সাইন্যাপস্‌ পত্রিকা🙏আমাদের পথ চলা শুরু ১৯৯৮🔰বর্তমানে ওয়েবে প্রকাশিত লিটল ম্যাগাজিন🌈পড়ার জন্য উন্মুক্ত, সবার জন্য, সবসময়🔆নিছক সাহিত্যচর্চা নয় এক জীবনচর্চা, জেগে থাকা

ছোটোদের সাইন্যাপস্‌।। জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩।। জুন ২০২৬


মৌসুমী ঘোষ সম্পাদিত ছোটোদের সাইন্যাপস্‌ 

জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ ।। জুন ২০২৬

স ম্পা দ কী য়

সাইন্যাপস্‌-এর ছোটোবন্ধুরা,

আমি যখন তোমাদের মতো ছোটো ছিলাম, আমি যখন তোমাদের মতো স্কুলে পড়তাম, আমাদের যখন তোমাদের মতো গ্রীষ্মের ছুটি পড়ত; তখন একবার স্কুল থেকে আমাদের কয়েকজন বন্ধুকে নিয়ে গেল স্কুলের কাছেই অবস্থিত হুগলি জেলে। যাকে এখন বলা হয় সংশোধনাগার। কি 'জেল' শুনে ভয় পেয়ে গেলে তো! আমিও তোমাদের মতো ভয় পেয়ে গেছিলাম। আমার মা'ও প্রথম শুনে দারুণ ভয় পেয়ে গেছিল। আরে না না তোমরা যা ভাবছ তা নয়। আমাদের দেশ যখন স্বাধীন হয়নি তখন এই হুগলি জেলে বন্দী ছিলেন কাজী নজরুল ইসলাম। তাই প্রতি বছর জ্যৈষ্ঠ মাসে নজরুলের জন্মদিনের দিন জেলে অনুষ্ঠান হতো। সেরকম এক অনুষ্ঠানের সাক্ষী হয়েছিলাম ছোটোবেলার স্কুলের বন্ধুদের সঙ্গে। ছোটোবেলার এমন মধুর স্মৃতি আমি আমার স্কুলের পেন্সিল বক্সের মধ্যে বন্ধ করে রেখেছিলাম। তোমরাও তোমাদের এমন স্মৃতিগুলো ছোটোদের সাইন্যাপস্‌- এর দপ্তরে লিখে পাঠাও। নজরুলকে নিয়ে লিখতে বসলে আমরা লিচু  চুরির কথা, খুকি ও কাঠবেড়ালীর কথা বলবই বলব। আর কী কী বলব? তা জানতে পীযূষ আঙ্কেলের কাজী নজরুলকে নিয়ে লেখাটা পড়ে নিও। স্বপন জ্যেঠু, সন্দীপন আঙ্কেল আর মৌসুমী পিসির লেখা নজরুলকে নিয়ে ছড়াগুলো পড়ে তোমাদের যে ভাল লাগবেই তা আমি আগেভাগেই বলে দিতে পারি। আর তোমাদের বন্ধু অম্বিকাও নজরুলকে নিয়ে কবিতা লিখে পাঠিয়েছে। এবারের সংখ্যায় রঙ্গনের গল্প লিখে পাঠিয়েছেন গৌরাঙ্গ জ্যেঠু। রঙ্গনকে কেমন লাগল জানিও কিন্তু। আর উত্তরের জঙ্গলের গল্প লিখে পাঠিয়েছে ভাস্বতী পিসি। সেই গল্প পড়তে পড়তে আমি তো ঘুমিয়ে পড়েছি। আমার ঘুম ভাঙল সাদা মোজা পরা মোষটাকে স্বপ্নে দেখে। ওটার ছবি আমাদের দপ্তরে পাঠিয়েছে আর এক জ্যেঠু। এবারে আমাদের দপ্তরে মলয় জ্যেঠু, মহুয়া পিসি, সুমেধা আন্টি, পারমিতা পিসিরা চিঠি পাঠিয়েছে। পরেরবার তোমরা পাঠিও এত্ত এত্ত চিঠি। ঐন্দ্রী, দেবাংশু আর আয়ুষ্মানের মতো আঁকা পাঠিও যাতে আষাঢ়ের সাইন্যাপস্‌ রঙীন হয়ে ওঠে প্রতিবারের মতো।   — মৌসুমী আন্টি।

 

।।। ।  গদ্য ।।। ।

ছোটোদের নজরুল
পীযূষ প্রতিহার
শিশুসাহিত্যে যে কতরকম বিষয় বৈচিত্র্য ও আবেগের রঙ রয়েছে তা বিস্ময়কর। শিশু সাহিত্যকে বোঝার বা উপলব্ধি করার বয়স শুধু শৈশব নয়। একজন পাঠক পরিণত বয়সে শিশুসাহিত্য পুনঃপাঠ করলে তার নানান নতুন অর্থ বা স্তর আবিষ্কার করেন। তোমরাও বড় হয়ে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে ছোটোবেলায় পড়া নানা কবিতা, গল্প, নাটক-কে অন্যভাবে আবিষ্কার করবে। 

 

বাংলা সাহিত্যে শিশুতোষ রচনার ভাণ্ডার নেহাত হেলাফেলার নয়। আলোচনায় সুকুমার রায়, উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী, লীলা মজুমদার, সত্যজিৎ রায়, শিবরাম চক্রবর্তী, প্রেমেন্দ্র মিত্র, নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়ের মতো শিশু সাহিত্যের দিকপালের নাম মনে এলেও কাজী নজরুল ইসলামের কথা সহজে মুখে আসে না। অথচ কাজী নজরুলের এমন কয়েকটি কবিতা ও গান রয়েছে যেগুলো ছাড়া বাঙালির শৈশব ভাবাই যায় না।

 

শৈশবে নজরুলের 'প্রভাতী' কবিতার লাইনগুলো, "ভোর হলো দোর খোলো/খুকুমণি ওঠো রে", পড়েনি বা শোনেনি এমন বাঙালি খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। 

 

এমনই আরো একটি কবিতা 'শিশুর সাধ', এর লাইনগুলো যদি দেখি তাহলে দেখতে পাই এখানে কৌতূহলী শিশুমনের নানা ধরনের জিজ্ঞাসার মাধ্যমে কবি যেন নিজেই শিশু হয়ে নতুন সকালে জেগে উঠতে চাইছেন। 

 

'খুকি ও কাঠবেড়ালি' কবিতায় ছোট্ট খুকি কাঠবেড়ালির সঙ্গে খুনসুটির সঙ্গে নানা কথাবার্তা ছোটদের খুব প্রিয় একটি কবিতা। 

 

'লিচুচোর' কবিতায় লিচু চুরি করতে গিয়ে কি বিপদ যে পদে পদে ছিল তার মজাদার অথচ হৃদস্পন্দন বাড়িয়ে দেওয়ার মতো ছন্দোবদ্ধ বর্ননা শিশু মনকে নাড়া দেয় ভীষণ ভাবে। এটা ছোটদের খুব প্রিয় একটি আবৃত্তির কবিতা, কোথাও কোথাও তবলার বোলের সঙ্গে আবৃত্তি করতে দেখা যায়। 

 

শিশু স্বভাবতই কল্পনাবিলাসী, তাই সে দেশে দেশান্তরে যেতে পারে মনে মনেই। 'সংকল্প' কবিতায় কাজী নজরুল ঠিক সেই শিশুমনকেই ফুটিয়ে তোলেন, "থাকবো নাকো বদ্ধ ঘরে দেখব এবার জগৎটাকে" বলার মাধ্যমে। 

 

'ফণিমনসা ও বনপরী' কবিতায় গাছপালা যে রূপকথার গল্পের মতো রূপ বদলায় সেরকম একটি শিশুতোষ গল্পের খোঁজ পাই। 

 

'ঝিঙেফুল' কবিতায় ঝিঙে ফুলের সঙ্গে নানা জিনিসের তুলনায় শিশুমনের কল্পনাকে বিস্তৃত করেছেন। 

 

মায়ের ভালবাসা ও আদর যে একেবারেই আলাদা, মা যে নিরাপদ আশ্রয় তা 'মা' কবিতায় কাজী নজরুল শিশুর ভাবনায় তুলে ধরেছেন। 

 

'পিলে পটকা' কবিতায় অনাবিল হাস্যরস সৃষ্টি করেছেন। 

 

'হোঁদল কুৎকুতের বিজ্ঞাপন' কবিতাটিতে এক অদ্ভুত লোকের কাল্পনিক চেহারার মজাদার ছন্দোবদ্ধ উপস্থাপনে শিশুদের অকৃত্রিম হাসি উৎপাদন করার সঙ্গে সঙ্গে তার বীরত্ব যে দেশের স্বাধীনতা আনতে পারে তা মনে করাতে ভোলেননি। এরকম আরো একটি কবিতা 'খাঁদু দাদু'। 

 

এই কবিতা গুলোয় ছোট ছোট পরিচিত, ধ্বন্যাত্মক, সুরেলা ও মিল যুক্ত শব্দের ব্যবহার করেছেন যা সহজেই মুখস্থ হয় ও মনের মধ্যে গানের মতো বাজতে থাকে। এই কবিতা গুলো শিশুদের বাচনভঙ্গি উন্নত করার সঙ্গে সঙ্গে স্পষ্ট উচ্চারণ, দ্রুত বলার ক্ষমতা, ছন্দ ও সুরেলা উচ্চারণ করার মাধ্যমে বাচিক শিল্পের ভিত্তি তৈরি করে।

 

নজরুলের কবিতার সঙ্গে সঙ্গে 'মধুমালা' নাটক ছোটদের খুব প্রিয়। এটি একটি রূপকথার নাট্যরূপ, যা শিশুদের মাঝে খুবই জনপ্রিয়। শিশুমনের গভীরে ডুব দিয়ে নজরুল লিখেছেন 'পুতুলের বিয়ে' নাটকটি, যা শিশুদের সঙ্গে সঙ্গে বড়দেরও খুব প্রিয়।

