৃত কবি সেইজন যিনি তাঁর আত্মমান নিছক মোহজালে সমর্পণ
করেন না। এসব হলো কবি ও
তার চরিত্র নির্মাণের গোড়ার কথা। এবার কবিতা
নির্মাণের ক্ষেত্রে তাগিদের কথায় ফিরি।
কবিতা রচনার প্রথম তাগিদ নিজের জীবনবোধ থেকেই
নির্মিত হয়। তাঁর
দেখা শোনা ঘটনা প্রবাহ কোনো কিছুই এড়িয়ে যাবার নয়। সামান্য কিছু লতা-গুল্ম রাস্তার একধারে দেখেছি অন্য একটি
অবহেলায় বেড়ে ওঠা বড়ো গাছটিকে ধরে বেড়ে উঠছে। দৃশ্যকল্পে যেন বড়ো গাছটি মা গাছ হয়ে অন্য ছোটো
লতা-গুল্মদের সন্তানের মতো স্নেহবশে আঁকড়ে রেখেছে। আবার দেখেছি এক আদিবাসী রমণী রাস্তার ওপরে মুখ থুবড়ে পড়ে
আছেন আর তাঁকে উদ্ধারের পরে সে যেন আমার ঘাড়ে মাথা রেখে আশ্রয় খুঁজেছে। এও তো সেই
কবিতাই। শুধু ঘটনার
কাব্যরূপ আর তাকে কিছু মানুষের কাছে কাব্যকুহকের মতো পৌঁছে দেওয়া। এর আবেদন তখনই সম্পূর্ণ হয় তা যেন সার্থক রূপে কবিতার আকার
পায়। তখন চেনা জানা
ছন্দ ব্যকরণ সব মিথ্যে একমাত্র সত্য শব্দের সঠিক দ্যোতনা। আমি ঘটনাকে এভাবেই লালন করি : সেখানে মিথ্যের কোনো ছলাকলা
নেই আমার জীবন যাপন, সময়ের সঙ্গে
অভিসার সব, সব যেন সেই
কবিতার মুহূর্ত প্রতি মুহূর্তে তাকে নিয়ে ঘর করা। পল্লীগ্রামে থাকাকালীন দেখেছি কতো না পটভূমি — সেখানে প্রথম ভোরের সূর্য যে কমলা বর্ণের
হয় তা জানা ছিল না, জানা ছিল না
রাজহাঁসের রাস্তা চলাচল আর তাদের নিজ ইচ্ছায় সামনের সব যান চলাচল বন্ধ করে দেওয়া। সব যেন তাদের ইচ্ছায় আর সম্মতিতে চলে। আবার সরু সুতোর জালে খ্যাপলা মেরে মেয়েদের মাছ ধরা। কাকে দেখবো কী দেখবো — তাদের জলে ভেজা কাদায় লেপা শরীর না চুনো মাছের ঝাঁক। দূর থেকে ঝড়ের আগমনের শব্দ সব কিছুই যেন বা কবিতা। ভয়ে দরজা বন্ধ করি ভাবিএইসব দৃশ্যসমূহ ছবি না কবিতা এক
অদ্ভুত শিহরণের মধ্যে সময় কেটে যেতে থাকে।
এত বছর কবিতার সঙ্গে কাল কাটানোর পর ক্রমশই
নিজের প্রতি আরো সন্দিহান হতে থাকি। কী লিখলাম এতদিনে কবিতা না ভ্রম, পড়া বা শেখার শেষ নেই; আর কবিতাপাঠ সে এক বিশেষ অধ্যায়, ভালো কবিতা মন্দ কবিতা কতো না সংকট। সমুদ্রস্রোতের মতো এর পরিধি, কারোর কবিতা তীরে এসে ভেঙে পড়ছে কিন্তু ওই পর্যন্তই আবার
কারোর কবিতা দীর্ঘ স্রোতের ভেতরে সপ্রাণ। এই সেই ঐশ্বরিক
কবিতা যা ধারণ করতে হবে শুধু কল্প জগতের নিছক খেলা নিয়ে নয় ঈশ্বরীর কবিতা নিয়ে
ধারণা সুস্পষ্ট হতে হবে। কবিতা রচনার
ক্ষেত্রে আরো একটি বিষয় প্রায়শই মনে আসে — তা হচ্ছে কবিতা রচনা মানে নিভৃতির সাধনা একান্ত গোপন
চিলছাদে চুপচাপ বসে থাকা। এক
এক সময় মনে হয় কিছু লিখবো না শুধু সময়ে ভাববো এক সময় সে ধরা পড়বেই তখন সংসার, তখন
ধর্ম সবই
যেন মিথ্যে একমাত্র কবিতাই সত্য। সেই শূণ্যতার অবসান থেকে
কবিতার প্রকৃত শরীর খাতায় খোদিত রূপে ধরা পড়বে। এ এক ধৈর্যের পরীক্ষা তবু
শেষপর্যন্ত কবিতা রচনা এক অলৌকিক বিষয় বলেই মনে হয়।
কতকটা দ্বিধা নিয়েই এই প্রসঙ্গটায় আসছি। অনেক বছর আগে একটি লিটল
ম্যাগাজিনের পাতায় এক অহং সর্বস্ব শ্লোগান ছিল, ‘নিন্দা বা প্রশংসা সমান জরুরি’। তখন লেখালেখির কাঁচা বয়সে
আমি শ্লোগানটির ভেতরকথা পর্যন্ত পৌঁছতে পারিনি। পরে পরে বয়স পাকার সঙ্গে কেন
জানিনা আপ্ত বাক্যটির সর্বান্তকরণ মানে নিয়ে প্রায়শই ভাবতে থাকলাম। এবং ভাবনা সকল এখনও লেখার পথে পথে চলতেই থাকে, ভাবি যিনি আমার লেখাটির গুণাগুণ করছেন তিনি ঠিক
সত্য কথাই বলছেন তো? না আমাকে নিছক সন্তুষ্ট করে প্রবোধ দিচ্ছেন।
সন্দেহ ও নিঃসন্দেহ তখন একাকারে চলে যায়। আমি থমকে যাই, আমি আলো ও আঁধারের হদিশ করতে পারিনা। তবু ভাবি
আমি কেন এতো কথা ভাববো। আমার কি দরকার। ভালো বলেছেন, বেশ। তাতে আমার আত্মতুষ্টি বাড়লে কি এমন ক্ষতি? বরং লাভই হলো, আমার ভবিষ্যৎ লেখার প্রতি দায়বদ্ধতা বাড়লো, আমি আমার নিবেশ আরো একাগ্র করতে পারবো এবং ভালো
লেখার জন্য আরো ভেতরে ভেতরে সংকল্প করব।
কিন্তু, তা তো হওয়ার নয়; ওই যে মানুষ বড়ো সন্দেহপ্রবণ। কেউ ভালো বললেও খারাপ আর খারাপ বললেও আরো আরো
তীব্র হলাহল। ভাববো আমার লেখার সমালোচনা করে তিনি আমার লেখার বুঝদার হতে পারেননি।
তিনি হয়ত’ আমার উন্মেষ চান না অথবা
অসূয়া পোষণ করেন। আসলে ভাবনাগুলি পরপর অস্বাভাবিক মনের বিকারেই এসে যায়। মানুষ বড়ো
ভাবপ্রবণ জীব, সে ভালোত্বটুকুই বেশি বোঝে
আর খারাপ বা বিরুদ্ধকথা বললেই তার ভেতরটুকু এক অন্যরকমের স্নায়ুবিকার হতে থাকে। আর যাঁরা এসব ব্যাপার মোটেই পাত্তা দেন না, তাঁদের এ বিষয়ে উপেক্ষাই থাকে। থাকে এসব আলোচনা
বা সমালোচনার উদ্দেশ্যে। তাঁরা মহৎ লেখক, তাঁদের প্রজ্ঞা এক নীরব
গৃহকোণের মধ্যেই বসবাস করে। নিরবচ্ছিন্ন স্তুতি তাঁদের ছোঁয় না। নির্বিকার একতরফা
লেখার প্রতি একনিষ্ঠ মনোযোগ। তবু এইসব চরিত্র অতি নগণ্য, হাতে গোনা মাত্র। তাঁরা তাঁদের আমূল চরিত্র নিজ
গুণে বদলে দিয়েছেন। তাঁদের ভাবুক মন, একনিষ্ঠতা, আর জীবন-যাপন একলাইনের মাত্রা দিয়ে চলতে
দিয়েছে। তাই তাঁরা লেখার প্রতি যে মগ্নতা আর ধ্যান দিয়েছেন, তা যেন মনে করায় বীজতলা থেকে ধানের দুধ পর্যন্ত
এক নীরব চাষির নিবিষ্ট কর্মকাণ্ড।
আর বাকি যাঁরা এরকম নন, তাঁরা কি তাঁদের লেখার প্রতি যত্নবান নন? তাঁরা কি শুধুই নাম আর যশের প্রতি বিলাসী থেকে
যেতে চান? প্রশ্ন থেকে প্রশ্ন — এর কোনো শেষ নেই; তো এতো ভাবনারই বা কি দরকার? যার যেরকম দর্শন। এসব চলতেই থাকবে নিরন্তর।
বহুবছর আগে আমি দেখেছিলাম কবি অরুণ মিত্র-কে। কী ভাবলেশহীন একজন মগ্ন কবি। মাথা ভর্তি রুপোলি চুলের ভেতরে বসে রয়েছেন প্রজ্ঞাবান কবি। তার
বিছানার নীচে শুধু বই আর বই। কোনও বড়ো প্রশ্ন করার সাহস পাইনি সেদিন। আর কবি বিনয় মজুমদার, তিনি তো অন্য পৃথিবীর লোক তার নিন্দা বা
