সাইন্যাপস্‌ ধারাবাহিক কলাম


সাইন্যাপস্ধারাবাহিক

আত্মকূটকথা।। শ্যামলজিৎ সাহা

সারে চার দশক ধরে চুঁচুড়ার কবি শ্যামলজিৎ সাহা কবিতা-জীবন যাপন করে চলেছেন। জন্ম ১৯৫৯; ম্যনেজমেন্ট পঠনের পরে কেন্দ্রীয় সরকারি চাকরি এবং পরে ব্যাঙ্কে কর্মজীবন। আশির দশক থেকে নিরবিচ্ছিন্ন কবিতাচর্চা প্রথম কাব্যসংকলনমুগ্ধকথা’(১৯৯২) পরের কাব্যসংকলনগুলি —  ‘বীজাক্ষর’(২০০৮), ‘সময়ের সান্ধ্যপাঠ’(২০১৬), ‘অন্তর্নিহিত’(২০২৫)একদা কবিতা লেখার পাশাপাশি লিটল ম্যাগাজিন সম্পাদনা — ‘শায়ক নৈহাটির আজকাল/আজকাল টাইটোনিডির কবিগোষ্ঠীর সঙ্গে যুক্ত থেকেছেন নিবন্ধ রচনা ও পুস্তক আলোচনা কবির প্রিয় বিষয়



পর্ব এক।। কবিতা নিয়ে ভাবনা : কবিতা নিয়ে তাগিদ

বাল্যকালে একদা মা-র কাছে তাঁর পিসিমার লেখা একটি হলুদ পাতা চোখে পড়েছিল তাতে সেই পিসিমার লেখা একটি দীর্ঘ নিখুঁত ছন্দের কবিতা পড়ে ছিলাম কবিতাটির বিষয়বস্তু এখন আর মনে নেই; এবং পরিতাপের বিষয় তা সংরক্ষণ করার সুযোগও হয়নি এ যাবৎ কাল সেই কবিতাটি আমি এখনও খুঁজে চলেছি কিন্তু এখনও তার হদিশ পাইনি একাদশ শ্রেণীতে পড়তে পড়তে পাঠ্য বইয়ের কিছু কবিতা মনের ভেতরে কোথাও যেন একটা ছবি ছন্দ দোলায়মানতা তৈরি করে দিয়েছিল চেষ্টা করতে থাকি কিছু লিখে ফেলবার, সেই বয়ঃসন্ধির সময় এমন কিছু কথা যা সহজে কাউকে বলা যায় না তাই যেন ভালোবাসার রূপকে কবিতার মতো কিছু একটা হয় এই হলো শুরুর কথা এ সময়ে কিছু সমমনস্ক বন্ধুবান্ধব ও মাস্টারমশাইয়ের উৎসাহে একটি পত্রিকাও বের করে ফেলি পরে পরে সেই পত্রিকার সূত্রপাতে আরো সম্পাদক ও কবিবন্ধু জড়ো হয় আমি ক্রমে নৈহাটির একটি পত্রিকাগোষ্ঠীতে আড্ডায়, কবিতাপাঠে এবং কবিতার বইয়ের সন্ধানে মেতে উঠি এইভাবে মনের ভেতরের একটি গোপন স্রোত ক্রমে কবিতার খাতায় প্রবহমান হয়ে ওঠে 

কবিতাযাপনের সেই শুরু যা আজ প্রায় সারে চার দশক ধরে আমাকে নিবিড় বন্ধনে জড়িয়ে রেখেছে লিখতে না পারলে বিপদ আবার লিখলেও বিপদ এক অদ্ভুত জীবন, যেচে নেওয়া কষ্ট যা অব্যক্ত, অশান্ত, অজানিত। এর কোনো বিরাম নেই; অন্তত চিন্তার কোষে হৃদয়ের রক্ত প্রাবাল্যে সেই যে কবি বলেছিলেন না কাগজ কলম নিয়ে চুপচাপ বসে থাকা আজ বসে থাকি, খোলা জানালার দিকে, নির্নিমেষ, সাড়হীন, কলম নড়ছেনা কোথাও কিংকর্তব্যবিমূঢ় দিশাহীন  যেমন গত তিনমাস না লেখার ভেতরে এক নিদারুণ সময় চলেছে তবু ভাবনার আহ্বান এড়াতে পারিনা  বিষয়ের শেষ নেই তোমার সামনে  তোমার পেছনে; শুধু খুঁজে নিতে হয় এটাই সারাৎসার। পালানোর উপায় নেই, এই ফাঁদে যে একবার পা দিয়েছে তার পালানোর উপায় নেই

তবে অনেক হয়েছে প্রেমের কবিতা লেখা, বৃষ্টির কবিতা লেখা, অবদমনের কবিতা লেখা কলমই তো সেই শক্তি যা তরবারির থেকেও সময় সময় ধারালো হতে পারে। কবিতা তো হৃদয়বৃত্তির কথা বলে, সেখানে কোনো সাজানো পটভূমি নেই; একমাত্র পটভূমি যা তোমার রচনা দিয়েই তৈরি করে নিতে হয় যেন এক গোপন অস্ত্র যা তোমার জীবনযাপন, সোজাসুজি দেখা পথ, আর সত্যকে নিয়ে চালিত হয়। সত্য ছাড়া জীবন হয়না, অহর্নিশ সত্য এবং তাকে যেভাবে দেখলাম তাই যেন কবিতার শরীর মেলে ধরে একজন কবির জীবন সেইরকমের ভাবনার মতই হবে যা নিজচক্ষে অবলোকন করিলাম তাহাই লিখিব কোনো বানানোর কথা তাতে লিপিবদ্ধ হবেনা, জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত হতে হবে বিবেকতাড়িত, কোনো মিথ্যে সেখানে নেই; কোনো লুকোচুরি নেই; রাজনীতি সে তো অনেক দূরের ব্যাপার

আজকাল দেখি কবিতা পত্রিকা প্রকাশ নিয়ে খুব প্যাঁচপয়জার চলে একটু চক্ষু প্রসারিত করলেই সব বোঝা যায় প্রচারের সবিশেষ টান, মোহগ্রস্ততা আর মাথা নীচু করে নিজের পরিব্যপ্তি বাড়ানো। এ এক নিম্নমানের অভিরুচি, কবিরাই হবেন সমাজের সব থেকে সম্মানীয় ব্যক্তি, তবে তার কেন এই মোহমুদগার স্রোতে নিজেকে ভাসিয়ে দেওয়া? আপনি সম্মানিত একমাত্র আপনার কবিতার ব্যাঞ্জনায় সেখানে অন্য কোনো তৎপরতা নিছক আত্মপ্রসাদ অতীতের দিকে তাকালেই বোঝা যাবে কেন জীবনানন্দ দাশ থেকে প্রণবেন্দু দাশগুপ্ত পর্যন্ত এখনও আমাদের আদর্শ উদাহরণ প্রকৃত কবি সেইজন যিনি তাঁর আত্মমান নিছক মোহজালে সমর্পণ করেন না এসব হলো কবি ও তার চরিত্র নির্মাণের গোড়ার কথা এবার কবিতা নির্মাণের ক্ষেত্রে তাগিদের কথায় ফিরি

কবিতা রচনার প্রথম তাগিদ নিজের জীবনবোধ থেকেই নির্মিত হয় তাঁর দেখা শোনা ঘটনা প্রবাহ কোনো কিছুই এড়িয়ে যাবার নয় সামান্য কিছু লতা-গুল্ম রাস্তার একধারে দেখেছি অন্য একটি অবহেলায় বেড়ে ওঠা বড়ো গাছটিকে ধরে বেড়ে উঠছে দৃশ্যকল্পে যেন বড়ো গাছটি মা গাছ হয়ে অন্য ছোটো লতা-গুল্মদের সন্তানের মতো স্নেহবশে আঁকড়ে রেখেছে আবার দেখেছি এক আদিবাসী রমণী রাস্তার ওপরে মুখ থুবড়ে পড়ে আছেন আর তাঁকে উদ্ধারের পরে সে যেন আমার ঘাড়ে মাথা রেখে আশ্রয় খুঁজেছে। এও তো সেই কবিতাই শুধু ঘটনার কাব্যরূপ আর তাকে কিছু মানুষের কাছে কাব্যকুহকের মতো পৌঁছে দেওয়া এর আবেদন তখনই সম্পূর্ণ হয় তা যেন সার্থক রূপে কবিতার আকার পায় তখন চেনা জানা ছন্দ ব্যকরণ সব মিথ্যে একমাত্র সত্য শব্দের সঠিক দ্যোতনা আমি ঘটনাকে এভাবেই লালন করি : সেখানে মিথ্যের কোনো ছলাকলা নেই আমার জীবন যাপন, সময়ের সঙ্গে অভিসার সব, সব যেন সেই কবিতার মুহূর্ত প্রতি মুহূর্তে তাকে নিয়ে ঘর করা পল্লীগ্রামে থাকাকালীন দেখেছি কতো না পটভূমি  সেখানে প্রথম ভোরের সূর্য যে কমলা বর্ণের হয় তা জানা ছিল না, জানা ছিল না রাজহাঁসের রাস্তা চলাচল আর তাদের নিজ ইচ্ছায় সামনের সব যান চলাচল বন্ধ করে দেওয়া সব যেন তাদের ইচ্ছায় আর সম্মতিতে চলে আবার সরু সুতোর জালে খ্যাপলা মেরে মেয়েদের মাছ ধরা কাকে দেখবো কী দেখবো  তাদের জলে ভেজা কাদায় লেপা শরীর না চুনো মাছের ঝাঁক দূর থেকে ঝড়ের আগমনের শব্দ সব কিছুই যেন বা কবিতা ভয়ে দরজা বন্ধ করি ভাবিএইসব দৃশ্যসমূহ ছবি না কবিতা এক অদ্ভুত শিহরণের মধ্যে সময় কেটে যেতে থাকে

এত বছর কবিতার সঙ্গে কাল কাটানোর পর ক্রমশই নিজের প্রতি আরো সন্দিহান হতে থাকি কী লিখলাম এতদিনে কবিতা না ভ্রম, পড়া বা শেখার শেষ নেই; আর কবিতাপাঠ সে এক বিশেষ অধ্যায়, ভালো কবিতা মন্দ কবিতা কতো না সংকট সমুদ্রস্রোতের মতো এর পরিধি, কারোর কবিতা তীরে এসে ভেঙে পড়ছে কিন্তু ওই পর্যন্তই আবার কারোর কবিতা দীর্ঘ স্রোতের ভেতরে সপ্রাণ এই সেই ঐশ্বরিক কবিতা যা ধারণ করতে হবে শুধু কল্প জগতের নিছক খেলা নিয়ে নয় ঈশ্বরীর কবিতা নিয়ে ধারণা সুস্পষ্ট হতে হবে কবিতা রচনার ক্ষেত্রে আরো একটি বিষয় প্রায়শই মনে আসে  তা হচ্ছে কবিতা রচনা মানে নিভৃতির সাধনা একান্ত গোপন চিলছাদে চুপচাপ বসে থাকা এক এক সময় মনে হয় কিছু লিখবো না শুধু সময়ে ভাববো এক সময় সে ধরা পড়বেই তখন সংসার, তখন ধর্ম  সবই যেন মিথ্যে একমাত্র কবিতাই সত্য সেই শূণ্যতার অবসান থেকে কবিতার প্রকৃত শরীর খাতায় খোদিত রূপে ধরা পড়বে এ এক ধৈর্যের পরীক্ষা তবু শেষপর্যন্ত কবিতা রচনা এক অলৌকিক বিষয় বলেই মনে হয়

 

পর্ব দুই।। নিন্দা বা প্রশংসা

কতকটা দ্বিধা নিয়েই এই প্রসঙ্গটায় আসছি। অনেক বছর আগে একটি লিটল ম্যাগাজিনের পাতায় এক অহং সর্বস্ব শ্লোগান ছিল, নিন্দা বা প্রশংসা সমান জরুরি তখন লেখালেখির কাঁচা বয়সে আমি শ্লোগানটির ভেতরকথা পর্যন্ত পৌঁছতে পারিনি। পরে পরে বয়স পাকার সঙ্গে কেন জানিনা আপ্ত বাক্যটির সর্বান্তকরণ মানে নিয়ে প্রায়শই ভাবতে থাকলাম। এবং ভাবনা সকল এখনও লেখার পথে পথে চলতেই থাকে, ভাবি যিনি আমার লেখাটির গুণাগুণ করছেন তিনি ঠিক সত্য কথাই বলছেন তো? না আমাকে নিছক সন্তুষ্ট করে প্রবোধ দিচ্ছেন। সন্দেহ ও নিঃসন্দেহ তখন একাকারে চলে যায়। আমি থমকে যাই, আমি আলো ও আঁধারের হদিশ করতে পারিনা। তবু ভাবি আমি কেন এতো কথা ভাববো। আমার কি দরকার। ভালো বলেছেন, বেশ। তাতে আমার আত্মতুষ্টি বাড়লে কি এমন ক্ষতি? বরং লাভই হলো, আমার ভবিষ্যৎ লেখার প্রতি দায়বদ্ধতা বাড়লো, আমি আমার নিবেশ আরো একাগ্র করতে পারবো এবং ভালো লেখার জন্য আরো ভেতরে ভেতরে সংকল্প করব।

কিন্তু, তা তো হওয়ার নয়; ওই যে মানুষ বড়ো সন্দেহপ্রবণ। কেউ ভালো বললেও খারাপ আর খারাপ বললেও আরো আরো তীব্র হলাহল। ভাববো আমার লেখার সমালোচনা করে তিনি আমার লেখার বুঝদার হতে পারেননি। তিনি হয়ত আমার উন্মেষ চান না অথবা অসূয়া পোষণ করেন। আসলে ভাবনাগুলি পরপর অস্বাভাবিক মনের বিকারেই এসে যায়। মানুষ বড়ো ভাবপ্রবণ জীব, সে ভালোত্বটুকুই বেশি বোঝে আর খারাপ বা বিরুদ্ধকথা বললেই তার ভেতরটুকু এক অন্যরকমের স্নায়ুবিকার হতে থাকে। আর যাঁরা এসব ব্যাপার মোটেই পাত্তা দেন না, তাঁদের এ বিষয়ে উপেক্ষাই থাকে। থাকে এসব আলোচনা বা সমালোচনার উদ্দেশ্যে। তাঁরা মহৎ লেখক, তাঁদের প্রজ্ঞা এক নীরব গৃহকোণের মধ্যেই বসবাস করে। নিরবচ্ছিন্ন স্তুতি তাঁদের ছোঁয় না। নির্বিকার একতরফা লেখার প্রতি একনিষ্ঠ মনোযোগ। তবু এইসব চরিত্র অতি নগণ্য, হাতে গোনা মাত্র। তাঁরা তাঁদের আমূল চরিত্র নিজ গুণে বদলে দিয়েছেন। তাঁদের ভাবুক মন, একনিষ্ঠতা, আর জীবন-যাপন একলাইনের মাত্রা দিয়ে চলতে দিয়েছে। তাই তাঁরা লেখার প্রতি যে মগ্নতা আর ধ্যান দিয়েছেন, তা যেন মনে করায় বীজতলা থেকে ধানের দুধ পর্যন্ত এক নীরব চাষির নিবিষ্ট কর্মকাণ্ড।

আর বাকি যাঁরা এরকম নন, তাঁরা কি তাঁদের লেখার প্রতি যত্নবান নন? তাঁরা কি শুধুই নাম আর যশের প্রতি বিলাসী থেকে যেতে চান? প্রশ্ন থেকে প্রশ্ন  এর কোনো শেষ নেই; তো এতো ভাবনারই বা কি দরকার? যার যেরকম দর্শন। এসব চলতেই থাকবে নিরন্তর। বহুবছর আগে আমি দেখেছিলাম কবি অরুণ মিত্র-কে। কী ভাবলেশহীন একজন মগ্ন কবি। মাথা ভর্তি রুপোলি চুলের ভেতরে বসে রয়েছেন প্রজ্ঞাবান কবি। তার বিছানার নীচে শুধু বই আর বই। কোনও বড়ো প্রশ্ন করার সাহস পাইনি সেদিন। আর কবি বিনয় মজুমদার, তিনি তো অন্য পৃথিবীর লোক তার নিন্দা বা প্রশংসায় কিছু এসে যায়নি। প্রকৃতপক্ষেই তাঁর কিছু এসে যায় না। অথবা কবি আলোক সরকার যেন নিভৃত প্রাণের দেবতা। তাঁর নিরন্তর বসবাস প্রকৃতিমধ্যেই। সব অলৌকিক ঘটনা সমূহ তিনি রেখে দিতে চান কবিতার শরীরেই শুধু।

তাই এরকম যাঁরা ছিলেন, তাঁরা কয়েকজন মাত্র। কবিতা লিখতে বসলে আবেগটুকু সংযত ও সংহত হওয়ার চেষ্টা করে যেতে হয়। তখন পাগলপারা লাগে। তখন জীবন আর জীবনাবসানের মধ্যবর্তী অবস্থা। রিলকে, র‍্যাঁবো, ব্যোদলেয়ার যেরকম সারস্বত ভাবনায় বশবর্তী ছিলেন। 

যৌবনের শুরুতে কত না পত্রিকায় লিখেছি। কিছুদিন আগে সেইসব কাগজ, লাল হয়ে যাওয়া কাগজের ভেতরে কত না পুরনো গন্ধ। আবিষ্ট হয়ে কিছুক্ষন পরে পরে অতীত ভাবনারা হামলা করে। এইসব কবিতাগুলি কেন ছাপতে দিয়েছিলাম? এখন মনে হয় হয়তো তারা কবিতাই ছিল না, আরো আরো ধৈর্য্য রাখা উচিৎ ছিল প্রকাশের তরে। যৌবন সব বুঝতে পারে না, নিন্দা বোঝে না, প্রশংসা খানিক বুঝতে পারে আর প্রকাশের রাজনীতি বোঝা সে তো অনেক দূরের ব্যাপার। রাজনীতির প্রসঙ্গ কেন আনলাম? লেখার শুরুতে কত লেখা লোকে বলে বাতিল বাতিল, কিছুই হচ্ছেনা। চাই আরো অনুশীলন আরো নিবিড় জাগ্রত মনোজগত। আমি তখন উদ্বেল, আমি তখন নিজের নাম মুদ্রিত অবস্থায় দেখতে চাই। তাই যাঁরা আমার লেখা ছাপলেন না আমি স্বল্প বিদ্যায় বুঝে নিলাম তাঁরা হয়তো আমার লেখা ধরতেই পারেন নি অথবা আমি তাঁদের দলে পড়ি না বলে কবিতা ছাপা হয় নি। আর এর থেকেই যেন রাজনীতির গন্ধটা ঘুলিয়ে ওঠে। তবু কিছু কাগজে লেখা ছাপা হয়, একটু একটু করে লোকে জানতে পারে আমার কবিতা। কিন্তু ওই যে সন্দেহ নামের রাক্ষস-টা আমাকে ক্রমশ প্ররোচনা দিতে থাকে, ‘কিছু কি হলো’? তখন নিজেই নিজের কপালে একান্তে করাঘাত করি, লেখাগুলি নির্বিবাদে মরে পুড়ে আংরা হয়ে যায়। সেই খাতাগুলি ভরে থাকে কবিতায়, কিন্তু এক সময় জরাজীর্ণ, ধুলিবসন হয়ে পড়ে। পুরনো লেখাগুলি ক্রমে দূরে অন্ধকারময় অতীতের গর্ভে বিলীন হয়ে যায়।

এরকম মনের অস্থিরতা সব কবিতা লেখকেরই সম্ভবত হয়ে থাকে। কম বা বেশি। তবে তার মাত্রা এক একজনের কাছে এক একরকম। স্বভাবতই নিন্দাসূচক বাক্য বা সমালোচনা কেউই সোজাভাবে নেন না। তাতে তাঁরা হতোদ্যম হতে পারেন না নিস্পৃহ হতে পারেন। আবার একাকীও হতে পারেন, নিঃসঙ্গ নিভৃত। তখন সব সান্ত্বনার শেষ হবে তাঁদের ওই কবিতাগুলি। ওই যে রমেন্দ্রকুমার বলেছিলেন শেষপর্যন্ত কবিতাগুলিই থাকবে, তারাই সন্তান তারাই মুখে আগুন দেবে। খুব কমজনই এরকম ভাবনায় সাহসী থাকেন। নির্বিকল্প কেউই নন, যাঁরা এসব চিন্তা মনের গহনে রেখে দেন, তাঁরা প্রহেলিকার স্তরে থাকেন। হয়ত নিজেকে বিড়ম্বিত করেন। সুতরাং নাম যশ কীর্তি সব এক একটি স্তর যা লেখাকে ক্রমে শত্রু করে, প্রতারণা করে, নিজপ্রতি সন্দেহ যুক্ত করে। তা বলে কি কেউ যশঃপ্রার্থী হবেন না? নাম কিনবেন না? হাতে তুলে দেওয়া পুরস্কার নেবেন না? প্রশ্ন প্রতিমুহূর্ত তাড়া করে ফেরে। নিজেকে নিয়েই উত্তর খোঁজা যাক  আমি কি তবে যশঃবিমুখ হব? এবং সেটা কিভাবে হব। যদি কোনোদিন কবি হিসেবে স্বীকৃত হই, তা কি কাঙ্খিত হবে না? যদি বলি না, তাহলে প্রতারণা হবে নিজেরই সঙ্গে। শুধু কোথাও একটা গণ্ডি টেনে রেখে দিতে হবে এবং প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হবে। কাকে যশ বলে, কাকেই বা স্বীকৃতি বলে? ভাবতে ভাবতে দিন ফুরিয়ে রাত চলে আসে কিন্তু মীমাংসা হয় না যে সূক্ষ্ম মন নিয়ে আমরা মোহসঞ্জাত বিষয়ের সম্মুখীন হই তার তল পাওয়া মুশকিল। আর যাঁরা লেখার ভাবনায় শেষটুকু ওই নিজ-নাম, আর নামযশটি মাথার ভেতরে রেখে কলম চালান তাঁরা কি শেষাবধি হারিয়ে যাবেন? কেননা তাঁরা এক মনবিকলনের শিকার মাত্র। ফলত এই নাম ভাবনায় পাকতে পাকতে তাঁদের আর প্রকৃত কবিতা লেখা হয়ে ওঠে না। যা হয়, কবিতা লিখতে এসে প্রমোদে ঢালিয়া দিনু মন