 

নজরুল শুধু কবিতা, নাটক ও উপন্যাসে সীমাবদ্ধ থাকেননি। তিনি বড় শিল্পী। অসংখ্য গান লিখেছেন, সুরারোপ করেছেন, গেয়েছেন, চিত্রনাট্য লিখেছেন, চলচ্চিত্র পরিচালনা করেছেন, এমনকি অভিনয়ও করেছেন। নানা ধরনের গানের মধ্যে শিশুদের জন্য গান বললেই যেগুলো মনে পড়ে সেগুলো হল - 'মোমের পুতুল মমীর দেশের মেয়ে...', 'প্রজাপতি প্রজাপতি...', 'হলুদ গাঁদার ফুল...', 'রুমঝুম রুমঝুম...', 'শুকনো পাতার নূপুর পায়ে...', 'শিউলি তলায় ভোরবেলায়...', 'ম্লান আলোকে ফুটলি কেন...', 'এই রাঙা মাটির পথে...', 'ছন্দের বন্যা হরিণী অরণ্যা...', 'দোদুল দোদুল দোলনচাঁপা...', 'দোলে ফুল দোলে খুকীর দোলনা...',  'চল্ চল্ চল্...', 'কারার ঐ লৌহ কপাট...' ইত্যাদি। ছোটরা যারা গান শেখে তাদের সকলেরই খুব পরিচিত গান এগুলো। এর মধ্যে বেশ কয়েকটি গানে ছোটদের নৃত্য পরিবেশন করতেও দেখা যায়।

 

লেখার আলাদা ধরনে, শিশুর উপযোগী জগৎ সৃষ্টির ক্ষমতায় তাঁর ছোটদের কবিতাগুলো কত না উজ্জ্বল! সবার জানা আছে যে, তাঁর সমস্ত সৃষ্টির মধ্যেই আছে এক ধরনের প্রাণোচ্ছলতা ও দেশপ্রেমের দীপ্তি। ছোটদের জন্য লেখা তাঁর সৃষ্টিকর্মগুলো এর ব্যতিক্রম নয়। প্রাণের উচ্ছ্বাস ছোটদের মনোজগতের এক প্রধান ও মৌলিক অনুষঙ্গ বলেই নজরুলের সৃষ্টি ছোটদের কাছে প্রিয় হতে পেরেছে।

 

এই ক্ষণজন্মা শিল্পী ছোটদের জন্য তাঁর ভালবাসা ও মমত্ব ফুটিয়ে তুলেছেন নানা সৃষ্টিতে। দুঃখের বিষয় এই যে, ১০জুলাই ১৯৪২ আকাশবাণী বেতারকেন্দ্রে ছোটদের জন্য একটি অনুষ্ঠান করার সময়ই বাকশক্তি হারিয়ে ফেলেন তিনি। তার পর থেকে জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত আর কিছুই সৃষ্টি করতে পারেননি। মারাত্মক পিকস ডিজিস তাঁর বাক ও চিন্তাশক্তি কেড়ে না নিলে হয়তো আরও অসংখ্য শিশুতোষ রচনা পেতাম আমরা।


।।। ।  কবিতা ও ছড়া ।।। ।  

প্রণাম নজরুল
সন্দীপন রায়

যে কলমে আঁকা বিদ্রোহ জেনো
সে কলমই আঁকে ফুল।
চরণ ছুঁয়েছে শ্যামামায়ের
আজ আমাদের নজরুল।
 
যে লেখনীতে আছে বিপ্লব গাঁথা,
জীবন জুয়ার বাজি।
মেরুদণ্ডের অন্য নামই আমাদের
প্রিয় কাজী।
 
মোল্লা, পুরুত গোঁড়ামিতে
দেখি প্রতিবাদী এক নাম।
অন্ধকারেও মুখরিত আলো
কাজী নজরুল ইসলাম।

 
 
বিদ্রোহী নজরুল
স্বপনকুমার বিজলী

 
সৃষ্টি সুখের উল্লাসে তাঁর
হৃদয় দুলে ওঠে,
বিভেদ ভুলে ভালোবাসার
কুসুম-কলি ফোটে।
 
ধর্ম শুধু রক্ত ঝরায়
মানবতা ছাড়া,
তাই গেয়েছেন সাম্যের গান
সব মনে দেয় নাড়া।
 
বিষের বাঁশি অগ্নি বীণা
নিজের হাতে লিখে,
প্রতিবাদের বীজ ছড়ালেন
দেশের চতুর্দিকে।
 
অত্যাচারীর শোষণ পীড়ন
সব হটে যায় দূরে,
শান্তি ও সুখ শহর গাঁয়ে
আবার আসে ঘুরে।

বিদ্রোহী কবির বন্দনা

অম্বিকা কুন্ডু
(দশম শ্রেণি, বিদ্যাসাগর শিশুনিকেতন, মেদিনীপুর)

 
বিদ্রোহের বাণী দিলে ছড়িয়ে তুমি সারা দেশে,
অন্যায়ের বিরুদ্ধে ছিলে দাঁড়িয়ে নির্ভয়ে, এক বেশে।
 
সাম্যের গেয়ে গান, জাগিয়েছ তুমি অগণিত প্রাণ,
তোমার লেখা শোনায় এখনো — স্বাধীনতার গান।
 
ছিল তোমার মমতার কলম দুঃখী মানুষের পাশে
তাইতো তুমি গেছো রয়ে সকলের হৃদয়ে গৌরবে
 
কলম ছিল তোমার শক্তি, সত্য ছিল তোমার বল,
নজরুল তুমি চিরকালই বাংলার সাহস-সম্বল
 
যতদিন এই বাংলা ভাষা বয়ে যাবে ধারা,
ততদিন শ্রদ্ধায় স্মরণ করবো তোমায় আমরা।


মিলিয়ে গেলেন খুকুর দুখু
মৌসুমী চট্টোপাধ্যায় দাস
 






 
 
 
 
 
মমির দেশের মোমের পুতুল
দেখাচ্ছে নাচ ঝুমুর ঝুম,
চোখ মেলে তাই দেখল ভোরে
ভাঙতে খুকুমণির ঘুম।
"কে বলেছে নাচ দেখাতে?"
পুতুল মেয়ে নাচের তাল
ভুল না করে জবাব দিল,
"হাঁদুদাদু বলল কাল,
'খুকুমণির মন ভালো নেই,
কাঠবিড়ালি নিখোঁজ তার,
কেঁদে কেঁদে কাহিল মেয়ে,
খুশি করা যে দরকার।'
তাইতো এলাম তাড়াতাড়ি
সাহারা মরু পেরিয়ে, বোন,
জৈষ্ঠ মাসের তাপপ্রবাহে
আমায় করে আপ্যায়ন
স্রষ্টা দুখু বাজিয়ে বাঁশি
রুম ঝুমা ঝুম নূপুরখান,
এই দেখনা, আমায় দিয়ে
মিলিয়ে গেলেন জুড়িয়ে প্রাণ।"


।। এবারে ক্যামেরায়  ।।

ছবি ভালো করে দেখতে, ছবির ওপর ক্লিক করুন।  
দেখা শেষ হলে ❌ চিহ্নে ক্লিক করে, বন্ধ করে মূল পেজে ফিরে আসুন 


।। চিত্রগুপ্তের ওয়াইল্ড লাইফ ফটোগ্রাফি।।

শাদা মোজা পরা মোষ! এর নাম গাউর বা গৌর। 
ভারতের প্রায় সব সংরক্ষিত অরণ্যেই 
এদের দেখতে পাওয়া যায়। 
শান্ত এই তৃণভোজী জীবটিকে 
অনেকে ভুল করে বাইসন বলে। 
ক্যামেরা তাক করতেই এই মা গাউর 
ছবি তোলার জন্য ঠিক দাঁড়িয়ে গেল। 
ছবিটা তোলা এক দশক আগে 
মহারাষ্ট্রের তাডোবা অভয়ারণ্যে

।।। । দুটি  গল্প ।।। । 

রঙ্গন ও মৌমাছি

গৌরাঙ্গ দাস

 
রঙ্গন প্রতিদিন ভোর বেলায়  বাবা ও মায়ের সঙ্গে বিছানা ছাড়ে। বাবা বেরিয়ে যান মর্নিং ওয়ার্কে। মা মন দেন গৃহ কাজে। রঙ্গন দাঁত ব্রাশ করতে করতে কয়েকটা পাক দেয় ওদের উঠোনে। উঠোনের চারপাশে ছড়িয়ে থাকা কয়েকটা ফুলের গাছে। রঙ্গন কামিনী ফুল গাছটার কাছে গিয়ে দাঁড়ায়, গাছ ভর্তি সাদা রঙের  ফুল। সুন্দর গন্ধ ছড়াচ্ছে। রঙ্গনের মনটা এক অজানা আনন্দে আলোকিত হয়।

 

অন্যদিনের মতো  রঙ্গন আজও  ফুল গাছগুলোর গোড়ায় জল দেয়। হাত মুখ ধুয়ে, দুটো ডাইজেস্ট বিস্কুট খেয়ে জল খায়। রঙ্গন বেকারির সুন্দর সুন্দর বিস্কুট একদম পছন্দ করে না। কেননা মার সঙ্গে একবার ডাক্তারের কাছে গিয়ে জেনেছিল, ময়দার কোন কিছু খাওয়া ভালো নয় । সেই থেকে, ওরা ময়দার বিস্কুট খায় না। এমনকি, লুচি পরাটাও গমের আটায় বানিয়ে খায়।

 

রঙ্গন খোলা জানালায় পড়তে বসেছে। পড়তে পড়তে কিছু বাদে খেয়াল করে- কামিনী ফুল গাছটাতে অনেকগুলো মৌমাছি উড়ছে। ওরা  ফুলের উপর বসছে আবার উড়ছে।

 

রঙ্গনের খুব ইচ্ছে হলো মৌমাছিদের সঙ্গে কথা বলার। বন্ধু করার। রঙ্গন  ডাকলো, ও ভাই মৌমাছিরা তোমরা কি কেউ একজন আমার কাছে আসবে, একটু কথা বলতাম। তোমাদের গান, উড়ে বেড়ানো,ফুলের উপর বসা,আমার খুব ভালো লাগছে। ইচ্ছা হচ্ছে তোমাদের সঙ্গে বন্ধুত্ব করি।  

 

একজন মৌমাছি উড়ে এলো। রঙ্গনের খোলা জানালা পেরিয়ে- টেবিল খুলে রাখা বইয়ের পাতার উপর বসল। বলল  বল ভাই কি বলতে চাও?