প্রশংসায় কিছু এসে যায়নি। প্রকৃতপক্ষেই তাঁর কিছু এসে যায় না। অথবা কবি আলোক সরকার যেন নিভৃত প্রাণের দেবতা। তাঁর নিরন্তর বসবাস
প্রকৃতিমধ্যেই। সব অলৌকিক ঘটনা সমূহ তিনি রেখে দিতে চান কবিতার শরীরেই শুধু।
তাই এরকম যাঁরা ছিলেন, তাঁরা কয়েকজন মাত্র। কবিতা লিখতে বসলে আবেগটুকু সংযত ও সংহত হওয়ার
চেষ্টা করে যেতে হয়। তখন পাগলপারা লাগে। তখন জীবন আর জীবনাবসানের মধ্যবর্তী
অবস্থা। রিলকে, র্যাঁবো, ব্যোদলেয়ার যেরকম সারস্বত ভাবনায় বশবর্তী ছিলেন।
যৌবনের শুরুতে কত না পত্রিকায় লিখেছি। কিছুদিন
আগে সেইসব কাগজ, লাল হয়ে যাওয়া কাগজের ভেতরে কত না পুরনো গন্ধ।
আবিষ্ট হয়ে কিছুক্ষন পরে পরে অতীত ভাবনারা হামলা করে। এইসব কবিতাগুলি কেন ছাপতে
দিয়েছিলাম? এখন মনে হয় হয়তো তারা কবিতাই ছিল না, আরো আরো ধৈর্য্য রাখা উচিৎ ছিল প্রকাশের তরে। যৌবন সব বুঝতে পারে না, নিন্দা বোঝে না, প্রশংসা খানিক বুঝতে পারে আর প্রকাশের
রাজনীতি বোঝা সে তো অনেক দূরের ব্যাপার। রাজনীতির প্রসঙ্গ কেন আনলাম? লেখার শুরুতে কত লেখা লোকে বলে বাতিল বাতিল, কিছুই হচ্ছেনা। চাই আরো অনুশীলন আরো নিবিড়
জাগ্রত মনোজগত। আমি তখন উদ্বেল, আমি তখন নিজের নাম মুদ্রিত
অবস্থায় দেখতে চাই। তাই যাঁরা আমার লেখা ছাপলেন না আমি স্বল্প বিদ্যায় বুঝে নিলাম
তাঁরা হয়তো আমার লেখা ধরতেই পারেন নি অথবা আমি তাঁদের দলে পড়ি না বলে কবিতা ছাপা হয় নি। আর এর থেকেই যেন
রাজনীতির গন্ধটা ঘুলিয়ে ওঠে। তবু কিছু কাগজে লেখা ছাপা হয়, একটু একটু করে লোকে জানতে পারে আমার কবিতা।
কিন্তু ওই যে সন্দেহ নামের রাক্ষস-টা আমাকে ক্রমশ প্ররোচনা দিতে থাকে,
‘কিছু কি হলো’? তখন নিজেই নিজের কপালে একান্তে করাঘাত করি, লেখাগুলি নির্বিবাদে মরে — পুড়ে আংরা হয়ে যায়। সেই খাতাগুলি ভরে থাকে কবিতায়, কিন্তু এক সময় জরাজীর্ণ, ধুলিবসন হয়ে পড়ে। পুরনো লেখাগুলি ক্রমে দূরে
অন্ধকারময় অতীতের গর্ভে বিলীন হয়ে যায়।
এরকম মনের অস্থিরতা সব কবিতা লেখকেরই সম্ভবত
হয়ে থাকে। কম বা বেশি। তবে তার মাত্রা এক একজনের কাছে এক একরকম। স্বভাবতই নিন্দাসূচক বাক্য বা সমালোচনা কেউই
সোজাভাবে নেন না। তাতে তাঁরা হতোদ্যম হতে পারেন না নিস্পৃহ হতে পারেন। আবার একাকীও হতে পারেন, নিঃসঙ্গ নিভৃত। তখন সব সান্ত্বনার শেষ হবে
তাঁদের ওই কবিতাগুলি। ওই যে রমেন্দ্রকুমার বলেছিলেন শেষপর্যন্ত কবিতাগুলিই থাকবে, তারাই সন্তান তারাই মুখে আগুন দেবে। খুব কমজনই এরকম ভাবনায় সাহসী থাকেন। নির্বিকল্প
কেউই নন, যাঁরা এসব চিন্তা মনের গহনে রেখে দেন, তাঁরা প্রহেলিকার স্তরে থাকেন। হয়ত নিজেকে
বিড়ম্বিত করেন। সুতরাং নাম যশ কীর্তি সব এক একটি স্তর যা লেখাকে ক্রমে শত্রু করে, প্রতারণা করে, নিজপ্রতি সন্দেহ যুক্ত করে। তা বলে কি কেউ
যশঃপ্রার্থী হবেন না? নাম কিনবেন না? হাতে তুলে দেওয়া পুরস্কার নেবেন না? প্রশ্ন প্রতিমুহূর্ত তাড়া করে ফেরে। নিজেকে
নিয়েই উত্তর খোঁজা যাক — আমি কি তবে যশঃবিমুখ হব? এবং সেটা কিভাবে হব। যদি কোনোদিন কবি হিসেবে স্বীকৃত হই, তা কি কাঙ্খিত হবে না? যদি বলি না, তাহলে প্রতারণা হবে নিজেরই সঙ্গে। শুধু কোথাও একটা গণ্ডি টেনে রেখে দিতে হবে এবং
প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হবে। কাকে যশ বলে, কাকেই বা স্বীকৃতি বলে? ভাবতে ভাবতে দিন ফুরিয়ে রাত চলে আসে কিন্তু
মীমাংসা হয় না। যে সূক্ষ্ম মন নিয়ে আমরা মোহসঞ্জাত বিষয়ের
সম্মুখীন হই তার তল পাওয়া মুশকিল। আর যাঁরা লেখার ভাবনায় শেষটুকু ওই নিজ-নাম, আর নামযশটি মাথার ভেতরে রেখে কলম চালান তাঁরা
কি শেষাবধি হারিয়ে যাবেন? কেননা তাঁরা এক মনবিকলনের শিকার মাত্র। ফলত এই
নাম ভাবনায় পাকতে পাকতে তাঁদের আর প্রকৃত কবিতা লেখা হয়ে ওঠে না। যা হয়, কবিতা লিখতে এসে ‘প্রমোদে ঢালিয়া দিনু মন’।
অতি তরুণ বয়সে দুটো জিনিসে খুব সঙ্কোচ হত। এক, আনন্দবাজার অফিসে ঢোকা আর দুই, কলেজ স্ট্রিটের কফি হাউসের মৌজে ঢোকা। তবু, আনন্দবাজারের সেইসব গুণীজন লেখা নিয়ে যেতে
বলতেন। একটা অন্যধরনের স্নেহমিশ্রিত আমন্ত্রণ ও আন্তরিকতা থাকত। তাঁদের মত অনেকেই
এখন আর ইহজগতে নেই যেমন আনন্দ বাগচী, সুনীল বসু, শক্তি চট্টোপাধ্যায়। আর কফি হাউসে যাঁরা টেবিল জুড়ে কফি ও সিগারেটের ধোঁয়ার
কুণ্ডলী ওড়াতেন দূর থেকে দেখেই আমি শুধু ‘জিজ্ঞাসা’ দপ্তরে শিবনারায়ণবাবু আছেন কি না জেনে যেতাম। কারা কারা যেন বলতেন
কফি হাউসের আড্ডাটা আসলে এক ধরণের যোগাযোগের সেতু, অভিপ্রায় যাঁর থাকবে ও যাঁর কবিতা একদিন
বিভিন্ন পত্রিকায় শিরোনাম পাবে তাঁদের নাকি কফি হাউসে যাওয়াটা জরুরি। সকলেই এরকম
মনভাবাপন্ন নন কিন্তু বাইরে থেকে আমার যা মনে হয়েছে কেউ কেউ তো বটেই। আর এখানেও
সূচনায় থাকছে এক প্রশংসাবিদ্ধ বাণী শোনার — অগ্রজ বা সমসময়ের সহ কবি ও
সম্পাদকের কাছ থেকে। কিন্তু কোথাও যেন এক সূক্ষ্ম ইশারা থেকে যাচ্ছে — ‘তুমি আমার লেখা ছাপলে আমিও
তোমার লেখা ছাপাবো আমার কাগজে।’ এক অলিখিত অপ্রকাশ্য শর্ত যা
মুখে বলা যায় না বোধে বুঝে নিতে হয় । অবশ্য স্বাভিমানযুক্ত কবি লেখকেরা সবসময়তেই
আলাদা থাকেন। কেননা কফি হাউসে তো প্রণবেন্দু দাশগুপ্ত, ভাস্কর চক্রবর্তী ও শম্ভু রক্ষিতের আড্ডা ও
কবিতার সত্য মিথ্যা নিয়ে আলোচনা বহু বহু করে গেছেন। তবু, তাঁদের কবিতা চিরকাল স্ববৈশিষ্ট্যেই রয়ে গেছে।
সেখানে কফি হাউসের ভূমিকা একান্ত গৌণ।
কফি হাউসের সিঁড়ি থেকে নেমে লিটল ম্যাগাজিনের
স্টলে পৌঁছাই। কতো না মুক্ত প্রকাশ সেইসব পত্রিকাগুলিতে। কবিতার স্রোত, গদ্যের প্রজ্ঞা, নাটকের স্পর্ধার বার্তা। আমি তখন ট্রামে চলা