অতি তরুণ বয়সে দুটো জিনিসে খুব সঙ্কোচ হত। এক, আনন্দবাজার অফিসে ঢোকা আর দুই, কলেজ স্ট্রিটের কফি হাউসের মৌজে ঢোকা। তবু, আনন্দবাজারের সেইসব গুণীজন লেখা নিয়ে যেতে বলতেন। একটা অন্যধরনের স্নেহমিশ্রিত আমন্ত্রণ ও আন্তরিকতা থাকত। তাঁদের মত অনেকেই এখন আর ইহজগতে নেই যেমন আনন্দ বাগচী, সুনীল বসু, শক্তি চট্টোপাধ্যায়আর কফি হাউসে যাঁরা টেবিল জুড়ে কফি ও সিগারেটের ধোঁয়ার কুণ্ডলী ওড়াতেন দূর থেকে দেখেই আমি শুধু জিজ্ঞাসা দপ্তরে শিবনারায়ণবাবু আছেন কি না জেনে যেতাম। কারা কারা যেন বলতেন কফি হাউসের আড্ডাটা আসলে এক ধরণের যোগাযোগের সেতু, অভিপ্রায় যাঁর থাকবে ও যাঁর কবিতা একদিন বিভিন্ন পত্রিকায় শিরোনাম পাবে তাঁদের নাকি কফি হাউসে যাওয়াটা জরুরি। সকলেই এরকম মনভাবাপন্ন নন কিন্তু বাইরে থেকে আমার যা মনে হয়েছে কেউ কেউ তো বটেই। আর এখানেও সূচনায় থাকছে এক প্রশংসাবিদ্ধ বাণী শোনার  অগ্রজ বা সমসময়ের সহ কবি ও সম্পাদকের কাছ থেকে। কিন্তু কোথাও যেন এক সূক্ষ্ম ইশারা থেকে যাচ্ছে — ‘তুমি আমার লেখা ছাপলে আমিও তোমার লেখা ছাপাবো আমার কাগজে এক অলিখিত অপ্রকাশ্য শর্ত যা মুখে বলা যায় না বোধে বুঝে নিতে হয় । অবশ্য স্বাভিমানযুক্ত কবি লেখকেরা সবসময়তেই আলাদা থাকেন। কেননা কফি হাউসে তো প্রণবেন্দু দাশগুপ্ত, ভাস্কর চক্রবর্তী ও শম্ভু রক্ষিতের আড্ডা ও কবিতার সত্য মিথ্যা নিয়ে আলোচনা বহু বহু করে গেছেন। তবু, তাঁদের কবিতা চিরকাল স্ববৈশিষ্ট্যেই রয়ে গেছে। সেখানে কফি হাউসের ভূমিকা একান্ত গৌণ।

কফি হাউসের সিঁড়ি থেকে নেমে লিটল ম্যাগাজিনের স্টলে পৌঁছাই। কতো না মুক্ত প্রকাশ সেইসব পত্রিকাগুলিতে। কবিতার স্রোত, গদ্যের প্রজ্ঞা, নাটকের স্পর্ধার বার্তা। আমি তখন ট্রামে চলা ঘণ্টার ধ্বনি শুনতে পাই  এটাই আসল ছবি  স্পর্ধাসেখানে নিন্দা বা প্রশংসা দুটোই ছোটো ছোটো শব্দ মাত্র।

আর একটি পরিবর্তন ইদানীং খুব চোখে পড়ে। ঢাউস সাইজের বইরূপ পত্রিকায় ঠেসে-ধরা এক একটি বিশেষ সংখ্যা। এসব পত্রিকাও বলা হয় লিটল ম্যাগাজিন। আমার বিস্ময়ের অবধি থাকে না, কী নিদারুণ অসম্ভব কার্যকলাপ থাকে এইসব পত্রিকাগুলিতে। গবেষণালব্ধ, অতি পরিশ্রমে লেখা, সময় এবং নিঃশেষিত প্রাণে ধরে রাখা বিষয়সমূহ। সেখানে যেন নিন্দা, প্রশংসা, প্রাপ্তির কোনো ভূমিকা নেই; এক উদ্ভাসিত জ্ঞানের উন্মোচন। এবং তা থেকে বহু মানুষের জ্ঞানপ্রাপ্তি ঘটে চলে দিনের পর দিন। আবার বইমেলা ঘিরেও এক ধরণের উন্মাদনা চোখে পড়ে। প্রতিদিনের ভিড়, নানা প্রকাশনার স্টলে বই নিয়ে মানুষের বিভোরতা সব কি মেকি বলে মনে হয়? লক্ষ লক্ষ লোকের ভেতরে মানুষের এই যে ঔৎসুক্য চোখ তা কি সত্যি লোক দেখানো? আমার তা মনে হয় না। সকলেই ড্রয়িংরুম সাজানোর জন্য বই কিনে নিয়ে যান না। কেউ কেউ হয়ত চা এর কাপ ঢাকা দেওয়ার জন্য একটি হার্ড পেপারে বাঁধানো বই ব্যবহার করতে পারেন, কিন্তু সকলেই নয়। এইসব বিশ্বাস এখনও মাথার ভেতরে ঘোরা ফেরা করে বলেই তো বেঁচে থাকতে ইচ্ছে হয়।

যৌবনের শুরুতেই আমি কবি সমর সেনের বাবু বৃত্তান্ত পাঠ করেছিলাম। বইয়ের শুরুতে ভূমিকার নিচে কবির ঠিকানা লেখা ছিল সুইনহো লেন আর সেই গলিতেই ছিল আমার ম্যানেজমেন্ট পড়ার ঠিকানা। বইটি পড়ার পরে আমি এতই বিমোহিত ছিলাম ভাবলাম একবার অন্তত তাঁর সাথে দেখা হওয়া দরকার। তারুণ্যের সাহসে ভর করে একদিন চলেই গেলাম তাঁর ঠিকানায়। ঢোলা পাজামা-পাঞ্জাবী তে এক সৌম্য দর্শন ঘাড় পর্যন্ত নেমে আসা সাদা চুলের এক সাধারণ মানুষ। প্রাথমিক পরিচয়ের শেষে তিনি হয়ত অবাকই হয়েছিলেন আমার অল্প বয়সের কৌতূহল দেখে। স্পর্ধাবশে তাঁকে সেদিন আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম কেন তিনি কবিতা লেখা ছেড়ে দিলেন। কিন্তু তিনি ওই প্রসঙ্গে না গিয়ে তাঁর সম্পাদিত বিখ্যাত পত্রিকা ফ্রন্টিয়ার নিয়েই বেশি আলোচনা করতে আগ্রহী ছিলেন। এই ঘটনাটি উল্লেখ করার একটাই কারণ প্রজ্ঞাবান কবিরা এভাবেই নির্মোহ থাকেন সেখানে নিন্দা প্রশংসা আলোচনা সমালোচনা সব নিরর্থক শব্দ মাত্র। 

আমার মনে পড়ে অরুণ মিত্রের ছোট্ট ফ্ল্যাটে বইয়ের রাজ্যে এক অশীতিপর মানুষের মুখ তাঁর ছায়ার সামনে বই ছায়ার পেছনে বই আধাঁর ঘেরা খাটের নিচে বই বই আর বই। তিনি কোনো ছোটো পত্রিকা তরুণ কবির কবিতার বই সবই সম্মান দিয়ে সংগ্রহে রাখতেন। কাউকেই উপেক্ষা করেন নি। তিনি যেন জেগে থাকা এক সময়ের দলিল। আর এক অরুণবাবুর কথা মনে পড়ে  তিনি উত্তরসুরি পত্রিকার সম্পাদক অরুণ ভট্টাচার্যশতরঞ্চি পেতে মেঝেতে বসে পত্রিকার জন্য লেখালেখি বাছাই করছেন আর তাঁর চতুর্দিকে পত্রিকা বই অগোছালো কিন্তু তারই মধ্যে তিনি তার ভেতর বাহিরে নিমজ্জমান।

কবিতা লেখার শুরুতে আমার কলেজ স্ট্রিট আমার কফি হাউস এসব নয়, আমার আড্ডার একটাই জায়গা ছিল। তা হল আজকাল পত্রিকার (অধুনা: আজকাল টাইটোনিডি), নৈহাটি স্টেশনের তিন নম্বর প্ল্যাটফর্ম, টিমটিমে আলো আর খোলা আকাশের নিচে ঘাসের ওপরে পাঁচজন কবি একজন গল্পকারের মাঝে পড়ে আমার সসংকোচ কবিতাপাঠ। কবি রমেন্দ্রকুমার আচার্যচৌধুরী একদা যাঁদের একটি চিঠিতে জানিয়ে ছিলেন সহজে বিখ্যাত হওয়া তোমাদের কপালে নেই। এ কথা কেন বলেছিলেন সেই অনুষঙ্গ এখানে ব্যাখ্যা করতে গেলে পুরনো ইতিহাসে ফিরে যেতে হয়। তাঁদের রচনাপাঠে তিনি আত্মহারা হতেন, নানাপ্রসঙ্গে তর্ক ও চলতে থাকতো। কিন্তু পারস্পরিক অগ্রজ অনুজের সম্পর্কে কখনো কোনো তিক্ততা ছিল না। এই প্রসঙ্গটি উল্লেখ করার একটাই বিষয় : তাঁদের সবার কাছেই ছিল নিন্দা বা প্রশংসা সমান জরুরি।

এত ঘটনার ক্রমউল্লেখের একটাই কারণ  কবিতার বই আলোচনাকালে আমি দেখেছি কখনো সামান্যতম সমালোচনার ধার ঘেঁষে চলে গেলে পরবর্তী কালে সেই কবির কাছে নানা কথার ঠোক্কর খেতে হয়। অনুভবে বুঝেছি সময় পাল্টে গেছে। এখন আর নিন্দা প্রশংসা সমান জরুরি এটি আপ্ত বাক্য নয় এখন স্বখেদে বলতে হয় কোনো সমালোচনা বা নিন্দা করা যাবে না শুধু মাত্র প্রিয়ভাষিত আলোচনাই হবে একমাত্র উদ্দিষ্ট। লেখা উচ্চগুণে পৌঁছাক বা না পৌঁছাক লেখাটি যেভাবেই হোক প্রশংসায় ভরিয়ে দিতে হবে তা আলোচকের নাই ভালো লাগুক। আসলে কবিতা নিঃশেষিত প্রাণের কথা সেখানে যা কিছু শব্দে উঠে আসে তা কবির হৃদয়ের মথিত কথাই। যতো যন্ত্রণার নিষিক্ত হিসেবএ এক বিহ্বল অবস্থা যা ব্যাখ্যাতীত। এই মায়ার ফাঁদে পড়ে কতো না কবি তাঁর জীবন নিঃস্ব করেছেন। তাই এ কথা বুঝতে হবে নিন্দা বা প্রশংসা ফাঁকা শব্দের বিলাপ মাত্র। প্রকৃত কবি শব্দ নির্মাণ করেন প্রথমত নিজের উপলব্ধিতে পরে পরে তা কোনো কোনো পাঠকের মনের আলোয় হয়ত ঢুকে পড়ে। তাই কবিতা নির্মাণ এক চলমান প্রক্রিয়া মাত্র।

যেহেতু কবি এবং কবিতা নিয়ে প্রায় পাঁচ দশকের কাছাকাছি জীবনটা চলে গেছে। এই জীবনের পেছনে যাঁরা পরোক্ষ বা প্রত্যক্ষভাবে আমাকে জড়িয়ে আছেন এরপর তাঁদের আলোকবৃত্তের কথা পরপর আসবে। কেননা তাঁরা ছাড়া এ আমার জীবন এবং তার বিবেচনা অসম্পূর্ণ। 


পর্ব তিন।। সত্যিকথা, রূপকথা


জন্মকথা

৫-ই কার্তিকের পরে আটান্নটা বছর কেটে গেছে।
দু'বছর পরে ষাট, তারপর, তারপর...
একজন মানুষ তাহলে কখন ইচ্ছে করবে

আত্মজীবনী লেখার! এই ভেবে আমি শুরু করি;
হাসপাতালে জন্মের মুহূর্তে আমার প্রবল চিৎকার!
আমি ফাটিয়ে দিলাম, 'এসে গেছি...'


কী লিখি এখন! শুধু চিৎকার জানালেই হল!
কথা শিখতে শিখতে ভাষা শেখার আড়ালে
আমার আত্মমোচন ঘটে, আকস্মিক বিড়াল লাফালে!


এই কবিতাটি আমি কেন উল্লেখ করলাম? আসলে ৫-ই কার্তিক, বৃহস্পতিবার ভোর চারটের সময় আমার জন্ম হয়েছিল বহরমপুরের জেনারেল হাসপাতালে। সারারাত আমার মাতামহ হাসপাতালে উদ্বিগ্ন চিত্তে কাটিয়ে ছিলেন। ভোরবেলা জন্মমুহূর্তে আমার চিৎকার ও কান্নার শব্দ ঘোষণায় দাদু নাকি মন্তব্য করেছিলেন,‘বেলার ব্যাটা হয়েছে এই গল্প আমার জননী বারবারই আমায় শোনাতেন, এমনকী বড়োবেলাতেও এইসব কাহিনি আমাকে শুনতে হয়েছিল। এখন এই ইহজগতে জননী আর নেই; এখন এইসব পুরোনো কথা আর কেউ বলবারও নেই। এই চিৎকারের ব্যাপারটা জিনগত  কেননা মাতামহর জমিদারী মেজাজ, আদেশ এবং অহমিকা এবং প্রজাশাসনের গরম রক্তটা বারবার নানা ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে টের পেয়েছি। প্রায় সাতশো বিঘার জমিদারী রাজত্ব আমার মামারবাড়ি স্বজনেরা ভোগ করে গেছেন এবং তার রেশও এখন বংশ পরম্পরায় চলছে। কিন্তু ইতিহাস সময়ের সঙ্গে অনেক কিছুই পালটে দেয়। এবং তাই হয়েওছে।

মামারবাড়িতে আমার মা বড়ো মেয়ে হওয়ায় অত্যন্ত আদরে এবং আনন্দে কাটিয়ে ছিলেন। তিনি দেখেছেন পিতৃগৃহের সুখ সমৃদ্ধি ভালোবাসা আবার গাঁয়ের বাড়িতে আমবাগানে ছোটোবেলায় দৌড়াদৌড়ি গাছ থেকে পড়ে যাওয়া পাকা তেঁতুলের স্বাদ  তাকে অনেক আত্মীয়ই নাম দিয়েছিলেন আহ্লাদী আবার আমার দিদার বাবার বাড়িও জমিদার গৃহে। এখনও মনে পড়ে টেয়া-বদ্যিপুর নামক স্থানে দাঁড়িয়ে থাকা সেই বিশাল অট্টালিকাটি। দিদার বাবার ছিল তিনটি বিবাহ এর মধ্যে মধ্যম জনকে শুনেছিলাম উনি তখনকার পূর্ব পাকিস্থানে রাজশাহী থেকে ঘোড়ায় চাপিয়ে লুট করে এনেছিলেন। এখন এসব গল্প কথা। কতোটা গল্প আর কতোটাই বা সত্যি তার সারবত্তার কোনও প্রমাণ নেই। কিন্তু গল্প হিসেবে আকর্ষণীয় আর দিদার নামটিও ছিল তেমনই চমকপ্রদ  শিবসীমন্তিনী। এই নাম যেন স্বর্গ থেকে প্রাপ্ত সেখানেও আদরের মাহাত্য। সেখানে যে মেয়ে জন্মেছে বলে তখনকার প্রাচীন সময়েও কোনও অবহেলা ছিল না। এ এক বিপরীত ছবি।

 

দিদা ছিলেন শ্যামবর্ণা আর দাদু ছিলেন প্রকৃত রাজপুরুষ  দীর্ঘাঙ্গ এবং গৌর কিন্তু এইসব নিয়ে দাদুর কোনও আফসোস ছিল না এবং অবহেলাও ছিল না একদমই অনেকটা রবীন্দ্রনাথ  মৃণালিনী দেবীর মতো। বরং দিদা বিবাহ জীবন থেকেই সারা জীবন অবধি দরিদ্র মানুষের জন্য অত্যন্ত অনুভূতিপ্রবণ ছিলেন। পিতলের ঘড়া থেকে রৌপ্যমুদ্রা এবং দামী শাড়ি থেকে শাল সবই তাঁর দানের সামগ্রী ছিল। কোনও দিন কোনও গরীব মানুষ দাদুর বাড়ি থেকে অন্য না খেয়ে ফেরৎ যাননি। কেননা দাদুকেও দেখতাম গ্রামের বাড়িতে গরীব প্রজাদের অকৃত্তিম ভালোবাসা। তার শহরের বাড়ির বারান্দায় ও উঠোনে প্রায় প্রতিদিনই কমপক্ষে তিরিশ চল্লিশটা পাত পড়তো আবার গ্রামের বাড়ির উৎসবের সময় আরও আরও বেশি। শোনা যায় রুদ্র বাড়ির বংশে কেউ একজন তথাকথিত সতী হয়েছিলেন এবং তাঁর শেষসময়ের পরনের শাড়ি বেনারসীটি টুকরো অংশ দিদা অনেককেই বিলিয়ে ছিলেন পবিত্র ঘটনার স্মারক হিসেবে। দিদার অতি অল্প বয়সে বিবাহ সম্পন্ন হয় এবং ক্রমাগত সন্তান উৎপাদনের ফলে তিনি ধীরে ধীরে এক মানসিক অবসাদের সম্মুখীন হন। সেসময় উন্নত চিকিৎসা ব্যবস্থা বা সচেতনতা তেমন ছিল না। ক্রমে ক্রমে তিনি জীর্ণ, অস্থির  হুটহাট করে বারবার বাড়ি থেকে বেরিয়ে যাওয়া এইসব ঘটনা নিত্যই ছিল। আবার দাদুর ক্ষেত্রে দেখেছি সহধর্মিণীর এরকম অস্থিরতা দেখে ভেতরে ভেতরে এক দুর্বিষহ যন্ত্রণা ভোগ করতেন যার বহিঃপ্রকাশ অবশ্য ছিল না। বরং প্রজাবৎসল, গ্রামের মানুষের জন্যে নানা কল্যাণকর কাজে নিজেকে ব্যস্ত রাখতেন। ফলাফল : এই ঔদাসীন্য দিদাকে আরও পীড়িত করতে লাগল তাছাড়া, বেলা, যূথী, হেনা, খুকি এই চার কন্যার মধ্যে যূথীর আকস্মিক মৃত্যু তাঁকে আরও বিহ্বল করে দিয়েছিল। যূথীমাসিকে আমি দেখিনি কিন্তু মায়ের কাছে গল্প শুনে শুনে তাঁর চেহারার একটা কাল্পনিক ছবি মনেতে তৈরি করে ফেলেছিলাম। তিনি বেঁচে থাকলে কিরকম হতেন বা আমার সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক কিরকম হতে পারত এইসব। দিদার আরও চার পুত্র সন্তানও ছিল, বীরেন্দ্র, শৈলেন্দ্র, রণেন্দ্র, এবং নির্মলেন্দু। তাঁদের বিষয় গল্পগাছা পরে পরে হবে। 

 

আগেই বলেছি সৌন্দর্য-পুরুষের সংজ্ঞা ছিল আমার দাদু আর দিদাও ছিলেন বিপরীতে। বিবাহ পরবর্তীতে তাঁরা একে অপরকে প্রবল ভালোবাসতেন কিন্তু পারস্পরিক উচাটনে তাঁরা যেন কোথাও জীবনের সোজাপথ হারিয়ে ফেললেন। সংসারে অভাব ছিল না কিন্তু অশান্তি ছিল। পরপর শোক এসেছিল, আকুল কান্না ছেয়েছিল গোটা সংসারকে। মামারবাড়ি গেলেই দেখতাম অশান্তির আবহাওয়া সেই পুরনো আনন্দ আর ফিরে পাচ্ছিনা। তাই শহরের বাড়ি ছেড়ে গাঁয়ের বাড়িতে চলে যেতাম। আমবাগানে পুকুরধারে গরুর গোয়ালে দৌড়াদৌড়ি। দুটি বিশাল ঘোড়াও ছিল একটি খয়েরি-সাদা অন্যটি কালচে সাদা মেশানো। বড় মামার শখের ঘোড়া ইচ্ছে মতো ঘোড়া ছুটিয়ে এদিক ওদিক। রূপবান বড় মামা পোলিও আক্রান্ত একটি সচল পা নিয়েই ঘোড়ার পিঠে চেপে বসতেন। আগেই বলেছি দাদু ছিলেন উদাসীন এবং নির্মল হৃদয়ের মানুষ তাঁর কাছে হিন্দু মুসলমান বলে কেউ ছিল না সব মানুষই তাঁর কাছে সাহায্য প্রার্থী ছিলেন এবং তাঁরাও ছিলেন দাদুর বিপদে আপদের সহায়। মনে আছে একবার কাঁঠাল বাগানের গাছকাটা নিয়ে দাদু কিছু মানুষের দ্বারা আক্রান্ত হয়েছিলেন তখন মুসলমান সম্প্রদায়ের মেয়েরাই তাঁদের ঘরে লুকিয়ে রেখেছিলেন তাতে দাদুর প্রাণ রক্ষা হয় এবং দাদু আজীবন কৃতজ্ঞ থাকেন। গ্রামের মোরাম রাস্তা প্রাথমিক বিদ্যালয় গ্রামীণ হাসপাতাল দুর্গা মণ্ডপ সবেতেই দাদুর প্রসারিত হাত ছিল।