 

বলতে চাই, তোমরা কি আমার বন্ধু হবে? তোমাদের সঙ্গে আমার বন্ধুত্ব করবার খুব ইচ্ছা হচ্ছে। জানো তো, গঙ্গাফড়িং ও আমার দের কামিনী ফুল গাছে এসে,বসার পর আমার বন্ধু হয়ে গেছে। ও রায়দের বড় বাগানে অর্জুন গাছে থাকে।

 

আমরাও তো রায়দের বড়  বাগানে থাকি। দীর্ঘ কান্ডওয়ালা আম গাছটার, যে ডালটা পুব দিকে ঝুকে পড়েছে, ওই ডালেই থাকি। সকালে নরম সূর্যের আলো গায়ে লাগাতে। দারুন জায়গায় বাসা আমাদের।

 — তোমাদের বাসা কত বড়?

 — লম্বায় তিন ফুট, পেট ঝুলে আছে চার ফুট।

 — তাহলে তো তোমরা ভীষণ বড় পরিবার।

 — ঠিক বলেছ,আমাদের রানি, শ্রমিক আর পুরুষ নিয়ে বিরাট পরিবার।

 — তা এই সকালে তোমরা কি মধু সংগ্রহ করতে এসেছ?

 — হ্যাঁ,আমরা শ্রমিক, আমাদের ডিউটি বারো ঘন্টা। সকাল ছটা থেকে সন্ধ্যা ছটা। আমাদের প্রচুর পরিশ্রম করতে হয়। কতবার যে বাসায় যেতে হয় মধু রেখে আসতে। আমরা ভাবছি রানিকে আবেদন করব আট ঘন্টা ডিউটির জন্য। তোমরা মানুষেরা একসময় আন্দোলন করেছিলে আমেরিকার শিকাগো শহরের হে মার্কেটে, আট ঘন্টা কাজের দাবিতে। সে আন্দোলনে শ্রমিকদের জয় হয়েছিল। সেই থেকে তো পৃথিবীতে পয়লা মে-কে আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস হিসেবে পালন করা হয়। পৃথিবীর প্রায় আশিটি দেশ শ্রমিক দিবস পালন করে।

 — ঠিক বলেছ, আচ্ছা যদি তোমাদের আবেদন রানি না মানেন?

 — তাহলে আমরা মিটিং মিছিল করে প্রতিবাদ তীব্র করে তুলবো। আশা করি আমরা স্বীকৃতি পাব, আট ঘন্টা কাজের।

 — করুণাময় তোমাদের মঙ্গল করুন। আচ্ছা, তোমরা রায়দের বাগানে কতদিন আছো?

 — অনেকদিন।

 — তোমরা কি এখানেই আজীবন থেকে যাবে?

 — যদি আমাদের ঘরে, তোমাদের মধ্যের মধু সংগ্রহের মানুষরা আঘাত না করে,আমরা থেকে যাব।

 — আঘাত মানে?

 — মধু সংগ্রহের কাজ যারা করেন তাদের অনেকেই আমাদের ঘরে আগুন ধরিয়ে দেন। আমরা অনেকেই পুড়ে মরি, আবার অনেকেই পালিয়ে যাই, সুযোগ পেলে।

 — সভ্য মানুষ তোমাদের পুড়িয়ে মারে?

 — হ্যাঁ, তুমি তোমার বাবা বা মায়ের কাছে শুনতে চাইলে জানতে পারবে। আচ্ছা ভাই, তুমি কি বই পড়ছো?

 — ইতিহাস।

 — আমাকে শোনাবে, তোমাদের অতীত কথা?

 — তুমি চাইলেই হবে, তবে- আমারও একটা শর্ত আছে,যদি তোমরা আমার সঙ্গে বন্ধুত্ব কর,আমি তোমাদের ইচ্ছা পূরণ করব।

 — কেন করব না,আমি তো তোমাকে  বন্ধু করে নিয়েছি। বল,তোমার বন্ধু গঙ্গা ফড়িংকে কোন খবর দিতে হবে?

 — ঠিক মনে করেছ, অনেকদিন আসছে না ও। ওর সঙ্গে দেখা হলে বলবে আমি ওকে দেখা করতে বলেছি।

 — ঠিক আছে, অনেক কথা হলো আজ , এখন তবে আমি যাই,অনেক মধু সংগ্রহের  কাজ বাকি।

 — ঠিক আছে। আবার যেদিন দেখা হবে সেদিন তোমাকে আমাদের ইতিহাস বলবোতা আবার কবে দেখা হবে?

 — কামিনী ফুল তো সূর্যের আলো পেলেই ঝরে যাবে,সুতরাং আবার যেদিন নতুন করে ফুল ফুটবে — সেদিন তোমার সঙ্গে আমার দেখা হবে। আর যদি মনে কর আমাকে খুব প্রয়োজন। তাহলে তুমি, ভারতবর্ষের ১৩০০ রকম পাখির যে কোন পাখিকে বা হাজার হাজার রকম বৈচিত্র্যময় পতঙ্গের যে কেউকে ডেকে, আমাকে খবর দেবার কথা জানাবে। ওরা আমাকে তোমার খবর পৌঁছে দেবে। জানো তো ভারতবর্ষের  সমস্ত রকম পাখি ও পতঙ্গের সঙ্গে আমার সুন্দর সম্পর্ক আছে। চলি ভাই। আর দেরি করবো না। ভালো থেকো। সাবধানে থেকো। আবার দেখা হবে।

 

মৌমাছি 'আবার আসিব ফিরে ধানসিঁড়িটির তীরে...', গান গাইতে গাইতে উড়ে গেল। সেই চলে যাওয়ার দিকে নিষ্পলক তাকিয়ে রইল রঙ্গন। 🔅




উত্তরের জঙ্গলে

ভাস্বতী বন্দ্যোপাধ্যায়

 
সে অনেক কাল আগের কথা। আনন্দপুর তখন একটা গণ্ডগ্রাম। সেই গ্রামে একটা হলদে রঙের দোতলা বাড়ি ছিল, লোকে তাকে সিংহবাড়ি বলত। সে বাড়ির সদর দরজার ওপরে দুটো সিংহের মূর্তি মুখোমুখি বসানো ছিল। একতলা, দোতলা মিলিয়ে অনেকগুলো ঘর সে বাড়িতে, ছোট, বড় অনেক মানুষ একসাথে থাকত। বাড়ির লাগোয়া একটা গোয়াল বাড়ি, সেখানেও ছোট, বড় অনেকগুলো গরু। বাড়ির ছেলেমেয়েরা ওই গরুর দুধ খেয়েই বড় হত। সকাল-বিকেল দুবেলা দুধ দুইতেন কত্তামা নিজে, বেচারা বাছুর বাঁধা থাকত মা-গরুর মুখের কাছটিতে। মা তার গা চেটে চেটে আদর করত আর দুধ দিত। পিতলের বালতিতে আওয়াজ হত চ্যাঁক-চোঁক।

 

ওই বাড়িটা আমাদের। বাড়ির মধ্যেই খেলার সাথি খুড়তুতো-জেঠতুতো ভাই-বোন। আমাদের না ছিল মোবাইল, না ছিল ইন্টারনেট, এমনকি টেলিভিশনও ছিল না। আমাদের ছিল সুযোগ পেলেই বাড়ির বাইরে মাঠে-ঘাটে ঘোরাফেরা। অহোরাত্র কারণে-অকারণে বকুনির ঘেরাটোপে আটকানো আমরা তখন কুচি দেওয়া ফ্রক পরে, লম্বা চুলে কলা-খোঁপা, বেরা-বিনুনি বেঁধে খালি পায়ে রাজ্য জয় করে বেড়াতাম। আমাদের সে জগতে ভূত-পেত্নি-ব্রহ্মদত্যি সব ছিল, কিছু কিছু মানুষকেও ভূত-প্রেত ভর করত হামেশাই। 

 

তবে ইস্কুল যাবার পথে যে সরু পায়ে চলা রাস্তাটা পানাপুকুরের গা ঘেঁসে চলে গেছে উত্তরের জঙ্গলে, সে রাস্তায় বিশেষ যেত না কেউ। বড়দের কড়া নির্দেশ ছিল ছোটরা যেন কোনোভাবেই ওই জঙ্গলে না ঢোকে। শুনশান রাস্তাটার ধারে ধারে বাবলা ঝোপ। ওইখানে গ্রামের এক প্রান্তে জঙ্গলের মধ্যে ছিল কানাবুড়ির চালাঘর। তার একটা চোখ নেই, সে চোখের জায়গায় অন্ধকার গর্ত। আর একটা চোখ যেন ঠেলে বেরিয়ে আসছে। চুলগুলো ছিল শনের নুড়ির মত। দাঁতগুলো কালো মিসমিসে। তাকে ডাইনি বুড়িও বলত কেউ কেউ। গ্রামে কারো কোনও আকস্মিক বিপদ-আপদ হলে তার পিছনে ডাইনি বুড়ির তুকতাক নিয়ে নানা কথা শোনা যেত। রঘুদা বলত, ওর ধারে কাছে গেলে বুড়ি নজরবন্দী করে ফেলে, কাছে টেনে নেয়, তারপর শরীরের সব রক্ত শুষে নিয়ে ছিবড়ে করে ফেলে দেয়। কথাটা ঠিক বিশ্বাস হত না, আবার অবিশ্বাস করার মত মনের জোরও ছিল না। সন্ধের পরে তো বটেই, দিনমানেও বিশেষ কেউ একা ঢুকত না সে জঙ্গলে। মাঝেমাঝে কাঠকুড়ানি-পাতাকুড়ানির দলকে দেখেছি বটে তবে তাদের সাথে হেঁসো-দা-কাস্তের মতো হাতিয়ারও থাকত।