ঘণ্টার ধ্বনি শুনতে পাই — এটাই আসল ছবি — স্পর্ধা। সেখানে নিন্দা বা প্রশংসা
দুটোই ছোটো ছোটো শব্দ মাত্র।
আর একটি পরিবর্তন ইদানীং খুব চোখে পড়ে। ঢাউস
সাইজের বইরূপ পত্রিকায় ঠেসে-ধরা এক একটি বিশেষ সংখ্যা। এসব পত্রিকাও বলা হয় লিটল
ম্যাগাজিন। আমার বিস্ময়ের অবধি থাকে না, কী নিদারুণ অসম্ভব কার্যকলাপ থাকে এইসব
পত্রিকাগুলিতে। গবেষণালব্ধ, অতি পরিশ্রমে লেখা, সময় এবং নিঃশেষিত প্রাণে ধরে রাখা বিষয়সমূহ।
সেখানে যেন নিন্দা, প্রশংসা, প্রাপ্তির কোনো ভূমিকা নেই; এক উদ্ভাসিত জ্ঞানের উন্মোচন। এবং তা থেকে বহু
মানুষের জ্ঞানপ্রাপ্তি ঘটে চলে দিনের পর দিন। আবার বইমেলা ঘিরেও এক ধরণের উন্মাদনা
চোখে পড়ে। প্রতিদিনের ভিড়, নানা প্রকাশনার স্টলে বই নিয়ে মানুষের
বিভোরতা সব কি মেকি বলে মনে হয়? লক্ষ লক্ষ লোকের ভেতরে
মানুষের এই যে ঔৎসুক্য চোখ তা কি সত্যি লোক দেখানো? আমার তা মনে হয় না। সকলেই ড্রয়িংরুম সাজানোর
জন্য বই কিনে নিয়ে যান না। কেউ কেউ হয়ত’ চা এর কাপ ঢাকা দেওয়ার জন্য
একটি হার্ড পেপারে বাঁধানো বই ব্যবহার করতে পারেন, কিন্তু সকলেই নয়। এইসব বিশ্বাস এখনও মাথার
ভেতরে ঘোরা ফেরা করে বলেই তো বেঁচে থাকতে ইচ্ছে হয়।
যৌবনের শুরুতেই আমি কবি সমর সেনের ‘বাবু বৃত্তান্ত’ পাঠ করেছিলাম। বইয়ের শুরুতে ভূমিকার নিচে কবির
ঠিকানা লেখা ছিল ‘সুইনহো লেন’ আর সেই গলিতেই ছিল আমার ম্যানেজমেন্ট পড়ার
ঠিকানা। বইটি পড়ার পরে আমি এতই বিমোহিত ছিলাম ভাবলাম একবার অন্তত তাঁর সাথে দেখা
হওয়া দরকার। তারুণ্যের সাহসে ভর করে একদিন চলেই গেলাম তাঁর ঠিকানায়। ঢোলা
পাজামা-পাঞ্জাবী তে এক সৌম্য দর্শন ঘাড় পর্যন্ত নেমে আসা সাদা চুলের এক সাধারণ
মানুষ। প্রাথমিক পরিচয়ের শেষে তিনি হয়ত অবাকই হয়েছিলেন আমার অল্প বয়সের কৌতূহল
দেখে। স্পর্ধাবশে তাঁকে সেদিন আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম কেন তিনি কবিতা লেখা ছেড়ে
দিলেন। কিন্তু তিনি ওই প্রসঙ্গে না গিয়ে তাঁর সম্পাদিত বিখ্যাত পত্রিকা ‘ফ্রন্টিয়ার’ নিয়েই বেশি আলোচনা করতে আগ্রহী ছিলেন। এই
ঘটনাটি উল্লেখ করার একটাই কারণ প্রজ্ঞাবান কবিরা এভাবেই নির্মোহ থাকেন সেখানে
নিন্দা প্রশংসা আলোচনা সমালোচনা সব নিরর্থক শব্দ মাত্র।
আমার মনে পড়ে অরুণ মিত্রের ছোট্ট ফ্ল্যাটে
বইয়ের রাজ্যে এক অশীতিপর মানুষের মুখ তাঁর ছায়ার সামনে বই ছায়ার পেছনে বই আধাঁর
ঘেরা খাটের নিচে বই বই আর বই। তিনি কোনো ছোটো পত্রিকা তরুণ কবির কবিতার বই সবই
সম্মান দিয়ে সংগ্রহে রাখতেন। কাউকেই উপেক্ষা করেন নি। তিনি যেন জেগে থাকা এক সময়ের
দলিল। আর এক অরুণবাবুর কথা মনে পড়ে — তিনি ‘উত্তরসুরি’ পত্রিকার সম্পাদক অরুণ
ভট্টাচার্য। শতরঞ্চি পেতে মেঝেতে বসে
পত্রিকার জন্য লেখালেখি বাছাই করছেন আর তাঁর চতুর্দিকে পত্রিকা বই অগোছালো কিন্তু
তারই মধ্যে তিনি তার ভেতর বাহিরে নিমজ্জমান।
কবিতা লেখার শুরুতে আমার কলেজ স্ট্রিট আমার কফি
হাউস এসব নয়, আমার আড্ডার একটাই জায়গা ছিল। তা হল ‘আজকাল’ পত্রিকার (অধুনা: ‘আজকাল টাইটোনিডি’), নৈহাটি স্টেশনের তিন নম্বর প্ল্যাটফর্ম, টিমটিমে আলো আর খোলা আকাশের নিচে ঘাসের ওপরে
পাঁচজন কবি একজন গল্পকারের মাঝে পড়ে আমার সসংকোচ কবিতাপাঠ। কবি রমেন্দ্রকুমার আচার্যচৌধুরী একদা যাঁদের
একটি চিঠিতে জানিয়ে ছিলেন সহজে বিখ্যাত হওয়া তোমাদের কপালে নেই। এ কথা কেন বলেছিলেন সেই অনুষঙ্গ এখানে ব্যাখ্যা
করতে গেলে পুরনো ইতিহাসে ফিরে যেতে হয়। তাঁদের রচনাপাঠে তিনি আত্মহারা হতেন, নানাপ্রসঙ্গে তর্ক ও চলতে থাকতো। কিন্তু
পারস্পরিক অগ্রজ অনুজের সম্পর্কে কখনো কোনো তিক্ততা ছিল না। এই প্রসঙ্গটি উল্লেখ
করার একটাই বিষয় : তাঁদের সবার কাছেই ছিল নিন্দা বা প্রশংসা সমান জরুরি।
এত ঘটনার ক্রমউল্লেখের একটাই কারণ — কবিতার বই আলোচনাকালে আমি দেখেছি কখনো
সামান্যতম সমালোচনার ধার ঘেঁষে চলে গেলে পরবর্তী কালে সেই কবির কাছে নানা কথার
ঠোক্কর খেতে হয়। অনুভবে বুঝেছি সময় পাল্টে গেছে। এখন আর নিন্দা প্রশংসা সমান জরুরি
এটি আপ্ত বাক্য নয়। এখন স্বখেদে বলতে হয় কোনো সমালোচনা বা নিন্দা
করা যাবে না শুধু মাত্র প্রিয়ভাষিত আলোচনাই হবে একমাত্র উদ্দিষ্ট। লেখা উচ্চগুণে
পৌঁছাক বা না পৌঁছাক লেখাটি যেভাবেই হোক প্রশংসায় ভরিয়ে দিতে হবে তা আলোচকের নাই
ভালো লাগুক। আসলে কবিতা নিঃশেষিত প্রাণের কথা সেখানে যা কিছু শব্দে উঠে আসে তা
কবির হৃদয়ের মথিত কথাই। যতো যন্ত্রণার নিষিক্ত হিসেব। এ এক বিহ্বল অবস্থা যা ব্যাখ্যাতীত। এই মায়ার ফাঁদে পড়ে কতো না কবি তাঁর জীবন
নিঃস্ব করেছেন। তাই এ কথা বুঝতে হবে নিন্দা
বা প্রশংসা ফাঁকা শব্দের বিলাপ মাত্র। প্রকৃত কবি শব্দ নির্মাণ করেন প্রথমত নিজের
উপলব্ধিতে পরে পরে তা কোনো কোনো পাঠকের মনের আলোয় হয়ত’ ঢুকে পড়ে। তাই কবিতা নির্মাণ এক চলমান
প্রক্রিয়া মাত্র।
যেহেতু কবি এবং কবিতা নিয়ে প্রায় পাঁচ দশকের
কাছাকাছি জীবনটা চলে গেছে। এই জীবনের পেছনে যাঁরা পরোক্ষ বা প্রত্যক্ষভাবে আমাকে
জড়িয়ে আছেন এরপর তাঁদের আলোকবৃত্তের কথা পরপর আসবে। কেননা তাঁরা ছাড়া এ আমার জীবন
এবং তার বিবেচনা অসম্পূর্ণ।
পর্ব তিন।। সত্যিকথা, রূপকথা
জন্মকথা
৫-ই কার্তিকের পরে আটান্নটা বছর কেটে গেছে।
দু'বছর পরে ষাট, তারপর, তারপর...
একজন মানুষ তাহলে কখন ইচ্ছে করবে
আত্মজীবনী লেখার! এই ভেবে আমি শুরু করি;
হাসপাতালে জন্মের মুহূর্তে আমার প্রবল চিৎকার!
আমি ফাটিয়ে দিলাম, 'এসে গেছি...'
কী লিখি এখন! শুধু চিৎকার জানালেই হল!
কথা শিখতে শিখতে ভাষা শেখার আড়ালে
আমার আত্মমোচন ঘটে, আকস্মিক বিড়াল লাফালে!