এরপরে আরও কিছু বহরমপুরের গল্প বলে আমি আমার চুঁচুড়ার বাড়িতে ফিরে আসব।


পর্ব চার।। লুপ্তির প্রবাহকাল

অনেক বছর ধরেই পুজোর ছুটিতে গঙ্গাধারী গ্রামের বাড়িতে আমরা চলে যেতাম। গ্রামের পুজোর আকর্ষণ নানারকম। তখন প্রকৃতি অতো বুঝতাম না, তবে পাতার গায়ে ভোরবেলা কেন জলের ফোঁটা দেখতে পাওয়া যায়, দল বেঁধে হাঁসেদের ঝাঁক ঘুম থেকে উঠেই দুলতে দুলতে কেন পুকুরে ঝাঁপ দেয়, এইসব দৃশ্যে মনে প্রশ্ন জাগলেও কাউকে সাহস করে জিজ্ঞেস করতে পারতাম না। বাবার অফিসে পনেরো দিন মতো পুজোর ছুটি থাকত, আর সেই অবসরে আমরা গাঁয়ে অবকাশ কাটাতাম। জামাই এলে গোয়ালের দুধ জ্বাল দিয়ে লোহার কড়াইতে দুধ মেরে মেরে মোটা মোটা সরভাজা দিদা নিজের হাতে বানাতেন। তার গন্ধে গোটা বাড়ি, উঠোন জুড়ে মৌতাতে আমোদিত হয়ে উঠত। সে এক স্বর্গীয় অনুভূতি সঙ্গে সরভাজার স্বাদু স্বাদ। বহরমপুর থেকে বাসে যেতাম হরিহরপাড়া এবং সেখান থেকে গরুর গাড়িতে গঙ্গাধারী পৌঁছাতাম। গরুর গাড়িতে খড় ছাওয়া চটের বস্তা দিয়ে বসার জায়গা বানানো হতো। আর যেতে যেতে গরুর গলায় বাঁধা ঘণ্টার ঠং ঠং শব্দ কি এক জাদু মিশ্রিত সুর রচনা করতো তা বোঝানো যাবে না। গ্রামের বাড়িতে ধুম করে দুর্গা পুজো হতো। দালান জুড়ে মেজো মামা নাটকের আয়োজন করতেন। মনে আছে পিচবোর্ড দিয়ে রূপোলী রাঙতা জুড়ে তরবারি তৈরির তৎপরতা। প্রেক্ষাপটে নাটকের সঙ্গে দিদির গান আরও মূর্ছনা তুলত। বিসর্জনের দিন সমস্ত পরিবেশ জুড়ে, দিকদিগন্তে একটা ভারী ভারী ভাব। আমার কেমন যেন কান্না-কান্না পেত। বিকেল হতেই আয়োজন নৌকোর ওপরে দেবীকে বরণ করে তোলা। দুটি নৌকো ভৈরব নদীর মাঝামাঝি এলে নৌকো দুটি ফাঁক হয়ে যেত এবং দেবীকে জলে আস্তে আস্তে নামিয়ে দেওয়া হতো। চারপাশে তখন কাঁসর ঢাকের বিদায়ের সুরে বিদীর্ণ হয়ে যেত। মনে আছে পরদিন একশো আট বার দুর্গা নাম লিখে দেবীর শূন্য বেদীতে গিয়ে রেখে আসতাম। এই অভ্যাস বহুবছর ধরেই আমাদের ছিল।  

ধীরে ধীরে শহর বহরমপুরের বাড়ির পরিবেশ পালটে যেতে লাগল। বড়মামার ডাক্তার হওয়ার ইচ্ছে থাকলেও তিনি ক্রমশ ব্যবসায়ী হয়ে উঠলেন। মেজোমামা জমি-জিরেতেই মনোনিবেশ করলেন। সেজোমামা হলেন ইঞ্জিনিয়ার এবং ছোটোমামা ইউনিভার্সিটি থেকে পাশ করে শিলিগুড়িতে গেলেন শিক্ষকতার চাকুরি নিয়ে। ছোটোমাসিও ইউনিভার্সিটির পড়া শেষ করলেন কিন্তু সেভাবে চাকুরির চেষ্টা করেন নি। নিজের ভেতর কোনও এক বিষন্নতার বিরহে বাস করতে লাগলেন একা একা। এবং তাঁর মনের হদিশও কেউ পেতে আগ্রহী ছিলেন না।

১৯৭১ সালে রাজনৈতিক আবহাওয়া উত্তপ্ত হতে লাগল। পশ্চিমবঙ্গ জুড়ে চলল শিক্ষিত ছেলেমেয়েদের সময় পালটানোর আন্দোলন। হয়ত এর স্ফুরণ অনেক আগে থাকতেই প্রস্তুত হয়েছিল। কিন্তু চারু মজুমদারের হত্যা-প্রতিহিংসার রাজনীতি ও আন্দোলন দমিয়ে দিতে পুলিশী নির্যাতন বহু উচ্চশিক্ষিত ছেলেমেয়েরা অকালে জীবন দিলেন। এ প্রসঙ্গে বরাহনগরের ঘটনা খুব মনে পড়ে, মনে পড়ে অজাতশত্রু হেমন্ত বসু নৃশংস হত্যাকাণ্ড। তাঁর মতো শ্রদ্ধেয় মানুষকেও কূটচক্রীদের হাতে খুন হতে হয়েছিল। আমার দাদুর রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে প্রচুর প্রভাব ছিল সারা মুর্শিদাবাদ জুড়েই। সে সময় শ্রদ্ধেয় নেতা ত্রিদিব চৌধুরি ছিলেন একজন অবিসংবাদিত আমনেতা এবং দাদুর অতি ঘনিষ্ঠ জন। এই পরিচয়ের মধ্যেও একদিন বড়োমামা হুমকির চিঠি পেলেন। তিনি বড়ো ব্যবসায়ী, বড়ো ঘরের ছেলে এবং অনেক লোকের ঈর্ষার বস্তু। নকশাল আন্দোলনের সময়ে তাঁদের নাম করে অনেক গুণ্ডা বদমাশ বড়োলোকদের বাড়ি বাড়ি টাকা চেয়ে চিঠি দিতে লাগল। বড়োমামা চিরকালই ডাকাবুকো ধরণের মানুষ ছিলেন, প্রথমত তিনি এসবে পাত্তা দিলেন না। এবং আরও সাহসী হয়ে উঠলেন। ফলাফল হল বিষম ও বেদনাদায়ক।

১৯৭১ এর ২১ শে এপ্রিল ব্যবসার জায়গা থেকে বাড়ি ফিরতেই বাড়ির সামনেই পাঁচ দুষ্কৃতকারী একযোগে তাঁর দেহে ছুরি ও গুপ্তি চালালো। সারা শরীরময় রক্তস্নান ও প্রায় অর্ধ গলাকাটা অবস্থায় তিনি দোকানের চাবিটি শুধু বৈঠকখানার জানলা দিয়ে ঘরে ছুড়ে দিয়েছিলেন। তার গলা ঝুলে গিয়েছিল তীক্ষ্ণ হেঁশোর আঘাতে। সেই রাত্রে খাওয়ার পরে দাদু এই দৃশ্য দেখে চেতনা হারালেন। বড়োমামা হাসপাতালে পৌঁছনোর আগেই প্রাণ হারালেন এবং একদিন বাদে দাদুও তাঁকে অনুসরণ করলেন। কাগজে সংবাদ হল : পুত্রশোকে পিতার মৃত্যুএই ঘটনা সেসময়ে আকছারই ঘটত। এমন কি বড়োমামাকে খুন করার আধঘণ্টা আগে ওই একই দল মোহন সিনেমার মালিকের ছেলেকেও হত্যা করে এসেছিল।

মামার বাড়ির আনন্দের দিন চিরকালের জন্য অন্তর্হিত হল। দিদার হাহাকার ও উন্মাদগ্রস্ততা, বড়োমামার অসহায় পাঁচ নাবালক পুত্র কন্যা আর আমার মা-এর আর্তনাদে আমি ভেতরে ভেতরে কেমন মুহ্যমান হয়ে গেলাম। ক্রমে আমার ছেলেবেলা গভীর বিষাদে ছেয়ে যেতে শুরু করলো। তখনও ভাবিনি আগামীতে আরও কি কি অন্ধকার অপেক্ষা করছে।

এবারে চুঁচুড়ার নিজের বাড়িতে ফিরে আসি। মা ছিল তাঁর বাবা মা এর আদরের ধন। তাঁকে কখনও দাদুর বকাঝকা খেতে হয়নি, যত্নে মানুষ করেছিলেন আর অভাবের তো প্রশ্ন নেই। দাদু যখন মেয়ের বাড়িতে আসতেন মনে আছে গ্রামের লোক সঙ্গে নিয়ে বস্তা করে লাল রঙা আলু, মোটা মিষ্টি চাল, কাঁঠাল, সজনে ডাঁটা নিয়ে আসতেন। আবার কখনও নদী বিলের মাছ ভরা বর্ষায় আমাদের বাড়ি চলে আসত এবং এতোই পরিমাণে আসত মা পাড়ার লোককে আমাকে দিয়ে বিলি করতে পাঠাতেন। আমার বাবা ছিলেন সরকারি স্বল্প বেতনের চাকুরে। ক্রিকেট নিবেদিত প্রাণ, ক্লাব প্রীতি, শরীর চর্চা, শরীরে তেল মেখে নিত্য গঙ্গা স্নান তাঁর শরীরকে আকর্ষণীয় করে তুলেছিল। স্নানে যখন যেতেন পাড়ার বয়স্করা বাবাকে বলতেন, ‘সোনার গৌরাঙ্গ যাচ্ছে এই রূপই দাদুকে প্ররোচিত করেছিল তাঁর সুন্দরী বড়ো কন্যাকে বাবার হাতে তুলে দিতে। কিন্তু সংসারের ছায়াছবি বিবাহ পরবর্তী জীবনে সুখের হয়নি। তিন ভাইবোন তাদের লেখাপড়ার খরচ সংসারের খরচে বাবা বরাবরই বিপর্যস্ত ছিলেন। এর সঙ্গে ছিল ঈর্ষা প্রসূত ঠাকুমা, জেঠা, কাকার সম্মিলিত মা এর প্রতি বিষোদ্গার ও কটূক্তি। কলহ চরম সীমায় পৌঁছালেও বাবার কোনও প্রতিবাদ ছিল না। মা ক্রমশ জীবনে আনন্দ হারিয়ে ফেললেন। তাঁর অপরাধ ছিল তিনি বড়োলোক বাড়ির আদুরে কন্যা, এই ঈর্ষা পরিবারের  অন্যদেরও আক্রান্ত করেছিল। এই পরিস্থিতিতে বেশ কয়েক বছর পরে আমাদের হাঁড়ি ভিন্ন হল। ভাগে পড়ল একটি শোয়ার ঘর, একটি রান্নার ঘর আর একত্রে থাকা স্নানের ঘর। দীর্ঘদিন এইভাবে বঞ্চনা চলার পরে মা তার তেজ ও গরিমা দেখিয়ে  বাড়িতে আর একটি ঘর আদায় করেছিলেন। এই ঘরটি আদায়ের পূর্বে যখন দিদা মাসিরা মা এর কাছে আসতেন তাঁদের শোয়ার জায়গা থাকত খাটের তলায়। এরই ভেতর একদিন মা গর্ভাবস্থায় চতুর্থ সন্তান হারালেন। মনে আছে বাড়িতে একজন ডাক্তার এসেছিলেন, তাঁর রক্তাক্ত গ্লাভস দেখেছিলাম নর্দমার মুখে একটি রক্তের ডেলা ফেলে দিতে। তখন বুঝিনি একটি প্রাণ পৃথিবীতে আসার পূর্বেই শেষ হয়ে গিয়েছিল।  



পর্ব পাঁচ।। সময় ও ভাগ্যলিপি

এই পরিবেশেই আমাদের তিন ভাই বোনের লেখাপড়া চলতে শুরু করল। দিদি বরাবরই স্কুলের পরীক্ষায় পজিশন পেতো। কখনও বা জ্যাঠার মেয়ে বা দিদির মধ্যে একটা অলিখিত প্রতিযোগিতা থাকত। আবার কখনও যদি-বা দিদির পজিশন জ্যাঠার মেয়ের থেকে এক ধাপ কম হত সেটা নিয়ে কাকার ছিল তেরছা কথাবার্তা। তিনি ছিলেন অনেকটা নারদ মুনির মতো এবং ঝোলটা বরাবরই আমাদের বিপক্ষে থাকত। চূড়ান্ত অপমানও মায়ের ভাগ্যে ছিল সামান্য ব্যাপারেই। আমি ও ভাই প্রথমে পাঠশালায় ও পরে হুগলি জেলার সেরা স্কুলের ভর্তি হয়েছিলাম। প্রথম প্রথম প্রাথমিকে ভালো জায়গায় থাকলেও পরে পরে বাইরে থেকে অনেক ভালো ছেলেরা কলেজিয়েট স্কুলের ভর্তি হত সে কারণে আমি ক্রমে ক্রমে সাধারণ ছেলে হয়ে উঠলাম। তবুও সেইসময়ের শিক্ষকেরা যেভাবে যত্ন নিয়ে পড়াতেন তাতে আমার কোনও আলাদা শিক্ষকের প্রয়োজন পড়েনি। তবু উঁচু শ্রেণীতে উঠবার পরে বাবা একজন শিক্ষককে বাড়িতে পড়ানোর জন্য নিযুক্ত করেছিলেন। কিন্তু তিনি আমার উন্নতির চেয়ে অবনতি বেশি করেছিলেন। কুড়ি বছর বয়সের সময় এবং চাকুরির প্রস্তুতির জন্য, ছাত্রছাত্রী পড়ানোর জন্য আমি বাবার কাছ থেকে ইংরেজি ভাষা রপ্ত করেছিলাম। ভাই ছিল ক্রিকেটপ্রেমী অনেকটাই বাবার ধাতে গড়া। কখন যে স্কুল থেকে ক্রিকেটের মাঠে চলে যেত কেউ জানতেও পারেনি। বিভিন্ন স্কুল টুর্নামেন্টে ও খেলে বেড়াতো। বাবার এইসবে প্রচ্ছন্ন প্রশ্রয় ছিল যেহেতু তিনিও বহুবছর ক্রিকেট খেলে গিয়েছিলেন। এছাড়া আমি নবম শ্রেণীতে এবং ভাই ষষ্ঠ শ্রেণীতে পড়ার সময়ে সাঁতারে ভর্তি হলাম। ভাই দ্রুতই দক্ষ সাঁতারু হয়ে উঠল ও কাউকে না জানিয়ে গঙ্গায় অর্ধেক সাঁতরে পার হয়ে যেত। দিদিকে দেখতাম নিষ্ঠার সঙ্গে পড়াশোনা করতে চিলছাদে উঠে চলে যেত যেখানে আমাদের ঘুঁটে কয়লার প্রয়োজনীয় স্টক থাকতো। যেখানে আরশোলা আর ঘুরঘুরে পোকার নির্বিঘ্ন বিচরণ ছিল।

অলংকরণ।। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সহায়তায়, রাজীব কুমার ঘোষ

এক এক সময় দেখতাম কাকা সবার অলক্ষ্যে ভাইকে নিয়ে ছাদে উঠে যেত। কাকা ঘুড়ি ধরতাই দিত আর ভাই সুতো ছেড়ে দিত। ঘুড়ি তখন আকাশের সীমানা ছাড়িয়ে অনেক দূরে। পাশের বাড়ির উঁচু ছাদ থেকে পাড়ার জেঠিমা কাকিমারা টমটম বলে ভাইকে উৎসাহ যোগাতো। আবার কেউ কেউ ওর নাম দিয়েছিল ছোটো সাহেবআমি অবশ্য এইসবের বিপরীত মেরুতে থাকতাম, শুধু চিলছাদের ওপরে উঠে অন্য বাড়িতে কেটে-পড়া ঘুড়ি ভাইয়ের জন্যে নিয়ে আসতাম। তবুও বাড়ির অশান্তিকর পরিবেশ থামল না, ঠাকুমা মাকে ভিন্ন হাঁড়ি করে দিলেও প্রচুর গালমন্দ বর্ষণ করতেন অকারণেই। অর্ধেক সময়েই তিনি একটি মাত্র গামছা পড়ে লজ্জা নিবারণ করতেন, শুচিবাইগ্রস্ত হয়ে জল ঢেলে রাখতেন মায়ের যাতায়াতের পথে। মা ও দেখতাম ক্রমশ জল ঘাঁটার বাই ধরেছেন। একদিন স্কুলের টিফিনের সময় বাড়িতে খেতে এসে আমি বাসন ধোয়ার জায়গায় প্রস্রাব করে দিই, তাই দেখে মা উঠোনের কোণে রাখা কয়লার স্তুপ থেকে এক খণ্ড কয়লা নিয়ে আমায় ছুঁড়ে মারতেই আমার নাক ফেটে রক্তারক্তি হয়। আকস্মিক এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে মা হতভম্ব হয়ে যান ও চিৎকার করে কেঁদে ওঠেন। পরে জেঠিমা আমার প্রাথমিক শুশ্রূষা করে কাকাকে দিয়ে হাসপাতালে পাঠিয়েছিলেন। রাত্রে বাবা অফিস থেকে ফিরলে মা কিছুটা লুকোচুরি খেললেন কিন্তু আমার নাকে ব্যান্ডেজ দেখে তিনি আর বাবার গালি থেকে মুক্তি পাননি। এই ঘটনার পরে অবশ্য মায়ের কাছে আমার আদর অনেকটাই বেড়ে গিয়েছিল।

এইসব ছোটোখাটো ঘটনা ছিল সত্তর দশকের গোড়ার দিকে। একাত্তরের ডামাডোলে দিদিকে একাকী প্রিন্সিপ্যালের ঘরে স্নাতক স্তরের পরীক্ষা দিতে হয়েছিল বাকিরা প্রকাশ্যে বই দেখে লিখে যাচ্ছিল, চূড়ান্ত অরাজকতায়। ভাই মাধ্যমিক পাশ করার পরে বাড়ি থেকে দূরে হুগলি ব্রাঞ্চ স্কুলে ভর্তি হয়েছিল। সে কারণে তার একটি সাইকেলের প্রয়োজন হতে বাবা সে সময়ের সবচেয়ে দামি সাইকেল ভাইকে কিনে দিয়েছিল। দিদি স্নাতকোত্তর পড়ার সময়ে কোনও আলাদা শিক্ষক রাখার ক্ষমতা বাবার ছিল না। মনে আছে দিদি নোটস মুখস্থ করে বাবার ঘরের কালো মেঝেতে চক খড়ি দিয়ে নোট লিখত। আবার বাবাও দেখতাম অনেক সময় দিদির নোটস সংশোধন করে দিচ্ছেন। এছাড়াও দুজন অধ্যাপক দিদির নিষ্ঠা দেখে দিদিকে তাঁদের বাড়িতে আলাদা করে সময় বের করে পড়াতেন। আমি থাকতাম আমার ভেতরেই একা একা, কখনও বা কাগজে আঁকাআঁকি কখনও বা শব্দ নিয়ে খেলা। একাদশ শ্রেণীতে হুগলি মহসিন কলেজে ভর্তি হলাম। বাণিজ্য নিয়ে পড়লেও সবচেয়ে ভালো লাগত বাংলার শিক্ষকদের সান্নিধ্য। সেই সময় কলেজের বাংলা অধ্যাপকের দল ছিলেন খুব নামীদামী যেমন অরুণ কুমার ঘোষ, প্রলয় শূর বা অনিতা বন্দ্যোপাধ্যায়। এই কলেজেই ইংরেজির অধ্যাপক ছিলেন কবি রমেন্দ্র কুমার আচার্য চৌধুরি বা দেবীপ্রসাদ বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁদের সঙ্গে হৃদ্যতা অবশ্য অনেক পরে হয়েছিল।

হুগলি মহসিন কলেজ, মূল ভবন
অলংকরণ - কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সহায়তায়, রাজীব কুমার ঘোষ
কলেজে আমার তিন ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিল যারা কবিতা নিবন্ধ লিখত এবং বাংলা সাহিত্য নিয়ে চর্চা ভালোবাসত। একদিন অধ্যাপিকা অনিতা বন্দ্যোপাধ্যায় আমাদের একটি লিটল ম্যাগাজিন প্রকাশ করার তাগিদ দিলেন। অর্থ ছিল না, উৎসাহ ছিল প্রবল। কিন্তু অনিতাদি ও আমার বন্ধুদের সামান্য হাত খরচের টাকা দিয়ে পত্রিকার প্রথম সংখ্যাটি প্রকাশিত হয়ে গেল। নাম ছিল শায়ক দেখলাম কলেজে আমরা কজন একটু আলাদাভাবে গুরুত্ব পাচ্ছি। পরে আরও কয়েকজন অধ্যাপক আমাদের পত্রিকায় তাঁদের কবিতা বা গদ্য দিয়ে সহযোগিতা করেছিলেন।

পুরনো বাড়ির ছাদের ঘর থেকে কদিন আগেই মায়ের বড়ি দেওয়ার কাঠের তক্তা ও নেট বাঁধানো পাত্রগুলি সরিয়ে দিলাম। মা বড়ি দিতেন নানা ব্যাঞ্জনে, একসঙ্গে ডাল, ফুলকপি, আদা ও নানা মশলা বেঁটে বড়ি দেওয়া হত। বড়ি পাহারা দেওয়ার জন্য বাবা নিযুক্ত ছিলেন। কেননা হনুমানের হঠাৎ হঠাৎ হানা ছিল প্রায়শই। মায়ের আরও সুখাদ্য বানানোর তরিবৎ ছিল, যেমন জিভেগজা, নিমকি, রাঙা আলুর পান্তুয়া এবং নানা রকমের নাড়ু। বিজয়ার পরে পাড়া প্রতিবেশি এবং আত্মীয়বর্গ বাড়িতে আসতেন। এখন সেসব অলীক কাব্য। এখন কে আর আসে, কারই বা সময় রয়েছে।

আমার দিদি ছিলেন খুবই সুন্দরী। লক্ষী প্রতিমার মতো পান-পাতা মুখ। রঙ ছিল বাবার মতো স্বর্ণাভ। মার কাজ ছিল দিদি বাইরে বেরোলে তাকে পাহারা দিয়ে বাড়িতে নিয়ে আসা কেননা সেই সময়তেও অনেক ফেউ পিছনে পড়েছিল। সমস্যা বহুল হতে দিদিকে পাত্রস্থ করার চেষ্টা চলতে লাগল। কিন্তু বাবার হাতে তেমন পয়সা না থাকায় ক্রমশ বাড়ির পরিবেশ আবারও ভারবহ হয়ে গেল। সেসব আলোচনা আগামীতে করা যাবে।   