 

রঘুদা ছিল আমাদের বাড়ির বাগাল, গরু-বাছুরের দেখাশোনা করত, চরাতে নিয়ে যেত, তাদের পুকুরে নামিয়ে গা ঘসে ঘসে চান করাতো, খড়-জাবনা মেখে খেতে দিত, আর ছোট বাছুরগুলোর সঙ্গে খেলত, ওদের গলায় লালসুতো দিয়ে পেতলের ঘণ্টি বেঁধে দিত, চলাফেরায় আওয়াজ হত টুংটুং। রঘুদার একটা টিনের বাক্স ছিল, গোলাপ ফুল আঁকা। সে বাক্সে সবসময় একটা তালা ঝুলত। আমাদের দুএকবার খুলে দেখিয়েছিল বাক্সটা। আশ্চর্য সব জিনিস ছিল সে বাক্সে। বাবুইয়ের বাসা, মৌচাকের ভাঙা টুকরো, নীল-হলুদ পাখির পালক এই সব। একটা সাদা ঝিনুক ছিল, রোদে ধরলেই তার ওপর যেন রামধনুর ঝিলমিল লেগে যেত। 

 

রঘুদার মাকে আমরা থুপিপিসি বলে ডাকতাম। সে আর রঘুদা সারাদিন আমাদের বাড়িতেই থাকত। দুপুরে কানাউঁচু সানকিতে নিজেদের ভাত-তরকারি বেড়ে নিয়ে গামছায় বেঁধে বাড়ি যেত, আবার বিকেল পড়তে না পড়তে চলে আসত। রাতে ঠাকুমার খাওয়া হলে মা-বেটায় খাবার নিয়ে বাড়ি যেত। থুপিপিসির কাছে আমাদের সব প্রশ্নের কিছু না কিছু উত্তর থাকতই। ওই জঙ্গলে কী আছে এই প্রশ্নে সে কেমন শিউরে ওঠা মুখ করে, ‘ওরেব্বাবা!বলে আকাশের দিকে একবার চোখ পাকিয়ে তাকিয়েই ঝপ করে চোখ বন্ধ করে ফেলত। তার মানে যে ঠিক কী তা স্পষ্ট করে না বুঝলেও সে যে এক ভয়ঙ্কর কিছু তা নিয়ে সন্দেহ থাকত না। 

 

থুপিপিসিকে আমরা যে খুব একটা পছন্দ করতাম তা নয়। আমাদের বাড়ির বাইরের যত দুষ্টুমি সব কী করে যেন থুপিপিসির কানে পৌঁছে যেত আর সেও দায়িত্ব নিয়ে সেসব পৌঁছে দিত মা-কাকিমা, বাবা-কাকাদের কানে। মুখে কিছু বলতে না পারলেও আমরা রোজ তাকে অভিশাপ দিতুম। চান করে কাচা জামাকাপড় পরে উঠোনের পূবদিকের কোণে বেলগাছের গা ছুঁয়ে অভিশাপ দিলে তা নাকি ফলতে বাধ্য  এটা আমাদের থুপিপিসিই বলেছিল। তার দেওয়া বিদ্যে আমরা তার ওপরেই ফলাতাম। কিন্তু বোধহয় আমাদের অভিশাপের জোর ছিল না। থুপিপিসির ওপর আমাদের কোনও অভিশাপই ফলে নি। তবে বিন্তি বলত, থুপিপিসির যে বদহজম লেগেই থাকত, আর সে সারাদিনই কচরমচর করে বিটনুন দেওয়া জোয়ান চিবোতো, এ আমাদের অভিশাপ ছাড়া আর কী কারণেই বা হবে! পূর্ণিমা-অমাবস্যায় যে তার বাতের ব্যথাটা বাড়ত, এও আমাদের অভিশাপ ফলে যাওয়ারই অব্যর্থ প্রমাণ।

 

তবে বাড়িতে শাস্তির মাত্রা অতিরিক্ত হলে বড়দের হেফাজত থেকে একরত্তি আমাদের ছিনিয়ে নিয়ে বগলদাবা করে থুপিপিসি সোজা হাঁটা দিত আতাপুকুরের পাড়ে কিম্বা ঘুরণ-চরকির মাঠে। কে জানে কেন তাকে কেউ বাধা দিতে আসত না। থুপিপিসি ছিল ঠাকুমার বাপের বাড়ির লোক। বাবা-কাকারাও নাকি এককালে কোলে-কাঁখে চড়েছে এই থুপিপিসির। মুখের ওপর কথা বলতে এলে দাবড়ানি খায় এখনও। তা বলে যে আমাদের খুব আহ্লাদ দিত থুপিপিসি তাও নয়। তবে তার অপরাধের ধারণা অন্যরকম ছিল। যেমন, সে ভেবে পেত না, পরীক্ষায় পাশ করার পরও আমাদের বকুনি খেতে হয় কেন। নম্বর কম পাওয়াটাও যে একটা শাস্তিযোগ্য অপরাধ — এমন বিশ্বাস তার ছিল না। 

 

সে যাই হোক, সেদিন রঘুদাকে দেখলাম শিস দিতে দিতে একা একা ওই জঙ্গলের রাস্তায় ঢুকে যাচ্ছে। কী ডাকাত ছেলে রে বাবা! তারপর অনেকক্ষণ কেটে গেল, আমাদের অনেক দান করে চু-কিতকিত, পাঁচ-ঘুঁটি খেলা হয়ে গেল, চান-খাওয়ার বেলা পড়ে এল, অথচ রঘুদা তখনও ফিরল না! ওর কি কোনও বিপদ হয়েছে? নিশ্চয়ই কানাবুড়ির পাল্লায় পড়েছে। এখন কী হবে?

 

রঘুদার ভয়ঙ্কর কোনও বিপদের আশঙ্কায় আমার চোখে জল চলে এল। কান্না বোধহয় ছোঁয়াচেতাই আমার দেখাদেখি সকলেই কান্না শুরু করল। আমরা নানা সুরে কাঁদতে কাঁদতে বাড়ি ফিরলুম। এমনিতে আমাদের কান্নাকাটিকে কেউ তেমন পাত্তা দিত না। সেদিনও তার ব্যতিক্রম হল না। বরং ছুটির দিনে দশ পাতা হাতের লেখা করা হয়নি বলে মেজকাকি বেশ করে বকে দিলেন। 

 

কারও কাছে পাত্তা না পেয়ে আমরা সোজা ঠাকুমার ঘরে গিয়ে উঠলুম। ঠাকুমা, যাকে আমরা কত্তামা বলতুম, তখন মালা জপছিলেন আর থুপিপিসি তাঁর পিঠের ঘামাচি মেরে দিচ্ছিল। থুপিপিসিকে দেখে আমাদের কান্নার আওয়াজ বেড়ে গেল। ঠাকুমার হাতের মালা খানিকের জন্য থামল একটু। থুপিপিসি ঘামাছি টিপতে টিপতে বলল, কাঁদিস কেন? আয়, আচার খাবি তোরা?

 

আচারের কথা শুনে আমাদের কান্নার আওয়াজ তিন সেকেন্ডের জন্য থেমে আবার দ্বিগুন জোরে বেজে উঠলো। এবার দুঃখের সঙ্গে কিছু অনুশোচনাও যোগ হল। আহা থুপিপিসি গো! তোমাকে যে আমরা এত অভিশাপ দিই, সেই জন্যই বোধহয় তোমার রঘুর এই বিপদ! কত্তামা আর নিশ্চিন্তে মালা জপতে পারলেন না। হাতের মালাখানি সরিয়ে রেখে ইশারায় আমাদের চুপ করতে বললেন। থুপিপিসি ঘামাছি মারা বন্ধ করে বলল, কী হইয়েছে কদেখি? তোদের ধরে মেরেছে কেউ? কী করিছিলি?

 

আমরা ইনিয়ে বিনিয়ে কাঁদতে কাঁদতে বললুম, রঘুদা চলে গেছে…!

কুথাকে?

ওই জঙ্গলের ভেতর। আমরা কতক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলাম, এল না।

তো কানছিস কেন তোরা?

ওখানে কানাবুড়ির ঘর আছে না? সে হয়ত রঘুদাকে এতক্ষণে ছিবড়ে করে ফেলেছে

 

ছিবড়ে হয়ে গেলে রঘুদাকে কেমন দেখতে হবে কে জানে! আর কি বাঁচবে রঘুদা? আমরা আবার কাঁদবার উপক্রম করলাম। কিন্তু থুপিপিসি খিলখিলিয়ে হেসে উঠল, ই দেখ গো! পুলাপান হে!

কত্তামাও দেখি বিনা বাক্যব্যয়ে মালাটা হাতে তুলে নিয়েছে আবার। থুপিপিসির কোনও হেলদোল নেই, ছোট ছোট চিনেমাটির কটোরায় আমাদের জন্য একটু করে আচার সাজিয়ে ফেলেছে।

টুকুস খা। চুরি করলে দেব পিঠে দুঘা। মন করলে চাই লিবি।

 

কোনক্রমে আচারটুকু শেষ করে আমরা দল বেঁধে গিয়ে বসে রইলুম শিলপুকুরের পাড়ে। আজ আর জলে নেমে ঝাঁপাই জোড়ায় মন নেই কারো। আমাদের মধ্যে সবচেয়ে ছোট যে চন্ন, সে বলল, আমার তালপাতার বাঁশিটা চেয়েছিল রঘুদা, ফিরে এলে ওকে ঠিক দিয়ে দেব!

 

বলতে বলতে সে আবার কাঁদবার উপক্রম করল। আমাদের সবারই মন ভীষণ খারাপ হয়ে রইল। দুপুরে খাবার সময় পেরিয়ে যাওয়ার পরও রঘুদা ফিরল না। মা যেন একটু চিন্তায় পড়ল। দুপুরের খাওয়াটা তো বাড়ি এসে খাবে ছেলেটা! গেল কোথায়?

