![]() |
| কবি বোধিসত্ত্ব মুখোপাধ্যায় |
সাইন্যাপস্ পত্রিকা স্মারক সম্মাননা ২০২৫ পেতে চলেছেন কবি বোধিসত্ত্ব মুখোপাধ্যায়।
কবিকে নিয়ে এই অনলাইন সংখ্যাটি সাইন্যাপস্ গড়ে তুলছে। যেহেতু অন্ লাইন তাই এই সংখ্যায় ক্রমাগত নানা তথ্য ও লেখা যোগ হতেই থাকবে। কবিকে নিয়ে আপনার লেখা পাঠাতে চাইলে ইউনিকোডে লিখে synapsepatrika@gmail.com এই ই-মেলের মেল বডিতে পেস্ট করে পাঠাবেন। আগে প্রকাশিত লেখাও প্রকাশ করতে আমরা ইচ্ছুক।
কবি বোধিসত্ত্ব মুখোপাধ্যায়ের কবিতা
কবি বোধিসত্ত্ব মুখোপাধ্যায়ের কবিতা নিয়ে আলোচনা
১। প্রেম ও প্রেমহীনতার অলৌকিক দ্বন্দ্ব ।। রমাপ্রসাদ মিত্র
২। বাক্-মঞ্জরীর ঘ্রাণ কবিতা সংকলনকে নিয়ে দীপক রঞ্জন ভট্টাচার্য্যের আলোচনা
৩। বোধিসত্ত্ব মুখোপাধ্যায়ের কবিতা নিয়ে আলোচনা করেছেন পারমিতা ভৌমিক
ছবিতে কবি বোধিসত্ত্ব মুখোপাধ্যায়
।। কবি সম্পর্কে তথ্যাবলি ।।
জন্ম ১৯৬৮
পিতা কালীপদ মুখোপাধ্যায়
মাতা লতিকা মুখোপাধ্যায়
পড়াশুনা
বেলুন আতরমণি নিম্ন বুনিয়াদি বিদ্যালয় (স্থাপিত ১৯৫২)
শশিভূষণ সাহা উচ্চ বিদ্যালয় (স্থাপিত ১৯৫১)
শ্রীগোপাল ব্যাণার্জী মহাবিদ্যালয় (স্থাপিত ১৯৫৮) থেকে বাংলায় স্নাতক
প্রথম কবিতা প্রকাশ — মনতর্পণ।। চৌমাথা, চুঁচুড়া।।
।। প্রথম কবিতা পুস্তিকায় উপস্থিতি ।।
শর্বরীবিভায় চিত্রমালা (প্রকাশ ২২শে শ্রাবণ, ১৩৯৭; ৮ অগাস্ট, ১৯৯০)
প্রকাশক অসিত সেন, প্রচ্ছদ সুজিত দত্ত। মুদ্রক হুগলী প্রেস। মূল্য ছিল ৮ টাকা।
তিন কবির অন্যতম (অন্যরা সনৎ দে, রমাপ্রসাদ মিত্র)
বোধিসত্ত্ব মুখোপাধ্যায়ের অংশটির নাম ছিল "কল্প ত্রিপিটক"। উৎসর্গ মা ও বাবাকে।
১৯টি কবিতা সঙ্কলিত হয়েছিল।
(চিত্রণ, গাছ, প্রহরে প্রবাহ, বর্ণালী ও মাধুরী, হাঁস ও কচ্ছপের গল্প, গঁগ্যার ছবি, সমুদ্র পর্ব, অস্ত্র-ভিক্ষা, ভিখারী, পাথর পাগল, ঘর, পক্ষীতীর্থম্ ঘুরে, ব্যাধ, জ্যামিতি, আবহ বিকার, ছায়াছবি, নিজস্ব উনুন, উৎসব, ঝড়-বৃষ্টি-ভয়)
।। প্রথম একক কবিতা পুস্তিকা ।।
চন্দ্রাহত শিলালেখ (প্রকাশ ১৯৯৪)
রচনাকাল ১৯৯০ থেকে ১৯৯৪
প্রচ্ছদলিপি রমাপ্রসাদ মিত্র। মুদ্রক অসিত সেন, হুগলী প্রেস। মূল্য ৭ টাকা।
প্রকাশক অভিজিৎ চক্রবর্তী ও অরূপ সেনগুপ্ত
সাংস্কৃতিকী "অভিক্রম", বোসের ঘাট, চুঁচুড়া।
উৎসর্গ শ্রীগৌতম মুন্সী ও শ্রীতুলসী চক্রবর্তী।
উৎসর্গ পৃষ্ঠার কবিতা ব্যতীত ৩৩টি কবিতার সঙ্কলন।
(অন্ধ, আকাশের গভীরে, সাদাপালক, সূর্য, মিলন, সরে যাই, শব্দ, বসন্ত, আলোকতীর্থ, তট, সরণ, জন্মান্তর, ঝরাফুল, সামবেদ, নতজানু, বিন্দু, নিমফুল, অশথপাতা, শ্রদ্ধা, বকুলমালা, অন্ধকার, শূন্যতা, ডাক, মুক্তি, ফেরা, বৃষ্টিতে, প্রতিবাদ, ব্যক্তিগত, রাত্রি, সুন্দর, কাল সারারাত, হারিয়ে যাচ্ছি, সব অসুখ সেরে গেছে।)
।। দ্বিতীয় কবিতা পুস্তিকা।।
কালচক্রযান (প্রকাশ ২ সেপ্টেম্বর ২০১৮)
প্রচ্ছদলিপি স্বপন মাতব্বর
প্রচ্ছদ মুনিকেশ শীল
ব্যাক কভার সুদীপ্ত ভট্টাচার্য
প্রকাশক দিনান্তের অন্বেষণের পক্ষে তথাগত মৌলিক
মূল্য ২০ টাকা
উৎসর্গ বন্ধুবর রমাপ্রসাদ মিত্র-কে।
উৎসর্গ কবিতা ব্যতীত ১২ টি কবিতার সঙ্কলন।
(কবিতাগুলি ১,২ নম্বরে চিহ্নিত। প্রথম পংক্তিগুলি উল্লেখ করা হল।
১ কথা কও বর্ণমালা, কথা বল নতুন জন্মের
২ কবিতার কল্পনায় কোনোদিন একা ছিল নাকি
৩ ঘুমলতা পাক খায় মাথার ওপরে, মেঘ-ভার
৪ সুস্থির বিশ্বাস থেকে নিঝুম সন্ন্যাসে যেতে চেয়ে
৫ কোনোদিন কারো কাছে বলিনি তোমার কথা, ছবি
৬ পাতাবাহারের নীচে উদ্গত অশ্রুর মতো জল
৭ নুন-হলুদের গানে, পাখীর সকাল, তার পাখায় বিস্তারে
৮ অস্পষ্ট আলোর মতো সময়ের বুকে
৯ আমাকে নিহত করে দলে পিষে চলে গেল যারা
১০ ক্যানভাসের শূন্যতায় শুধু এক অলৌকিক চাঁদ
১১ আমার সনেটগুচ্ছ খেয়ে নীল উইপোকা যত!