পর্ব ছয় ।। যা জীবন তা উচাটনই

আগের লেখায় যে পর্যন্ত এসে থেমেছিলাম, ভেবেছিলাম সেখান থেকেই ওই লেখাটি আরও একটু দীর্ঘায়িত করব, কিন্তু আকস্মিক একটি ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে আমি অন্য একটি চরিত্রে চলে যেতে বাধ্য হলাম। তিনি গত সোমবার ৫-ই জানুয়ারি পরলোকে চলে গেছেন। তিনি ছিলেন জীবিত থাকা আমার একমাত্র মাসি। আগেই লিখেছিলাম তিন কন্যার নাম দাদু রেখেছিলেন ফুলের নামে, বেলা-হাস্নুহেনা-যুথি। এর মধ্যে চতুর্থ কন্যার ডাক নাম ছিল খুকি। যিনি নানা মানসিক টানাপড়েনের মধ্যে পড়ে বহুবছর পূর্বেই আত্মহনন করেছিলেন। আর যিনি গত সোমবার গত হলেন তাঁর নামটিই ছোটো করে ডাকা হত হেনানামে। অনেক গুণের গুণবতী তিনি ছিলেন, লেখাপড়া ছাড়াও সেতার বাদনে তিনি যথেষ্ঠ পারদর্শী ছিলেন এমনকি এন সি সি এর ক্যাডেট হিসেবে নয়া দিল্লিতে প্রজাতন্ত্র দিবসের অনুষ্ঠানেও অংশগ্রহণ করেছিলেন। ছোটোবেলায় আমি যখন মামার বাড়ি যেতাম তখন এই মাসি পড়াশোনা করতেন। মনে আছে গ্রামের বাড়ি থেকে শহরের বাড়িতে গাওয়া ঘি এসে পৌঁছালে আমাকে সুঘ্রাণভরা ঘি দিয়ে পরোটা ভেজে খাওয়াতেন। কিন্তু এই খাওয়ার ব্যাপারটা খুব চুপি চুপিই সারতে হত কেননা আমি তখন অর্শ রোগে কষ্ট পেতাম। কিন্তু পরে দিদার এনে দেওয়া দৈব ওষুধে আমার এই রোগ ভালো হয়ে গিয়েছিল।

বিবাহের পরে মাসির গ্রামের বাড়িতে আমি খুব ছোটোবেলা থেকেই যাতায়াত করতাম। বর্ধমান জেলার ধাত্রীগ্রাম থেকে সিমলন নামের এই গ্রামে অনেক বর্ধিষ্ণু পরিবার বসবাস করতেন। আমার মেসোমশাই ছিলেন অত্যন্ত পণ্ডিত মানুষ, প্রথম জীবনে বোলপুরে অধ্যাপনা করলেও পরে গ্রামের মানুষ তাঁকে গ্রামে তৈরি হওয়া উচ্চমাধ্যমিক স্কুলে হেডমাস্টার হিসেবে ফিরিয়ে আনেন। এছাড়াও রাজনীতিহীন সময়ে তিনি প্রায় দশটা গ্রাম জুড়ে পঞ্চায়েত প্রধানও হয়েছিলেন। বিভিন্ন গ্রামে উন্নতিকল্পে এখনও বহুমানুষ তাঁকে স্মরণ করেন। আমি সিমলনে গেলেই বাঁশের মাচায় বসে গ্রামের প্রকৃতির সঙ্গে নিজেকে জুড়ে নিতাম তখন থেকেই যেন গ্রামের গাছগাছালি পশু পাখির সঙ্গে আমার একটি হৃদ্যতা তৈরি হয়ে গিয়েছিল। এছাড়াও মেসোমশাই অত্যন্ত পশুপ্রেমী ছিলেন, নিজের বাগানে অনেকটা জায়গা জুড়ে নানা গাছ ছাড়াও ময়ুর, কুকুর, বিড়াল, গরু, পাখি, খরগোশ, বেজি এদের মধুর সহাবস্থান আমি দেখেছি। এই সময়তেই আমি প্রথম অর্জুন গাছ ও নানা নাম না জানা লতা গুল্মের সঙ্গে পরিচিত হই।

প্রায়শই আমি যখন এই গ্রামে যেতাম আমার পকেটে বিশেষ টাকা পয়সা থাকত না। মাসির বাড়ি থেকে ফিরবার সময় তিনি জোর করে আমার হাতে বেশ কিছু টাকা গুঁজে দিতেন এছাড়াও জমির চাল, আলু, নারকেল এইসব তো দিতেনই। আমাদের সংসারের সংকটের সময় এইসব প্রাপ্তি অমূল্য ছিল। আমার মাসি ছিলেন অনেকটা আমার দিদার মতো, কেউ কোনওদিন জানতেও চায়নি তিনি কাকে কতো কিছু গোপনে সাহায্য করেছিলেন।

মনে পড়ে সিমলনের শস্যভরা মাঠ আর পুকুর ভরা মাছের কথা। হাঁসেদের দুলকি চালে হেঁটে পুকুরে নেমে পড়া, আমার কাছে ছিল এইসব বিস্ময়কর ছবি। দুপুর দিকে নির্জনতা আর দূর থেকে কুবপাখির থেমে থেমে ডাক আমি খুব উপভোগ করতাম, নিঃঝুম দুপুর বেলায় আমি ভাঙা ডাল দিয়ে পুকুরে পড়ে থাকা পাকা কুল পাড়ের দিকে টেনে টেনে আনতাম। গ্রামের মধ্যিখানে একটি বিশালাকায় তেঁতুল গাছ ছিল। চৈত্র মাসে ধূধূ দুপুর বেলায় আমি যে কোথায় কোথায় চলে যেতাম তা কেউ খোঁজ করত না। একবার ছিপ ফেলে আমি বাড়ির পিছনের পুকুরে মৎস্য শিকার অভিযানে যাই, সারাদিন ছিপ ফেলে দুটি মাত্র ল্যাটা মাছ পেয়েছিলাম, সে এক নিদারুণ আনন্দের যুদ্ধজয় ছিল!

অলংকরণ - কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সহায়তায়, রাজীব কুমার ঘোষ

আমার এইসব কাণ্ড দেখে মেসোমশাই আমাকে নানারকমের পাখি ও গাছ চেনাতেন। বাগানে লাগানো তেজপাতা গাছ, বাদাম গাছ এবং বাদাম গাছ পুষ্ট হওয়ার পরে বাদামের গুচ্ছ দেখে আমি উত্তেজিত হয়েছিলাম। একবার হাঁসেদের ঘরে দেখেছিলাম একটি বিশালাকৃতির সাপের উপস্থিতি। তখন হাঁসেরা ডিম ফেলে পুকুরে সাঁতরাতে চলে গিয়েছিল। হয়ত সেই পরে থাকা ডিমের খোঁজে সাপটির আগমন। আর একবার গোয়াল ঘরে গরুদের খাবারের গামলায় খাবার দিতে গিয়ে রাখাল বালকটি ছিটকে সরে আসে। দেখা যায় সেখানেও একটি বিশাল সাপ উদ্যত ছোবল নিয়ে উঠে পড়েছে। পরে এই সাপটিকেও সাঁওতাল পাড়া থেকে আসা অভিজ্ঞজনেরা বাঁশের সাঁড়াশি দিয়ে সাপটিকে গ্রেপ্তার করে। যে হাঁড়িতে করে তারা সাপটিকে জঙ্গলে ছাড়তে যাচ্ছিল হঠাৎই হাঁড়ির মুখ বাঁধা দড়ির ছোঁয়ায় ভয় পেয়ে হাঁড়িটিকে মাটিতে ফেলে দেয়, ফলত রাগী সাপটি বেরিয়ে পড়ে এবং সমানে মাটিতে ছোবল মারতে থাকে। পরে ছুট ছুট এবং কিছু পরে তাকে আবার ধরা হয়।

ভালো মানুষের সংখ্যা, দয়ালু মানুষের সংখ্যা ক্রমশ কমে আসছে। স্বার্থ সর্বস্ব এখনকার সমাজ বড়োই একা। মাসির প্রয়াণে প্রথমেই মনে পড়ল কত দরিদ্র মানুষ তাঁর অভাব অনুভব করবেন। অগ্নি নির্বাপিত হওয়ার পরে এ কথাই ভাবছিলাম ফিরে আসা দগ্ধ ছাইতে ঠাণ্ডা জল দিতে দিতে এক অসীম শূন্যতায় মন ছেয়ে যাচ্ছিল। মনে হচ্ছিল তাহলে অহংকার, কূটতা, লিপ্সা এই শব্দগুলি নিতান্তই তুচ্ছ, ঘোরমাত্র।


পর্ব সাত ।। সতেরোর ভূত

ভূত জীবনে নানাভাবে ঘাড়ে চড়েছে। প্রেতাত্মার সঙ্গে আমার মায়ের নাকি দু'বার পরিচয় ঘটেছিল। একবার মায়ের দাদামশাই মারা যাওয়ার পরে তাঁকে মা কুয়োতলার পাড়ে বসে থাকতে দেখেছিলেন। আরও একবার মা গরমকালে মাদুর বিছিয়ে সন্ধ্যে বেলায় ছাদে বাতাস খাচ্ছিলেন, তারপর তিনি যখন ঘুমিয়ে পড়েছিলেন আমার সেজো ঠাকুমা মায়ের কাছে এসে বলেছিলেন, ‘বউমা সন্ধ্যেবেলা এলোচুলে তুমি শুয়ে আছো কেন?’ দু'বারই মায়ের পরবর্তী প্রতিক্রিয়া ভালো হয়নি, তীব্র চিৎকারে সবাইকে ব্যতিব্যস্ত করে ভয় পাইয়ে দিয়েছিলেন! আমার জীবনেও একবার অন্য অনুভব হয়েছিল, এলাহাবাদে ভাই আকস্মিক মারা যাওয়ার পরে একদিন ভোর রাত্রে দেখি সে ক্ষুদ্র শরীর নিয়ে আমার পায়ের কাছে বসে আছে! এই ঘটনার ব্যাখ্যা আমি আজও খুঁজে চলি। গয়াতে আবার আমরা ভাইয়ের পিণ্ডদান করার পরে যখন আশ্রমে ফিরে আসি, চকিতে দেখি এক তীব্র হাওয়ায় সামনের টিনের ছাদটি দুলে উঠেছিল। মনে হল কে যেন তীব্র বেগে ছুটে গেল! এইসব ঘটনা ব্যাখ্যাতীত, কোনও উত্তর খোঁজাও যাবে না।

তবে যে ভূত সতেরো বছর বয়সে আমার ঘাড়ে চেপে বসেছিল তা এখনও বহন করে চলেছি। এই বয়সে পৌঁছে যেন মনের ভেতরে প্রতিনিয়ত অন্য কিছু হয়ে যাচ্ছেআমি বুঝতে পারছিলাম। নানা চিত্ত চাঞ্চল্য, অস্থিরতা, গুমরানো ভাব, অহরহ অজানা কষ্ট সব মিলিয়ে একটা অন্য কিছু অথচ না পারছি বলতে না পারছি কাউকে জানাতে। আমার বাবা অফিস থেকে অনেক ডায়েরি  উপহার পেতেন, সবাইকে বিলিয়েও একটি ডায়েরি উনি আমাকে দিতেন। মায়ের বিবাহের উপহার চোখের বালি’, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের উপন্যাস সমূহ ও শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের গল্প, উপন্যাস ক্লাস নাইন টেনেই আমার পড়া হয়ে গিয়েছিল। আমার বাবা ছিলেন পাঁড় কমিউনিস্ট, রাশিয়া থেকে বাড়িতে নানা ম্যাগাজিন আসত, খুব অল্প পয়সায় ঝকঝকে সেসব বই ও পত্রিকা। লেলিন থেকে দস্তয়ভস্কি সবার সঙ্গেই সে সময় আমার পরিচয় ঘটে গিয়েছিল। ডায়েরিটি পাওয়ার পরে কিছু কিছু লাইন আমার মনে হতেই আমি লিখে ফেলতে লাগলাম। ক্রমান্বয়ে এই অভ্যাস চলতে থাকল, অবশ্য গোপনেই।

পরে পরে আমার মনোনিবেশ হয়ে যায় রবীন্দ্রকাব্যে রবীন্দ্রসঙ্গীতে, বিহারীলাল চক্রবর্তী, অমিয় চক্রবর্তী, জীবনানন্দ দাশে। এদিকে ডায়েরির পাতা ক্রমশ শূন্য থেকে ভর্তি হতে শুরু করে। তখন চিনের তৈরি বিখ্যাত কলম ছিল উইংসাং। কালির কলম কিন্তু সরসর করে চলত। আর কলমের খাপটি ছিল সোনালি রঙের। নিব ছিল তীক্ষ্ণ। এখনও সেইসব কলম কয়েকটি রয়ে গেছে। এখন অবশ্য আমার লেখায় একটি বহুদিনের পুরনো জীর্ণ সাধারণ কলম রয়েছে যাকে আমি ছাড়তে পারিনি। যে কটি লেখা ডায়েরির পাতায় জমছিল তার কয়েকটি আমি দু-একটি পত্রিকায় পাঠাতে শুরু করি। এবং আশ্চর্যের ব্যাপার কবিতাগুলি ছাপাও হয়ে গেল। সেইসময়ে আমার শহরের কয়েকজন কবির সঙ্গে আলাপ হয়ে যায়, যেমন কার্তিক চট্টোপাধ্যায়, অলোকরঞ্জন চক্রবর্তী, প্রদ্যুম্ন মিত্র, আলোক সোম ইত্যাদি। 

কবি কার্তিক চট্টোপাধ্যায়
স্কেচ- এ আই সহায়তায় রাজীব কুমার ঘোষ
মনে আছে আলাপ হওয়ার পরে আমার প্রধানত আড্ডার জায়গা ছিল শীতল চৌধুরীর মেস বাড়ি এবং আলোক সোমের চায়ের দোকান। ক্রমে ক্রমে আমি কবিতা লিখছি এ খবর বাবার কাছে পৌঁছে যায় এবং যথারীতি কবিতা লিখে কিছু হবেনা, পড়াশোনা শেষ করে চাকরির চেষ্টায় মন দিতে হবে এইসব আজ্ঞা। অবশ্য আড়ালে আবডালে কবিতা লেখার ব্যাপারে আমার মায়ের প্রচ্ছন্ন উৎসাহ ছিল। কেননা মায়ের এক পিসির কবিতা লেখার অভ্যাস ছিল, সেই পিসির চমৎকার হস্তাক্ষরে লেখা ছন্দবদ্ধ দীর্ঘ কবিতাটি আমি পড়েছিলাম। অসাধারণ একটি সুলিখিত ভাবনায় আচ্ছন্ন কবিতাটি ছিল - কিন্তু কালের যাঁতাকলে পড়ে সে লেখাটি কোথায় হারালো জানা যায়নি। সেসময় আলোকদার সঙ্গে আমার ঘনিষ্ঠতা এবং নিয়মিত কবিতা নিয়ে নানা আলোচনা আমাকে সমৃদ্ধ করছিল, একদিন তিনি বললেন নৈহাটি চলো, এক আড্ডায় তোমাকে ঘুরিয়ে নিয়ে আসি। নৈহাটির চার নম্বর প্ল্যাটফর্মের শেষ প্রান্তে  ঘাসের মাথায় বসে আলো আঁধারি পরিবেশে হতে চলা কবিতা আড্ডায় আমি যেন শীতার্ত রাত্রিতে হাত আগুনে সেঁকে নিতাম। আড্ডার মুখ্য ছিলেন বাপী সমাদ্দার, তিনি আজকালনামে একটি পত্রিকা শুরু করেছিলেন এবং সেই পত্রিকাকে ঘিরে আরও অনেক কবি, গল্পকার সেখানে নিয়মিত জমায়েত হতেন। যেমন আলোক সোম ছাড়াও বৈদ্যনাথ চক্রবর্তী, ভাস্কর মিত্র, অমিত নাথ, নব শী এবং অতনু ভট্টাচার্য থাকতেন। এ ছাড়াও সুদীপ্ত ভট্টাচার্য প্রায়শই আমারই মতন চুঁচুড়া থেকে নৈহাটির আড্ডায় আসতেন। পরে পরে এই রাত্রিকালীন আড্ডায় সমরেশ বসু থেকে কবি রবীন সুর, জয় গোস্বামী এঁরাও এসেছেন। অনেক তরুণ কবিরাও আসতেন আমারই মতন। কেউ কেউ কবিতা চর্চা নিয়ে অনেক দূর এগিয়ে গেলেন কেউ কেউ অন্তর্হিত হয়ে গেলেন।

তখন বাপীদার আজকালপত্রিকা বাংলা কবিতার নতুন পরিবর্তন খুঁজে পেয়েছে। নতুন ভাবনা, নতুন ভাষা এবং এক অন্য ছাঁচে ঢালা আন্দোলন। আমার তখন নিয়মিতই নৈহাটির আড্ডায় যাওয়া অভ্যাস হয়ে গিয়েছিল, পকেটে থাকত গুচ্ছ গুচ্ছ নতুন লেখা এবং মনেতে উত্তেজনা। কবিতা পাঠ করাও যে একটা অধিকন্তু শিল্প তা এই আড্ডা থেকে শিখেছিলাম। স্পষ্ট উচ্চারণ, কণ্ঠস্বরের ওঠা-নামা এবং যতিচিহ্নের বিষয়ে অভিজ্ঞান থাকা জরুরি, তা না হলে কবিতার সম্যক উপলব্ধি মনের ভেতরে জারিত হওয়া সম্ভবপর নয় এই শিক্ষা পেয়েছিলাম।

একদিন রাত করে নৈহাটি থেকে ফিরতে দেখি আমার ভাই সাইকেল নিয়ে দাঁড়িয়ে আমার জন্য অপেক্ষা করছে, কাছে আসতেই গম্ভীরভাবে বললো, ‘বাড়ি চল, বাবা দেবে। বুঝলাম আজ কিছু হবে আর কবিতা লেখারও সমাপ্তি ঘটবে। যা ভয় পেয়েছিলাম তা অবশ্য ঘটেনি মা আমাকে আড়ালে রেখেছিল। এই আড্ডার সঙ্গে চলতে লাগল শায়ক পত্রিকাটির আপাদমস্তক বদল। একটি নিটোল কাগজের জন্য আজকালেরকবিরা আমাকে নানাভাবে উপদেশ দিলেন এবং আমারও মনে হল পত্রিকা যদি করতেই হয় সিরিয়াসনেসটা জরুরি। পত্রিকায় ক্রমে বাহ্যিক আকৃতি এবং বিষয়ের নানা পরিবর্তন এলো। ততোদিনে অবশ্য আমার সঙ্গে থাকা বাকি দুই বন্ধু পড়াশোনা এবং ব্যক্তিগত অসুবিধার কারণে ছিটকে গিয়েছেন। আমাকে একাই পত্রিকা করতে হবে ভেবে মন স্থির করে নিলাম। নানাভাবে নানা লেখকের ঠিকানা জোগাড় করে লেখা আনতে লাগলাম। এইসময়ে কবি দেবীপ্রসাদ বন্দ্যোপাধ্যায়, বিনয় মজুমদার, অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত, প্রণবেন্দু দাশগুপ্ত ও শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের কাছেও কবিতা চেয়ে পেয়েছি। নানা অমূল্য গদ্য লিখলেন আজকালেরকবিরা। এছাড়া নতুন কবিরাও শায়কেলেখার জন্য আগ্রহী হলেন। আমার লেখা সম্পাদকীয়র মাধ্যমে নানা বিপ্লবাত্মক ঘোষণা ছড়িয়ে দিলাম, এমনকি পাঠকেরাও রেহাই পেলেন না।

এইসব ঘোষণার মধ্যে আমার অবশ্য কোনও বিপ্লব করার ইচ্ছে ছিল না। আমি শুধু চেয়েছিলাম এমন একটি পত্রিকা হোক যেখানে লেখাগুলির মধ্যে হৃদজারিত মৌলিক কবিতা থাকবে, নিজস্ব ভাষায় কথা বলা হবে এবং সার্বিক ভাবে পত্রিকাটির একটি অন্য চরিত্র থাকবে। এই পত্রিকার মাধ্যমে বাংলাদেশের এক মুক্তিযোদ্ধা কবির সাথে আমার ঘনিষ্ঠতা হয় তার নাম ওয়াহিদ রেজা, ড্যাফোডিল নামের একটি অতি সুন্দর পত্রিকা সম্পাদনা করতেন, রঙিন কাগজে কবিতা ছাপা হত আর অক্ষরের টাইপও ছিল মোটা মোটা। সেখানেও আমার কবিতা নিয়মিত ছাপা হতে লাগল, সীমান্ত পেরিয়ে আমার কবিতা তখন অন্য দেশে। এর বেশ কিছুদিন পরে ওয়াহিদ ভারত সফরে এলে একদিন আমার বাড়িতে এসে হাজির হল। আমার মা যেহেতু রাজনৈতিক ঘরের মানুষ ছিলেন, খবর কাগজের মাধ্যমে রাজনীতির প্রতিটি খবরাখবরই তিনি নিয়মিত রাখতেন। মনে আছে মুজিবুর রহমানের পরিবারসহ হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় মা দীর্ঘদিন বিহ্বল ছিলেন। ওয়াহিদকে সামনে পেয়ে তাঁর দুঃখ উথলে উঠেছিল, মা ওয়াহিদকে পুত্রসম যত্নে নানা পদ রেঁধে মধ্যাহ্ন ভোজ করিয়েছিলেন। একদিনের সেই আতিথিয়তায় মা হয়ে উঠেছিল যেন ওয়াহিদের আপন মাসিমা। তখন থেকেই ড্যাফোডিলপ্রকাশিত হলে ওয়াহিদ দু'কপি আমাকে পাঠাতো। এক কপি আমার নামে আর এক কপি মায়ের নামে। পত্রিকার কোণে লেখা থাকত সুন্দর হস্তাক্ষরে, ‘মাসিমাকে