 

থুপিপিসির যেন কোনও চিন্তাই নেই, বলল, দ্যাখো গা, কোথায় ছুটে বেড়াচ্ছে ভাম নয়ত খটাসের পিছু পিছু! বিহান বেলা লিয়ে এসে বুলবে, কশে ঝাল দিয়ে রেন্ধে দাও গো।

 

রঘুদার খাবারটা সানকিতে বেড়ে গামছায় বেঁধে বাড়ি চলে গেল থুপিপিসি। আশ্চর্য মা যাহোক! তবে যে শুনতুম রঘুদা নাকি তার মায়ের কোল পোঁছাছেলে, বেশি বয়সের সন্তান, তাই খুব আদরের? একদম বাজে কথা। বিন্তি আমার কানে কানে বলল, ‘নিশ্চয়ই সৎ-মাতখন আমরা জানতাম সৎ-মা মানেই অত্যাচারী, ভয়ঙ্কর নিষ্ঠুর।

 

বিকেলে থুপিপিসি কাজে এসে বলল, রঘুদা নাকি তখনও বাড়ি আসে নি। বাবা বড়কাকাকে বলল, একবার বোধহয় খোঁজ নেওয়া দরকার। জঙ্গলে ঢুকেছিল না? আলো থাকতে থাকতে চল একবার ঘুরে আসি।

 

বাবা আর বড়কাকা বেরিয়ে গেলে আমরা একজোট হয়ে ছাদে উঠলাম, ছাদ থেকে জঙ্গলের কিছুটা দেখা যায়। খানিক পরে দেখলাম বড়কাকা হন্তদন্ত হয়ে বেরিয়ে এল। এরপর দেখলাম বাড়িতে সবাই একটু ব্যস্ত হয়ে উঠল। মেজকাকি গরম দুধ ফ্লাস্কে ঢেলে আর বিস্কুটের কৌটো একটা কাপড়ের ব্যাগে গুছিয়ে দিল। বড়কাকা কাকে যেন বলল, ধেনোকে খবর দাও, হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে।

 

ধেনোকাকার একটা ভ্যান রিক্সা ছিল। সম্বৎসর ক্ষেত থেকে ধান বইত, আলু বইত, রাসের মেলায় যাত্রাপার্টি এলে ওর ভ্যানে গুঁতোগুঁতি করে বসে অনেকে মিলে যাত্রা শুনতে যেত। গ্রামে যে কারুর দরকারে সব সময় ধেনোকাকার ডাক পড়ত। কিন্তু হাসপাতাল কেন? রঘুদার কিছু হয়েছে? বাবাকে দেখছি না, তবে কি বাবারই কিছু হল? মাকে জিগ্যেস করতে গিয়ে দেখলুম, ‘আমিও সঙ্গে যাববলে মা লাফিয়ে ধেনোকাকার ভ্যানে উঠে পড়ল। তবে তো নিশ্চয়ই বাবারই কিছু হয়েছে। আর রঘুদা? কিছুই বুঝতে পারছিলাম না। ঝুপ করে সন্ধে হয়ে গেল। 

 

বড়কাকি হাই-ইস্কুলের ভূগোলের দিদিমণি। খুব গম্ভীর। তাছাড়া, ভূগোল আমার মোটেই ভালো লাগত না। তাই বড়কাকিকে এড়িয়েই চলতাম। কিন্তু এখন কি আর এড়িয়ে থাকা যায়? কাছে গিয়ে বললাম, বড়কাকি, বাবা কোথায়? মা কখন আসবে?

 

বড়কাকি রান্নাঘরে রুটি সেঁকছিলেন। কেমন আনমনে উত্তর দিলেন, এই তো, একটু সামলে গেলেই চলে আসবে।

তারপরেই আমার দিকে চোখ পাকিয়ে বললেন, এখনও পড়তে বসনি? এক্ষুনি যাও।

বলেই একটা গরম রুটি গুড় মাখিয়ে বাঁশির মত পাকিয়ে আমার হাতে ধরিয়ে দিলেন।

 

আমার খিদে পাচ্ছিল না। বড়রা কেউ তো কিছু বলছেই না! ছোট বলে আমাদের কি চিন্তা হয় না? বিন্তি ওর মায়ের ভয়ে পড়তে বসে গেছে। আমিও পড়তে বসলাম, কিন্তু মন বসছিল না একেবারেই। রঘুদার নিশ্চয়ই ভয়ঙ্কর কোনও বিপদ হয়েছে। ওকে বাঁচাতে গিয়ে হয়ত বাবারও। ওদের নিয়ে হাসপাতালে যাচ্ছে বড়কাকা আর মা। 

 

রাতে ডিমের ঝোল আর ভাত খেয়ে বড়কাকির দুপাশে শুয়ে পড়লাম আমি আর বিন্তি। কোথায় ঘুম? কেবল এপাশ আর ওপাশ। 

বড়কাকি বলল, ঘুমিয়ে পড়। কাল ইস্কুল আছে না?

মা আর বড়কাকা কখন আসবে বড়কাকি?

আসবে এখন। ঘুমিয়ে পড়। সকালে উঠে দেখতে পাবি মাকে।

 

আমার খুব চিন্তা হচ্ছিল, বাবার জন্য, মায়ের জন্য, রঘুদার জন্য। হঠাৎ খুব কান্না পেল আমার। আমি কান্না চাপতে চেষ্টা করলাম। বড়কাকির একটা হাত প্রথমে আমার পিঠে তারপর আসতে আসতে আমার মাথায়, বুলিয়ে যেতে লাগল। আমি আর নিজেকে সামলাতে পারলাম না। ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলাম। 

বাবার কি কিছু হয়েছে? মা যে ওরকম করে চলে গেল? এখনও কেন আসছে না কেউ?

 

বড়কাকি যেন আর ভূগোলের দিদিমনিই নয়, এমন গলা করে বলল, বোকা মেয়ে, বাবার কিচ্ছু হয় নি! বুড়িমা খুব অসুস্থ, হাসপাতালে নিয়ে যেতে হয়েছে। ওনার তো কেউ নেই, তাই দাদা-দিদি সঙ্গে গেছেন। আজ রাতেই ফিরবেন হয়ত।

আর রঘুদা? ওর কিছু হয় নি?

রঘুই তো প্রথম দেখেছিল বুড়িমা অসুস্থ। বুড়িমার দেখাশোনা করছিল সারাদিন। তাই বাড়ি আসতে পারেনি, কাউকে ডাকতেও পারেনি। সন্ধের সময় তোর বাবা আর কাকা গিয়ে দেখল, বেশ বাড়াবাড়ি। তাই তো হাসপাতালে নিয়ে গেল। ভাগ্যিস আমাদের রঘু জঙ্গলে চালতা পাড়তে গিয়েছিল! না হলে বুড়িমা হয়ত মরেই পড়ে থাকত, কেউ টের পেত না।

 

তাহলে এই ব্যাপার? বিন্তি বলল,

মা, তুমি ওই বুড়িমাকে দেখেছ? ও নাকি ডাইনি?

মানুষ কখনো ডাইনি হয়? পড়াশোনা করে এই বুদ্ধি হচ্ছে তোমাদের?

তাহলে সবাই কেন আমাদের বারণ করে ওই জঙ্গলে যেতে?

ওখানে অনেক আজেবাজে লোক নানা কুকর্ম করে। পুলিশ মাঝেমাঝেই রেইড করে। একবার তো কয়েকজনকে অ্যারেস্টও করেছে। তাই তোমাদের ওখানে যাওয়া নিষেধ। 

 

বোঝো কাণ্ড! ওই কানাবুড়িবলে যে বুড়িমাকে নিয়ে এত কথা, তাঁরও অসুখ হয়, তাঁকে নিয়ে হাসপাতালে ছুটতে হয়। ডাইনিদের কি অসুখ হয়? ধুর! রঘুদা শুধু শুধু আমাদের ভয় দেখিয়ে গেছে এতদিন। আমি জিগ্যেস করলুম,

— বড়কাকি, বুড়িমা ভালো হয়ে যাবে, বল?

— হ্যাঁ নিশ্চয়ই।

 

বড়কাকি ঘুমিয়ে পড়লেও আমাদের চোখে ঘুম নেই। উত্তেজনায়। বিন্তি ফিসফিসিয়ে বলল,

ডাইনি বলে আসলে কিছু হয় না, তাই না রে?

শুনলি না, মানুষ ডাইনি হয় না?

রঘুদা যে বলে জঙ্গলে নাকি অনেক চালতা পেকেছে! কাল যাবি, দিনের বেলায়?

একটু ঝাল নুন করে নিতে হবে।

রঘুদাকে কিন্তু একটাও দেব না। মিথ্যুক!

হুম, চাইতে এলে দেখাব মজা।

কাউকে বলিস না, কিন্তু!