১২ কালযানে স্থির বুদ্ধ ধ্যানময়, করুণামৈত্রীর )
।। তৃতীয় কবিতার বই।।
বাক্-মঞ্জরীর ঘ্রাণ (প্রকাশ ডিসেম্বর ২০১৯)
প্রচ্ছদ সুদীপ্ত ভট্টাচার্য
প্রকাশক গৌতম মুখোপাধ্যায়, মানবজমিন প্রকাশন, নিউ কোদালিয়া ব্যান্ডেল।
মূল্য ১৩০/-
উৎসর্গ অসীম ভট্টাচার্য, দেবস্মিতা ভট্টাচার্য
৫৬ টি কবিতার সঙ্কলন।
(জোর, বাক্ মঞ্জরির ঘ্রাণ-১, বাক্ মঞ্জরির ঘ্রাণ-২, দিনগুলি, মায়া, তৃনাদপি, চাষ, বৃষ্টির ছবি, চিঠি, জিজ্ঞাসা, রূপান্তর, বেড়ানো, গ্রহণ, শম, গল্প, সম্পর্ক, রাই, ছায়া, পদাবলী, কম্পন, আগমন, দহন, দুপুর, বিভ্রম, মহাদুপুর, চর্যাপদ-১, চর্যাপদ-২, চর্যাপদ-৩,বিস্ময়, অবস্থান, সিদ্ধি, বাড়ি, তর্পণ, বিষাদ মঙ্গল, শূন্যতা, কাটা ঘুড়ি, বিষলতা, যাপন, মাথুর, কুহক, যন্ত্রনা, অক্ষর, বাসনা, নিখোঁজ, আগুন অক্ষর-১, আগুন অক্ষর-২, শূন্য, গাছ, দাহ লিপি-১, দাহ লিপি-২, নিস্পৃহ, জন্ম, গন্ধ, রূপ, আমিও বাজতে পারি, সংসার)
বোধিসত্ত্ব মুখোপাধ্যায়ের কবিতা ।। পর্ব ১
সাইন্যাপস্ নির্বাচিত কবিতা (প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থগুলি থেকে)
(মূল বানান অপরিবর্তিত)
কল্প ত্রিপিটক (শর্বরীবিভার চিত্রমালা) থেকে
উৎসর্গ পৃষ্ঠার কবিতা
সমস্ত দিন আজ মুচড়ে উঠেছে বুক প্রগাঢ় চিন্তায়।
সেই স্বর শোনা গেছে; দীর্ঘ কোলাহলেরও মাঝে তার স্বর
অবিনশ্বর তরঙ্গে উদ্বেলিত ক'রে দিয়েছে মস্তিষ্কের কোষ,
বিরামহীন সঙ্গীতে ঝঙ্কত হ'য়েছে তার চলার ছন্দ।
সেকি ফিরে যাচ্ছে? নাকি অবিচল, স্থির? ঘোষণা ক'রেছে
শুধু, সতর্ক ক'রেছে; অস্বীকারের নতুন এক ভঙ্গীমা, না-
কি শক্তির দম্ভ!
আবার নতুন ক'য়ে প্রস্তুত ক'রতে হবে খাতার লাইন, নতুন
ক'রেই শুরু হবে চলাফেরা, তবু ছাড়তে পারবো না এই
প্রিয় আসন, এ সজ্জা; যাই হোক না-কেন আমি আছি
এবং আমি থাকবো এই সাঁকোর ওপর, যেমন ছিলাম।
তবুও চিন্তা হয়-যখনই পরিচিত শব্দের অর্থ যায় পাল্টে, ব্যবহারও।
চিত্রণ
প'ড়ে আছে কাঠ-কুটো-বালি, যজ্ঞ অগ্নি
নির্বাপিত প্রায়, তবু উঁকি দেয় মৃদু
ধোঁয়ালীন আগুনের অনুজ্জ্বল সর;
বৈকালিক ক্ষীণ বায়ু বিস্মৃত করায়
সূর্যের প্রদাহরূপ; কারো বা নিবিদে
জ্বলে সুর যন্ত্রণায়, নির্জন প্রদেশে
কোনো কোনো বৃদ্ধ লোল আস্তরণে ভেজা,
বে-আব্রু পোষাকে আঁকে তিমির আকাশ।
এ মঞ্চে যারাই এসে গেয়ে গেছে গান
প্রাণ মুক্ত চাপা শ্বাসে, চেতনাকুঠুরী
বৈশাখীর রূপদাহে হ'য়েছে উজ্জ্বল,
ছুঁয়েছে রূপালী রেখা মাটির কলস।
মাছেদের অন্ধ খেলা ঢেউয়ের দোসর;
বন্ধ চোখে ভেসে ওঠে এসব চিত্রণ।
গঁগ্যার ছবি
শব্দতরঙ্গ ভেঙে উঠে আসে ছবি
গঁগ্যার তুলির ঘাতে,
সে ছবি খুব পরিচিত, তবু
তাতে অজ্ঞাত মুহূর্তের রঙ।
তার নাম জানি না,
হয়তো বা নক্ষত্রসূচক
নামে তার কোনো পরিচয় আঁকা নেই।
সমুদ্র পর্ব
১.
সমুদ্রের কাছে গিয়ে প্রতিদিন বলি
— থিতু হও রত্নাকর,
সমূহ অগ্নি পাক নির্বাণ তোমার স্পর্শে—
আকাশকে বুকে নিয়ে নির্বিকার সমুদ্র
রহস্যআঁচলে ঢাকে দেহ।
মৌন ভাব সম্মতিই — প্রতিদিন ভেবে
নিজস্ব স্বভাবে
জলের বুদ্ধদ নিয়ে খেলা করি, আর
এ হাত বাড়িয়ে দিই স্পর্শ অভিলাষে;
তন্দ্রাহত দ্বীপের বুক থেকে
ঘুম আলো ও ঝিনুক ছিনিয়ে আনতে
ক্রমাগত দীর্ঘ হয় হাত
প্রতিদিন এ খেলায় নিদারুণ শ্রান্ত হয়ে আজ
জোর ক'রে বাড়াই সে হাত সমুদ্রের দিকে,
দেখি সহস্র খণ্ডের মাঝে
গুপ্ত রেখে শিল্পসত্তা
মৃদু চীৎকারে ব'লে ওঠে—
থিতু হও, তবে সমূহ অগ্নি পাবে নির্বাপণ মন্ত্র
গরলের মহিমায়।
২.