পর্ব আট।। মৃত্যু যখন কবিতাকে ছাপিয়ে ওঠে

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আমার কবিতা লেখাটা জীবনের অবশ্য কর্তব্য হয়ে দাঁড়ালো। ভেতরে বহমান এমন একটা স্রোত বইতে লাগল যা আমি বুঝে উঠতে পারিনি। চারদিকে কত না বিষয় ও ঘটনাসমূহ ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। আমার জগ-সংসার আর মানুষজন তখন বিস্ময়ের বিষয়। একপ্রান্তে দূর থেকে আমি সব কিছু লক্ষ্য করে যাচ্ছি আর অন্যপ্রান্তে একটি অচেনা পৃথিবী। একটি নিতান্ত সামান্য বিষয়ও তখন অজান্তে কবিতা। এই দেখার রূপ, কথা যেন অন্য আবিষ্কার। আমার মানসচক্ষু খুলে গেল একটু একটু করে। অন্যদিকে নিয়মমত লেখাপড়াও চলতে থাকল, বাণিজ্যে স্নাতকস্তর থেকে সুযোগ পাওয়া ম্যানেজমেন্টে ডিপ্লোমা পর্যন্ত। প্রথম বেসরকারি চাকরিতে যোগের দিন থেকেই না-যাওয়া। আমার স্পর্ধার শুরু। আমাদের পরিবারে তিন চার পুরুষই সরকারি চাকরিতে উচ্চপদে ছিলেন। আমার পিতামহ আমাদের বসতবাটিটি নির্মাণ করেন। ঠাকুরদালান, দুটি বাড়ির মাঝে একটি যোগাযোগের দরজা, খিলানসহ বিশালাকায় দুটি কাঠের প্রবেশপথ যা আমি এখনও অতি যত্নে লালনপালন করে চলেছি। অতি পুরনো এই বাড়িতে অনেক নির্মাণ ও পুনর্নির্মাণ হয়েছে যেখানে আমার রোজগারের অর্থ পরিশ্রম এবং মায়ের আবেগ রয়েছে। এর জন্য আমি চাকুরিজীবনে বিশেষ অর্থ সঞ্চয় করতে পারিনি। বিশাল বাড়ির ছাদে আমি একটি লৌহ নির্মিত পেঁচালো কাঠামো দেখেছিলাম। শোনা যায় অনেক পূর্বে এখানে জাঁকালো পুজো হত, কিন্তু কোনও দুর্ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে তা বন্ধ হয়ে যায়। অনেক মানুষজনের একান্নবর্তী পরিবার থেকে এখন জ্যাঠামশাইয়ের অংশে তাঁর মেয়ে একার জীবন যাপন করছে আর আমি বাড়ির বাইরে — সেখানে যারা বসবাস করেন তারা একান্তই আমার পরিবারের বাইরের লোকজন। আমার অংশ বাস্তবিক তালা বন্ধ সেখানে কিছু পায়রা নিজেদের মধ্যে লুকোচুরি খেলে।

ইতিমধ্যে নৈহাটির আজকালপত্রিকাসহ বিভিন্ন উল্লেখযোগ্য পত্রিকায় আমার নিয়মিত লেখা ছাপা হতে থাকে। তখন আমার কুড়ি-একুশ বয়স হবে, একদিন আমি সাহস করে দেশপত্রিকায় কবিতা পাঠিয়ে দিই। কিছুদিন বাদেই একটি পোস্টকার্ড বাড়িতে পৌঁছায়, তাতে লেখা তোমার লেখা পছন্দের কাছাকাছি এসেছে, আবার লেখা পাঠাও’, নিচে কবি আনন্দ বাগচীর সই। পরে পরে আমি কবিতা পাঠাই এবং কিছুদিনের মধ্যেই আমার একটি কবিতা ছাপা হয়ে যায়। গুহামানবীএই নামে সেই কবিতার শেষ লাইনে লেখা ছিল সেজানের ছবি মনে পড়ে, আর পাহাড়ি লালের বাঘঝাঁপা গ্রাম মনে পড়ে। আশ্চর্য হল এই যে কোথায় শিল্পী পল সেজান কোথায় বা পুরুলিয়ার বাঘঝাঁপা? সেই প্রথম কবিতার বিস্তার এবং ক্ষমতা উপলব্ধি করলাম। জীবনে প্রথম রোজকার হল পঞ্চাশ টাকা। ভাই সেই চেক পোস্টম্যানের হাত থেকে নিয়ে আমার হাতে দিয়ে বলেছিল, ‘এই নে তোর চেক। সেই শুরু, আজকালবা পরে পরিবর্তিত নামে আজকাল টাইটোনিডিরপ্রতিষ্ঠান বিরোধী আন্দোলন থাকলেও তাঁরা কখনও অন্তত প্রকাশ্যে আমার বাণিজ্যিক কাগজে লেখা নিয়ে কোনও আপত্তি তোলেন নি। আর আমিও চেয়েছিলাম আমার কবিতা সর্বত্র ছড়িয়ে যাক। শুধু প্রকাশ স্পৃহায় যেন কোনও লোভের দাগ না লাগে, সেই থেকে এই জীবন দর্শন আমি মেনে চলেছি। এরপরে আশি নব্বই দশক থেকে শুরু করে আমি নিয়মিতই দেশপত্রিকায় কবিতা লিখে গিয়েছি। মনে আছে, তখন বেকার ছিলাম এবং নতুন লেখা নিয়ে দেশপত্রিকার দপ্তরে জমা দিয়ে আসতাম। সে সময়ে দপ্তরে যাওয়া নিয়ে এখনকার মতো এতো বিধি নিষেধ ছিল না। কাঁচের ঘরের বাইরে থেকে দেখতাম বিখ্যাত মানুষেরা কাজে ব্যস্ত। একদিন করিডরে শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে দেখা, আলাপ করতেই বলে উঠলেন, ‘তুমিই শ্যামলজিৎ? ভালো লিখছ, লিখে যাও। আমি বুঝলাম তিনি আমার কবিতা নিয়ে আগ্রহী রয়েছেন। সাধারণত অতি সংকোচ নিয়ে আমি কবি সুনীল বসুর হাতে কবিতা জমা দিয়ে আসতাম। দেখতাম তাঁর চোখের সমস্যার জন্য তিনি পাণ্ডুলিপির ওপরে প্রায় চোখ ছুঁইয়ে নিবিষ্ট মনে প্রুফ দেখে যাচ্ছেন। আমার দ্বিধা দেখে একদিন বলে উঠলেন, ‘এখানে তো অনেকেই লেখা দিতে আসে, জানবে তোমার ক্ষমতাবলেই তোমার লেখা ছাপা হয়

রমেন্দ্রকুমার আচার্য চৌধুরী
স্কেচ- এ আই সহায়তায় রাজীব কুমার ঘোষ

শায়ক পত্রিকা করার সময়ে আমার রমেন্দ্রকুমার আচার্য চৌধুরী, দেবীপ্রসাদ বন্দ্যোপাধ্যায়, শক্তি চট্টোপাধ্যায়, প্রণবেন্দু দাশগুপ্ত, অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত এবং সর্বোপরি বিনয় মজুমদারের সঙ্গে বিশেষ ঘনিষ্ঠতা হয়েছিল। তাঁরা আমার কাগজে লেখা চাইলেই পাঠাতেন এবং বিনয় দা আমাকে আমার কবিতা নিয়ে চিঠিও দিতেন। শ্রদ্ধেয় মানুষ ছিলেন পান্নালাল দাশগুপ্ত, তিনি কম্পাস নামে একটি পত্রিকা নিয়মিত করতেন যা রাজনৈতিক হলেও অত্যন্ত গুণসম্পন্ন কাগজ ছিল, তাঁর সঙ্গে আমার আকস্মিকভাবে আলাপ হয়েছিল। জিজ্ঞাসা পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন শ্রীশিবনারায়ণ রায়। সেখানে আমার কয়েকবার কবিতা ছাপা হয়। রেনেসাঁসআন্দোলন নিয়ে তাঁর প্রবন্ধগুলি অমূল্য এবং এখনও শিরোধার্য। পরে আমি যখন নয়াদিল্লিতে কেন্দ্রীয় সরকারের চাকুরিতে চলে যাই তখন বাংলা ছেড়ে যাওয়ার সন্তপের কথা তাঁকে জানালে তিনি আমাকে একটি পোস্টকার্ডে ধৈর্য রাখতে বলেছিলেন। কখনও কখনও আমি বরাহনগরে উত্তরসূরি পত্রিকার সম্পাদক শ্রীঅরুণ ভট্টাচার্যের বাড়িতে যেতাম সেখানে দেখতাম তিনি মেঝেতে মাদুর বিছিয়ে একমনে পত্রিকার প্রুফ দেখে যাচ্ছেন। নিবিষ্টতা কাকে বলে সে বিষয়ে আমার সম্যক উপলব্ধি হতে থাকল। উত্তরসূরিপত্রিকায় আহ্বান ছিল বাংলার প্রাচীন কবিতার আবার পুনর্পাঠে। তাঁর উদাত্ত শ্লোগান প্রতিটি সংখ্যার কভারে ছাপা হত। উত্তরসূরিতেও আমার কবিতা ছাপা হয়েছিল যা অরুণবাবু অন্য পত্রিকার ভালো কবিতা থেকে সংগ্রহ করে ছাপাতেন। 

আজকালপত্রিকায় যেমন গুচ্ছ গুচ্ছ আমার কবিতা ছাপা হয়েছিল তেমনই পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশে আমার প্রচুর লেখা ছাপা হয়েছিল। কবিতা লেখার সঙ্গে সঙ্গে আমাকে বুদ্ধদেব বসুবিনয় মজুমদার নিবিড় সখ্যতা দিয়েছিলেন। মাইকেল মধুসূদন দত্তের আট ছয়ের বা ছয় আটের অক্ষরবৃত্তের চলন থেকে আমি ক্রমশ বিনয় মজুমদারের লম্বা লম্বা অক্ষরবৃত্তের কবিতা অনুধাবন করতে লাগলাম। ফলত ছন্দে অক্ষরবৃত্ত আমাকে বিশেষ অভ্যাস থেকে কুশলী করে তুলেছিল যার রেশ এখনও চলছে। আমি মাত্রাবৃত্তে কবিতা লিখতে গিয়ে দেখলাম আমি যে কথাটা বলতে চাইছি তা যেন কোনও সীমায় আটকে যাচ্ছে এবং আমার কবিতা কোথায় যেন স্খলনে পড়ছে। সুতরাং আমি ক্রমশ গদ্য কবিতা এবং ভাঙা পয়ারে মগ্ন হলাম। এছাড়াও প্রচুর কবিতার বই পড়তে পড়তে নিজের ক্ষুদ্র গণ্ডিটাকে বিস্তারে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলাম। এ প্রসঙ্গে আমি আপন দাদার মতো কবি সুদীপ্ত ভট্টাচার্যের কাছে বিশেষ ঋণী। তিনি তাঁর বইয়ের সংগ্রহ পুরোটাই আমাকে তুলে দিয়েছিলেন, বেকার অবস্থায় আমার তখন বই কেনার বিশেষ সামর্থ্য ছিল না। প্রতি রবিবারই আমার নিয়ম ছিল একটি দুটি বই তাঁর বাড়ি থেকে নিয়ে আসা এবং পড়ে পরের সপ্তাহে ফেরত দিয়ে আবার দু একটি বই নিয়ে আসা। এই নিয়মের অভ্যাস টানা তিন বছর ধরে প্রায় চলেছিল। উপরন্তু, সুদীপ্তদার বাড়িতে  তাঁর মায়ের হাতে তৈরি লুচি, আলুর তরকারি আর মিষ্টি আমার অতিরিক্ত প্রাপ্য ছিল।

এর মধ্যেই দিদির বিবাহ প্রবাসী এক ডাক্তারের সঙ্গে ঠিক হয়ে গেল। কিন্তু এই বিবাহের অর্থ ব্যবস্থা নিয়ে মা এবং বাবা বিশেষ সংকটে পড়েছিলেন। আমার মামার বাড়ির দিক দিয়ে সম্পন্নতা থাকা সত্ত্বেও কোনও সহায়তা মা পায়নি অথচ জমিজিরেতে মায়েরও দাবি ছিল। আমার বাবার তেমন প্রস্তুতি ছিল না বিবাহযোগ্যা মেয়ের জন্য সামান্য পুঁজিরও ব্যবস্থা করার। এ সময় আকস্মিক ভাবেই আমার মেসোমশাইয়ের এক ছাত্র অনেক সহায়তা দিয়েছিলেন এবং বাবা ঠিক করেছিলেন অনতিবিলম্বে বাবার অবসরের টাকা থেকে সেই ছাত্রের টাকা মিটিয়ে দেবেন। বিবাহ সম্পন্ন হওয়ার কিছুদিন পর থেকেই তাঁরা বাবাকে নির্মমভাবে অর্থ ফেরতের তাগিদ দিলেন এবং নিতান্ত বাধ্যবাধকতায় আমার জামাইবাবু সেই অর্থ মিটিয়ে দেন এবং পরে বাবার অবসরের টাকা থেকে তাঁর অবদান শোধ করা হয়। বিবাহ পরবর্তী সময়ে আমাদের সাংসারিক অর্থ সংকট চরমে ওঠে এমন কি আমার রাত্রিকালীন দীর্ঘদিনের দুধ খাওয়ার অভ্যাসটাও বন্ধ হয়ে যায়।

কবিতা লেখার সঙ্গে সঙ্গে আমার কয়েকটি টিউশন সঙ্গী ছিল। চারটি ছাত্র ছাত্রী পড়িয়ে তিন চারশো টাকা রোজগার ছিল। তার কিছুটা মায়ের হাতে কিছুটা চাকরি পরীক্ষার দরখাস্তে আর বাকিটা পত্রিকার পেছনে খরচ করতাম। আমার ছোটোবেলার বন্ধুরা অত্যন্ত প্রাণের কাছাকাছি ছিল। একটি ভগ্নপ্রায় বাড়িতে আমরা চার পাঁচজন বন্ধু একসঙ্গে চাকরির পরীক্ষার প্রস্তুতি নিতাম। এক একজন একটি পত্রিকা বা বই কিনত ফলে আমাদের পাঠের পরিধি বেড়ে যেতে লাগল। আমরা ক্রমশ একটা যোগ্য স্থানে চলে যেতে শুরু করেছিলাম এরকমটা মনে হয়েছিল। ফলে বছর তিনেক বাদেই দেখা গেল বন্ধুরা আমাদের মাঠের আড্ডায় তাদের চাকরির খবর নিয়ে আসছে। এই খবর আমাকে আরও যেন মনের দিক দিয়ে অস্থির করে দিচ্ছিল। সংশয় হয়েছিল তবে কি আমার কোনও যোগ্যতাই নেই

এসময়ে এলাহাবাদে দিদির বাড়িতে যাওয়ার জন্য আমার ভাই জেদ ধরেছিল। কিন্তু এলাহাবাদে গরমে প্রচুর লু বয়, কিন্তু ভাইয়ের জেদের কাছে দিদি হার মেনেছিল। ট্রেনে যেতে যেতে আকস্মিক ভাইয়ের প্রস্রাব বন্ধ হয়ে যায় এবং তলপেটে প্রচুর যন্ত্রণা হতে থাকে। জামাইবাবু ডাক্তার হওয়া সত্ত্বেও চলন্ত ট্রেনে তিনি অসহায় ছিলেন। সকালে এলাহাবাদ পৌঁছালে ক্যাথিটার দিয়ে ভাইয়ের প্রস্রাব বের করা হয় কিন্তু দুদিন কাটতে না কাটতেই তার জ্বর এবং বমি হতে থাকে। প্রথমে ম্যালেরিয়া ভাবলেও পরে হাসপাতালে ভর্তির পরে জানা যায় তার একসঙ্গে দুটি কিডনিই কাজ করছে না। টেলিগ্রাম পেয়ে প্রথমে বাবা মা ও পরে আমি এলাহাবাদে পৌঁছে যাই। অমন অনিন্দ্যসুন্দর শরীর দেখি বিছানায় মিশে আছে, ম্লান দৃষ্টি, অব্যক্ত চাহনি। এ দৃশ্য দেখে আমি কাঁদতে কাঁদতে কেবিনের বাইরে চলে আসি। মাত্র ছাব্বিশ দিনের মধ্যেই সব চিকিৎসা ব্যর্থ করে সে চলে গিয়েছিল। সেসময় মা প্রায় উন্মাদ আর আমি কীরকম অস্বাভাবিক হয়ে গিয়েছিলাম! এলাহাবাদ স্টেশনে ভাইয়ের ব্যাগ ভর্তি বই আর জামাকাপড় ফিরিয়ে এনেছিলাম, তখনও তাঁর একাউন্টেন্সি বইয়ের ভাঁজে স্কেল মার্ক করা আছে সে ছুটিতে গিয়ে কতদূর পড়েছিল। কিন্তু তখন নিয়তি তাঁকে আরও অনেক দূরে নিয়ে চলে যাবে, কোন সীমানার পাড়ে আমরা জানিনি।   



পর্ব নয়।। মৃত্যু দেখিয়েছে সারসত্য

ভাইয়ের মৃত্যু আমার জীবনটা পালটে দিল। একদিকে মায়ের হাহাকার অন্যদিকে বাবার স্থিরতা। তিনি আমাকে প্রবোধ দিচ্ছেন, ‘জীবনে প্রথম মৃত্যু দেখলি, এই অস্থিরতা হবেই, আমি আমার বাবাকে ষোলো বছর বয়সে হারিয়েছি। আমার ভেতরে সবসময় একটা ছটফটানি, বাড়ি থেকে বেরিয়ে আসা, উচাটন যেন সব মিলিয়ে উন্মাদগ্রস্থতা। এই ব্যাপারটা বহুমাস ধরেই চলেছিল। শেষপর্যন্ত কলমের কাছেই আশ্রয় নিলাম, ভরসা চাইলাম। কতো না এপিটাফ রচিত হতে থাকল এবং এই কবিতাগুলি আমার লুপ্ত চেতনার থেকে জন্ম নিল। আমার অভিপ্রায় আর নিজের কাছে ছিল না, আমি কাউকেই বোঝাতে পারিনি সে সময় আমার ভেতরে কি চলেছিল? এই মৃত্যুতেই দেখলাম কতো আত্মীয় সান্ত্বনা দেওয়ার ছলে মাকে আরও উত্ত্যক্ত করছে, কাকাকে দেখতাম হাতে গোছা ধূপ নিয়ে গোটা বাড়ি ধোঁয়া ছড়াচ্ছে। সেই বয়সে এই আদিখ্যেতা আমার মনে হয়েছিল শোককে আরও উসকে দেওয়া। সব মিলিয়ে পরিবার ক্রমশ ধ্বংস ও ধ্বস্ত হতে থাকে।

আমার দিদি বিবাহ পরবর্তী জীবনে অন্তত ছয় সাত বছর সুখে ও আনন্দেই ছিল। কিন্তু তিরাশির ওই দুর্ঘটনায় তারাও ক্রমশ সুখের স্বাদহীনতার মধ্যে ভাঙতে থাকে। একদিন জামাইবাবু হসপিটাল থেকে রাতে বাড়ি ফেরার পথে মোটরবাইক দুর্ঘটনায় পড়ে নাকের ওপরে মারাত্মক চোট পান। কিছুদিন পর থেকেই তাঁর স্নায়ু ঘটিত নানা অসুবিধা হতে থাকে। একদিন সই করতে গিয়ে দেখেন তাঁর হাত থেকে কলম খসে পড়ছে। ক্রমশ তিনি নানা শারীরিক অসহায়তার মধ্যে পড়তে থাকলেন যেহেতু তিনি নিজে ডাক্তার ছিলেন, তাঁর বুঝতে অসুবিধা হয়নি কি হতে চলেছে তাঁর শরীর জুড়ে। তবু সেই সময় উন্নত চিকিৎসা ব্যবস্থা ও পরবর্তীতে আমেরিকায় তাঁর দিদি দাদারা থাকায় তাঁকে আমেরিকা নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। সেইসময় আমি কেন্দ্রীয় সরকারের পেট্রোলিয়াম দপ্তরে নয়াদিল্লির শাস্ত্রীভবনে নিয়োজিত ছিলাম। ফলত জামাইবাবু আমেরিকা যাওয়ার সময় প্রধানমন্ত্রী দপ্তরে ডাক্তার হিসেবে তাঁর সহায়তা পেতে আমাকে যেতে হয়েছিল। কিন্তু তিন মাস আমেরিকায় থাকা সত্ত্বেও তাঁর চিকিৎসায় কোনও সুরাহা হয়নি। তখনও পর্যন্ত মোটর নিউরোন ডিসিসেরকোনও চিকিৎসা ব্যবস্থা আবিষ্কৃত হয়নি যা এখনও অনাবিষ্কৃতই থেকে গেছে। এই একই রোগে বিখ্যাত বৈজ্ঞানিক স্টিফেন হকিং আক্রান্ত হলেও নানা যন্ত্রের সাহায্যে প্রায় ছত্রিশ বছর বেঁচে ছিলেন।

আমেরিকা থেকে ফেরার পরে ক্রমশ জামাইবাবু এলাহাবাদে তাঁর বাসায় হুইল চেয়ারে বসে নিস্তেজ হয়ে যেতে থাকলেন। স্বাস্থবান মানুষটি চলশক্তি হারিয়ে শুধু অশ্রুপাত করতেন। অত্যন্ত দয়ালু ও আবেগী এই মানুষটির জন্য তাঁর বাবা মা সহ সকলকেই আড়ালে অশ্রু বিসর্জন দিতে দেখেছি। এ সময় আমার দিদির দৈনন্দিন সেবাকাজ ছিল মহৎ ও কষ্টকর, একটি রুটি খাওয়াতে তাঁর দেড় ঘণ্টাও লেগে যেত। এভাবেই আরও ছয় বছর কেটে যাওয়ার পরে তিনি এক সকালে পরলোকে চলে যান।