না, কক্ষনো না। 🔅



।। । । ছবির পাতা।।। । 

ছবি ভালো করে দেখতে, ছবির ওপর ক্লিক করুন।  
দেখা শেষ হলে ❌ চিহ্নে ক্লিক করে, বন্ধ করে মূল পেজে ফিরে আসুন 


ছবি- দেবাংশু ঋষিদাস।। বয়স চার বছর
কে এ সি-র ছাত্র, ত্রিপুরা


ঐন্দ্রী সাহা।। বয়স ৭ বছর
তৃতীয় শ্রেণি।। আমেটি ইন্ট্যারন্যাশনাল স্কুল, আমেটি


আয়ুষ্মান মণ্ডল।। নবম শ্রেণি
জি ডি গোয়েঙ্কা পাবলিক স্কুল, দক্ষিণেশ্বর
---------------------------------------------------------------

ছোটোদের সাইন্যাপস।। বৈশাখ ১৪৩৩।। মে ২০২৬।। পাঠপ্রতিক্রিয়া

ছবিতে ক্লিক করলে বৈশাখ সংখ্যাটি পড়া যাবে

পাঠপ্রতিক্রিয়া - ১

আলোচক – মলয় সরকার

এই প্রথম আমি সাইন্যাপস্‌-এর ব্যাপারে বা পাতায় কথা বলছি। তার কারণ অবশ্যই সম্পাদিকা মৌসুমীর আন্তরিক আহ্বান। আর মৌসুমী বললে আমার না বলার ক্ষমতাটা কেমন যেন পথ হারিয়ে ফেলে।

 

যাই হোক, ছোটদের সাইন্যাপস্‌ পত্রিকার প্রথম সংখ্যা পড়লাম। এতে অনেকেই রয়েছে যারা আমার পূর্বপরিচিত।  সেই রকম একজন চিত্রগ্রাহক ঋপণ আর্য, যাঁর ছবির আমি এক ভক্ত হয়ে গেছি। ওনার ছবি কথা বলে। এখানে ছবিটি সাদায় কালোয়। ফটোগ্রাফিক দৃষ্টিতেশিল্পীরা বলেন, ছবির বেশি ভাষা ফোটানো যায় সাদা কালোতেই। তাই সদ্যপ্রয়াত বরেণ্য ফোটোগ্রাফার রঘু রাইয়ের বেশি ছবি সাদায় কালোয়। অবশ্য আমারও এই মত।তাতে আমার মনে হয় ছবির গভীরতা অনেক বেশি ফুটে ওঠে। এখানে ছবিটি দেখেই বোঝা যাচ্ছে৷ এরা খুবই সাধারণ বা নিম্নবিত্ত ঘরের গ্রাম্য শিশু। এদের ছবিতে চোখমুখ না থাকলেও, ফুটে উঠেছে শিশুসুলভ সারল্য।পোষাকে নেই এদের চাকচিক্য।  গ্রামীণ পটভূমিকায় গ্রাম বাংলার সাধারণ শিশুদেরযারা আমাদের অপু-দুর্গার প্রতিভূ তাদেরই চিত্রায়িত করা হয়েছে। বড় মন কেড়ে নেওয়া ছবি।

 

এর পরে আসি, লেখক ও সাহিত্য পরিবারের কন্যা শ্রীপর্ণার নতুন ধরণের সৃষ্টিতে। এর আগে ওর লেখা পড়েছি। কমিক্স ছবি ও লেখাতেও যে হাত পাকাচ্ছে, দেখে ভাল লাগল। ওর মনে হয় কালো বেড়াল বেশি পছন্দ। এর আগেও পড়েছি ওর কফি হাউসের কালো বেড়ালটা’(বোধ হয় নামটা ঠিকই বলেছি), সেখানেও কালো বেড়ালের গল্পই ছিল। তখনই তার মাকে বলেছিলাম, মেয়ের পাকা হাত, ঠিক মত চললে ভবিষ্যতে ঊজ্বল হবে। এই রচনাতেও, যদিও ছোট, আঁকা ও ভাবনার মুন্সীয়ানার লক্ষণ আছে।

 

এখানে আবার পাচ্ছি রতনতনু বাবুর কবিতা। তাতে নতুন বছরের কাছে অনেক কিছু আনার ফরমায়েস পাঠিয়েছেনযেমন আমার ছেলেমেয়েরা আমি অফিস থেকে ফেরার আগে আনতে বলে দিত বিভিন্ন জিনিসের ফর্দ। আব্দারের চাহিদার মধ্যে,যেমন বর্ণচোরা আম আছে, আছে বিনোদ দুলের জন্য বইও। পড়াশোনার চিন্তাও চাহিদার লিস্ট থেকে বাদ যায় নি।তাই লাল ধারাপাত বইও চাই। মনে পড়ে গেল ছেলেবেলাটা। আজকাল তো ধারাপাত আর বর্ণপরিচয় দুষ্প্রাপ্য।  দুধেল গরুর দুধ আর শূন্য হাড়িতে ভাতের চাহিদায় মনে পড়ে যায় অন্নদার আত্মপরিচয়ে ঈশ্বরী পাটনীর চাহিদা, যা তৎকালীন যুগে সমস্ত গ্রাম্য পরিবারের বাঙালীর চিরন্তন চাহিদা ছিল,’আমার সন্তান যেন থাকে দুধে ভাতে

 

এর পরে পাই প্রবাহনীল দাস। এই প্রবাহনীল আর ভানুপ্রিয়া মাহাতো, এদের লেখা আগেও পড়েছি। ছোট হলেও এতা সম্ভাবনাময়। খুব সুন্দর লেখা কবিতা। গরমের মধ্যেও কৌতুকের ছোঁয়া আছে।

 

সবিতা রায় বিশ্বাসও লিখেছেন গরমকে নিয়ে কবিতা।

 

কাঁদনের গল্পে কিছু অপূর্ণতা পেলাম। গাছটা কি গাছ, কেন তার খবর পঞ্চায়েত অফিসে গেল, সেটা খুব যেন পরিষ্কার বুঝলাম না। উদ্দেশ্যটা ভাল কিন্তু গাঁথনিটা যেন একটু খামতির।

 

সৃঞ্জয়ের দাদু ও তাঁর পোষ্যএর কল্পনা খুব সুন্দর। শিশু মন তো এমনই হবে। এই কল্পনাই তো তাদের মনকে সুন্দর করে।

 

অমিতাভ দাসের ছকুমামার গল্প বেশ ভালই। 'গুল মারাএকটা আর্ট। এটা সত্যি সত্যি ভাল লেখকের হাতে পড়ে কেমন সুন্দর হয়ে ওঠে, তার ঊজ্বল নিদর্শন তো আমাদের নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘’চার মূর্তিকিংবা প্রেমেন্দ্র মিত্রের ঘনাদা

 

মানসী গাঙ্গুলীর ছেলেবেলার গল্পগুলো আসলে আমাদের সেই হারিয়ে যাওয়া দিনের গল্প। আর এগুলোর ছোঁয়া পেলেই মন হয়ে ওঠে নস্ট্যালজিক। আজ থেকে বছর পঞ্চাশ বা ষাট আগে প্রায় সমস্ত গ্রামবাংলার ছেলে বা আজকের শহুরে বুড়োদের সবারই ছিল এই একই ছবি। এই গল্পে সবাই খুঁজে পাবেন তাঁদের হারিয়ে যাওয়া দিন। ভাল লেখা।

 

এরপরে ছবির কথা। জয়দীপের আঁকা সত্যিই সুন্দর। অনেক বড় শিল্পীর মত।রণবীর ও শ্রেয়সী ও খুবই সুন্দর।

 

আর মৌসুমীর সম্পাদকীয় সম্বন্ধে নতুন কিছু বলছি না।

 

সেই সঙ্গে কামনা করব নতুন শিশুর স্বাস্থ্যসম্মত শ্রীবৃদ্ধি।


পাঠপ্রতিক্রিয়া - ২ 

আলোচক – সুমেধা চট্টোপাধ্যায়


বাংলা ওয়েবম্যাগাজিনের দীর্ঘ ঐতিহ্যে শিশু-কিশোরদের জন্য নিবেদিত পত্রিকার সংখ্যা খুব বেশি নয়। সেই বিচারে ছোটোদের সাইন্যাপস্‌ একটি ব্যতিক্রমী উদ্যোগ। ১৯৯৮ সাল থেকে পথ চলা শুরু করা সাইন্যাপস্‌ পত্রিকার এই শিশু-বিভাগটি মৌসুমী ঘোষের সম্পাদনায় যে আন্তরিকতা ও যত্নের সঙ্গে প্রকাশিত হয়, তা পড়লেই অনুভব করা যায়। বৈশাখ ১৪৩৩/মে ২০২৬ সংখ্যাটি হাতে নিয়ে বসলে মনে হয় যেন গরমের ছুটির একটা দুপুর এসে গেল হঠাৎ আলসে, রঙিন, একটু দুষ্টুমিভরা, কিন্তু ভেতরে ভেতরে গভীর ও অর্থবহ। আমার এই দাবদাহের একটি দুপুর ভরিয়ে রাখল "ছোটদের সাইন্যাপস"।
 

সম্পাদকীয় পাঠকের সঙ্গে সেতু

সম্পাদকীয়টি পড়েই বোঝা যায়, মৌসুমী আন্টি ছোটদের সত্যিকারের বন্ধু। লেখক মৌসুমী ঘোষকে আমি বহুদিন ধরে চিনি। ছোটদের জন্য নিরন্তর কাজে দিদির কোনওদিন এক ফোঁটাও ক্লান্তি নেই।  বাঘু মামা, সিংহ দাদা, মিউ মাসি, পাখি দিদি, মন্টে-ঘন্টে-পন্টে এইসব কল্পিত চরিত্রের উল্লেখ করে তিনি পাঠককে শুরু থেকেই এমন একটা উষ্ণ কল্পজগতে টেনে নেন, যেখানে পত্রিকাটি পড়া শুধু পড়া নয়, একটি উৎসবে যোগ দেওয়া। সম্পাদকীয়র ভাষা সহজ, আন্তরিক, কিন্তু একটুও শিশুসুলভ ছাড় দেওয়া নয়। বরং ছোটদের সঙ্গে সমানে সমানে কথা বলার যে ভঙ্গি, সেটাই এই পত্রিকার সবচেয়ে বড় শক্তি। পরের সংখ্যার জন্য লেখা-আঁকা-পাঠপ্রতিক্রিয়া পাঠানোর আহ্বানটুকুও স্বাভাবিকভাবে এসেছে চাপিয়ে দেওয়া মনে হয়নি।

 

কবিতা ও ছড়া তিনটি রঙ, তিনটি সুর

 

এই সংখ্যায় কবিতা ও ছড়ার পাতায় তিনটি রচনা রয়েছে এবং মজার বিষয় হলো তিনটিই বৈশাখ ও গ্রীষ্মকে ঘিরে আবর্তিত হলেও তিনটির সুর সম্পূর্ণ আলাদা।

 

রতনতনু ঘাটীর "এসো এসো তুমি নতুন বছর" ছড়াটি প্রথম পড়তে বসলে মনে হয় এটি সাধারণ বর্ষবরণের ছড়া। কিন্তু পড়তে পড়তে বোঝা যায়, এটি আসলে একটি সামাজিক দলিল। নতুন বছরের কাছে দাবিদাওয়ার তালিকায় কবি শুধু নিজের জন্য চাননি বিনোদ দুলে, সুনয়নী টুডু, একলা বোন এইসব প্রান্তিক মানুষের কথা তুলে এনেছেন। অভাবী শিশুর জন্য নতুন বইয়ের দাবি, মলিন মায়ের শূন্য হাঁড়িতে ভাত ফোটার প্রার্থনা এই পঙক্তিগুলো শিশুপাঠ্য ছড়ার সীমা ছাড়িয়ে একটা মানবিক উচ্চতায় পৌঁছে যায়। ছোটদের মনে সহানুভূতি ও সমাজবোধের বীজ বপন করার এর চেয়ে সুন্দর পথ আর কী হতে পারে?