তোমার কাছেই যেতে চাই
তোমাকেই শেষ কথা ব'লে যাবো আমি।
হে ঊর্মিমালি,
প্রবালের দ্বীপ গ'ড়ে আপাত সুনীল হ'য়ে
সান্তনা দিতে চাও,
তবু শুভ্র শঙ্খ
ধ্যানের সরল ছবি দেখে
তোমাকেই পেতে চেয়ে দাঁড়ায় তীরে;
অথচ তোমার খেলা উপহাসে মর্মরিত ছিল—
সেই দেখে নিজ মুখে শঙ্খ
বিবর নির্মাণ করে, স্তম্ভিত হয়।
শঙ্খের শুভ্রতায় হ'তে যদি শ্বেতাঙ্গী
অথবা প্রবালে রক্তক্ষীর,
ডুবে যেতো সমুদয় প্রিয়তার বোধ।
হে সমুদ্র নীলাম্বরি,
ঝিনুক ফুলের বালা একহাতে প'রে
অন্যহাতে শঙ্খ নিয়ে
তোমার কাছেই যাবো
তোমার গর্ভজাত অগ্নিকে
আমার এ গর্ভে নিতে।
৩.
ঘন সন্ধ্যায় আমি
আকাশের বুকে খুঁজি সেই পাখি, যার
ডানায় লগ্ন ছিল প্রিয়তার সুর;
গানের অমরাবতী
সাজানো ছিল সে কণ্ঠে মধুর তানে।
ব্যর্থ প্রয়াস পাখিদের খোঁজ জানা
তবু এক আশা মূর্তিতে দেয় রঙ,
নেশার আবহে জাগে একা শুকতারা
প্রণত সেখানে নীহারিকা, ছায়াপথ।
সফল সুরেই মঞ্জরী ঢালে সুধা;
আকাশের নীল দর্পণে পড়ে গভীর আলোর বন্যা,
জোনাকির আলো মৃদু মৃদু দোলে, ক্রমে
পাখির কাকলি, সাগরের স্বর একযোগে দুলে ওঠে।
পরিচিত স্বর শুনে
নীলাম্বরীকে আবাহন করি ঘরে;
যেহেতু আমার খাঁচা নেই কোনো, তাই
পাখির স্পর্শ হয়তো পাবোনা ভেবে
উড়ন্ত পাখি দেখেই তৃপ্ত হই।
সুনীল বিন্দু এসে গুঞ্জন তোলে ভাঙা আঙিনায় জোয়ারের মতো আজ,
আবেগ যদিও নেই জোয়ারের, তবু
সে তো জোয়ারের প্রতিরূপ হ'তে জানে।
সংগীত নেই, পাখিরা স্তব্ধ কালো
হলুদ জোছোনা সমুদ্র কাছে ভেবে
নৃত্য আবেগে ছুটে যায় বহু দূরে,
নদীও সবেগে সমুদ্র পেতে ছোটে
নদী নই আমি, তবু
জোয়ার-ভাঁটায় মেতে ওঠে সারা দেহ।
8.
সমুদ্রের কাছে গেলে শোনা যায় আগুনের গান,
যেখানে নদীর বেণী
ফিরে এসে ফিরে পায় নিজের বিভূতি
সেখানেও আগুনের কলতান ভাসে;
আগুনের ফুল ফোটে
যেখানে নিখাদ মাঠ রাতের বিস্ময়ে সুগভীর
এভাবেই নভো
আগুনের আঁচ পেয়ে মুক্ত হ'য়ে থাকে।
সমুদ্রের গর্ভে জাত আগুনের শিখা
কখনো হ'য়েছে না-কি নরম পেলব?
যে শিখা মাঠের বুকে
জাগায় রহস্যক্ষুধা, সে কি হ'তে পারে
অহিংস নীল?
এসব অজানা, তবু বারবার যাই
সমুদ্র নিকটে ভেবে নিরালা বাগানে।
অনির্বাণ শিখা চাই, আজ
রোদের সংজ্ঞা থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন হবে সে;
যে আগুনশিখা
মুহূর্তের বুকে পারে ছাই ক'রে দিতে
এই সুতোর পোষাক;
যে সব আগুন দেবে জল, ঘুম, বাতি
রঙের ছোঁয়ায়
তার স্পর্শ নিতে
বাড়িয়ে দিয়েছি হাত সমুদ্রে ও মাঠে।
৫.
মানুষ পোড়ার গন্ধ পেলাম সমুদ্রের ধারে
সুদেহী মানুষ পোড়ে বিষন্ন মূর্তিতে
সমুদ্র বাতাস তাকে সান্ত্বনা দিতে চেয়ে
ছুটে গিয়ে স্তম্ভিত হয়, আর ফিরে এসে
সমুদ্রকে স'রে যেতে বলে।
নিখুঁত মানুষ পুড়ে গেলো
জানলো না কেউ,
কোনো উত্তরপুরুষ দিল না বিসর্জন
দগ্ধ অস্থি মজ্জা,
তার ছায়া হ'লো সমুদ্রে বিলীন।
সমুদ্রের নিকটে গিয়েও একটি মানুষ
সমুদ্র পেলো না তার হাতের মুঠোয়।
নিজস্ব উনুন
এইমাত্র একটি পাখি ভূমায় গেল
এইমাত্র একটি মেঘ অদৃশ্যে লুকোলো
এইমাত্র একটি মেয়ে কান্না জুড়লো।
এ সবই যেহেতু ঘটেছে এইমাত্র, তাই
এখন বিষাদপ্রহৃত বেলা এবং আমি
নিজের নগ্নতাকে ঢাকবার আয়োজনে
বেড়ালের সাথে পাতালাম সখ্য।
আমিও তাপস হ'লাম ওর মতই।
চন্দ্রাহত শিলালেখ থেকে
(মূল বানান অপরিবর্তিত)
উৎসর্গ পৃষ্ঠার কবিতা
বড় বেশি সত্য ছিলো তোমার জাগরণ,
চাঁদ ছুঁয়ে নেমে এলো অক্ষরের পর অক্ষর
রক্তবর্ণ ওড়না উড়তে উড়তে কোথায় হারিয়ে গেলো যেন
তারপর সকালের আলোয় তুমি রোদ্দুর
সবাই তোমাকে বড় সুন্দর ছুঁয়ে আছে আজ।
সাদাপালক
সাদাপালক তিমিরহরণ সাদাপালক আয়
জ্যোৎস্না কুড়ুই, কাঠকুডুনি জ্যোৎস্না তোর গায়!
আমের বকুল বুকের পাঁজর পলাশ বুঝি হাত!
বটের পাতার মুকুট পাবি ভাঙবো ঝড়ের রাত!