নব্বইয়ের এই ঘটনার সময়ের কিছু আগে আমি এক সকালে বাড়িতে এক বারান্দা থেকে আর এক বারান্দায় লাফিয়ে যেতে গিয়ে  ছিটকে পড়ে আমার ডান হাত ভেঙে ফেলি। রক্তাক্ত হাত দেখে আমার মা সেদিন হয়ত ভেবেছিলেন আমার দ্বিতীয় পুত্র সন্তানটিও বোধহয় গেল। কিন্তু দীর্ঘ চিকিৎসার পরে, প্রায় দেড় বছর অবধি ভুগে নানা যন্ত্রণার শেষে আমি আমার হাত পুনরায় পূর্ণশক্তিতে ফিরে পাই। আমার যিনি ডাক্তার ছিলেন, ডাক্তার রঞ্জিত চ্যাটার্জি আমার বাবার প্রতি অত্যন্ত প্রসন্ন ছিলেন ও আমার সুচিকিৎসার জন্য যা যা করণীয় তা তিনি করেছিলেন। তাঁর কাছে আমার ঋণের শেষ নেই। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত পারিবারিক একটি অশান্তির জেরে তিনি আত্মহনন করেন। সে সময় চুঁচুড়ার মানুষজন অত্যন্ত বিক্ষুব্ধ হয়েছিলেন এই ঘটনায়। আমার হাতকে সম্পূর্ণ ভালো করার জন্যে দীর্ঘ অপেক্ষা করতে হয়েছিল। এই বুড়োছেলেকে বাবা মাথায় তেল মাখিয়ে স্নান করিয়ে দিতেন আর মা  খাইয়ে দিতেন। প্রায় পঁয়তাল্লিশ দিন ছুটির পরে আমি রাধাকান্তপুরে আমার কর্মস্থলে যোগ দিই। প্রকৃতপক্ষে ব্যাঙ্কে আমি উপস্থিত থাকতাম কিন্তু কোনও কাজ কেউই করতে দিত না কেননা তখনও আমার ডান হাত ভারি লেদার গার্ডের সাপোর্টে থাকত। এর দু মাস বাদেই জামাইবাবুর মৃত্যুর খবর আসায় বাবা মাকে এক বস্ত্রেই এলাহাবাদ চলে যেতে হয়। আমি বিপন্ন ও অসহায় অবস্থায় একাই বাড়িতে রয়ে যাই। কয়েকমাস পরে আমি একটু ধাতস্থ হলে এলাহাবাদে পৌঁছে যাই, মনে হয়েছিল সে সময় আমার শারীরিক অসুবিধা সত্ত্বেও দিদির পাশে দাঁড়ানোটা জরুরি। এলাহাবাদ থেকে আমি ওকে বেনারসে ওর আত্মীয়দের কাছে নিয়ে যাই। একদিন বিশ্বনাথ মন্দির দর্শনের সময় ভীড়ের ভেতরে আমার ভাঙা হাতে আবার ধাক্কা লাগে এবং ভেতর থেকে রক্ত ও পুঁজ বেরোতে থাকে। সে সময় দিদি আমাকে প্রাথমিক শুশ্রূষার পরে বেনারসের বাড়িতে ফিরিয়ে নিয়ে যায়।


পঁচাশি-ছিরাশি সালে আমি কেন্দ্রীয় সরকারের চাকরি করার পরে সাতাশির জানুয়ারিতে স্টেট ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়াতে ডাক পাই। লিখিত পরীক্ষা পাশ করার পরে ইন্টারভিউ দিয়ে আমার তখন দু বছর দিল্লির চাকরি হয়ে গেছে। আগেই বলেছি দিল্লির চাকরি কেরিয়ার তৈরি করতে আমায় অনেক দূর নিয়ে যেতে পারত। এক হাজারি বেতন থাকা সত্ত্বেও আমি ভালোভাবে জীবন যাপন করেও ব্যাঙ্কে পাঁচশ টাকা জমাতে পারতাম। পরে এই টাকা জমিয়ে প্রথম ছুটিতে বাড়ি এসে আমি মায়ের জন্য গ্যাসের কানেকশন করিয়ে দিয়েছিলাম। তখনও পর্যন্ত মা তোলা উনুনে ঘুঁটে কয়লার ধোঁয়া মেখে রান্না করত। কিন্তু নয়াদিল্লির শাস্ত্রীভবনে আমার পোস্টিং হলেও পুরনো দিল্লির গান্ধীনগরে প্রথমে একটি মেস যা জামাইবাবুর মেসনামে সমধিক পরিচিত ছিল। কিন্তু অতি নোংরা ডিঙিয়ে অন্য একটি বাড়িতে খেতে যেতে হত বলে সারাদিনই ঘিনঘিনানি নিয়ে থাকতাম। পুরনো দিল্লির বর্জ্য ব্যবস্থা ছিল খোলা নর্দমাই। বর্ষাকালে যা একটি বৃহৎ নরককুণ্ডে পরিণত হত। এমনকি মানুষের বর্জ্যও বর্ষার জলে রাস্তায় ভেসে যেত। গান্ধীনগর থেকে যখন আমি নয়াদিল্লির অফিসে যেতাম তখন অন্যরকম ছবি। হিল এরিয়ায় নয়াদিল্লির রাস্ট্রপতি ভবন থেকে নর্থব্লক সাউথ ব্লক ছিল সুবিস্তৃত পথ ও গাছগাছালি ঘেরা মনোরম দৃশ্যপটে। শাস্ত্রী ভবনে আমাদের পেট্রোলিয়াম দপ্তরে প্রতিদিনই আমাকে হিন্দি বলা নিয়ে অনেক ঠাট্টা, উপহাস শুনতে হত। বিভিন্ন প্রদেশের মেয়েরাও এ ব্যাপারে পিছপা ছিল না। তখন যায়েগি আর যায়েগার মধ্যে তফাৎ বুঝিনি। পেট্রোলিয়াম দপ্তরে কাজ করতে করতে বুঝলাম আমি একটি ছোটোখাটো ভারতবর্ষের মধ্যে এসে পড়েছি। নানা ভাষা, নানা জাতি, নানা খাদ্যাভ্যাস। তখন নিজেকে ভারতবর্ষের একজন নাগরিক হিসেবে অত্যন্ত গৌরবান্বিত বলে মনে হত। এস পি শর্মা, রামাকৃষ্ণাণ, সাহু এইসব ভিন প্রদেশের কলিগেরা আমার অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ হয়ে উঠল। আমরা একসঙ্গে কফি টেবিল থেকে লাঞ্চ টেবিল আনন্দের সঙ্গে অতিবাহিত করতাম আর ছিল বোট ক্লাবে প্রশস্ত লনে শীতের দুপুরে হিমাচল প্রদেশ থেকে আসা এক টাকার ফলের চাট যা অতি উপাদেয় ছিল। প্রথম তিনমাস পরে আমি বাড়িতে এলে আমার গৌরবর্ণ রঙ আর ঝকঝকে স্বাস্থ্য দেখে মা বিস্মিত হয়েছিল। এসবই ভালো আবহাওয়ার গুণ। 

নয়াদিল্লিতে চাকরিরত অবস্থায় দুটি উল্লেখযোগ্য দুর্ঘটনা ঘটেছিল। এক, ইন্দিরা গান্ধী হত্যাকাণ্ডের পরে স্বর্ণমন্দিরে বিদ্রোহী নেতা সন্থ লঙ্গোয়ালের হত্যাকাণ্ড এবং দিল্লির একটি কারখানায় গ্যাস দুর্ঘটনা। এইসব খবরে স্বভাবতই মা খুব উদ্বিগ্ন হতেন এবং আমার বন্ধুর ল্যান্ডলাইন থেকে আমাকে চাকরি ছেড়ে দেওয়ার জন্য আকুতি জানাতেন। কিন্তু তখনও স্টেট ব্যাঙ্কের চাকরির বিশদ খবর আসেনি। ফলত মানসিক টানাপড়েন চলতেই থাকল। আর আমিও কলকাতায় যাতে বদলি হই পূর্ণোদ্যমে তার চেষ্টা চালাতে থাকলাম। একদিন সন্ধ্যে বেলায় মন্ত্রী প্রিয়রঞ্জন দাশমুন্সির বাড়িতে সাহস করে গেলাম। দশ নম্বর জনপথে তখন তিনি ছিলেন উপমন্ত্রী। তাঁর সেক্রেটারি ভেতর ঘরে আমাকে নিয়ে গেলেন, দেখলাম তিনি একটি সিল্কের চুড়িদার পাঞ্জাবী পড়ে সোফাতে এলিয়ে শুয়ে আছেন, আমি বিশদে তাঁকে আমার বাড়ি ফিরে যাওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথা জানালাম। প্রায় দশ মিনিট একপক্ষে আলাপচারিতা চলার পরে তিনি আমাকে বললেন, ‘আপনার সমস্যাটা বুঝতে পারলাম না। বাংলায় কথাবার্তা চলা সত্ত্বেও তিনি আমার সমস্যা অনুধাবন করতে পারেন নি। বুঝলাম তিনি তখন মৌতাতে ছিলেন। পরে আর তাঁর সাথে যোগাযোগ করার ইচ্ছে হয়নি। 

কেন্দ্রীয় সরকারের দপ্তরে থাকাকালীন অনেক নেতা ও মন্ত্রীদের সঙ্গে আমার সংযোগ ঘটেছিল। বর্ধমানের এম পি সুধীর রায়ের কোটায় আমার ট্রেনের রিজার্ভেশন হত আবার নিজের দপ্তর ছাড়াও সি পি এম এম পি অনিল বসুর কার্ডে আমি দুদিন পার্লামেন্ট সেশন দেখার অভিজ্ঞতা লাভ করেছিলাম। আমার দু হাত দূর থেকে পার্লামেন্টের মেন গেটে দেখতাম প্রধানমন্ত্রী পি ভি নরসীমা রাও, মাধবরাও সিন্ধিয়া, বসন্ত শাঠে প্রমুখ বিখ্যাত পার্লামেন্টিয়ানরা ঢুকছেন। তখন তল্লাশি, কড়াকড়ি থাকলেও বাড়াবাড়ি ছিল না। পার্লামেন্ট সেশনে একদিন দেখেছি বাম নেতা সোমনাথ চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে কংগ্রেস নেতা প্রিয়রঞ্জন দাশমুন্সির আক্ষরিক অর্থে আস্তিন গোটানো লড়াই। তবু কখনও শালীনতার সীমা অতিক্রম করে তা নোংরা অবস্থায় যায়নি। 

আমি সকাল সাড়ে নটার মধ্যে দপ্তরে পৌঁছে গেলে একদিন একটি চতুর্থ শ্রেণির কর্মী আমাকে মন্ত্রীর ঘর দেখাতে নিয়ে গিয়েছিল। সেসময় পেট্রোলিয়াম মন্ত্রী ছিলেন রাজস্থানের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর বিশাল ঘরে ঢুকতেই নরম কার্পেটে আমার পা ডুবে গিয়েছিল, টেবিলের বাঁপাশে ছিল সারি সারি নানা রঙের ল্যান্ডলাইন। কর্মীটি আমাকে বলেছিল প্রত্যেকটি ল্যান্ডলাইনে রাষ্ট্রপতি থেকে প্রধানমন্ত্রী পর্যন্ত হট কানেকশন রয়েছে। আমি প্রধানমন্ত্রীর কোনটি ল্যান্ডলাইন জেনে কানে নিতেই একটা পোঁ পোঁ আওয়াজ করতে লাগল, আমি ঘাবড়ে গিয়ে তড়িঘড়ি যন্ত্রটি আবার যথাস্থানে রেখে দিয়েছিলাম। 


পর্ব দশ ।। বিচিত্র প্রভুর দেশ

ভাইয়ের মৃত্যুর দেড় বছরের মধ্যে আমি চাকরি পেয়ে দিল্লি চলে গিয়েছিলাম। সুতরাং বাড়িতে মা এবং বাবা একাই পড়ে রইল। আমার বাবার ভেতর একটা চাপা স্বভাব ছিল এবং প্রয়োজনাতিরিক্ত কথা বলতেও চাইতেন না। কিন্তু ক্রমশ মা-র একাকীত্ব আরও প্রবল হয়ে উঠল। বন্ধুর ল্যান্ডলাইনে কেবলই বলতেন, ‘বাবা ফিরে আয় আমারও এসব ফোন পেলে মনের অস্থিরতা বেড়ে যেত। শান্তি করে, আনন্দের সঙ্গে চাকরি করাটা হয়ে উঠতো না। অথচ অন্যান্য প্রদেশের সহকর্মীদের দেখতাম পরবর্তী উচ্চপদে যাওয়ার জন্যে তখন থেকেই পড়াশোনায় ব্যস্ত হয়ে থাকতে। তাছাড়া বাঙালি ঘরকুনো অলস বলেও একটি পরিচিত বদনামও ছিল। অবশ্য এই সময় পরিস্থিতি বদলে গিয়েছে, এখন বাঙালি অনেক সাহসী ও বাইরে যেতে দ্বিধা করেনা। কিন্তু আমার বেশ তৎপরতা বেড়ে গেল কলকাতার কোনও অন্য মন্ত্রালয়ে বদলি হওয়ার। কেননা পেট্রোলিয়াম মিনিস্ট্রির কোনও দপ্তর কলকাতায় ছিল না। বিভিন্ন মিনিস্ট্রিতে দেখতাম অত্যন্ত উচ্চ পদে বাঙালি আই এ এস নিযুক্ত রয়েছেন, ঘরের বাইরে বোর্ডে তাঁদের উজ্জ্বল গৌরবান্বিত পরিচিতি জ্বল জ্বল করছে। কিন্তু কেউই নিজেকে বাঙালি হিসেবে পরিচয় দিতে চাইতেন না। আর আমার মতো সামান্য কর্মীকে কেনই বা তারা পাত্তা দেবে?

আমার বন্ধুরা সারা সপ্তাহে ডাল-ভাত-ডিমসেদ্ধ খেয়ে কাটালেও শনি-রবিবারে আমাদের পিকনিক মেজাজ থাকত। শনিবারে যমুনার রুই বা কাতলার সমারোহ ও রবিবারে থাকত খাসির ঢেকুর। যেহেতু যে বাড়িতে আমরা থাকতাম সেখানের মালিক এবং তার ছেলেমেয়েরা সকলেই নিরামিষাশী ছিলেন, স্বভাবতই তাঁরা বিরক্ত হতেন, ধোঁয়া ও গন্ধের উৎপাতে। মনে আছে তখন রুই-কাতলা কিনতাম আঠেরো-কুড়ি টাকা কেজিতে আর খাসির মাংস ছিল কুড়ি বাইশের কেজি। শনি-রবি নয়াদিল্লির রাজপথে ঘুরে বেড়ানো, বিশেষত পালিকা মার্কেটের পাতাল বাজারে। একটি ফুলশার্ট কিনেছিলাম মাত্র একশো টাকায় এবং সেই শার্টটি ছিল আকর্ষণীয় মোটা নীল রঙের স্ট্রাইপের। কেউ কেউ উইকেন্ডে জয়পুর-আগ্রা-মুসৌরিতে বেড়াতে চলে যেত, আমিও যেতে পারতাম, কিন্তু বাবা-মাকে নিয়ে যেতে পারছি না, এই পিছুটানে আমি নয়াদিল্লিতে একাই ঘুরে বেড়াতাম, নানা রাস্তা চিনে নেওয়া, রাস্তাগুলির নাম জানা আমার কাছে ইতিহাস খোঁজা ছিল। যেমন আকবর রোড, শাহজাহান রোড, রাইসিনা হিলস ইত্যাদি। মনে আছে একদিন কবি আলোক সোম দিল্লিতে এসে হাজির হলে আমরা শীতার্ত রৌদ্রে বোট ক্লাবে কবিতা নিয়ে আড্ডা মেরেছিলাম। সেই রাতে এম পি অনিল বসুর সরকারি ফ্ল্যাটে তাঁরই রাতপোশাক পরে কাটিয়েছিলাম। আর একদিন পিলসুজ পত্রিকার সম্পাদক সমীর দে রায়ের উপস্থিতিতে একটি সুন্দর সঙ্গ অতিবাহিত হয়েছিল। কবি নীলাঞ্জন মুখোপাধ্যায় আমাদেরই মতো কেন্দ্রীয় সরকারের অন্য দপ্তরে কাজ করত, তাঁর সঙ্গে আকস্মিক গান্ধীনগরে বাসে আলাপ। এছাড়াও আমার দিদির এক আত্মীয় দম্পতি চাকরিসূত্রে পুরনো দিল্লির বিবেকবিহারে থাকতেন সেখানেও তাঁদের বাসায় কখনও গেলে আমাদের অতীব আপ্যায়নে অস্বস্তি বাড়াতেন। এই সময়েই জিজ্ঞাসাপত্রিকার সম্পাদক শ্রীশিবনারায়ণ রায় আমাকে প্রবোধ জানিয়ে একটি পোস্টকার্ড লিখেছিলেন, আস্বস্ত করেছিলেন নানা কথায়, কেননা সেই সময় আমি পশ্চিম বাংলা ছেড়ে এবং কবিতার আবহাওয়া না পেয়ে অত্যন্ত হতাশাগ্রস্থ হয়ে পড়েছিলাম।

এই নিবিড়তার ভিতরেই আমার আকস্মিক দিল্লির চাকরির বদলি হিসেবে কলকাতার বাণিজ্য দপ্তরে বদলি হয়ে আসার সুযোগ হয়। সব মন খারাপ ফেলে রেখে দিল্লিকে বিদায় দিয়ে একদিন কলকাতার অফিসে যোগ দিলাম, চুঁচুড়া স্টেশনে আমার বেডিং নিয়ে বাবা বাড়ি চলে গেলেন আর আমি গেলাম সরাসরি নতুন দপ্তরে যোগ দিতে। এক নম্বর কাউন্সিল হাউস স্ট্রিটের অফিসে পৌঁছে বাণিজ্য দপ্তরে রিপোর্ট করলাম। কিছুদিন যেতে না যেতেই বুঝলাম এই দপ্তরটি কেবলমাত্র সময় কাটানোর জায়গা। বিশাল লালবাড়ি, প্রচুর কর্মচারী, কিন্তু কে কোথায় কখন টেবিলে থাকে জানা যায় না। একদিন দেখলাম এক অচেনা অজানা ব্যক্তি এসে দিল্লির বাণিজ্য দপ্তর থেকে বদলি হয়ে আসা এই অফিসে তাঁর স্থানে দিল্লির টেবিলে এখন কে রয়েছেন তা জানতে চাইছেন। পরে বুঝলাম ওই ব্যক্তি দিল্লিতে গিয়ে পয়সা কড়ি ফেলে তাঁর অভিষ্ঠ কাজ সিদ্ধ করবেন। সুতরাং এখনকার সিস্টেম নিয়ে দুঃখিত হওয়ার কিছু নেই। দেশটারই জন্ম হয়েছিল করাপশন লগ্নে! সে রাজনীতি হোক বা অর্থনীতি হোক। রাজনীতির নেতারা যতোই লম্ফঝম্ফ মারুন না কেন দেশের পরিবর্তন থমকেই থাকবে। সুতরাং অফিসের পরিস্থিতি আমাকে আবার আফসোসের জায়গায় ঠেলে দিল।

এর মাঝের সময়ে পাঁচ পাঁচটা রিমাইন্ডার স্টেট ব্যাঙ্ক থেকে এসে গেছে। ফলত নানা টালবাহানার পরে বহু লোকের পরামর্শ  নিয়ে স্টেট ব্যাঙ্কের একটি গ্রামীণ শাখা মেমারির কাছে রাধাকান্তপুরে রিপোর্ট করি। জানুয়ারির এক তারিখেই ব্যাঙ্কে যোগ দিই সে কারণে তারিখটি সারা জীবনে অর্থবহ হয়ে থাকবে। প্রথম দিনেই ব্রাঞ্চ ম্যানেজার আমাকে ভল্টে ঢুকিয়ে দিলেন এবং দু আঙুলের কাজ শেখালেন অর্থাৎ দুটি আঙুলের কায়দায় নোট গোনা। দু চারদিন বাদে একটি জালঘেরা খাঁচায় আমাকে বন্দি করে দেওয়া হল। সেখানে শিক্ষার নতুন পাঠ ছিল গ্রাহকদের টাকা নির্ভুলভাবে দিতে হবে এবং টাকা জমা করতে হবে। আমার কেমন অস্বস্তি হতে লাগল, তাহলে কি আমি খাঁচায় বন্দি জীবজন্তু হয়ে গেলাম! মানসিক টানাপড়েনে জীবনের খাদ কোথায় যে বয়ে চলেছে ধরতেও পারছিনা।

অথচ রাধাকান্তপুরের শাখার সামনের এবং পিছনের বিস্তীর্ণ সবুজের সমারোহ, যেদিকেই চোখ চলে যায় দেখি সবুজ ধানক্ষেত ক্রমশ ফসল পাকার পরে সময়ের সঙ্গে ধূসর রঙে পরিণতি পাচ্ছে। আর একটি আকর্ষণ ছিল মধ্যাহ্ন ভোজের খাওয়া দাওয়া। সকালে আমার কাজই ছিল যে মেয়েগুলি টোঙায় ভরে বেতের ঝুড়িতে খাপলা মেরে মাছ ধরে নিয়ে আসত তাদের পাকড়াও করা। প্রায়ই খালবিলের মাছ খাওয়া হত, বিশেষত ফলুই মাছ। একটিমাত্র কাঁটা, তুলনাহীন স্বাদ। আর ছিল ক্ষেতের টাটকা সবজি এবং শাকপাতা। আমি সেইসময় থেকে বাড়িতে ভাত খাওয়া ছেড়েই দিয়েছিলাম। আকর্ষণ ছিল দুপুরের ওই মধ্যাহ্নের খাওয়া — ভাত, কলাইডাল, সবজি পোস্ত, মাছ এবং পাতিলেবু। ধীরে ধীরে গ্রামের আশেপাশের ব্যবসায়িক গদিতে স্থানীয় মানুষের সঙ্গে আমার ভাবসাব হয়ে গেল, তাদের সুখ দুঃখের ধারণাগুলি আমার কাছে স্পষ্ট হতে শুরু করল, মনে হল মানুষ এখনও কত দুঃখার্ত জীবন যাপন করছে। অফিসের পাশে একটি মিষ্টান্নের দোকান ছিল, সেখানে তখন অন্য আকর্ষণ — মৌতাতে ওঠা গরম রসগোল্লা আর সুঘ্রাণে ওঠা গরম মাখা সন্দেশ — সে এক অনির্বচনীয় স্বর্গীয় আস্বাদ।