এই কবিতাটি আমি কেন উল্লেখ করলাম? আসলে ৫-ই কার্তিক, বৃহস্পতিবার ভোর চারটের সময় আমার জন্ম হয়েছিল
বহরমপুরের জেনারেল হাসপাতালে। সারারাত আমার মাতামহ হাসপাতালে উদ্বিগ্ন চিত্তে
কাটিয়ে ছিলেন। ভোরবেলা জন্মমুহূর্তে আমার চিৎকার ও কান্নার শব্দ ঘোষণায় দাদু নাকি
মন্তব্য করেছিলেন,‘বেলার ব্যাটা হয়েছে’। এই গল্প আমার জননী বারবারই আমায় শোনাতেন, এমনকী বড়োবেলাতেও এইসব কাহিনি আমাকে শুনতে হয়েছিল।
এখন এই ইহজগতে জননী আর নেই; এখন এইসব পুরোনো কথা আর কেউ বলবারও নেই। এই চিৎকারের ব্যাপারটা
জিনগত — কেননা মাতামহর জমিদারী মেজাজ, আদেশ এবং অহমিকা এবং প্রজাশাসনের গরম রক্তটা
বারবার নানা ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে টের পেয়েছি। প্রায় সাতশো বিঘার জমিদারী রাজত্ব
আমার মামারবাড়ি স্বজনেরা ভোগ করে গেছেন এবং তার রেশও এখন বংশ পরম্পরায় চলছে। কিন্তু
ইতিহাস সময়ের সঙ্গে অনেক কিছুই পালটে দেয়। এবং তাই হয়েওছে।
মামারবাড়িতে আমার মা বড়ো মেয়ে হওয়ায় অত্যন্ত
আদরে এবং আনন্দে কাটিয়ে ছিলেন। তিনি দেখেছেন পিতৃগৃহের সুখ সমৃদ্ধি ভালোবাসা আবার
গাঁয়ের বাড়িতে আমবাগানে ছোটোবেলায় দৌড়াদৌড়ি গাছ থেকে পড়ে যাওয়া পাকা তেঁতুলের
স্বাদ। তাকে অনেক আত্মীয়ই নাম
দিয়েছিলেন ‘আহ্লাদী’। আবার আমার দিদার বাবার বাড়িও জমিদার গৃহে। এখনও
মনে পড়ে ‘টেয়া-বদ্যিপুর’ নামক স্থানে দাঁড়িয়ে থাকা সেই বিশাল
অট্টালিকাটি। দিদার বাবার ছিল তিনটি বিবাহ এর মধ্যে মধ্যম জনকে শুনেছিলাম উনি
তখনকার পূর্ব পাকিস্থানে রাজশাহী থেকে ঘোড়ায় চাপিয়ে লুট করে এনেছিলেন। এখন এসব
গল্প কথা। কতোটা গল্প আর কতোটাই বা সত্যি তার সারবত্তার কোনও প্রমাণ নেই। কিন্তু
গল্প হিসেবে আকর্ষণীয় আর দিদার নামটিও ছিল তেমনই চমকপ্রদ — শিবসীমন্তিনী। এই নাম যেন স্বর্গ থেকে প্রাপ্ত
সেখানেও আদরের মাহাত্য। সেখানে যে মেয়ে জন্মেছে বলে তখনকার প্রাচীন সময়েও কোনও
অবহেলা ছিল না। এ এক বিপরীত ছবি।
দিদা ছিলেন শ্যামবর্ণা আর দাদু ছিলেন প্রকৃত
রাজপুরুষ — দীর্ঘাঙ্গ এবং গৌর কিন্তু এইসব নিয়ে দাদুর কোনও
আফসোস ছিল না এবং অবহেলাও ছিল না একদমই অনেকটা রবীন্দ্রনাথ – মৃণালিনী দেবীর মতো। বরং দিদা বিবাহ জীবন থেকেই
সারা জীবন অবধি দরিদ্র মানুষের জন্য অত্যন্ত অনুভূতিপ্রবণ ছিলেন। পিতলের ঘড়া থেকে
রৌপ্যমুদ্রা এবং দামী শাড়ি থেকে শাল সবই তাঁর দানের সামগ্রী ছিল। কোনও দিন কোনও
গরীব মানুষ দাদুর বাড়ি থেকে অন্য না খেয়ে ফেরৎ যাননি। কেননা দাদুকেও দেখতাম
গ্রামের বাড়িতে গরীব প্রজাদের অকৃত্তিম ভালোবাসা। তার শহরের বাড়ির বারান্দায় ও উঠোনে প্রায়
প্রতিদিনই কমপক্ষে তিরিশ চল্লিশটা পাত পড়তো আবার গ্রামের বাড়ির উৎসবের সময় আরও আরও
বেশি। শোনা যায় রুদ্র বাড়ির বংশে কেউ একজন তথাকথিত সতী হয়েছিলেন এবং তাঁর শেষসময়ের
পরনের শাড়ি বেনারসীটি টুকরো অংশ দিদা অনেককেই বিলিয়ে ছিলেন ‘পবিত্র’ ঘটনার স্মারক হিসেবে। দিদার অতি অল্প বয়সে বিবাহ
সম্পন্ন হয় এবং ক্রমাগত সন্তান উৎপাদনের ফলে তিনি ধীরে ধীরে এক মানসিক অবসাদের
সম্মুখীন হন। সেসময় উন্নত চিকিৎসা ব্যবস্থা বা সচেতনতা তেমন ছিল না। ক্রমে ক্রমে
তিনি জীর্ণ, অস্থির — হুটহাট করে বারবার বাড়ি থেকে
বেরিয়ে যাওয়া। এইসব ঘটনা নিত্যই ছিল। আবার দাদুর ক্ষেত্রে
দেখেছি সহধর্মিণীর এরকম অস্থিরতা দেখে ভেতরে ভেতরে এক দুর্বিষহ যন্ত্রণা ভোগ করতেন
যার বহিঃপ্রকাশ অবশ্য ছিল না। বরং প্রজাবৎসল, গ্রামের মানুষের জন্যে নানা
কল্যাণকর কাজে নিজেকে ব্যস্ত রাখতেন। ফলাফল : এই ঔদাসীন্য দিদাকে আরও পীড়িত করতে
লাগল। তাছাড়া, বেলা, যূথী, হেনা, খুকি এই চার কন্যার মধ্যে যূথীর আকস্মিক মৃত্যু
তাঁকে আরও বিহ্বল করে দিয়েছিল। যূথীমাসিকে আমি দেখিনি কিন্তু মায়ের কাছে গল্প শুনে
শুনে তাঁর চেহারার একটা কাল্পনিক ছবি মনেতে তৈরি করে ফেলেছিলাম। তিনি বেঁচে থাকলে
কিরকম হতেন বা আমার সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক কিরকম হতে পারত এইসব। দিদার আরও চার পুত্র
সন্তানও ছিল, বীরেন্দ্র, শৈলেন্দ্র, রণেন্দ্র, এবং নির্মলেন্দু। তাঁদের
বিষয় গল্পগাছা পরে পরে হবে।
আগেই বলেছি সৌন্দর্য-পুরুষের সংজ্ঞা ছিল আমার দাদু
আর দিদাও ছিলেন বিপরীতে। বিবাহ পরবর্তীতে তাঁরা একে অপরকে প্রবল ভালোবাসতেন কিন্তু
পারস্পরিক উচাটনে তাঁরা যেন কোথাও জীবনের সোজাপথ হারিয়ে ফেললেন। সংসারে অভাব ছিল
না কিন্তু অশান্তি ছিল। পরপর শোক এসেছিল, আকুল কান্না ছেয়েছিল গোটা সংসারকে। মামারবাড়ি
গেলেই দেখতাম অশান্তির আবহাওয়া সেই পুরনো আনন্দ আর ফিরে পাচ্ছিনা। তাই শহরের বাড়ি
ছেড়ে গাঁয়ের বাড়িতে চলে যেতাম। আমবাগানে পুকুরধারে গরুর গোয়ালে দৌড়াদৌড়ি। দুটি
বিশাল ঘোড়াও ছিল একটি খয়েরি-সাদা। অন্যটি কালচে সাদা মেশানো। বড় মামার শখের ঘোড়া
ইচ্ছে মতো ঘোড়া ছুটিয়ে এদিক ওদিক। রূপবান বড় মামা পোলিও আক্রান্ত একটি সচল পা
নিয়েই ঘোড়ার পিঠে চেপে বসতেন। আগেই বলেছি দাদু ছিলেন উদাসীন এবং নির্মল হৃদয়ের মানুষ
তাঁর কাছে হিন্দু মুসলমান বলে কেউ ছিল না সব মানুষই তাঁর কাছে সাহায্য প্রার্থী
ছিলেন এবং তাঁরাও ছিলেন দাদুর বিপদে আপদের সহায়। মনে আছে একবার কাঁঠাল বাগানের
গাছকাটা নিয়ে দাদু কিছু মানুষের দ্বারা আক্রান্ত হয়েছিলেন। তখন মুসলমান সম্প্রদায়ের মেয়েরাই তাঁদের ঘরে
লুকিয়ে রেখেছিলেন তাতে দাদুর প্রাণ রক্ষা হয় এবং দাদু আজীবন কৃতজ্ঞ থাকেন। গ্রামের মোরাম রাস্তা
প্রাথমিক বিদ্যালয় গ্রামীণ হাসপাতাল দুর্গা মণ্ডপ সবেতেই দাদুর প্রসারিত হাত ছিল।
এরপরে আরও কিছু বহরমপুরের গল্প বলে আমি আমার
চুঁচুড়ার বাড়িতে ফিরে আসব।
পর্ব চার।। লুপ্তির প্রবাহকাল
অনেক বছর ধরেই পুজোর ছুটিতে গঙ্গাধারী গ্রামের
বাড়িতে আমরা চলে যেতাম। গ্রামের পুজোর আকর্ষণ নানারকম। তখন প্রকৃতি অতো বুঝতাম না, তবে
পাতার গায়ে ভোরবেলা কেন জলের ফোঁটা দেখতে পাওয়া যায়, দল বেঁধে হাঁসেদের ঝাঁক ঘুম
থেকে উঠেই দুলতে দুলতে কেন পুকুরে ঝাঁপ দেয়, এইসব দৃশ্যে মনে প্রশ্ন
জাগলেও কাউকে সাহস করে জিজ্ঞেস করতে পারতাম না। বাবার অফিসে পনেরো দিন মতো পুজোর ছুটি
থাকত, আর