সাদাপালক, ভীষণ অসুখ, শ্মশানবন্ধু নেই
যারা ছিলো আগুন খেলো, হারিয়ে দিলো খেই।
বৃষ্টি তখন মধ্যরাতে দুয়ার ছিল খোলা
এক চিলতে মেঘের মতো বাতাস দিলো দোলা।
ঝাপ্টে এসে বিছানাতে আসন নিলো শিল
চোখের মণি জ্বলতে জ্বলতে দর্জা দিলো খিল
খিল পড়লো বাইরে তবু পদ্মদীঘির চুল
জড়িয়ে এলো, ঘরের ভেতর ভয়ে ভাঙলো কূল।
সাদাপালক, রাত্রিব্যাপী কূল ভাঙছে দেখি
বালিশ দিলাম তাও হলো না শরীর মুচড়ে বেঁকি।
বেঁকতে বেঁকতে প্রণাম হলাম, প্রণত ধরিত্রী
কে যে আগুন, কে কুটোটি, কেই বা সৎ-সতী!
তিমিরহরণ সাদাপালক, বিকেল হলেই আয়
বাবার দেওয়া উড়নি দেবো জড়িয়ে তোর গায়!
অশথপাতা
উল্টো হাওয়ায় উড়িয়ে দিলাম অশথপাতার মুখ
জলের দরে বিকিয়ে দিলাম আস্ত ব্রহ্মজ্ঞান
মনের মতো নাচিয়ে নিলাম ময়ূরকণ্ঠী কেশ
দাবানলে পুড়িয়ে নিলাম
হারিয়ে যাওয়া এবং হঠাৎ অন্ধকারে
কুড়িয়ে পাওয়া চিকনবরন সুখ
লোধ্রপাড়ের শাড়ি পরে যে মেয়েটি
অগাধজলে দাঁড়িয়ে একা
নিভিয়ে ছিলো জ্ঞান,
জলোচ্ছ্বাসী তাঁর হাসিটি কোথায় ছিলো? আজকে আবার
কেমন করে হাতের মুঠোয় বন্দী করে
কোজাগরীর জ্যোৎস্না যেন
ছড়িয়ে দিলাম, উড়িয়ে দিলাম উল্টো হাওয়ায়
তা জানি না, হঠাৎ দেখি
অশথপাতায় আবার এলো বর্ষামাখা গান;
"শেকড় চেনো?"-বললো পাতা
আমি বললাম “হ্যাঁ”।
আকাশ চিরে উঠলো হেসে সঞ্জীবনীপাতা,
ভেসে ভেসে দূরের আমি ঠেকলো এসে দারুদ্বীপে একা
যে মেয়েটি চিতায় চিতায় লক্ষ বছর ঘুরছিলো, আর
অগ্নিহস্ত বাড়িয়ে কেবল ডাকছিলো, সে এখন কোথায়?
এই পাতা, তুই সেই মেয়েকে এবার পাঠা!
এখন পাগল হাওয়ায় হাওয়ায় বর্ষামুখর গান,
এখনই ত সময়, আহা! নতুন করে শিক্ষা নেবার
পুড়ন্ত ধূপ-দান!
যা উড়ে যা অশথপাতা, নিভিয়ে অভিমান
লক্ষ বছর যে মেয়েটি চিতায় ছিলো, এবার তাকে আন্?
ফেরা
যতই ডাকো
আর যাবো না।
বৃষ্টি-বাদল মাথায় নিয়ে বারদুয়ারে দাঁড় করিয়ে
চোখের ওপর ছুঁড়লে বালি,
ফিরিয়ে নিলে আঁকার যত রঙের তুলি
যাবজ্জীবন পূর্ণ ঝুলি উজাড় করে
যা দিয়েছি
সবই যদি মিথ্যে ছিলো
বিশ্বব্যাপী রূপের আগুন কে জ্বালালো?
বাঘের মতো গোঁয়ার চোখে দাঁড়িয়ে ওরা
ভয়ের কথা বললো, তবু
তোমার কথা ভেবে আমি সব হারালাম!
অন্ধ এখন,
টলমলিয়ে হাঁটছি আঁধার-উৎস থেকে
অনির্দেশের শেষ সীমানায়
হোঁচট খেয়েও ফিরবো ঠিকই আবার আদি
শান্তিপুরের ব্রহ্মডাঙায়!
সব অসুখ সেরে গেছে
সব অসুখ সেরে গেছে
অমৃতের পাত্র হাতে আমিই দেবতা
নিয়ে যাও তোমাদের অংশটুকু, আর
যেখানে আগুনশিখা, ঢালো অন্ধকারকুটো,
ভুল মেধা-অভিশাপ
খুলে ফেলো মিথ্যা আচরণ
সমস্বরে বলে ওঠো
আমি তূণ আমি তীর আমারি ভেতরে সেই আদি ব্রহ্ম-নাদ
কৃষ্ণগহ্বর থেকে পাতাল অবধি চলে আমার ভ্রমণ
সব পাওয়া হয়ে যাবে আমাকেই পেলে।
সব অসুখ সেরে গেছে
এই দেখো
আমি এক বিরাট বিশ্ব
কালচক্রযান থেকে
(মূল বানান অপরিবর্তিত)
উৎসর্গ পৃষ্ঠার কবিতা
বন্ধুবর রমাপ্রসাদ মিত্র-কে
সময় শাসন তবু কম কথা নয়।
আকণ্ঠ বিষের জ্বালা অমৃত করেছো
দু'হাতে ফেলেছো ব্যথা জঞ্জালের মতো।
অদৃশ্য সুতোয় বাঁধা মায়াঘুম যেন
খসে গেল আচমকার নিগূঢ়-নির্দেশে
তারপর যোগব্রতে বিরজা-আগুনে
ভষ্মীভূত যাত্রাপথ, নিলে না পারানি।
কলম-কবিতা খাতা স্তব্ধ-সমাহিত
জাদুকরী ঈশারায়, যেন নীরবতা
নতুন অতিথি তাই আসন পেতেছে।
ছিল আলোটানাটানি? নিভৃত-প্রহার,
তাই এত নীরবতা? অমিল অক্ষর?
সম্মোহিত বর্ণে শিল্পী সাধনা শেখালে
পাথরে বিমূর্ত মুখ ফুটে ওঠে যদি!
৪.
সুস্থির বিশ্বাস থেকে নিঝুম সন্ন্যাসে যেতে চেয়ে
থমকে যায় মাছরাঙা জলের অস্পষ্ট রেখা দেখে।
বিদ্যুৎ বিভ্রাটে যেন, দৃষ্টিভ্রম নয়, আহা! কত
দুঃখ চিনেছে সে একা; অতলের মহা জিজ্ঞাসায়
কৌতূহলে নিরুত্তর যেন যুবকের ক্লান্ত মুখ।
মাৎসর্যের টানে পাখি বসে থাকে ধ্যানমৌনভাবে
সজাগ দৃষ্টির বলে চেতনার নিচে নেমে যায়
সেখানে কত কী পোকা পাঁকের আড়ালে উচাটন
মাছের জীবন তবু যে কোনো মূহূর্তে কেঁপে ওঠে।
অনিঃশেষ গোপনতা প্রবাহিত উভয় দিকেই।
কে কার হিসাব রাখে; আকাশের বিস্তৃতির নিচে
উলঙ্গ প্রহার, হত্যা রাহাজানি, দুঃখ-দৈন্যভার
৯.