বৃহস্পতিবার ব্যাঙ্কে নন ব্যাঙ্কিং ডে বলে একটি বিষয় ছিল। ওইদিন লেনদেন বন্ধ থাকলেও ব্যালেন্স মেলানো, ঋণ খেলাপিদের তাগাদা মারা, এবং ছাগল গরুর লোনে তাদের কানে ইনস্যুরেন্স কম্পানির ইস্পাতের ট্যাগ লাগানোর কাজ। দেখতাম ট্যাগ লাগানোর সময় তাদের এক সেকেন্ডের আর্তধ্বনি ! বর্ষার সময় ছিল রাস্তাঘাটের নিদারুণ অবস্থা, ট্রাক্টরের চাকায় চারপাশের বাড়িঘর কাদায় ছিটকে ছিটকে যেত। সেরকম এক ঘোরতর বর্ষার দিনে ব্যাঙ্কে ঢুকে দেখি ব্রাঞ্চ ম্যানেজার তার লজ্জা নিবারণের জন্যে দুটি ডাস্টার জোড়া দিয়ে ব্যাঙ্কের কাজকর্ম করছেন আর শরীরের নিচের অংশটি টেবিলের ভেতরে ঢুকিয়ে রেখেছেন। কি নিদারুণ পরিস্থিতি! এই দৃশ্যে না পায় হাসি না পায় কান্না, সবেতেই করুণ দৃশ্যপট।

স্কেচ- এ আই সহায়তায় রাজীব কুমার ঘোষ

এই নন ব্যাঙ্কিং ডে তে আমি সাধারণত একটি পরের ট্রেনে যেতাম। দেখতাম কলেজ এবং ইউনিভার্সিটির ছেলে-মেয়েদের ভীড় স্টেশন চত্বরে। লক্ষ্য করলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বেশ কয়েকটি মেয়ে আমি যে কামরায় উঠি সেই কামরাতেই তারা উঠে আমাকে একা করে দিচ্ছে, নিজেদের মধ্যে কথা বলা ছাড়াও বুঝতে পারছি তারা আমার বিষয়ে বিশেষ আগ্রহী, আমি মেমারি স্টেশনে নেমে গেলেও তারা যাবে বর্ধমান পর্যন্ত। আমি ট্রেনেতে সাধারণত বই বা পত্রিকা নিয়েই যাতায়াত করতাম, তাস খেলা বা আড্ডা আমার ধাতে ছিল না। কিছুদিন পরে দেখলাম চার পাঁচটি মেয়ে আমার সঙ্গে যেচে আলাপ করতে শুরু করে দিল। এবং পরিচয় বাড়তে তারা একদিন আমাকে তাদের ইউনিভার্সিটি দেখাতে নিয়ে গিয়েছিল। আমি সেদিন নোটিশ ছাড়াই অফিসে যাইনি, সারাদিন ইউনিভার্সিটির জঙ্গল এবং বাগান দেখে আমার দিনটি অন্যরকম কেটেছিল। পরে পরে আরও একটি আকর্ষণীয় ঘটনা ঘটেছিল তা আগামীতে বিস্তারে বলা যাবে।



পর্ব এগারো ।। কবিতা বা ঈশ্বরী

যেতে যেতে একলা পথে থাকা হয়নি। ক্রমশ একটি তরুণীর প্রতি মোহগ্রস্ত হয়ে পড়লাম। মনে হয় তারও মনোভাব ক্রমে আমার প্রতি গাঢ় হয়ে উঠেছিল। আমি কো-এড কলেজে পড়লেও মেয়েদের প্রতি কলেজে আমার তেমন আগ্রহ দেখা যায়নি। আমি এতোই ভীত ছিলাম যে একা একা কলেজে না গিয়ে আমার বন্ধু নাট্যকার সমীর সেনগুপ্তকে নিয়ে একসঙ্গে কলেজে যেতাম। তার ওপরে আবার সেই সময়ে আমার দিদি ওই একই কলেজে পোস্ট গ্রাজুয়েশন করছে। সুতরাং অলক্ষ্যে কে আমার ওপর নজরদারি করছে সে বিষয়ে আমি সম্যক অবহিত ছিলাম। যাই হোক উল্লেখ্য তরুণীটি ওর এক বন্ধুর সঙ্গে নৈহাটি থেকে ব্যান্ডেল হয়ে বর্ধমান ইউনিভার্সিটিতে পড়তে যেত। এবং ওদের সঙ্গে ব্যান্ডেল স্টেশনে ট্রেন পৌঁছালে একই কামরায় ওরাও উঠত। সাধারণত এই ঘটনাটি ঘটত বৃহস্পতিবার দেখে কেননা আমি ওইদিন পরের ট্রেনে ব্যাঙ্কে যেতাম। দেখা গেল প্রথম মেয়েটি আমার প্রতি অনুরক্ত হলেও দ্বিতীয় মেয়েটি ক্রমশ আমার মনোযোগ তার দিকে সরানোর চেষ্টা করছে। আমার বয়স কম এবং মনে দোলাচল অসীম। এই সময় আমি যারপরনাই মানসিক দিক দিয়ে বিহ্বল ছিলাম। কিন্তু কিছুদিন পরে বোঝা গেল দ্বিতীয় মেয়েটির একটি তরুণের সঙ্গে আগে থেকেই ভবিষ্যৎ নির্মিত ছিল এবং উপলব্ধি হল প্রথম মেয়েটির নিরুক্ত ভালোবাসাকে আঘাত করা। ফল যা হওয়ার হল, আমার আমও গেল ছালাও গেল। পরে বহু বহু ভাঙা-অভাঙার নানা আশ্চর্য কবিতা নির্মিত হল এবং সেইসব কবিতা সেইসময় ছাপা হতে লাগল আজকাল’, ‘কৌরব’, ‘অলিন্দ’, ‘অনুবর্তনএইসব কাগজে।

স্কেচ- এ আই সহায়তায় রাজীব কুমার ঘোষ

রাধাকান্তপুরে আমার কর্মজীবন সাত বছরের অধিক সময় কেটেছিল কেননা আমি জায়গাটিকে ভালোবেসে ফেলেছিলাম। আমি বুঝতে পারিনি সময় বহতা নদীর মতো কিন্তু মানুষ প্রকৃতি বিচিত্র রূপে আমার কাছে আসত। এমনকী নানারকম পশু পাখির বিচরণ আচরণ উড়ান সবই আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করত। তখন কবিতার ভেতরে নিজের চেতনা, বোধ নতুন মনে হতে লাগল। আমি পুরোপুরি নিজেকে কবিতার ভেতরে সমর্পণ করে উঠলাম। এইসময় বাবা মা আমার বিবাহের জন্যে প্রস্তুতি শুরু করে দিয়েছিলেন। তাঁদের মেয়ে-খোঁজাশুরু হয়ে গেল। বিরানব্বইয়ে আমার বিবাহ একটি শুভদিন দেখে বর্ধমানে স্থির হল। মনে আছে আমি ও মা উদ্দিষ্ট মেয়েটিকে দেখে এককথাতেই পছন্দ করেছিলাম। আবার বিরানব্বইতেই আমার প্রথম কাব্যগ্রন্থ মুগ্ধকথাপ্রকাশিত হয়েছিল সুতরাং বিরানব্বই সনটি আমার জীবনে একটি অতি উল্লেখযোগ্য বছর। বিবাহের শর্ত হিসেবে আমার বাবা মাকে পূর্বেই বলেছিলাম, আমি কোনও পণ নামক দুষ্ট বুদ্ধিতে থাকব না। এই শর্তে যারপরনাই পুরনোপন্থি আমার বাবা মা অসন্তুষ্ট হয়েছিলেন এবং পুত্রের বিবাহে নিজেরা একটি পয়সাও খরচ করেন নি। মনে আছে আমি দিদির কাছ থেকে সেইসময় তিরিশহাজার টাকা ধার নিয়ে বিবাহের খরচ মিটিয়ে ছিলাম। মাত্র দুটি অ্যামবাসাডর করে বিবাহ সম্পন্ন করতে গিয়েছিলাম।

কিন্তু বিবাহ পরবর্তীতে আমার সুখী জীবন ভাগ্যে ছিল না। অহরহ সংসারে ছোটোখাটো বিষয় নিয়ে অশান্তি চলতেই লাগল। এ যেন মায়ের জীবনে যে বঞ্চনা ছিল, যে অসুখ ছিল, যে ভালোবাসা ছিল না, তাই পুরনো ছবি নতুন রূপে আমার স্ত্রীর ওপর বর্তাল। যে বাড়ি আমি অর্থ দিয়ে, স্বপ্ন দিয়ে হলুদ রঙ দিয়ে তৈরি করে এসেছিলাম সেই বাড়ি একদিন আমি পরিত্যাগ করতে বাধ্য হলাম। শেষপর্যন্ত আমার একটি ঘর নিয়ে এপাড়া ওপাড়া করে দশটি বছর কেটে গেল। অর্থাৎ বিবাহ উত্তর জীবন যেন ছন্নছাড়া বিভ্রান্তিকর টানাপড়েনে চলতে ফিরতে লাগল। যে বাবা মা ছাড়া আমার অস্তিত্ব ছিল না তাঁদের খোঁজ খবর নিতে আমি যিনি আমাদের বাড়িতে কাপড় জামা কাচা ও ইস্ত্রির কাজ করতেন, তাঁর কাছ থেকে খবর নিতাম। সবজি বাজারে এককোণে ঘাপটি মেরে বসে থাকতাম, কখন আমার বাবা বাজারে এলে তাঁর মুখটি একবার দেখতে পাব। বাড়ি ছাড়ার বছর তিনেকের মধ্যে আমার কন্যা সন্তান জন্মালে মা অবশ্য একদিন তাকে দেখতে এসেছিল। কিন্তু মনোভাব পালটায়নি, যদিও আমার সন্তানকে তাঁরা খুবই ভালোবাসতেন। এসব কিছুই জুড়ে নিয়ে একটি দীর্ঘ কবিতা রচনা করা যায়, যা হবে সর্বজনীন অনেকে হয়ত মিল পাবেন তাঁদের জীবনেও ঘটে যাওয়া ব্যাথা বেদনার সঙ্গে। কিন্তু ব্যক্তিগত জীবন শুধু কবিতা না, তার থেকে বোধের উন্মোচন এবং নিজেকে ছেঁড়া খোঁড়া একটি অতীব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, না হলে তা পূর্ণ কবিতা হয়ে ওঠে না। আবার আত্মার ভেতরে যন্ত্রণা দুঃখ এগুলি যদি আত্মীকরণ না করা যায় তাহলে তাও কিন্তু কবিতা হয়ে ওঠে না। যেহেতু আমার কবিতাকে প্রবল নীতিবোধ এবং জীবন যাপনের সঠিক মাপকাঠি হিসেবে ধরেছিলাম তাই আমি চেষ্টা করেছি নিজের হৃদয়কে অবিরত শুদ্ধ রাখার।

আগেই প্রথম কবিতার বই মুগ্ধকথানিয়ে উল্লেখ ছিল। দু'একটি কবিতা যদি এখানে বাছাই করে পড়ি তাহলে মনে হয় সেইসময়ে আমার কী মনোভাব চলছিল তার সামান্য আঁচ পাওয়া যেতে পারে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কবিতা চলতে থাকে, বোধ পালটায়। মানসিকতার পরিবর্তন হয় তাই সেইসময়ের কবিতা পড়া যেতেই পারে :

 

একটি পীড়ন                                                                                                                     

ভারতবর্ষের মধ্যে দেবপুর বাঁধ।

সাতাশির জানুয়ারি থেকে যাতায়াত।

সরাসরি পথ থেকে ধুলো এসে বসে

আমার মাথায়। এখানেই ভাবিনি

সেচবন্দী মুনিশের ভাষা চাষ তত্ত্ব

কারণে বা অকারণে ট্রাকটরের

অসহ কাহিনী যার নাম কোল্ডস্টোর,

যাতে ফসল স্বগুণে অধীর হয়েছে।

 

আর সামান্য পাথর দিয়ে ঘেরা বন্দী,

দুই চোখে দ্বিধা। দেখল না ফসলের

গর্ভ, আলোড়ন। ছবির আলেখ্য থেকে

যার ক্রমশ প্রকাশ আবাদে, আড়তে।

খুব কাছ থেকে দেখিনি এমন

কুমড়োর স্তূপে আলোকিত ঝুপড়ির

কোণ, ভেঙে পড়া খেড়ো চাল থেকে

সশব্দে গড়িয়ে আসা মানুষের বাচ্ছা।

                                                                  

 

ওর বন্ধু যদি

 ওর বন্ধু যদি আমাকে গ্রহণ করে

 তবে কী ঘোর অন্যায় কাজ হয়ে যাবে?

 ফর্সা, লাল মুখ ক্রমশ সুন্দর হয়,

 ঘোরবর্ণে আমারই দিকে চেয়ে থাকে।

 আমি তাকাতেই সেই মুখ বিপর্যস্ত

 হয়, কোথা থেকে দুর্যোগের বার্তা আনে।

 তোমার বন্ধুকে যদি আমি টেনে নিই,

 যদি সমস্ত সরলকথা বলে তাকে

 মুগ্ধ করি, তবে তাকে অন্যায় বলবে?

 একটি সঞ্চার চাপা রেখে দিই আর

 গোপন পরিক্রমায় বিদ্ধ হই প্রশ্নে।

       

 তোমার বন্ধুর কথা তোলা থাক আজ।

 তুমি তোমার মুখের ভাঁজে কোন্ ছায়া

 ঢাকা দিয়ে দূরে সরে যাচ্ছ শুধু বলো।

 নিজেকে ভাসিয়ে নিয়ে অতল স্নানের

 শেষে অতিকায় সামুদ্রিক জীব হও,

 ভয়ানক হয়ে ওঠো তা আমাকে বলো।

 এখন শরীর ঘৃণ্য হয়ে ওঠে, তপ্ত

 হয় মনের উচ্ছ্বাস। ভারি হয়ে আসে,

 স্তব্ধ হয়ে আসে দুই বন্ধুর দেহ।

 

 হে বিচ্ছিন্না, তুমি তাকিও না এই দিকে।

 

মুগ্ধকথাবইটির প্রথম প্রকাশ মার্চ ১৯৯২। বিক্রয়মূল্য ছিল ১৫ টাকা। প্রকাশিত হয়েছিল আজকাল টাইটোনিডিরব্যানারে। উৎসর্গ পত্রে লেখা ছিল বুডুলের স্মৃতি’, আমার ভাইয়ের ডাক নাম এবং কপিরাইট ছিল আমার মায়ের নামে, ‘শিবানী সাহা। ব্লার্বের কিছু অংশ পাঠ করি : অবশ্যমান্য এই কবিতাগুলো বাংলা কবিতার পাঠককে অনেক সুস্থির বাতাসে নিয়ে যাবে বলে বিশ্বাস। অনেক ক্ষেত্রে আগামকে জানিয়ে দেওয়ার ঢঙে বলা খুব চড়া বা কখনো বেশ মন্দ্র উচ্চারণ থেকে যা উঠে আসে তা শিল্প ও স্থাপত্যের দিকে নতুন চূড়ান্ত এক তেজস্ক্রিয় প্রকাশ। আজকের হানিকর পৃথিবীতে বাঁচা-মরা দুই-ই কিরকম গুরুত্ব হারিয়ে ফেলছে। এই গ্রন্থে মৃত্যু এক মহীয়ান আসন দখল করে বসে আছে  ঘুরে ফিরে যে মৃত্যুকে মুগ্ধকথার শরীরে পাওয়া গেছে তা কখনো সার্বজনীন আবার কখনো তা খুবই ব্যক্তিক। আমরা পরম্পরাগত অভিঘাতী সাবলীল এক ভাষায় ভর করে ক্রমশ মরনোত্তর ক্লেশ-ক্লেদ-হীন এক জীবনকে চিনতে পারি। পার্থিব পাওয়ার মধ্যে আমাদের অমূল্য এই লাভ ঘটে

কবিতা অনুভূতির। তাই উপরোক্ত দুটি কবিতার অধিক ব্যাখ্যার প্রয়োজন নেই। 



পর্ব বারো ।। সহজ জীবন : বিনীত যাপন                                                                

সহজ কথা যেমন সহজভাবে বলা যায় না তেমনই কঠিন কথাও সহজে বলা যায় না। সাংসারিক অশান্তির কথা যত সহজে ও সংক্ষেপে বললাম ব্যাপারটা সেরকম সহজ ছিল না। কুটিল জটিল নিকটাত্মীয়ের উস্কানি মা-র মতো সহজ মানুষকেও তাড়িত করতে চেষ্টা করেছিল আমাকে যতদূর তাঁর কাছ থেকে সরিয়ে দেওয়া যায়। সবটাই বুঝতাম, অহর্নিশ কষ্ট পেতাম কিন্তু তার ভেতরেও হৃদয় ও বিবেককে সদা জাগ্রত রাখতাম। কোনও প্ররোচনাই আমাকে আমার বিশ্বাস ও ন্যায়নীতি থেকে সরাতে পারেনি। কেননা এখানে জড়িত ছিল একটি সদ্য বিবাহিত তরুণীর জীবন ও তাঁর সংকটকাল। তৎসত্ত্বেও আমি কি আমার পিতা-মাতার কর্তব্য করিনি? বাইরে থেকে প্রায় সবটাই করেছিলাম, এবং প্রায় শব্দটির উল্লেখ এই জন্যেই করলাম আমার পরিবারের কেউ একজন আমাকে ভেতরে ঢোকা থেকে নানাভাবে আটকে রাখার চেষ্টা করে যাচ্ছিল। যেহেতু তাঁর বৈবাহিক জীবন ব্যর্থ হয়ে গিয়েছিল তার মানসিকতাই ছিল অন্য কোনও মেয়ের বিবাহিত জীবন যাতে সুখের না হয়। এ এক অদ্ভূত জটিল মনস্তত্ত্বের বিষয়।

বিবাহের প্রথম তিন বছর আমাদের দাম্পত্য জীবন একটি ঘরে কাটালেও বিবাহ পরবর্তী জীবনে আমরা আনন্দে বেড়ানো থেকে শুরু করে নানা সুসময় কাটিয়েছিলাম, অন্তত নিজেদের সুখের সময় থেকে বঞ্চিত করিনি। করিনি এ কারণেই যাতে পরবর্তী জীবনে কোনও আফসোস না থাকে। তিন বছর পরে কন্যা সন্তানের জন্ম হলে আমরা নতুন আনন্দময় জীবন শুরু করতে লাগলাম। এই সময়তেই আমার বর্ধমানে একটি বদলির সুযোগ ঘটে। রাধাকান্তপুরের মায়া কাটিয়ে আমি বর্ধমানের নতুনগঞ্জে বদলি হলাম। শ্বশুরমশাইয়ের পুরনো একটি সাইকেল নিয়ে আমি বর্ধমান স্টেশন থেকে নতুনগঞ্জে যাতায়াত করতাম। খোসবাগান পেরোতেই দেখতাম সকালবেলাতেই সারি সারি মেয়েরা খদ্দের ধরার জন্যে লাইনে দাঁড়িয়ে রয়েছে। এই ছবি আমাকে খুবই পীড়িত করত। বর্ধমান থাকার সময় আমাকে স্টেট ব্যাঙ্কের অনেক দূরের শাখায় ব্যাঙ্কের কাজের জন্যে পাঠানো হত। নানা গ্রাম গঞ্জ, নানা মানুষের মুখ, তাঁদের দৈনন্দিন জীবন-যাপনের সঙ্গে আমি পরিচিত হতে লাগলাম। সেইসময়ে যেমন অর্থেরও টান ছিল তেমন বিভিন্ন শাখায় গেলে কিছু বাড়তি উপার্জনও হত। একবার বর্ধমান-মুর্শিদাবাদ সীমানার কাছে আমাকে একটি গ্রামীণ শাখায় যেতে বলা হয় একদিনের কাজে, কিন্তু সেই জায়গাটি এতোই প্রাকৃতিকভাবে সুন্দর ছিল আমি কাজ শেষে আরও দুদিন কাছাকাছি এক আত্মীয়ের বাড়িতে থেকে গিয়েছিলাম। তখন যোগাযোগের জন্য টেলিফোন ব্যবস্থা অতো সক্রিয় ছিল না ফলত অফিস এবং বর্ধমানে শ্বশুরবাড়ি আমাকে নিরুদ্দেশ ভেবে অত্যন্ত উদ্বিগ্ন ছিল। তিনদিন পর বর্ধমানের অফিসে ফিরে এলে আমার অবশ্য আপ্যায়নেরজন্য কোনও ত্রুটি ছিল না। কোথাও হারিয়ে যাওয়া নেই মানা’ — এই সৎ চিন্তা থেকে এরপরে নিবৃত্ত হয়েছিলাম, যদিও তা আগামী দিনের চাকরি বাঁচানোর ইচ্ছায়।