সেই অবসরে আমরা গাঁয়ে অবকাশ কাটাতাম। জামাই এলে গোয়ালের দুধ জ্বাল দিয়ে লোহার
কড়াইতে দুধ মেরে মেরে মোটা মোটা সরভাজা দিদা নিজের হাতে বানাতেন। তার গন্ধে গোটা
বাড়ি, উঠোন
জুড়ে মৌতাতে আমোদিত হয়ে উঠত। সে এক স্বর্গীয় অনুভূতি সঙ্গে সরভাজার স্বাদু স্বাদ। বহরমপুর
থেকে বাসে যেতাম হরিহরপাড়া এবং সেখান থেকে গরুর গাড়িতে গঙ্গাধারী পৌঁছাতাম। গরুর
গাড়িতে খড় ছাওয়া চটের বস্তা দিয়ে বসার জায়গা বানানো হতো। আর যেতে যেতে গরুর গলায়
বাঁধা ঘণ্টার ঠং ঠং শব্দ কি এক জাদু মিশ্রিত সুর রচনা করতো তা বোঝানো যাবে না। গ্রামের
বাড়িতে ধুম করে দুর্গা পুজো হতো। দালান জুড়ে মেজো মামা নাটকের আয়োজন করতেন। মনে
আছে পিচবোর্ড দিয়ে রূপোলী রাঙতা জুড়ে তরবারি তৈরির তৎপরতা। প্রেক্ষাপটে নাটকের
সঙ্গে দিদির গান আরও মূর্ছনা তুলত। বিসর্জনের দিন সমস্ত পরিবেশ জুড়ে, দিকদিগন্তে
একটা ভারী ভারী ভাব। আমার কেমন যেন কান্না-কান্না পেত। বিকেল হতেই আয়োজন নৌকোর
ওপরে দেবীকে বরণ করে তোলা। দুটি নৌকো ভৈরব নদীর মাঝামাঝি এলে নৌকো দুটি ফাঁক হয়ে
যেত এবং দেবীকে জলে আস্তে আস্তে নামিয়ে দেওয়া হতো। চারপাশে তখন কাঁসর ঢাকের
বিদায়ের সুরে বিদীর্ণ হয়ে যেত। মনে আছে পরদিন একশো আট বার দুর্গা নাম লিখে দেবীর
শূন্য বেদীতে গিয়ে রেখে আসতাম। এই অভ্যাস বহুবছর ধরেই আমাদের ছিল।
ধীরে ধীরে শহর বহরমপুরের বাড়ির পরিবেশ পালটে
যেতে লাগল। বড়মামার ডাক্তার হওয়ার ইচ্ছে থাকলেও তিনি ক্রমশ ব্যবসায়ী হয়ে উঠলেন।
মেজোমামা জমি-জিরেতেই মনোনিবেশ করলেন। সেজোমামা হলেন ইঞ্জিনিয়ার এবং ছোটোমামা
ইউনিভার্সিটি থেকে পাশ করে শিলিগুড়িতে গেলেন শিক্ষকতার চাকুরি নিয়ে। ছোটোমাসিও
ইউনিভার্সিটির পড়া শেষ করলেন কিন্তু সেভাবে চাকুরির চেষ্টা করেন নি। নিজের ভেতর
কোনও এক বিষন্নতার বিরহে বাস করতে লাগলেন একা একা। এবং তাঁর মনের হদিশও কেউ পেতে
আগ্রহী ছিলেন না।
১৯৭১ সালে রাজনৈতিক আবহাওয়া উত্তপ্ত হতে লাগল।
পশ্চিমবঙ্গ জুড়ে চলল শিক্ষিত ছেলেমেয়েদের সময় পালটানোর আন্দোলন। হয়ত এর স্ফুরণ
অনেক আগে থাকতেই প্রস্তুত হয়েছিল। কিন্তু চারু মজুমদারের হত্যা-প্রতিহিংসার
রাজনীতি ও আন্দোলন দমিয়ে দিতে পুলিশী নির্যাতন বহু উচ্চশিক্ষিত ছেলেমেয়েরা অকালে
জীবন দিলেন। এ প্রসঙ্গে বরাহনগরের ঘটনা খুব মনে পড়ে, মনে পড়ে অজাতশত্রু হেমন্ত
বসু নৃশংস হত্যাকাণ্ড। তাঁর মতো শ্রদ্ধেয় মানুষকেও কূটচক্রীদের হাতে খুন হতে
হয়েছিল। আমার দাদুর রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে প্রচুর প্রভাব ছিল সারা মুর্শিদাবাদ জুড়েই।
সে সময় শ্রদ্ধেয় নেতা ত্রিদিব চৌধুরি ছিলেন একজন অবিসংবাদিত আমনেতা এবং দাদুর অতি
ঘনিষ্ঠ জন। এই পরিচয়ের মধ্যেও একদিন বড়োমামা হুমকির চিঠি পেলেন। তিনি বড়ো ব্যবসায়ী, বড়ো
ঘরের ছেলে এবং অনেক লোকের ঈর্ষার বস্তু। নকশাল আন্দোলনের সময়ে
তাঁদের নাম করে অনেক গুণ্ডা বদমাশ বড়োলোকদের বাড়ি বাড়ি টাকা চেয়ে চিঠি দিতে লাগল। বড়োমামা
চিরকালই ডাকাবুকো ধরণের মানুষ ছিলেন, প্রথমত তিনি এসবে পাত্তা
দিলেন না। এবং আরও সাহসী হয়ে উঠলেন। ফলাফল হল বিষম ও বেদনাদায়ক।
১৯৭১ এর ২১ শে এপ্রিল ব্যবসার জায়গা থেকে বাড়ি
ফিরতেই বাড়ির সামনেই পাঁচ দুষ্কৃতকারী একযোগে তাঁর দেহে ছুরি ও
গুপ্তি চালালো। সারা শরীরময় রক্তস্নান ও প্রায় অর্ধ গলাকাটা অবস্থায় তিনি দোকানের
চাবিটি শুধু বৈঠকখানার জানলা দিয়ে ঘরে ছুড়ে দিয়েছিলেন। তার গলা ঝুলে গিয়েছিল
তীক্ষ্ণ হেঁশোর আঘাতে। সেই রাত্রে খাওয়ার পরে দাদু এই দৃশ্য দেখে
চেতনা হারালেন। বড়োমামা হাসপাতালে পৌঁছনোর আগেই প্রাণ হারালেন এবং একদিন বাদে
দাদুও তাঁকে অনুসরণ করলেন। কাগজে সংবাদ হল : ‘পুত্রশোকে
পিতার মৃত্যু’। এই ঘটনা সেসময়ে আকছারই ঘটত। এমন কি বড়োমামাকে
খুন করার আধঘণ্টা আগে ওই একই দল মোহন সিনেমার মালিকের ছেলেকেও হত্যা করে এসেছিল।
মামার বাড়ির আনন্দের দিন চিরকালের জন্য
অন্তর্হিত হল। দিদার হাহাকার ও উন্মাদগ্রস্ততা, বড়োমামার
অসহায় পাঁচ নাবালক পুত্র কন্যা আর আমার মা-এর আর্তনাদে আমি ভেতরে ভেতরে কেমন
মুহ্যমান হয়ে গেলাম। ক্রমে আমার ছেলেবেলা গভীর বিষাদে ছেয়ে যেতে
শুরু করলো। তখনও ভাবিনি আগামীতে আরও কি কি অন্ধকার অপেক্ষা
করছে।
এবারে চুঁচুড়ার নিজের বাড়িতে ফিরে আসি। মা ছিল তাঁর বাবা মা এর আদরের ধন। তাঁকে কখনও দাদুর বকাঝকা খেতে হয়নি, যত্নে মানুষ করেছিলেন আর অভাবের তো প্রশ্ন নেই। দাদু যখন মেয়ের বাড়িতে আসতেন মনে আছে গ্রামের লোক সঙ্গে নিয়ে বস্তা করে লাল রঙা আলু, মোটা মিষ্টি চাল, কাঁঠাল, সজনে ডাঁটা নিয়ে আসতেন। আবার কখনও নদী বিলের মাছ ভরা বর্ষায় আমাদের বাড়ি চলে আসত এবং এতোই পরিমাণে আসত মা পাড়ার লোককে আমাকে দিয়ে বিলি করতে পাঠাতেন। আমার বাবা ছিলেন সরকারি স্বল্প বেতনের চাকুরে। ক্রিকেট নিবেদিত প্রাণ, ক্লাব প্রীতি, শরীর চর্চা, শরীরে তেল মেখে নিত্য গঙ্গা স্নান তাঁর শরীরকে আকর্ষণীয় করে তুলেছিল। স্নানে যখন যেতেন পাড়ার বয়স্করা বাবাকে বলতেন, ‘সোনার গৌরাঙ্গ যাচ্ছে’। এই রূপই দাদুকে প্ররোচিত করেছিল তাঁর সুন্দরী বড়ো কন্যাকে বাবার হাতে তুলে দিতে। কিন্তু সংসারের ছায়াছবি বিবাহ পরবর্তী জীবনে সুখের হয়নি। তিন ভাইবোন তাদের লেখাপড়ার খরচ সংসারের খরচে বাবা বরাবরই বিপর্যস্ত ছিলেন। এর সঙ্গে ছিল ঈর্ষা প্রসূত ঠাকুমা, জেঠা, কাকার সম্মিলিত মা এর প্রতি বিষোদ্গার ও কটূক্তি। কলহ চরম সীমায় পৌঁছালেও বাবার কোনও প্রতিবাদ ছিল না। মা ক্রমশ জীবনে আনন্দ হারিয়ে ফেললেন। তাঁর অপরাধ ছিল তিনি বড়োলোক বাড়ির আদুরে কন্যা, এই ঈর্ষা পরিবারের অন্যদেরও আক্রান্ত করেছিল। এই পরিস্থিতিতে বেশ কয়েক বছর পরে আমাদের হাঁড়ি ভিন্ন হল। ভাগে পড়ল একটি শোয়ার ঘর, একটি রান্নার ঘর আর একত্রে থাকা স্নানের ঘর। দীর্ঘদিন এইভাবে বঞ্চনা চলার পরে মা তার তেজ ও গরিমা দেখিয়ে ‘এ’ বাড়িতে আর একটি ঘর আদায় করেছিলেন। এই ঘরটি আদায়ের পূর্বে যখন দিদা মাসিরা মা এর কাছে আসতেন তাঁদের শোয়ার জায়গা থাকত খাটের তলায়। এরই ভেতর একদিন মা গর্ভাবস্থায় চতুর্থ সন্তান হারালেন। মনে আছে বাড়িতে একজন ডাক্তার এসেছিলেন, তাঁর রক্তাক্ত গ্লাভস দেখেছিলাম নর্দমার মুখে একটি রক্তের ডেলা ফেলে দিতে। তখন বুঝিনি একটি প্রাণ পৃথিবীতে আসার পূর্বেই শেষ হয়ে গিয়েছিল।