 

প্রবাহনীল দাসের "এই গরমে" ছড়াটি সম্পূর্ণ ভিন্ন মেজাজের। মেদিনীপুরের দ্বাদশ শ্রেণির এই ছাত্র গরমের তীব্রতাকে এমন রসিকতায় মুড়িয়ে দিয়েছে যে পড়তে পড়তে হাসি আটকানো দায়। পিচ রাস্তায় প্যাকেট ফেটে ডিম খানখান, আর সেই ডিম দিয়ে অমলেট হওয়ার কল্পনা এই ধরনের রসবোধ এই বয়সে সত্যিই বিরল। ছড়াটির ছন্দও টানটান, একটু তরতরে, যা বিষয়ের সঙ্গে মিলে যায় চমৎকারভাবে।

 

সবিতা রায় বিশ্বাসের "পয়লা বোশেখে" ছড়াটি ঐতিহ্যের পথে হেঁটে বর্ষবরণের আনন্দকে বাংলার লোকজীবনের সঙ্গে মিলিয়ে দেয়। গাজন মেলা, চরকি খেলা, ঝাল মুড়ি, তেঁতুলের জল, আমিনা-মালতী-জরিনা-তপতীর একসঙ্গে উৎসবে মেতে ওঠা এই চিত্রগুলো কেবল উৎসবের বর্ণনা নয়, এগুলো ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে মানুষের মিলনের কথা বলে। "হাত রেখে হাতে / যিশু বিশু সাথে" এই পঙক্তিটি সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির একটি সুন্দর ইঙ্গিত।

 

গল্পের পাতা তিনটি ভিন্ন স্বাদ

 

এই সংখ্যার গল্পের পাতা বৈচিত্র্যে ভরপুর। তিনটি গল্প তিনটি সম্পূর্ণ আলাদা জগৎ।

 

শতদ্রু মজুমদারের "কাঁদনের গল্প" এই সংখ্যার সবচেয়ে তীক্ষ্ণ রচনা। কাঁদন পরামানিক গ্রামের চিরপরিচিত চোর, সাইকেল থেকে মন্দিরের জুতো, পুকুরের মাছ পর্যন্ত সব চুরি করা যার স্বভাব একদিন একটা গাছ চুরি করে আনে। এই গাছই তার জীবনের সবচেয়ে বড় বিপদ হয়ে ওঠে। পঞ্চায়েত এসে গাছে বেড়া দেয়, বনবিভাগ পুরস্কার দেয় অঞ্চল প্রধানকে কারণ একজন দাগি চোরকে দিয়ে বৃক্ষরোপণ করানো তার কৃতিত্ব। আর কাঁদন নিজে স্বীকার করলেও কেউ বিশ্বাস করে না যে সে গাছটা চুরি করেছে। এই নির্মম ব্যঙ্গ যেখানে একজন মানুষের সত্যকথাও অবিশ্বাস্য হয়ে যায় তার অতীতের কারণে প্রাপ্তবয়স্কদের সাহিত্যেও বিরল। ছোটদের পত্রিকায় এই স্তরের সামাজিক শ্লেষ একটা বাড়তি মাত্রা যোগ করেছে, যা বয়স্করাও উপভোগ করবেন।

 

ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্র সৃঞ্জয় মৌলিকের "দাদু ও তাঁর পোষ্য" গল্পটি সরল গদ্যে লেখা, কিন্তু ভেতরে রোমাঞ্চের কমতি নেই। গ্রামের নদীর পাড়ে বেড়াতে যাওয়া, পুকুরে কুমির দেখা, তারপর দাদুর নিজেই কুমিরের পিঠে চড়ে বসা এই চমকের পর শেষে দাদুর মুচকি হাসি মুখে বলা "ও যে আমার পোষা!" এই সমাপ্তিটুকু গল্পটিকে মনে রাখার মতো করে তোলে। একজন কিশোর লেখকের কাছ থেকে এই পরিমিতিবোধ এবং গল্প বলার ক্ষমতা অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক।

 

অমিতাভ দাসের "ছক্কুমামার গল্প" এই সংখ্যার অন্যতম আকর্ষণ। ছক্কুমামা একটি চমৎকার চরিত্র বয়স্ক, একটু খামখেয়ালি, কিন্তু নিজের বিশ্বাসে অটল। মাথা নিচে পা ওপরে করে যোগা করা থেকে শুরু, তুলসীপাতার চা, জ্যোতিষীর পরামর্শ, শিবলিঙ্গ প্রতিষ্ঠা এবং তারপর কোমরের ব্যথা সেরে যাওয়া সব মিলিয়ে একটা আস্ত মানুষ দাঁড়িয়ে যান। লেখক ভাইপোর বিজ্ঞানমনস্ক সংশয় আর মামার সরল বিশ্বাসের মধ্যে যে দ্বন্দ্বটুকু তৈরি করেছেন, সেটি গল্পকে সহজ-মজার স্তর থেকে একটু গভীরে নিয়ে যায়। কাশী যাওয়ার পরিকল্পনা, আর "স্বপ্নে" বাবা বিশ্বনাথের ডাক এই সমাপ্তিটুকু সত্যিকারের হাসির রস নিয়ে আসে।

 

শৈশব স্মৃতি যে লেখা বুকে থেকে যায়

 

মানসী গাঙ্গুলীর "গ্রীষ্মদুপুরের সেই দুষ্টুমিগুলো" এই সংখ্যার মুকুটমণি বললে অত্যুক্তি হয় না। এটি শুধু একটি স্মৃতিচারণ নয়, এটি একটি সম্পূর্ণ যুগের দলিল। যে দুপুরে ঘুঘু পাখি ডাকত, কৃষ্ণচূড়া আগুন ছড়াত, মা-ঠাকুমা ঘুমোতেন আর বাচ্চারা মেতে উঠত নানা দুষ্টুমিতে সেই দুপুরের বর্ণনায় লেখিকা এমন সূক্ষ্ম ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য বিবরণ দিয়েছেন যে পাঠক নিজেই সেই ঘরে গিয়ে বসে পড়েন।

 

খেলনাবাটির রান্নাঘর থেকে গোয়ালঘরে গিয়ে গরুর দুধ দুইয়ে আনা, শিলে আমছেঁচা, ঝিনুক দিয়ে আমের খোসা ছাড়ানো, কলাপাতার ঠোঙায় আচার ভাগ করে নেওয়া, বাঁশের তরোয়ালের ডগায় আলতা মাখিয়ে রানা প্রতাপের যুদ্ধ প্রতিটি বিবরণ এত নির্ভুল এবং এত প্রাণবন্ত যে মনে হয় লেখিকা গল্পটা লেখেননি, আঁকছেন। সাঁওতাল দাশুর কথা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হাতের কাজে দক্ষ সেই মানুষটি বাচ্চাদের আবদার মিটিয়ে তরোয়াল বানিয়ে দিত, সযত্নে চাঁছত যাতে নরম হাতে চোঁচ না ফোটে এই মানবিক স্পর্শটুকু লেখাটিকে আলাদা উচ্চতায় নিয়ে যায়।

 

লেখাটি পড়তে পড়তে যে কোনো পাঠকের নিজের শৈশব চোখের সামনে ভেসে উঠবে। এবং শেষ পঙক্তিতে এসে — "বড় হবার সঙ্গে সঙ্গে গ্রীষ্মের দুপুরের রঙ বদলাতে লাগল, কিন্তু সেই ছোট্টবেলার দুপুরগুলো আর ফিরে এল না কোনোদিন" পাঠক একটু থমকে যান। এই বেদনা সার্বজনীন।

 

ছবির পাতা ও কমিকস দেখার আনন্দ

শ্রীপর্ণা ঘোষের ছবি ও লেখায় কমিকসটি পত্রিকার একটি বিশেষ আকর্ষণ। আমার ছোট থেকেই কমিক্সের প্রতি আগ্রহ, তাই শ্রীপর্ণার কালো বিড়ালের গল্প আমার বেশ লেগেছে। ছবির পাতায় জয়দীপ সাহা (দশম শ্রেণি, সোদপুর হাই স্কুল), শ্রেয়সী ঘোষ (সপ্তম শ্রেণি, পূর্ব বর্ধমান) এবং মাত্র ছয় বছর বয়সী রণবীর দত্তের (ত্রিপুরা) আঁকা ছবি স্থান পেয়েছে। বিভিন্ন বয়সের, বিভিন্ন রাজ্যের শিশুদের শিল্পকর্ম একই পাতায় দেখা এটাই এই ম্যাগাজিনের শক্তি। ছয় বছরের একটি শিশুর কাজকে মর্যাদা দিয়ে ছাপানো শুধু উৎসাহ নয়, এটি একটি সংস্কৃতি গড়ে তোলার কাজ।

 

সামগ্রিক মূল্যায়ন

ছোটোদের সাইন্যাপস্‌-এর এই বৈশাখ সংখ্যাটি কেবল বিনোদনের পত্রিকা নয়। এখানে রসিকতা আছে, রোমাঞ্চ আছে, নস্টালজিয়া আছে কিন্তু সেই সঙ্গে আছে সামাজিক সংবেদনশীলতা, শিল্পের প্রতি শ্রদ্ধা, এবং ছোট-বড় সব বয়সের মানুষকে একসঙ্গে ধরে রাখার সেই বিরল ক্ষমতা যা সত্যিকারের ভালো সাহিত্যের লক্ষণ।

 

পত্রিকাটি শুধু ছোটদের জন্য নয়। যে বড় মানুষ একটু থেমে এর পাতা উলটাবেন, তিনিও নিজের হারিয়ে যাওয়া শৈশবকে খুঁজে পাবেন কোনো না কোনো লেখায়। এই ক্ষমতাই ছোটোদের সাইন্যাপস্‌-কে আর পাঁচটা শিশুপত্রিকা থেকে আলাদা করে রাখে।


পাঠপ্রতিক্রিয়া -

আলোচক – পারমিতা মন্ডল

 
 

প্রথমেই বলি প্রচ্ছদটি অসাধারণ, একদম ছোটদের মনের মতোই রঙিন।

 

ঋপণ আর্যর ছবি মনকাড়া হয়েছে। ছোটবেলার স্মৃতি মনে করায়। সাদা কালো ছবিটিতে দাঁড়িয়ে থাকা চারজন আমি ও আমার তিন বন্ধু ছাড়া আর কেউ তো নয়।

 

"কফি রহস্যে কাপুচিন" কমিক্স শ্রীপর্ণার মস্তিষ্ক প্রসূত। লেখা ও ছবি দুটোই দুর্দান্ত হয়েছে। তবে প্রথম পাতার লেখাগুলো আর একটু বড় হলে পড়তে সুবিধা হতো। যেভাবে কফি বিশেষজ্ঞ কাপুচিন গোয়েন্দাগিরি করলো, সত্যি কী যে ভালো হয়েছে! ভালোবাসা নিও শ্রীপর্ণা।

 

রতনতনু ঘাটী মহাশয়ের ছড়া "এসো এসো তুমি নতুন বছর" - এর বিষয়ে আর কী বলব!

 

ছন্দে ছন্দে মহা আনন্দে ছড়া পড়ে যাই

 

লেখককে আমার শত নমস্কার জানাই

 

ছড়াটিতে নতুন বছরকে উদ্দেশ্য করে মনের ইচ্ছা জানানো হয়েছে। এক কথায় মানবিক আবেদন ধরা পড়ে।

 

প্রবাহনীল দাসের কবিতা "এই গরমে" বেশ ভাবায়। সত্যিই এই গরম থেকে কীভাবে নিস্তার পাওয়া যায় তার হদিশ দিয়ে যায় এই কবিতা।

 

সবিতা রায় বিশ্বাসের লেখা ছড়া "পয়লা বোশেখে" পড়তে ভালো লেগেছে। পয়লা বৈশাখ, বাঙালির নতুন বছর শুরুকে ঘিরে উদযাপনের নানা দিক তিনি তুলে ধরেছেন ছড়ার প্রতিটা ছত্রে।

 

শতদ্রু মজুমদারের গল্প "কাঁদনের গল্প।। এই যাঃ" বেশ মজার ছলে শিক্ষণীয় একটি গল্প। আজকালকার যুগে সুযোগসন্ধানী মানুষের অভাব নেই। ভালো কাজ করলেও তারা সেটার দাম দিতে পারে না। নিজের স্বার্থের জন্য চুপ থাকে।

 

সৃঞ্জয় মৌলিকের লেখা গল্প "দাদু ও তার পোষ্য" পড়ে আমারও চোখ ছানাবড়া হয়ে গেল। দাদুর পোষ্য কুমীর! ওরে বাবা! সৃঞ্জয়ের কল্পনার জগত অনেক বড় হোক। ভালো হয়েছে গল্পটি।

 

অমিতাভ দাসের লেখা "ছক্কু মামার গল্প" এক কথায় অসাধারণ। মামা ভাগ্নার কথোপকথন বেশ মজার আবেশ ছড়িয়ে দেয়।

 

শৈশব স্মৃতি বিভাগে মানসী গাঙ্গুলীর লেখা "গ্ৰীষ্মদুপুরে সেই দুষ্টুমিগুলো" পড়লাম খুব মন দিয়ে। ছোটবেলার দিনগুলো আর ফেরে না। শুধু স্মৃতি রয়ে যায়। প্রতিটা লাইনে তাঁর ছোটবেলা বুনেছেন লেখক। খুব সুন্দর এবং একটু মনকেমন করা। তবুও স্মৃতি নিয়েই তো এগিয়ে চলা।

 

ছোটোদের ছবিগুলোও খুব সুন্দর হয়েছে। আরও অনেক লেখো, আঁকো তোমরা।

 

সব মিলিয়ে সংখ্যাটি চমৎকার লেগেছে। শুভেচ্ছা জানাই সম্পাদক মৌসুমী ঘোষ দিকে যার লেখা সম্পাদকীয়টি ভারি মিষ্টি।


পাঠপ্রতিক্রিয়া - ৪

আলোচক – মহুয়া মীল


ছোটোরা, তোমাদের নতুন সাইন্যাপসের রঙ্গিন ঝকঝকে প্রচ্ছদ দেখে আমিও  তোমাদের মতই হুড়োহুড়ি করে পড়ে ফেললাম বৈশাখ, ১৪৩৩ এর সংখ্যা।

 

তোমাদের মধ্যেই কোনো চারজন ছুটির দুপুরে গাছের তলায় খেলার ফাঁকে গল্প করছিলে আর ঋপণ আর্য ছবি তুলে নিয়েছেন। ভারি সুন্দর সাদা-কালো ছবি। জানো তো আমি এখনও কমিকস পড়তে খুউব ভালবাসি।

 

শ্রীপর্ণা ঘোষ, তোমাদের একটা  ছোট্ট দিদি নিজেই এঁকেছে, লিখেছে। যেটা পড়ে আমি জানলাম ১২৪ বা তারও বেশি রকমের কফি বিনস পাওয়া যায়। আর জানলাম ছোট্ট গোয়েন্দা রিমিল আর কাপুচিন মিলে...., আর বলব না, তোমরা পড়ে নিও। নতুন বছর নিয়ে ছড়া লিখেছেন রতনতনু ঘাটী। নতুন বছর কী কী নিয়ে আসে জানো তো, তোমরা? পড়ে দেখো তো তোমাদের জানার সঙ্গে মিলছে কিনা। তোমাদের কিছু চাওয়ার থাকলে বলে দিও,সবার সব আশা পূর্ণ হবে নতুন বছরে। প্রবাহনীল দাস, তোমাদের আরেক বন্ধু ছড়া লিখে এই গরমে সাবধানে থাকতে বলেছে। সবিতা রায় বিশ্বাস ছড়া লিখেছেন পয়লা বৈশাখ নিয়ে। আমার বাপু সব ছড়া মুখস্থ হয়ে গেছে, তোমরাও করে নিও।

 

গাছ চুরি শুনেছ কখনো? কাঁদন তো এবার বাটি, ঘটি কিছু চুরি না করে গাছ চুরি করেছে। ও কি তোমাদের মত

 

গ্লোবাল ওয়ার্মিং এর বিপদ বুঝতে পেরেছে? লেখক শতদ্রু মজুমদারকে জিজ্ঞেস করে দেখো তো।

 

সৃঞ্জয় মৌলিকের দাদুর গল্প পড়ে এক্ষুনি ওর দাদুর বাড়ি যাওয়ার ইচ্ছে হচ্ছে , পুকুরে পোষা কুমির দেখার জন্য। অমিতাভ দাসের  ছক্কুমামার গল্পটা দারুণ মজার। মামা যোগব্যায়াম আর শিবপুজো করে কোমড়ের ব্যাথা কিরকম সারিয়ে ফেললো বলো তো! বিশ্বাস না করলে কিন্তু  মামা তোমাদের বেনারস নিয়ে যাবেন না।

 

তোমাদের তো এখন গরমের ছুটি, দুপুরে কি করোএসি ঘরে বসে প্রোজেক্ট করো তো? আমরা কি করতাম বলো তো? ' শৈশবের স্মৃতি ' তে মানসী গাঙ্গুলি লিখেছেন সে গল্প। পড়তে পড়তে আমার তো নিজের ছোটোবেলা মনে পড়ে যাচ্ছিল।

 

সব শেষে মন ভরে গেল শ্রেয়সীরণবীর আর জয়দীপের ছবি দেখে। কী সুন্দর এঁকেছে!

------------------------------------

জ্যৈষ্ঠ সংখ্যার প্রচ্ছদ।। রাজীব কুমার ঘোষ।
ছবিটি নজরুল ইসলামের মূল ছবি থেকে লিনো কাট শৈলীতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে বানানো।
------------------------------------

সাইন্যাপস্‌ আমন্ত্রণ---------------------------

সুধী, আগামী

 ১৩ জুন, ২০২৬ শনিবার বিকেল পাঁচটায়,
“সাইন্যাপস্ পত্রিকা স্মারক সম্মাননা ২০২৫”
আমরা তুলে দিতে চলেছি
হুগলির সুপরিচিত কবি বোধিসত্ত্ব মুখোপাধ্যায়ের হাতে।
অনুষ্ঠানটি হবে কবিকে ঘিরে। তার এবং তার কবিতা সম্পর্কে বক্তব্য রাখবেন অপরাপর সাহিত্য ব্যক্তিত্ববৃন্দ।
এই সম্মাননা অনুষ্ঠানে আপনার উপস্থিতি আমরা প্রত্যাশা করি।
অনুষ্ঠানস্থল – কিশোর প্রগতি সংঘের গ্রন্থাগারের সভাকক্ষ। কামারপাড়া, চুঁচুড়া
— রাজীব কুমার ঘোষ, মৌসুমী ঘোষ
 

 
সাইন্যাপস্‌ বিজ্ঞাপণ---------------------------