স্কেচ- এ আই সহায়তায় রাজীব কুমার ঘোষ
বর্ধমানে দৈনন্দিন যাতায়াত করলেও বিশেষ নিমন্ত্রণ ব্যতিরেকে আমি শ্বশুরবাড়ি যেতাম না। শ্বশুরমশাইয়ের পোস্টিং ব্যাঙ্কের অন্য বাড়িতে হলেও উনি নতুনগঞ্জের অফিসে সপ্তাহে একদিন আমার সঙ্গে দেখা করতে আসতেন ও কন্যার জন্য মুখবন্ধ একটি পত্র আমার হাত দিয়ে পাঠাতেন। সাধারণত পারস্পরিক কুশল সংবাদের আদান প্রদানে আমি পোস্টম্যানের কাজ করতাম বিনা পারিশ্রমিকে। মাঝে মধ্যে শাশুড়িমা জামাই নিমন্ত্রণে মধ্যাহ্নভোজে ডাকতেন। পঞ্চ ব্যাঞ্জনে খাওয়া দাওয়ার পরে আমি বিশ্রাম নিতে গিয়ে বিকেল পর্যন্ত ঘুমিয়ে পড়তাম। অফিসের গুরুত্ব কেউ বুঝতেন না, তার থেকে বুঝিবা জামাইয়ের বিশ্রাম অধিক জরুরি ছিল। ফলত ঘুম যখন ভাঙত তখন অফিসপর্ব সেদিনের মতো শেষ হয়ে গেছে। অতি আরামের শেষে আমি ত্বরিতে অফিসে পৌঁছে সাইকেলটি নিয়ে স্টেশনের পথে ধাঁ হয়ে যেতাম। সেসব দিন ছিল আনন্দের বিস্তার, মজার বিপন্নতা। অফিসের অ্যাসোসিয়েশনের পঁচাত্তর বছর পূর্তি উপলক্ষ্যে সারা বাংলা জুড়ে একটি গল্প লেখার প্রতিযোগিতার আহ্বান হয়। মনে আছে অ্যাসোসিয়েশনের এক নেতা যিনি আমাকে খুবই ভালোবাসতেন আমাকে একটি গল্প লিখে প্রতিযোগিতায় পাঠাতে বললেন। আমি তাঁকে জানাই আমি কবিতাই লিখি। তবু তাঁর তাগিদে আকস্মিক একটি পুরনো ঘটনা মনে পড়ায় গল্পটি তৈরি হল ও তা শেষ দিনে আমি কলকাতার হেড অফিসে পৌঁছে দিয়ে আসি। এই প্রতিযোগিতায় মুখ্য বিচারক ছিলেন একক পত্রিকার সম্পাদিক শ্রীশুদ্ধসত্ত্ব বসুকিছুদিন বাদে প্রতিযোগিতার ফল বের হলো এবং বিস্ময়ের কথা আমার গল্পটিই প্রথম স্থান অধিকার করলো। ফলাফল আমার একটি মেডেল ও পাঁচ হাজার টাকার অর্থমূল্য এবং নেতাজি ইন্ডোরে ভরা দর্শকের মাঝে সম্বর্ধনা। এই পরিস্থিতিতে পুরস্কারটি গ্রহণ করতে গিয়ে আমি স্টেডিয়ামে স্টেজে ওঠার সিঁড়িটাই হারিয়ে ফেলেছিলাম। সেই সময় পাঁচহাজার টাকার মূল্যটি অনেক ছিল, কিন্তু টাকাটা নিয়ে আমি কি করব ভেবে পাচ্ছিলাম না। তারপরে সদ্যজাত কন্যার অন্নপ্রাশনে একটি স্বর্ণালঙ্কার কিনে ফেলেছিলাম।

এরপরে অবশ্য দু একটি গল্পে হাত পাকিয়ে ফেললাম, এখনও যা অপ্রকাশিত রয়েছে। প্রচুর গল্প পড়ি, জীবনের নানা ঘটনা পাকেচক্রে গল্পের মাধ্যমে ফিরে আসে, পৃথিবীর অনেক শ্রেষ্ঠ গল্প বাংলা ভাষাতেই লেখা হয়েছে কিন্তু আন্তর্জাতিক স্তরে বিশেষ পৌঁছায়নি কেননা প্রকৃত অর্থে বাংলা ভাষার গল্প অনূদিত হওয়ার লোক নেই। যাই হোক কবিতাতেই আমার মুক্তি, এই আপ্ত বাক্য মনে রেখেই কবিতাতেই নিজের জীবন উৎসর্গ করলাম। গল্প লেখার অ্যাডভেঞ্চার থেকে নিজেকে বিরত করলাম।

বর্ধমানে কাজে থাকার পরিপ্রেক্ষিতে আমি প্রায় পঁচিশটি ছাব্বিশটি বিভিন্ন শাখায় কাজ করতে গিয়েছিলাম। শুধুই কাজের পরিপ্রেক্ষিত নয়, দেখতাম সেখানকার মানুষজন তাদের কথার বাচনভঙ্গিমা, ভাষার পরিবর্তন এইসব। ছোটো ছোটো পরিচ্ছন্ন কুঁড়ে ঘর, বাঁশের কঞ্চির বেড়া সুখী অথচ অভাবীর গৃহকোণ। কাঁইগ্রাম বলে একটি অজগাঁয়ে একবার একটি কাজের জন্য সেখানকার ব্যাঙ্কের শাখায় গিয়েছিলাম, সেখানকার ব্রাঞ্চ ম্যানেজার ছিলেন এমন একজন যাঁর বাড়ি ছিল কলকাতার বালিগঞ্জে। বর্ষার দিনে বড়ো রাস্তা থেকে গ্রামে ঢুকতে প্রবল বৃষ্টির ভেতরে কাদামাখা রাস্তায় আমার জুতো আটকে গিয়েছিল। একটি গাছের নীচে আশ্রয় নিলেও জলে ভিজে একশা হয়ে, যখন ব্রাঞ্চে পৌঁছাই আমি তখন বিধ্বস্ত। ম্যানেজার আমাকে অত্যন্ত যত্ন করলেন, মধ্যাহ্ন ভোজে আপ্যায়িত করলেন এবং কাজের চেয়েও তিনি যে কতো দুরাবস্থার মধ্যে জীবন যাপন করছেন তা বোঝালেন। ভাবলাম কোথায় বালিগঞ্জ আর কোথায় কাঁইগ্রাম? সবাই পরিবর্তিত জীবন যাপনের সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারে না।

এইসব অভিজ্ঞতা হয়ত কাঁইগ্রামের ব্রাঞ্চ ম্যানেজারকে পরবর্তী জীবনে কিছু স্মৃতি, কিছু শিক্ষা দিয়ে আলোকিত করতে পারে যদি না তিনি আলোকপ্রাপ্ত হয়েছেন এই মনোভাবে থাকেন। অনেকেই এইসব গূঢ় তত্ত্ব ভাবেন না। জীবন ও যাপনকে অতো তলিয়ে দেখার সময় নেই, তারা আনন্দ ও সুখের সময়কেই মহান প্রাপ্তি বলে ধারণা করেন। কিন্তু আমাদের দেশ গ্রাম দিয়েই ঘেরা। গ্রামের মানুষজন এখনও অভাবগ্রস্ত। সামান্য কিছুতেই তাঁদের সন্তুষ্টি। আমার চাকরি জীবনে অনেক জেলারই প্রচুর গ্রাম দেখার সুযোগ ঘটেছে, আমি দৈনন্দিন তাঁদের জীবনে মিশে যেতে পেরেছি কিছুটা হলেও তাঁদের সুখ ও দুঃখে নিজেকে মেলাতে চেয়েছি। তাঁরা আমাকে নিজের মানুষ মনে করেই গ্রহণ করেছিলেন ও যথাযথ সম্মানও দিয়েছিলেন। পশ্চিম বাংলার বিভিন্ন জেলার গ্রামের রূপও ভিন্ন ভিন্ন। আবার মানুষের প্রকৃতিও নানা রকমের। তাই আমার মনে হয় সব রকমের রূপের সঙ্গেই পরিচিতি হওয়া বাঞ্ছনীয় কেননা স্মৃতি ও সমৃদ্ধি, অভিজ্ঞতা ও কাতরতা সবই পরবর্তী জীবনে পাথেয় হয়। শুধুই যে আমি এইসব অভিজ্ঞতা লেখার কাজেই ব্যবহার করেছি তা নয়; নিজের দেশকে বিশদভাবে জানাটা জরুরি। শহুরে বাতাসের ধূসরতা,আবিলতা থাকে, কিন্তু গ্রামে ধূসরতা থাকলেও মনের আবিলতা তেমন চোখে পড়েনি কেননা তাঁদের চাহিদা সামান্যই, একটা দিন ভালোভাবে কেটে গেলেই হল, অধিক কি, তা জানতে তাঁরা আগ্রহী নন।


পর্ব তেরো ।। কবিতার আঁকাবাঁকা পথ

বর্ধমান শহরে আমার প্রায় তিন বছরের যাতায়াতের পর অনেক একঘেয়েমি লাগতে শুরু করে দিয়েছিল। আমিও পরিবর্তন চাইছিলাম, একইরকম মানুষ থেকে পথ বাড়িঘর রোজ দেখা থেকে এক খারাপ লাগা শুরু হয়ে গিয়েছিল। পুরষ্কার পাওয়ার ঘটনাটি আমাকে কলকাতায় বদলি হওয়ার একটা সুযোগ করে দিল। তখন স্টেট ব্যাঙ্কের হেড অফিস ছিল জীবনদীপ বিল্ডিং’-এ। সেখানকার বড়ো এক নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি আমাকে অ্যাসোসিয়েশানের কাগজে লেখার জন্য নিয়ে যেতে চাইলেন। এছাড়াও স্টেট ব্যাঙ্কের ঐতিহ্যশালী হিস্ট্রি সেল’- এ আমার পোস্টিং হবে এই প্রতিশ্রুতিও দিলেন। সেসময় হিস্ট্রি সেল’-এ অধিকর্তা ছিলেন বিশিষ্ট ঐতিহাসিক নীহাররঞ্জন রায়ের পুত্র অভীক রায়। কিন্তু কলকাতা পৌঁছোলে প্রয়োজন ভিত্তিক কারণে আমার অন্য একটি শাখায় পোস্টিং হল কিন্তু হেড অফিসে থাকার সুবাদে আমার লেখার পরিধি এবং স্বাধীনতা অনেক বিস্তৃত হয়েছিল। অফিসে কাজের তেমন চাপ না থাকায় আমি মাঝে মধ্যেই কলেজ স্ট্রিটে গিয়ে বই পত্তর ঘাঁটাঘাটি করার সুযোগ পেতাম। সেসময় অনুবর্তনপত্রিকার সম্পাদক অনির্বাণ ধরিত্রীপুত্রের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা হয়। অনুবর্তনপত্রিকায় বিভিন্ন সংখ্যায় আমার গুচ্ছ গুচ্ছ কবিতা ছাপা হতে লাগল। আমি অক্ষরবৃত্ত এবং টানা পয়ারে প্রচুর কবিতা লিখেছিলাম। এবং এইজন্য কিছুটা প্রচারে আলোকপ্রাপ্ত হয়েছিলাম। এই সুযোগটা এবং প্রাপ্তি অনির্বাণদাই করে দিয়েছিলেন। তাঁর পত্রিকার জন্য আমাকে আর একটি কাজ করে দিতে হত, যা আমি অবশ্যকর্ম বলে মনে করেছিলাম। অনুবর্তনেরপ্রতি সংখ্যার জন্যেই পূর্ব পুঁটিয়ারিতে কবি দেবীপ্রসাদ বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখা আনতে তাঁর বাড়িতে আমাকে যেতে হত। দেবীদার সঙ্গ যে কদিন আমি পেয়েছিলাম তা আমার কাছে বিশেষ পাওনা ছিল। অনুবর্তনপত্রিকার সঙ্গে থেকে ক্রমশ আমার কবি গৌতম বসুর সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বেড়েছিল। মানুষ এবং কবি হিসেবে তিনি একজন প্রাজ্ঞ সৎ ও সহমর্মী মানুষ ছিলেন। আমার দ্বিতীয় বইটি প্রকাশের সময় তিনি আমাকে সুপরামর্শ দিয়ে কৃতজ্ঞতাপাশে আবদ্ধ করেছিলেন। তাঁর অকাল প্রয়াণ আমার ব্যক্তিগত ক্ষতি ছিল। তাঁর বিষয়ে পরবর্তীতে আরও বলব। অন্যদিকে ব্যক্তি অনির্বাণের কবিতার আমি মুগ্ধ পাঠক ছিলাম, তাঁর পড়াশোনার ব্যাপ্তি বিস্ময়ের এবং তাঁর স্মরণশক্তি, বাগ্মিতা আকর্ষণীয়। একবার মনে আছে অফিসের সামনের মাঠে তাঁর সঙ্গে একান্ত ভাবে আমার কিছু কবিতা পাঠের সুযোগ ঘটেছিল। তিনিও আমার কবিতা নিয়ে বিশেষ উচ্চকণ্ঠ ছিলেন।

হেড অফিসে আমার বেশ কিছু সহকর্মীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা হয়ে গিয়েছিল। সামনের মাঠে ক্রিকেট খেলা, স্পোর্টস ইভেন্ট, নাটকের অনুষ্ঠান, গানের অনুষ্ঠান এইসব ছিল খোলামেলা আবহাওয়ার নিদর্শন। বন্ধুসঙ্গ এবং উচ্চপদের সহকর্মীরাও আমাকে বেশ ভালো রকমের পছন্দ করতেন। তাঁদের সঙ্গে কাজের সম্পর্কের বাইরেও একটি বৃহৎ সম্পর্ক তৈরি হয়ে গিয়েছিল। তখন এখনকার সময়ের মতো এতো স্বার্থ সর্বস্বতা ছিল না। আমাদের একটা খুব ভালো উচ্চমানের লাইব্রেরি ছিল যেখান থেকে আমি নিয়মিত বই সংগ্রহ করতাম ও মূলত উপন্যাস ও গল্পপাঠের সুযোগ পেয়ে গিয়েছিলাম। আমি সাংস্কৃতিক কমিটির সঙ্গে যুক্ত হয়ে গিয়েছিলাম যার ফলস্বরূপ আমাকে একবার প্রয়াত সাহিত্যিক মাননীয়া মহাশ্বেতা দেবীকে অফিস অ্যাসোসিয়েশানের একটি অনুষ্ঠানে তাঁকে আনতে গিয়েছিলাম। তাঁর বাড়িতে এবং গাড়িতে আসবার সময় অনেক আলাপচারিতা হয়েছিল যখন তিনি শুনলেন আমার মামার বাড়ি বহরমপুরে, তখন তিনি উৎসাহিত হয়ে তাঁর বাবার বাড়ির বিষয়ে গল্প করতে লাগলেন। তাঁর বাবা কবি মনীশ ঘটক আমার দাদুর বিশেষ বন্ধু স্থানীয় ছিলেন, আমিও তাঁকে বহরমপুর লাল দিঘীর পাড়ে ঘুরতে দেখতাম। মহাশ্বেতা দেবীর সঙ্গে আমার একটি ব্যক্তিগত ছবি এখনও মোবাইলে ঘোরাফেরা করে। 

কলকাতা হেড অফিসে একটি মেডিক্যাল ডিসপেনসারি ছিল। ডাক্তারের সহৃদয়তায় আমি বাবার জন্য কিছু স্পেসিমেন ওষুধ সংগ্রহ করতাম। ডিসপেনসারির পাশের ঘরটিই ছিল মেয়েদের কমনরুম সেখানে দুপুরে খাওয়া দাওয়ার পরে তাদের জমাটি আড্ডা বসত। আমি যখন ওষুধ আনতে যেতাম তাদের কথাবার্তা ও হাস্যরস আমার কানে ছিটকে ছিটকে আসত। একদিন মনে আছে সাইজনিয়ে কি একটা কথায় তাদের অট্টহাস্যে আমি চমকিত হয়েছিলাম! জীবনদীপবিল্ডিং-এর নীচে মধ্যাহ্ন বিরতির আড্ডায়  একটি আধা পাগলা সহকর্মীর সঙ্গে অন্য এক সহকর্মীর ক্ষ্যাপামিকে কেন্দ্র করে লাথালাথি চলছিল। এই স্থান দিয়ে তখন একজন উচ্চপদস্থ আধিকারিক যাচ্ছিলেন, তিনি ওপরে গিয়ে আমাদের বড়ো নেতাকে বলেছিলেন আপনার ছেলেরা নীচে লাথালাথি করছে। আর একদিন বেশ কিছু উচ্চপদস্থ আধিকারিক আমাকে বললেন চলো একটু বাইরে ঘুরে আসি। ওইদিন আমাদের জি এম বহরমপুরে বিশেষ কাজে চলে গিয়েছিলেন। যেহেতু কলকাতা থেকে বহরমপুর অনেকটাই দূরে এবং রাতের আগে তাঁর ফেরার সম্ভাবনা ছিল না তাই আমরা সুযোগের সদব্যবহার করতে লিন্ডসে স্ট্রিটের একটি পাবে গিয়ে হাজির হয়েছিলাম। সেখানে নানা পদে খাওয়া-দাওয়া চলল সঙ্গে নানা ব্র্যান্ডের পানীয়। সন্ধের দিকে যখন আমি বাড়িতে ফিরব আমাকে একজন বাসে তুলে দিয়েছিল। বাসে ওঠার আগে আমি একটি পাঁচ টাকার কয়েন বুক পকেটে রেখে দিয়েছিলাম, যাতে বাস কনডাক্টরের সঙ্গে আমার বেশি কথা চালাচালি না হয়। হাওড়া স্টেশনে পৌঁছে আমি ট্রেনের সামনে গিয়ে দেখে নিয়েছিলাম ঠিক ট্রেনে উঠছি কিনা। আবার চুঁচুড়া স্টেশনে নেমে আর এক বিপত্তি, এতো জল পেটে পড়ায় আমার প্রচুর প্রস্রাবের বেগ এসে গিয়েছিল। মনে আছে সাইকেল গ্যারাজে সাইকেল নেওয়ার আগেই আমি মুক্তির শ্বাস নিয়েছিলাম। গুরুত্বপূর্ণ এটাই আমার অস্বাভাবিক আচরণ দেখে সাইকেল গ্যারাজের ছেলেটি প্রভূত বিস্মিত হয়েছিল। সেইদিন আমার সাইকেলের গতিবেগ ছিল ঘণ্টায় প্রায় একশো কিলোমিটার! এরকম আরও মদ্য ও পদ্যের ঘটনা রয়েছে। দীঘা যাওয়ার বাসে আমাদের সহকর্মীর দল পরিবারসহ যাত্রা করেছিলাম। বাসে মানুষ ওঠার আগেই মদ্যের বড়ো ক্রেট উঠে গেল। বাস চলতে শুরু করতেই পিছনের আসনে সহকর্মীরা মধু পান করতে একে একে সামনের সিট থেকে উঠে এলো। শুরু হল পানীয় সহযোগে পথ চলা। আমিও মনে হয় এই উৎসবে একটুখানি অংশ নিয়েছিলাম। 

স্কেচ- এ আই সহায়তায় রাজীব কুমার ঘোষ

হেড অফিস থেকে বিকাশনামের স্টেট ব্যাঙ্কের নিজস্ব একটি ম্যাগাজিন বের হত। সেখানে একবার আমার ছবিসহ সাক্ষাৎকার ছাপা হয়েছিল ফলে আমি যে একটি দুষ্কর্মে লিপ্ত রয়েছি অফিসের পরিচিতরা জেনে গিয়েছিলেন। দ্বিতীয় বইটি বের হওয়ার পরে তখনকার সি জি এম, এক বাঙালি ভদ্রলোক ছিলেন, শুনেছিলাম তিনি লেখালেখি পছন্দ করেন, তাঁকে আমার একটি বই আমি পাঠাই। কয়েকদিন পরে তাঁর সেক্রেটারি আমাকে ডেকে পাঠালেন। সি জি এম স্যারের সঙ্গে দেখা হতে তিনি আমাকে যথাযথ সম্মান দিয়েছিলেন এবং নিয়মিত কবিতা পড়েন এটা জানিয়েছিলেন। তাঁর সাক্ষাতের আগে আমার মনে যে একটি দ্বিধা ছিল, কবিতা লিখি এ জন্য ব্যাঙ্কের কাজে ফাঁকি দিই কি না এই প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হবে। কিন্তু এইসব ঘটেনি। হেড অফিস নতুন বাড়িতে সমৃদ্ধি ভবনেউঠে আসার সময়ে উদ্বোধনের দিন শ্রীসৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় প্রধান অতিথি হিসেবে এসেছিলেন, তাঁর সঙ্গে সামান্য কথার সুযোগে আমার কবিতার বইটি তাঁর হাতে তুলে দিয়েছিলাম।

কলকাতা থাকাকালীন আমি আনন্দবাজারের অফিসে দেশপত্রিকার জন্য কবিতা জমা দিয়ে আসতাম। দেশেকয়েকবার কবিতা ছাপার পরে কবি সুনীল বসু তাঁর হাতেই কবিতা জমা দিয়ে আসতে বলতেন। সব কবিতাই যে ছাপা হত তা অবশ্য নয়; কিন্তু সুনীল দার সঙ্গে কথাবার্তায় আমি উৎসাহিত হতাম, তিনিও কেন জানিনা আমাকে বিশেষ স্নেহ করতেন। এই হাউসে যেতে গিয়ে আমার সঙ্গে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, শক্তি দা এবং নীরেন দা-র সঙ্গে সামান্য কথাবার্তা হত। নীরেন দার লম্বা চেহারা, সাদা ধুতি পাঞ্জাবী আমাকে ব্যক্তি হিসেবে অত্যন্ত আকর্ষণ করত। আনন্দমেলারঘরে ক্রমে সাধনা মুখোপাধ্যায়, শ্যামলকান্তি দাশ ও রতনতনু ঘাটীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বেড়েছিল। একবার মাত্র সাগরময় বাবুর ঘরেতে গিয়েছিলাম তাঁকে একটি বই দিতে। ছোটো খাটো স্থূলকায় এবং আপাত গম্ভীর ব্যক্তিত্ব দেখে তাঁর ঘরে যেতে পরে আর বিশেষ সাহসী হইনি।




(পরের পর্ব।। আসছে ৮.৩.২৬)

আপনার মতামত নিচে 
'আপনার মন্তব্য লিখুন' শীর্ষক বক্সে লিখে 
আমাদের জানান। 
লিটল ম্যাগাজিন বেঁচে থাকে 
পাঠকদের মতামতে। 🙏



শ্যামলজিৎ সাহার এখনো পর্যন্ত প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থগুলি

মুগ্ধকথা (১৯৯২)

বীজাক্ষর (২০০৮)

সময়ের সান্ধ্যপাঠ (২০১৬)

অন্তর্নিহিত (২০২৫)



সাইন্যাপস্‌ বিজ্ঞাপণ---------------------------




SYNAPSE STORE লিংক