এই পরিবেশেই আমাদের তিন ভাই বোনের লেখাপড়া চলতে শুরু করল। দিদি
বরাবরই স্কুলের পরীক্ষায় পজিশন পেতো। কখনও বা জ্যাঠার মেয়ে বা দিদির মধ্যে একটা
অলিখিত প্রতিযোগিতা থাকত। আবার কখনও যদি-বা দিদির পজিশন জ্যাঠার মেয়ের থেকে এক ধাপ
কম হত সেটা নিয়ে কাকার ছিল তেরছা কথাবার্তা। তিনি ছিলেন অনেকটা নারদ মুনির মতো এবং
ঝোলটা বরাবরই আমাদের বিপক্ষে থাকত। চূড়ান্ত অপমানও মায়ের ভাগ্যে ছিল সামান্য
ব্যাপারেই। আমি ও ভাই প্রথমে পাঠশালায় ও পরে হুগলি জেলার সেরা স্কুলের ভর্তি
হয়েছিলাম। প্রথম প্রথম প্রাথমিকে ভালো জায়গায় থাকলেও পরে পরে বাইরে থেকে অনেক ভালো
ছেলেরা কলেজিয়েট স্কুলের ভর্তি হত সে কারণে আমি ক্রমে ক্রমে সাধারণ ছেলে হয়ে
উঠলাম। তবুও সেইসময়ের শিক্ষকেরা
যেভাবে যত্ন নিয়ে পড়াতেন তাতে আমার কোনও আলাদা শিক্ষকের প্রয়োজন পড়েনি। তবু উঁচু
শ্রেণীতে উঠবার পরে বাবা একজন শিক্ষককে বাড়িতে পড়ানোর জন্য নিযুক্ত করেছিলেন।
কিন্তু তিনি আমার উন্নতির চেয়ে অবনতি বেশি করেছিলেন। কুড়ি বছর বয়সের সময় এবং
চাকুরির প্রস্তুতির জন্য, ছাত্রছাত্রী পড়ানোর জন্য
আমি বাবার কাছ থেকে ইংরেজি ভাষা রপ্ত করেছিলাম। ভাই ছিল ক্রিকেটপ্রেমী অনেকটাই
বাবার ধাতে গড়া। কখন যে স্কুল থেকে ক্রিকেটের মাঠে চলে যেত কেউ জানতেও পারেনি।
বিভিন্ন স্কুল টুর্নামেন্টে ও খেলে বেড়াতো। বাবার এইসবে প্রচ্ছন্ন প্রশ্রয় ছিল
যেহেতু তিনিও বহুবছর ক্রিকেট খেলে গিয়েছিলেন। এছাড়া আমি নবম শ্রেণীতে এবং ভাই ষষ্ঠ
শ্রেণীতে পড়ার সময়ে সাঁতারে ভর্তি হলাম। ভাই দ্রুতই দক্ষ সাঁতারু হয়ে উঠল ও কাউকে
না জানিয়ে গঙ্গায় অর্ধেক সাঁতরে পার হয়ে যেত। দিদিকে দেখতাম নিষ্ঠার সঙ্গে পড়াশোনা
করতে চিলছাদে উঠে চলে যেত যেখানে আমাদের ঘুঁটে কয়লার প্রয়োজনীয় স্টক থাকতো। যেখানে
আরশোলা আর ঘুরঘুরে পোকার নির্বিঘ্ন বিচরণ ছিল।
![]() |
| অলংকরণ।। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সহায়তায়, রাজীব কুমার ঘোষ |
এক এক সময় দেখতাম কাকা সবার অলক্ষ্যে ভাইকে
নিয়ে ছাদে উঠে যেত। কাকা ঘুড়ি ধরতাই দিত আর ভাই সুতো ছেড়ে দিত। ঘুড়ি তখন আকাশের
সীমানা ছাড়িয়ে অনেক দূরে। পাশের বাড়ির উঁচু ছাদ থেকে পাড়ার জেঠিমা কাকিমারা ‘টমটম’ বলে
ভাইকে উৎসাহ যোগাতো। আবার কেউ কেউ ওর নাম দিয়েছিল ‘ছোটো সাহেব’। আমি
অবশ্য এইসবের বিপরীত মেরুতে থাকতাম, শুধু চিলছাদের ওপরে উঠে অন্য
বাড়িতে কেটে-পড়া ঘুড়ি ভাইয়ের জন্যে নিয়ে আসতাম। তবুও বাড়ির অশান্তিকর পরিবেশ থামল
না, ঠাকুমা
মাকে ভিন্ন হাঁড়ি করে দিলেও প্রচুর গালমন্দ বর্ষণ করতেন অকারণেই। অর্ধেক সময়েই
তিনি একটি মাত্র গামছা পড়ে লজ্জা নিবারণ করতেন, শুচিবাইগ্রস্ত হয়ে জল ঢেলে
রাখতেন মায়ের যাতায়াতের পথে। মা ও দেখতাম ক্রমশ জল ঘাঁটার বাই ধরেছেন। একদিন
স্কুলের টিফিনের সময় বাড়িতে খেতে এসে আমি বাসন ধোয়ার জায়গায় প্রস্রাব করে দিই, তাই
দেখে মা উঠোনের কোণে রাখা কয়লার স্তুপ থেকে এক খণ্ড কয়লা নিয়ে আমায় ছুঁড়ে মারতেই
আমার নাক ফেটে রক্তারক্তি হয়। আকস্মিক এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে মা হতভম্ব হয়ে যান ও
চিৎকার করে কেঁদে ওঠেন। পরে জেঠিমা আমার প্রাথমিক শুশ্রূষা করে কাকাকে দিয়ে
হাসপাতালে পাঠিয়েছিলেন। রাত্রে বাবা অফিস থেকে ফিরলে মা কিছুটা লুকোচুরি খেললেন
কিন্তু আমার নাকে ব্যান্ডেজ দেখে তিনি আর বাবার গালি থেকে মুক্তি পাননি। এই ঘটনার
পরে অবশ্য মায়ের কাছে আমার আদর অনেকটাই বেড়ে গিয়েছিল।
এইসব ছোটোখাটো ঘটনা ছিল সত্তর দশকের গোড়ার
দিকে। একাত্তরের ডামাডোলে দিদিকে একাকী প্রিন্সিপ্যালের ঘরে স্নাতক স্তরের পরীক্ষা
দিতে হয়েছিল বাকিরা প্রকাশ্যে বই দেখে লিখে যাচ্ছিল, চূড়ান্ত অরাজকতায়। ভাই
মাধ্যমিক পাশ করার পরে বাড়ি থেকে দূরে হুগলি ব্রাঞ্চ স্কুলে ভর্তি হয়েছিল। সে
কারণে তার একটি সাইকেলের প্রয়োজন হতে বাবা সে সময়ের সবচেয়ে দামি সাইকেল ভাইকে কিনে
দিয়েছিল। দিদি স্নাতকোত্তর পড়ার সময়ে কোনও আলাদা শিক্ষক রাখার ক্ষমতা বাবার ছিল
না। মনে আছে দিদি নোটস মুখস্থ করে বাবার ঘরের কালো মেঝেতে চক খড়ি দিয়ে নোট লিখত।
আবার বাবাও দেখতাম অনেক সময় দিদির নোটস সংশোধন করে দিচ্ছেন। এছাড়াও দুজন অধ্যাপক
দিদির নিষ্ঠা দেখে দিদিকে তাঁদের বাড়িতে আলাদা করে সময় বের করে পড়াতেন। আমি থাকতাম
আমার ভেতরেই একা একা, কখনও বা কাগজে আঁকাআঁকি কখনও বা শব্দ নিয়ে
খেলা। একাদশ
শ্রেণীতে হুগলি মহসিন কলেজে ভর্তি হলাম। বাণিজ্য নিয়ে পড়লেও সবচেয়ে ভালো লাগত
বাংলার শিক্ষকদের সান্নিধ্য। সেই সময় কলেজের বাংলা অধ্যাপকের দল ছিলেন খুব নামীদামী
যেমন অরুণ কুমার ঘোষ, প্রলয় শূর বা অনিতা
বন্দ্যোপাধ্যায়। এই কলেজেই ইংরেজির অধ্যাপক ছিলেন কবি রমেন্দ্র কুমার আচার্য
চৌধুরি বা দেবীপ্রসাদ বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁদের সঙ্গে হৃদ্যতা অবশ্য অনেক পরে
হয়েছিল।
![]() |
| হুগলি মহসিন কলেজ, মূল ভবন অলংকরণ - কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সহায়তায়, রাজীব কুমার ঘোষ |
পুরনো বাড়ির ছাদের ঘর থেকে কদিন আগেই মায়ের বড়ি
দেওয়ার কাঠের তক্তা ও নেট বাঁধানো পাত্রগুলি সরিয়ে দিলাম। মা বড়ি দিতেন নানা
ব্যাঞ্জনে, একসঙ্গে
ডাল, ফুলকপি, আদা
ও নানা মশলা বেঁটে বড়ি দেওয়া হত। বড়ি পাহারা দেওয়ার জন্য বাবা নিযুক্ত ছিলেন।
কেননা হনুমানের হঠাৎ হঠাৎ হানা ছিল প্রায়শই। মায়ের আরও সুখাদ্য বানানোর তরিবৎ ছিল, যেমন
জিভেগজা, নিমকি, রাঙা
আলুর পান্তুয়া এবং নানা রকমের নাড়ু। বিজয়ার পরে পাড়া প্রতিবেশি এবং আত্মীয়বর্গ
বাড়িতে আসতেন। এখন সেসব অলীক কাব্য। এখন কে আর আসে, কারই বা সময় রয়েছে।
আমার দিদি ছিলেন খুবই সুন্দরী। লক্ষী প্রতিমার মতো পান-পাতা মুখ। রঙ ছিল বাবার মতো স্বর্ণাভ। মার কাজ ছিল দিদি বাইরে বেরোলে তাকে পাহারা দিয়ে বাড়িতে নিয়ে আসা কেননা সেই সময়তেও অনেক ফেউ পিছনে পড়েছিল। সমস্যা বহুল হতে দিদিকে পাত্রস্থ করার চেষ্টা চলতে লাগল। কিন্তু বাবার হাতে তেমন পয়সা না থাকায় ক্রমশ বাড়ির পরিবেশ আবারও ভারবহ হয়ে গেল। সেসব আলোচনা আগামীতে করা যাবে।