আমাকে নিহত ক'রে দ'লে পিষে চ'লে গেল যারা
অপূর্ব সর্ষের ক্ষেত এঁকে দিল চোখের সামনে।
লাজবস্ত্র খুলে নিলে অন্ধকারে প্রেত যোনি হ'য়ে
আড়ালে দেখেছি কেউ স্বেচ্ছাতন্ত্রে লুঠেছে ফাগুন।
কী করার ছিল বলো, ঝড় তুলে ডালভাঙা ছাড়া
নয়তো বাজের ঘায়ে ফাঁক ক'রে দিয়ে ধড় মাথা
হয়তো আমিও খুনি, হিংসার লোলুপ আঠা লেগে
ঘুমে বন্দী চেতনায় সাজিয়েছি বেআব্রু কল্যাণ।
সেই কবে ভোরবেলা চেপে ধ'রে ঘাড়-হেঁট, ব্যথা
একটানে ছিঁড়ে নিলো ঘুম আর শান্তির পেখম
পালক ছিঁড়েছে তবু কিছুই বলিনি, অসহায়
প্রেম দিয়ে অসাগর সাজিয়েছি বোধনের ঘট।
অনেক জোয়ার ভাঁটা, অনেক লবনজল ছেঁচে
পারিজাত মুকুলিত, জলঢালি সন্ধ্যা ও সকালে।
১১.
আমার সনেটগুচ্ছ খেয়ে নিল উইপোকা যত!
শিয়রে জমেছে মেঘ, ঝড়বৃষ্টি কাদা মেখে পোকা
যখন কামড় দিল বর্ণগুচ্ছ বেমালুম সাদা
মনে হল পাশে নেই বর্ণালী আকাশ যথাযথ
নিবিড় ধ্যানের মতো ঘুমঘোরে আচ্ছন্ন ব-দ্বীপ
সেখানে কত যে যত্ন, ধৈর্য দিয়ে গাঁথা হলে পদ
রাধা ও কৃষ্ণের নামে জয়ধ্বনি দিয়ে মুখ-ব্যথা
সেসব অক্ষর ফোটে ছত্রাকের আশ্চর্য কৌশলে
অথচ আড়ালে দেখো ছায়া খায় সূর্যের কিরণ
মধ্যাহ্নের লিপিগুলো অন্ধকার করে দিল পোকা।
নীরব বর্ণের সুর সনেটের দৃঢ়তা ঘোচায়
নিখিল গর্ভের আর্তি মোচনের মতো শান্তিময়
সুরটুকু অবশেষে মাত্রাহীন ছন্দহীন বেঁধে
নিজেকে সাজাবে তাই মৃত্যু খায় অনন্ত আকাশ।
১২.
কালযানে স্থির বুদ্ধ ধ্যানময়, করুণামৈত্রীর
কথা ব'লে মুগ্ধ করে উদাস নিশ্চিন্ত প্রজাদের,
অন্নাভাবে নগরীর পথে পথে কাঁদে শত শিশু
করুণা-মৈত্রীর মতো তথাগত প্রখর দৃষ্টিতে
বুঝে যায় রাজাদের পাপে রাজ্য শকুনের গৃহ।
অসহ তাপের নিচে মাথা পেতে ভবিষ্যৎ লিপি
পোড়ে, তার রক্ত-ঘাম শুষে নেয় মাটি, স্নেহহীন
নগরীর দেহ থেকে নান্দনিক কলাকৃতি লয়
শান্তা জানে ক্ষত স্থানে মহার্ঘ তেল ও বিষময়।
শান্তস্বরে সুর তোলে অনিকেত সময়ের গান।
সুতরাং, নিশ্চলতা ভেঙে উঠে দৃঢ় পদক্ষেপে
দরজা-জানালা খুলে নগরীর পথে তথাগত
ভিক্ষান্নের পাত্রখানি মেলে ধরে অপূর্ব কৌশলে।
শ্রমন বুঝেছে, তাই লেখা চলে কালচক্রযান
বাক্- মঞ্জরীর ঘ্রাণ থেকে
(মূল বানান অপরিবর্তিত)
জোর
সেই কথাটাই ব'লবো। অনেক তরঙ্গ থেকে উঠে আসা ফেনার মতো
শব্দগুলি ডুবে ভেসে কাদামাটি মেখে ঝিনুকের গন্ধ নিয়ে হাতে
এসে পড়ে। পুরনো কাগজের মতো ফেলে দিই সব। ব্যাধ চোখে
রোদ্দুর ভাঙতে ভাঙতে সেই কথাটাই ব'লবো ব'লে তীক্ষ্ণ বল্লমের মতো
দাঁড়িয়েছি টানটান। হাত পাতো, কথাগুলো রাখবো।
মায়া
আগুনের ফুলকির মতো সে বুকে বসে গেল। দৈবী মায়া! নির্লিপ্ত
উদ্দীপন শেষে দেখি আগুনের ভিতরে আগুন খায় যা কিছু সম্বল,
হাড়-মজ্জা বাসনার সমিধ। কিছুই করার নেই, মুগ্ধতা নিয়ে বেঁচে থাকা।
এই আত্মবিলাসের হ্রদে ছায়া পড়ে তার। দেখার ইচ্ছা হয় না
আর তাকে।
গল্প
অপমান এসে দুয়ারে বসলো। দীর্ঘ পরিশ্রমের পর যেমন কপাল
ভিজিয়ে দেয় ঘাম, তেমনি দুয়ার জুড়ে আসর জমানোর মতো
তার ভঙ্গি। সোজা হ'য়ে দাঁড়াতেই সে মিশে গেল পাপোশের
মধ্যে। নীরবতায় মাখামাখি রোদ্দুর তখন সাফ ক'রে দিল
ঘর-দুয়ার। এভাবেইতো এক-একদিন ঝমঝমাঝম বৃষ্টির গল্প
তৈরী হয়।
চর্যাপদ-২
আগুন মিথ্যা বলে না। শব্দের গোড়ায় জাল দিলে উথলে ওঠে
দুধ। দ্বন্দ্বের আড়ালে বসে থাকে বেড়ালটা। তীক্ষ্ণ দৃষ্টি। এলোমেলো
ঝোড়ো হাওয়ায় সন্ন্যাসও শিথিল। বুদ্ধের শরণ মাগি, ধর্মেরও।
সঙ্ঘের কথা আর কিছুই বলার নেই। পুরনো ব্যথার মতো রক্তপাত
চলতেই থাকে।
চর্যাপদ-৩
খুঁটে খাই। পাখির জীবন। পোকা-মাকড়-দানাশস্য, ঘাসের বীজ, বালি
ও কাঁকর। কখনো-কখনো নিজের ছায়াও। ভেজা ডানার ঝাপট