পর্ব ছয় ।। যা জীবন তা উচাটনই
আগের লেখায় যে পর্যন্ত এসে থেমেছিলাম, ভেবেছিলাম সেখান থেকেই ওই লেখাটি আরও একটু দীর্ঘায়িত করব, কিন্তু আকস্মিক একটি ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে আমি অন্য একটি চরিত্রে চলে যেতে বাধ্য হলাম। তিনি গত সোমবার ৫-ই জানুয়ারি পরলোকে চলে গেছেন। তিনি ছিলেন জীবিত থাকা আমার একমাত্র মাসি। আগেই লিখেছিলাম তিন কন্যার নাম দাদু রেখেছিলেন ফুলের নামে, বেলা-হাস্নুহেনা-যুথি। এর মধ্যে চতুর্থ কন্যার ডাক নাম ছিল খুকি। যিনি নানা মানসিক টানাপড়েনের মধ্যে পড়ে বহুবছর পূর্বেই আত্মহনন করেছিলেন। আর যিনি গত সোমবার গত হলেন তাঁর নামটিই ছোটো করে ডাকা হত ‘হেনা’ নামে। অনেক গুণের গুণবতী তিনি ছিলেন, লেখাপড়া ছাড়াও সেতার বাদনে তিনি যথেষ্ঠ পারদর্শী ছিলেন এমনকি এন সি সি এর ক্যাডেট হিসেবে নয়া দিল্লিতে প্রজাতন্ত্র দিবসের অনুষ্ঠানেও অংশগ্রহণ করেছিলেন। ছোটোবেলায় আমি যখন মামার বাড়ি যেতাম তখন এই মাসি পড়াশোনা করতেন। মনে আছে গ্রামের বাড়ি থেকে শহরের বাড়িতে গাওয়া ঘি এসে পৌঁছালে আমাকে সুঘ্রাণভরা ঘি দিয়ে পরোটা ভেজে খাওয়াতেন। কিন্তু এই খাওয়ার ব্যাপারটা খুব চুপি চুপিই সারতে হত কেননা আমি তখন অর্শ রোগে কষ্ট পেতাম। কিন্তু পরে দিদার এনে দেওয়া দৈব ওষুধে আমার এই রোগ ভালো হয়ে গিয়েছিল।
বিবাহের পরে মাসির গ্রামের বাড়িতে আমি খুব ছোটোবেলা থেকেই যাতায়াত করতাম। বর্ধমান জেলার ধাত্রীগ্রাম থেকে সিমলন নামের এই গ্রামে অনেক বর্ধিষ্ণু পরিবার বসবাস করতেন। আমার মেসোমশাই ছিলেন অত্যন্ত পণ্ডিত মানুষ, প্রথম জীবনে বোলপুরে অধ্যাপনা করলেও পরে গ্রামের মানুষ তাঁকে গ্রামে তৈরি হওয়া উচ্চমাধ্যমিক স্কুলে হেডমাস্টার হিসেবে ফিরিয়ে আনেন। এছাড়াও রাজনীতিহীন সময়ে তিনি প্রায় দশটা গ্রাম জুড়ে পঞ্চায়েত প্রধানও হয়েছিলেন। বিভিন্ন গ্রামে উন্নতিকল্পে এখনও বহুমানুষ তাঁকে স্মরণ করেন। আমি সিমলনে গেলেই বাঁশের মাচায় বসে গ্রামের প্রকৃতির সঙ্গে নিজেকে জুড়ে নিতাম তখন থেকেই যেন গ্রামের গাছগাছালি পশু পাখির সঙ্গে আমার একটি হৃদ্যতা তৈরি হয়ে গিয়েছিল। এছাড়াও মেসোমশাই অত্যন্ত পশুপ্রেমী ছিলেন, নিজের বাগানে অনেকটা জায়গা জুড়ে নানা গাছ ছাড়াও ময়ুর, কুকুর, বিড়াল, গরু, পাখি, খরগোশ, বেজি এদের মধুর সহাবস্থান আমি দেখেছি। এই সময়তেই আমি প্রথম অর্জুন গাছ ও নানা নাম না জানা লতা গুল্মের সঙ্গে পরিচিত হই।
প্রায়শই আমি যখন এই গ্রামে যেতাম আমার পকেটে বিশেষ টাকা পয়সা থাকত না। মাসির বাড়ি থেকে ফিরবার সময় তিনি জোর করে আমার হাতে বেশ কিছু টাকা গুঁজে দিতেন এছাড়াও জমির চাল, আলু, নারকেল এইসব তো দিতেনই। আমাদের সংসারের সংকটের সময় এইসব প্রাপ্তি অমূল্য ছিল। আমার মাসি ছিলেন অনেকটা আমার দিদার মতো, কেউ কোনওদিন জানতেও চায়নি তিনি কাকে কতো কিছু গোপনে সাহায্য করেছিলেন।
মনে পড়ে সিমলনের শস্যভরা মাঠ আর পুকুর ভরা মাছের কথা। হাঁসেদের দুলকি চালে হেঁটে পুকুরে নেমে পড়া, আমার কাছে ছিল এইসব বিস্ময়কর ছবি। দুপুর দিকে নির্জনতা আর দূর থেকে কুবপাখির থেমে থেমে ডাক আমি খুব উপভোগ করতাম, নিঃঝুম দুপুর বেলায় আমি ভাঙা ডাল দিয়ে পুকুরে পড়ে থাকা পাকা কুল পাড়ের দিকে টেনে টেনে আনতাম। গ্রামের মধ্যিখানে একটি বিশালাকায় তেঁতুল গাছ ছিল। চৈত্র মাসে ধূধূ দুপুর বেলায় আমি যে কোথায় কোথায় চলে যেতাম তা কেউ খোঁজ করত না। একবার ছিপ ফেলে আমি বাড়ির পিছনের পুকুরে মৎস্য শিকার অভিযানে যাই, সারাদিন ছিপ ফেলে দুটি মাত্র ল্যাটা মাছ পেয়েছিলাম, সে এক নিদারুণ আনন্দের যুদ্ধজয় ছিল!
![]() |
| অলংকরণ - কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সহায়তায়, রাজীব কুমার ঘোষ |
আমার এইসব কাণ্ড দেখে মেসোমশাই আমাকে নানারকমের পাখি ও গাছ চেনাতেন। বাগানে লাগানো তেজপাতা গাছ, বাদাম গাছ এবং বাদাম গাছ পুষ্ট হওয়ার পরে বাদামের গুচ্ছ দেখে আমি উত্তেজিত হয়েছিলাম। একবার হাঁসেদের ঘরে দেখেছিলাম একটি বিশালাকৃতির সাপের উপস্থিতি। তখন হাঁসেরা ডিম ফেলে পুকুরে সাঁতরাতে চলে গিয়েছিল। হয়ত সেই পরে থাকা ডিমের খোঁজে সাপটির আগমন। আর একবার গোয়াল ঘরে গরুদের খাবারের গামলায় খাবার দিতে গিয়ে রাখাল বালকটি ছিটকে সরে আসে। দেখা যায় সেখানেও একটি বিশাল সাপ উদ্যত ছোবল নিয়ে উঠে পড়েছে। পরে এই সাপটিকেও সাঁওতাল পাড়া থেকে আসা অভিজ্ঞজনেরা বাঁশের সাঁড়াশি দিয়ে সাপটিকে গ্রেপ্তার করে। যে হাঁড়িতে করে তারা সাপটিকে জঙ্গলে ছাড়তে যাচ্ছিল হঠাৎই হাঁড়ির মুখ বাঁধা দড়ির ছোঁয়ায় ভয় পেয়ে হাঁড়িটিকে মাটিতে ফেলে দেয়, ফলত রাগী সাপটি বেরিয়ে পড়ে এবং সমানে মাটিতে ছোবল মারতে থাকে। পরে ছুট ছুট এবং কিছু পরে তাকে আবার ধরা হয়।
ভালো মানুষের সংখ্যা, দয়ালু মানুষের সংখ্যা ক্রমশ কমে আসছে। স্বার্থ সর্বস্ব এখনকার সমাজ বড়োই একা। মাসির প্রয়াণে প্রথমেই মনে পড়ল কত দরিদ্র মানুষ তাঁর অভাব অনুভব করবেন। অগ্নি নির্বাপিত হওয়ার পরে এ কথাই ভাবছিলাম ফিরে আসা দগ্ধ ছাইতে ঠাণ্ডা জল দিতে দিতে এক অসীম শূন্যতায় মন ছেয়ে যাচ্ছিল। মনে হচ্ছিল তাহলে অহংকার, কূটতা, লিপ্সা এই শব্দগুলি নিতান্তই তুচ্ছ, ঘোরমাত্র।
পর্ব সাত ।। সতেরোর ভূত
ভূত জীবনে নানাভাবে ঘাড়ে চড়েছে। প্রেতাত্মার সঙ্গে আমার মায়ের নাকি দু'বার পরিচয় ঘটেছিল। একবার মায়ের দাদামশাই মারা যাওয়ার পরে তাঁকে মা কুয়োতলার পাড়ে বসে থাকতে দেখেছিলেন। আরও একবার মা গরমকালে মাদুর বিছিয়ে সন্ধ্যে বেলায় ছাদে বাতাস খাচ্ছিলেন, তারপর তিনি যখন ঘুমিয়ে পড়েছিলেন আমার সেজো ঠাকুমা মায়ের কাছে এসে বলেছিলেন, ‘বউমা সন্ধ্যেবেলা এলোচুলে তুমি শুয়ে আছো কেন?’ দু'বারই মায়ের পরবর্তী প্রতিক্রিয়া ভালো হয়নি, তীব্র চিৎকারে সবাইকে ব্যতিব্যস্ত করে ভয় পাইয়ে দিয়েছিলেন! আমার জীবনেও একবার অন্য অনুভব হয়েছিল, এলাহাবাদে ভাই আকস্মিক মারা যাওয়ার পরে একদিন ভোর রাত্রে দেখি সে ক্ষুদ্র শরীর নিয়ে আমার পায়ের কাছে বসে আছে! এই ঘটনার ব্যাখ্যা আমি আজও খুঁজে চলি। গয়াতে আবার আমরা ভাইয়ের পিণ্ডদান করার পরে যখন আশ্রমে ফিরে আসি, চকিতে দেখি এক তীব্র হাওয়ায় সামনের টিনের ছাদটি দুলে উঠেছিল। মনে হল কে যেন তীব্র বেগে ছুটে গেল! এইসব ঘটনা ব্যাখ্যাতীত, কোনও উত্তর খোঁজাও যাবে না।