দিলেই নামে বৃষ্টি। গাছের মাথায় টাঙানো বড় বড় ছাতার
নিচে বসে স্বপ্ন আঁকা চলে নিশ্চিন্দিপুরের। ওখানে তখন মেঘ।
গাছের নিচে ব্যাঙের সংসার।
কাটা ঘুড়ি
এক এক সময় একটা কাটা ঘুড়ি জানালায় উঁকি দেয়।
কখনো বা পাশের ঝোপে ছিন্ন ভিন্ন হ'য়ে ছিটকে পড়ে।
খুব বর্ষা নামে তখন। হাজার-হাজার বছর ধ'রে অবুঝ
বৃষ্টিতে ভরে যায় ঘর-দোর। রান্না-বান্না, বিছানা-বালিশ
ভেসে যায় উঠোনে, রাস্তায়।
যতটা রোদ্দুর এলে সব জল উধাও হ'তে পারে, তা আর
কিছুতেই আসে না এখানে
সংসার
ইচ্ছা করে ঝুঁটি ধ'রে থামিয়ে দিই ওকে। সটান দাঁড় করিয়ে
বলি, সব কিছুতে এত তাড়া কেন? হাওয়ার মতো হালকা
হ'য়ে কিছুটা সময় গল্প করো, নদীর মুখ দাও ঘুরিয়ে।
মেঘগুলো জড়ো ক'রে বানাও অলীক প্রাসাদ। তারপর
সম্রাটের আসনে ব'সে আবহ-বিকার ঘুচিয়ে চারিদিকে
লাগাও রং; ওকে না থামালে কী ভাবে গোছাবো বাসন-
পত্র, আর কী ভাবেই বা কুড়াবো ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন হওয়া শব্দগুলো।
বোধিসত্ত্ব মুখোপাধ্যায়ের কবিতা ।। পর্ব ২
অগ্রন্থিত কবিতা
যাপন
হারানো ঠিকানা আর খুঁজি না এখন
ঢেউ দেখে বোঝা যায় সমুদ্র কতটা উত্তাল
কোন মেঘে বৃষ্টি নামে,কোন মাটি ফসল ফলায় বোঝা যায় তাও!
কারো নাম কাটা গেছে ঠিকানা খাতায়
তাকে আর খুঁজি না কোথাও
কোন গলি মিশেছে কোথায়
ভাবি না এখন
ক্রমাগত হেঁটে যাই দিগন্তের দিকে
মিলে যায় হিসেব নিকেশ সব।
অসমান ভূপৃষ্ঠের মতো সত্য মনে হয়
সময়ের ধারাপাতখানি।
আলো
কাকে যে খুঁজছে আলো বুঝতে পারি না
আলো স্পর্শ করে বাড়ি
দীপ থেকে জ্বলে ওঠে দীপ
অনাহত যন্ত্রণা থেকে ফোটে ফুল
প্রশান্তির দুয়ারে তখন অপূর্ব নুপূর
চুপ করে শুনি আর আলো হয়ে উঠি
অকপট
ঘরের কোণে জমা ধুলো বালি তুলে ফেলি
তবুও পোকামাকড়ের আনাগোনা থামে না
একটুও
অন্ধকার গলে গেলে বাইরে আনার মতো অসহ্য
কষ্ট আর কিবা থাকে
ভেবে যাই
ধুলো জমে কাদা হলে কতটা জলের প্রয়োজন
গাছের আড়ালে পোকা জলের ধাক্কায় ঝেড়ে
ফেলি রোজ
হেরে যাওয়া মানুষের গোপন কান্নার মত
ওইসব মাকড়ের বাসা বিষন্ন করে।
অন্দরমহল জুড়ে ছেঁড়া পাতা,ঝরা মুকুলের
সুর আর ঘুণপোকা চাপা আগুনের মতো
জ্বলতেই থাকে
কৌশল জারি জুরি বড় বেশি মিথ্যা মনে হয়।
বোধিসত্ত্ব মুখোপাধ্যায়ের কবিতা ।। পর্ব ৩
অপ্রকাশিত কবিতাআকাশ বৃত্তি
১.
সূচিহীন এলোমেলো শব্দ ছকের ঘরে
যেমন যত্ন এসে মিলে মিশে অর্থ মেলায়,
যেমন নদী এসে মুছে দেয় যাবতীয় পদছাপ,
তেমনি বন্ধুর মতো যেখানে যেমন খুশি হাত
রাখো অক্ষর বাগানে,
পাতার আড়ালে ফুল দেখা দিতে পারে!
পৃষ্ঠাগুলি বলে শুধু
আলোর অক্ষরে রাখা আকাশ বলয়!
২.
কে আমায় স্পর্শ করে ঘুমের ভেতর, কে
জাগায় স্বপ্ন থেকে!
আবহ বিকার যেন।
গুপ্ত লণ্ঠনের ক্ষীণ আলো মোছে আঁধার
— আকাশ।
এবার কি যেতে হবে অনেক অনেক দূর!
স্বপ্ন স্মৃতির কাছে নিঝুম বসতি গড়ে।
জলের কল্লোল আসে,
ধ্রুবতারা উজ্জ্বল হয়।
আগুনের পথে গেলে পিপাসার শেষ দ্বীপে
পৌঁছানো যায়?
৩.
মাঝে মাঝে মনে হয়
আমার আড়ালে
লতা গুল্ম গাছের শিকড়ে
বাধা পড়ে থাকা রাজপথ
ছুটে গেছে দিগন্তের দিকে।
আকাশ নেমেছে বুকে
অঝোর বৃষ্টির শব্দ
কাগজের নৌকা নিয়ে খেলা করে জল
এইভাবে ভিজে ভিজে ধুয়ে যায় কঠিন অসুখ।
একটি পূর্ণিমা পেতে এমন প্রান্তর হয়ে থাকা।
৪.
একটা অক্ষরের জন্য অপেক্ষা
কেউ না কেউ ডাকবেই একদিন
তার জন্য মালা গাঁথা আছে
ভালোবাসা রাঙিয়ে দেবে চলা
বাইরের কোলাহল ভেতর দিকে টানে যদি টানুক না,
রোদ্দুর স্পর্শ করলে ঘুম ভাঙবে ঠিকই।
আসলে একটা অক্ষরের মাঝে
মাথা গুঁজে আছে আরও অক্ষর
তার জন্য অপেক্ষা করতে করতে আকাশ হয়ে ওঠা
তার ব্যাপ্তি কতদূর নিয়ে যেতে পারে মাঝিই জানে।
৫.