তবে যে ভূত সতেরো বছর বয়সে আমার ঘাড়ে চেপে বসেছিল তা এখনও বহন করে চলেছি। এই বয়সে পৌঁছে যেন মনের ভেতরে প্রতিনিয়ত ‘অন্য কিছু হয়ে যাচ্ছে’ আমি বুঝতে পারছিলাম। নানা চিত্ত চাঞ্চল্য, অস্থিরতা, গুমরানো ভাব, অহরহ অজানা কষ্ট সব মিলিয়ে একটা অন্য কিছু অথচ না পারছি বলতে না পারছি কাউকে জানাতে। আমার বাবা অফিস থেকে অনেক ডায়েরি উপহার পেতেন, সবাইকে বিলিয়েও একটি ডায়েরি উনি আমাকে দিতেন। মায়ের বিবাহের উপহার ‘চোখের বালি’, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের উপন্যাস সমূহ ও শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের গল্প, উপন্যাস ক্লাস নাইন টেনেই আমার পড়া হয়ে গিয়েছিল। আমার বাবা ছিলেন পাঁড় কমিউনিস্ট, রাশিয়া থেকে বাড়িতে নানা ম্যাগাজিন আসত, খুব অল্প পয়সায় ঝকঝকে সেসব বই ও পত্রিকা। লেলিন থেকে দস্তয়ভস্কি সবার সঙ্গেই সে সময় আমার পরিচয় ঘটে গিয়েছিল। ডায়েরিটি পাওয়ার পরে কিছু কিছু লাইন আমার মনে হতেই আমি লিখে ফেলতে লাগলাম। ক্রমান্বয়ে এই অভ্যাস চলতে থাকল, অবশ্য গোপনেই।
পরে পরে আমার মনোনিবেশ হয়ে যায় রবীন্দ্রকাব্যে রবীন্দ্রসঙ্গীতে, বিহারীলাল চক্রবর্তী, অমিয় চক্রবর্তী, জীবনানন্দ দাশে। এদিকে ডায়েরির পাতা ক্রমশ শূন্য থেকে ভর্তি হতে শুরু করে। তখন চিনের তৈরি বিখ্যাত কলম ছিল ‘উইংসাং’। কালির কলম কিন্তু সরসর করে চলত। আর কলমের খাপটি ছিল সোনালি রঙের। নিব ছিল তীক্ষ্ণ। এখনও সেইসব কলম কয়েকটি রয়ে গেছে। এখন অবশ্য আমার লেখায় একটি বহুদিনের পুরনো জীর্ণ সাধারণ কলম রয়েছে যাকে আমি ছাড়তে পারিনি। যে কটি লেখা ডায়েরির পাতায় জমছিল তার কয়েকটি আমি দু-একটি পত্রিকায় পাঠাতে শুরু করি। এবং আশ্চর্যের ব্যাপার কবিতাগুলি ছাপাও হয়ে গেল। সেইসময়ে আমার শহরের কয়েকজন কবির সঙ্গে আলাপ হয়ে যায়, যেমন কার্তিক চট্টোপাধ্যায়, অলোকরঞ্জন চক্রবর্তী, প্রদ্যুম্ন মিত্র, আলোক সোম ইত্যাদি।
![]() |
| কবি কার্তিক চট্টোপাধ্যায় স্কেচ- এ আই সহায়তায় রাজীব কুমার ঘোষ |
তখন বাপীদার ‘আজকাল’ পত্রিকা বাংলা কবিতার নতুন পরিবর্তন খুঁজে পেয়েছে। নতুন ভাবনা, নতুন ভাষা এবং এক অন্য ছাঁচে ঢালা আন্দোলন। আমার তখন নিয়মিতই নৈহাটির আড্ডায় যাওয়া অভ্যাস হয়ে গিয়েছিল, পকেটে থাকত গুচ্ছ গুচ্ছ নতুন লেখা এবং মনেতে উত্তেজনা। কবিতা পাঠ করাও যে একটা অধিকন্তু শিল্প তা এই আড্ডা থেকে শিখেছিলাম। স্পষ্ট উচ্চারণ, কণ্ঠস্বরের ওঠা-নামা এবং যতিচিহ্নের বিষয়ে অভিজ্ঞান থাকা জরুরি, তা না হলে কবিতার সম্যক উপলব্ধি মনের ভেতরে জারিত হওয়া সম্ভবপর নয় এই শিক্ষা পেয়েছিলাম।
একদিন রাত করে নৈহাটি থেকে ফিরতে দেখি আমার ভাই সাইকেল নিয়ে দাঁড়িয়ে আমার জন্য অপেক্ষা করছে, কাছে আসতেই গম্ভীরভাবে বললো, ‘বাড়ি চল, বাবা দেবে’। বুঝলাম আজ কিছু হবে আর কবিতা লেখারও সমাপ্তি ঘটবে। যা ভয় পেয়েছিলাম তা অবশ্য ঘটেনি মা আমাকে আড়ালে রেখেছিল। এই আড্ডার সঙ্গে চলতে লাগল ‘শায়ক’ পত্রিকাটির আপাদমস্তক বদল। একটি নিটোল কাগজের জন্য ‘আজকালের’ কবিরা আমাকে নানাভাবে উপদেশ দিলেন এবং আমারও মনে হল পত্রিকা যদি করতেই হয় সিরিয়াসনেসটা জরুরি। পত্রিকায় ক্রমে বাহ্যিক আকৃতি এবং বিষয়ের নানা পরিবর্তন এলো। ততোদিনে অবশ্য আমার সঙ্গে থাকা বাকি দুই বন্ধু পড়াশোনা এবং ব্যক্তিগত অসুবিধার কারণে ছিটকে গিয়েছেন। আমাকে একাই পত্রিকা করতে হবে ভেবে মন স্থির করে নিলাম। নানাভাবে নানা লেখকের ঠিকানা জোগাড় করে লেখা আনতে লাগলাম। এইসময়ে কবি দেবীপ্রসাদ বন্দ্যোপাধ্যায়, বিনয় মজুমদার, অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত, প্রণবেন্দু দাশগুপ্ত ও শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের কাছেও কবিতা চেয়ে পেয়েছি। নানা অমূল্য গদ্য লিখলেন ‘আজকালের’ কবিরা। এছাড়া নতুন কবিরাও ‘শায়কে’ লেখার জন্য আগ্রহী হলেন। আমার লেখা সম্পাদকীয়র মাধ্যমে নানা বিপ্লবাত্মক ঘোষণা ছড়িয়ে দিলাম, এমনকি পাঠকেরাও রেহাই পেলেন না।
এইসব ঘোষণার মধ্যে আমার অবশ্য কোনও বিপ্লব করার ইচ্ছে ছিল না। আমি শুধু চেয়েছিলাম এমন একটি পত্রিকা হোক যেখানে লেখাগুলির মধ্যে হৃদজারিত মৌলিক কবিতা থাকবে, নিজস্ব ভাষায় কথা বলা হবে এবং সার্বিক ভাবে পত্রিকাটির একটি অন্য চরিত্র থাকবে। এই পত্রিকার মাধ্যমে বাংলাদেশের এক মুক্তিযোদ্ধা কবির সাথে আমার ঘনিষ্ঠতা হয় তার নাম ওয়াহিদ রেজা, ‘ড্যাফোডিল’ নামের একটি অতি সুন্দর পত্রিকা সম্পাদনা করতেন, রঙিন কাগজে কবিতা ছাপা হত আর অক্ষরের টাইপও ছিল মোটা মোটা। সেখানেও আমার কবিতা নিয়মিত ছাপা হতে লাগল, সীমান্ত পেরিয়ে আমার কবিতা তখন অন্য দেশে। এর বেশ কিছুদিন পরে ওয়াহিদ ভারত সফরে এলে একদিন আমার বাড়িতে এসে হাজির হল। আমার মা যেহেতু রাজনৈতিক ঘরের মানুষ ছিলেন, খবর কাগজের মাধ্যমে রাজনীতির প্রতিটি খবরাখবরই তিনি নিয়মিত রাখতেন। মনে আছে মুজিবুর রহমানের পরিবারসহ হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় মা দীর্ঘদিন বিহ্বল ছিলেন। ওয়াহিদকে সামনে পেয়ে তাঁর দুঃখ উথলে উঠেছিল, মা ওয়াহিদকে পুত্রসম যত্নে নানা পদ রেঁধে মধ্যাহ্ন ভোজ করিয়েছিলেন। একদিনের সেই আতিথিয়তায় মা হয়ে উঠেছিল যেন ওয়াহিদের আপন মাসিমা। তখন থেকেই ‘ড্যাফোডিল’ প্রকাশিত হলে ওয়াহিদ দু'কপি আমাকে পাঠাতো। এক কপি আমার নামে আর এক কপি মায়ের নামে। পত্রিকার কোণে লেখা থাকত সুন্দর হস্তাক্ষরে, ‘মাসিমাকে’।
.png)





.jpeg)
.jpeg)



2 মন্তব্যসমূহ
এই দীর্ঘ কবিতা যাপনের সাক্ষী থাকার সুযোগ হয়েছে বহুলাংশে। শ্যামলজিৎ সাহা যে দরদ নিষিক্ত কবিতা রচনা করেন তা তাঁর ব্যক্তিগত জীবন-অভিজ্ঞাকে পাঠকের স্নায়ুতে চারিয়ে দিতে পারে, যে পাঠক নিজেকে প্রস্তুত করেছেন। প্রায় অর্ধ শতকের এই গমন এক স্থির জীবনদর্শনের খুব কাছে নিয়ে গেছে তাঁকে - এই লেখা লেখায় সেই পথের দিকে আলো পড়ে।
উত্তরমুছুনবড় ভালো লিখছে বন্ধু আমার...চলমান ছবি দেখছি যেন
উত্তরমুছুন