আবির মাখবো বলে কতদূর এগিয়ে এসেছি।
পর্বত সাগর ভেঙে
সমতলে বৃক্ষশোভা সুশোভিত নদীতীরে
চুপচাপ দাঁড়িয়ে দেখি,
দূরে আগ্নেয় পাহাড়ের হাসি,
তার নীরব উল্লাস থেকে বোঝা যায়
তারসপ্তকে বাঁধাসুরে পরমা প্রকৃতি গাঢ় নীল
এই সমভূমি থেকে দুহাত বাড়াই।
আবির মাখবো বলে বাইরে বেরিয়ে আসে
ভিতর আকাশ।
৬.
নদীর খোলা বুক, ভেসে যাই।
পূর্ণিমায় ঢেউ ওঠে,
রাতে জোয়ার উচছ্বাস
মাটি উথাল পাথাল।
কেউ বুঝতেই পারে না
জলের ঘূর্ণিতে ঝরা পাতা
কীভাবে স্নান সেরে নেয়!
অলঙ্কার সরিয়ে নিলে সবকথা অমৃত হয় কি না
বোঝা বাকি রেখে
ভাসানের ডাক আসে,
দুহাট খোলা বুকে
জোয়ারে জলে অকারণ গান জাগে
গানের অঙ্গ জুড়ে নীল আকাশ ফুটে উঠলেই
মনে পড়ে দিগন্তের স্পর্শকথা।
ভেসে যাওয়ার দিকে নদীর কোনো দুঃখ থাকে না আর।
৭.
কার্যত অন্ধকার আকাশ ছুঁয়েছে যখন
উঠোনের কোণে তুমি খুঁজে চলো
যাকিছু হারিয়েছে,
অথচ সামনে বেড়াল ব'সে
দেখে সব
খুঁজতে খুঁজতে তুমি বাইরে যাবেই
আর অন্ধকারে কেউ এসে খুঁজে যাবে
অন্যকিছু
যেখানে তোমার গন্ধ লুকানো রয়েছে।
সেদিনও বেড়াল ব'সে দেখবে
কীভাবে অন্ধকার
তার রূপটান মুছে দিতে পারে!
।। কবি বোধিসত্ত্ব মুখোপাধ্যায়ের কবিতা নিয়ে আলোচনা ।।
প্রেম ও প্রেমহীনতার অলৌকিক দ্বন্দ্ব
রমাপ্রসাদ মিত্র
(রমাপ্রসাদ মিত্র সম্পাদিত "বিচিত্রা" পত্রিকার মাঘ ১৩৯৮ "কবিতা জিজ্ঞাসা ২" শীর্ষক সংখ্যায় প্রকাশিত হয়েছিল বোধিসত্ত্ব মুখোপাধ্যায়ের চার্টই কবিতা। এই কবিতাগুলিকে নিয়ে অকাল প্রয়াত রমাপ্রসাদ মিত্র একটি আলোচনা লিখেছিলেন। পাঠকদের সুবিধার্থে কবিতাগুলি প্রবন্ধে মাঝেই তুলে দেওয়া হল। বানান, মূল পত্রিকায় যা প্রকাশ হয়েছিল তা অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে।)
কবিতা আসলে এক মাধ্যম, এক সেতু, এক সংযোগ। কবি পাঠকের সঙ্গে যুক্ত হতেই চান তাঁর অভিজ্ঞতার নির্যাস নিয়ে, তাঁর ধরা-অধরা স্পন্দনমালা নিয়ে। আপাতভাবে মনে হতে পারে, নিজেকে সযত্ন আড়ালে রাখতে চান তিনি। কিন্তু সে-আড়াল যোগেরই এক পন্থা, এক ধরন; সে এক কুশলী প্রকাশমাত্র। এ-আড়াল কবি আর পাঠকের দ্বৈত অভিসারলীলায় অবিচ্ছেদ্য। কবিতার এই যোগ নির্দিষ্ট এক ধরনেই নয়, সাধিত হতে পারে বিচিত্রভাবে, যেমন বোধিসত্ত্বের এই কবিতামালায়।
জলোচ্ছ্বাসে ধ্বসে গেছে
জলোচ্ছ্বাসে ধ্বসে গেছে
জলোচ্ছ্বাসে ধ্বসে গেছে কিছু কিছু বাড়ি
তাই দেখে নদী, তুমি ছোঁবে না সাগরে?
তোমার প্রাণের সুরে কল্লোলিত গান
তবে কি আছাড় খাবে শুষ্ক বালুতটে?
পাথর বালিতে গড়া শহরের দ্বীপ
মুখর, নোংরা পচা ডাষ্টবিন একা
মিনারের স্বীকৃতি কি পেয়ে যাবে; হায়!
রক্ত আছে, হাড় আছে; জোয়ারের জোর
ভাঁটার প্রবলটানে সংযম বাঁধা,
এর চেয়ে কত আর শক্তি চাও, বলো —
প্রাণ আছে দুপারের বালি রোদ গাছে
যখন আগুন জ্বলে চারিদিকে আলো
আগুনশরীরে থাকে ধ্বংসের বীজ
যে আগুন সেও বোঝে, — নদী মানে গতি।
নদী তার গতিধারা, উৎস, বিলয়-সব কিছু নিয়ে মানবজীবনের এক প্রসিদ্ধ রূপক বা সমান্তরাল এক প্রতিচ্ছবি। কর্ত দেশ, প্রান্তর, সম-অসম নানান তল পেরিয়ে পেরিয়ে শেষে মোহনায় সাগরের সঙ্গে মিলনে তার সার্থকতা — মানব-জীবনও যেমন, শান্ত-ক্ষুব্ধ অযুত মুহূর্ত পেরিয়ে একদিন সন্ধিক্ষণে মৃত্যুতে লীন হয়ে মুক্তি তার। তাই নদীর স্বাভাবিক ও প্রত্যাশিত পরিণতি সাগরমিলন এবং মানব-জীবনের স্বাভাবিক ও সংগত পরিণতি মৃত্যু। সাগরকে নদীর ছুঁতে পারা তাই প্রাণময় জীবনের পরম সিদ্ধির কথা বলে। উল্টো দিকে, যে-সব নদী মরুপথে ধারা হারিয়ে ফেলে, তারা জীবনের ব্যর্থতা ও অসার্থকতার বার্তা আনে। এ-কবিতায় নদী সেই প্রাণের প্রতীক যা কেবলি ছুঁতে চায় সাগরকে — সিদ্ধিকে, পরমতাকে। সেই নদীর জলোচ্ছ্বাসের ফলে স্বাভাবিক কোনো মঙ্গলকর পরিণতির বদলে "ধ্বসে গেছে কিছু কিছু বাড়ি" অর্থাৎ প্রাণ তার চাঞ্চল্যে অপ্রত্যাশিত কিছু ক্ষতি ক'রে ফেলেছে। এখানে কবিকে আমরা প্রায় এক সর্বজ্ঞ কথক (omniscient narrator) হিসেবে দেখতে পাচ্ছি। তিনি এখানে কথকই নন শুধু, উপদেষ্টাও। নদীকে, প্রাণকে তিনি বলেন তাই, চলার পথে তোমার শক্তিতে কিছু বিরূপ ফল ঘটেছে ব'লে তুমি কি সাগর ছোঁবে না? পরমের কাছে পৌঁছনোর লড়াই থামিয়ে দেবে? তবে তো শুষ্ক বালুতটের নীরসতায় স্তব্ধ হয়ে যাবে তোমার সম্ভাবনা। দ্বিতীয় স্তবকের প্রথম তিনটি চরণে শুনি নাগরিক সভ্যতার কৃত্রিমতা, ক্লেদ, জটিলতার প্রতি কবিকণ্ঠের অসহিষ্ণু, ক্রুদ্ধ, ক্ষুব্ধ উচ্চারণ যার মধ্যে আধুনিক কবিতার প্রসিদ্ধ চরিত্রলক্ষণ বিতৃষ্ণা (boredom) ও বিবমিষা (nausea) ছায়া ফেলেছে। 'মিনার'' সেই প্রামাণিকতা (authenticity)র প্রতীক যা সমাজে পুজো পায় সাধারণ মানুষের। এইখানে এসে নদীর রূপকটি কতকটা স্খলিত হয়ে যায় এবং নদী যে নির্মল প্রাণেরই দোসর, তা স্পষ্টতর হয়ে ওঠে। তাই কবিপুরুষ তাকে প্রাণিত করতে চান তার লড়াই-এর জন্য, তাকে মনে করিয়ে দেন তার শক্তির কথা, সংযমের কথা-দুপারের বালি, রোদ, গাছে জেগে থাকা উজ্জ্বলতার কথা আর মনে করিয়ে দেন লড়াই-এর মূল উপাদান তার রক্ত ও হাড়ের অস্তিত্বের কথা। তৃতীয় স্তবকে নদীর কথা নেই, আছে আগুনের কথা। এ-কবিতা আদ্যন্ত রূপক নয়। এখানে আগুন এক বিশৃঙ্খলার প্রতীক, পথভ্রষ্ট এক সামাজিক দুঃসময়ের প্রতিনিধি। তার ছোঁয়াচ ছড়ায় নানা-দিকে। চারিপাশ আলো ক'রে সে জানান দেয় তার অস্তিত্বের। সেই আগুন আসলে ধ্বংসের বীজের বাহক।
শেষ চরণটি আপাত-বিভিন্ন আগুনকে কবিতার মূল সঙ্গে যোগ ক'রে দেয়। আর তখন বুঝতে পারি আমরা, "নোংরা পচা ডাষ্টবিন” -এর ক্লিন্ন সভ্যতাকে ধ্বংস করার জন্যই আগুনের কথা এসেছে। এমন হতে পারে যে, বিশৃঙ্খলার আগুনই বিশৃঙ্খলাকে ধ্বংস করবে কিংবা নদীর ভিতর থেকে জ্বলবে সেই আগুন (বাড়বানলের কথা মনে আসে) — এইটেই কবির প্রত্যাশিত। কবির আরো ইচ্ছে, সেই আগুন নদীর গতিতে ভর ক'রে সমুদ্রে পৌঁছে যাক। কোনো পাঠকের পক্ষে শেষ চরণটির এমন ব্যাখ্যা ভাবাও অসঙ্গত নয় যে, "নদী মানে গতি" ব'লে সে সমস্ত বিশৃঙ্খলার আগুনকে অগ্রাহ্য ক'রে, জয় ক'রে সমুদ্রে অর্থাৎ সিদ্ধিতে পৌঁছবে।
রাখীদিকে
রাখীদিকে
কে কবে জ্যোৎস্না খুঁড়ে জল পায়, বল্!
অথচ সন্ন্যাসী বলে, 'খুঁড়ে যাও, ভাই
জানো না কোথায় সোনা মাটির গুহায়
লুকিয়ে জ্যোতির মতো স্থির হ'য়ে আছে'।
আশ্চর্য প্রভাবে তাঁর খুঁড়ে যাই, মূঢ়
বুঝেও বুঝিনা, মাটি ও চাঁদের আলো
সমার্থ কখনো হয়? দিদি, গাছ বাড়ে,
দেখি শীতে ঝ'রে পড়ে রূপালীর পাতা;
ছোটো হই আমি, ক্রমে নিচু হ'তে হ'তে
গোলাপের ডাল ধরি, চেপে বসে হাতে
অনিবার্য রক্তপাত...কোথায় গোলাপ?
কখন হ'য়েছি অন্ধ; দিন কাটে, আলো
ছিঁড়ি, বরফের হাসি পরিহাস করে,
পদছাপ মুছে দেয় মেঘ ছুটে এসে
এই কবিতা আদ্যন্ত ঝুঁকে আছে নেতির দিকে, অপ্রাপ্তির হতাশাক্ষুব্ধ যন্ত্রণার ভিতরে সর্বগ্রাসী এক 'না'-এর হাঁ-মুখের গভীরে। এখানে কয়েকটি প্রতীকের দীপ্ত ব্যবহার আছে। 'জল' জীবনরসের তথা প্রত্যাশিত ঐশ্বর্যের প্রতীক। এই প্রতীকের ভাবনায় প্রচলিত সর্বজনীন ধারণা (universal concept) প্রাধান্য পেয়েছে। 'সন্ন্যাসী" সেই প্রামাণিক অস্তিত্ব (authentic existence)-এর প্রতিনিধি যার অনিঃশেষ প্রেরণায় অসাধ্যসাধনের উদ্দীপনা জাগে। সন্ন্যাসী তাই 'আশ্চর্য প্রভাব' বিশিষ্ট। কিন্তু জ্যোৎস্না কেবলি মায়াময়: ছলনায় তাকে মরীচিকার সমধর্মী ব'লে মনে হয় কবির। 'দিদি' ('রাখীদি') শ্রদ্ধা-ভালোবাসার এক মানুষী প্রতিমা থাকে কবি নিঃশেষে বলতে পারেন তাঁর অপ্রাপ্তির কথা, হতাশার কথা। বস্তুতঃ কবিতাটি রাখীদিকেই প্রদত্ত। 'গাছ' প্রতীকে চিত্রকল্প (image), আবেগ (emotion) এবং ধারণা বা কল্পনা (idea)- প্রতীকের প্রায় সমস্ত গুণ ও ধর্ম সংহত হয়েছে। এ-গাছ আসলে জীবনচক্র'। জীবনের জন্ম-বৃদ্ধি মৃত্যুর-সহজ এক চিত্রকল্প গাছ।
'রূপালী' এখানে বিশেষণ নয়, বিশেষ্য। সেজন্যই 'রূপালী পাতা' নয়, কবির উচ্চারণ 'রূপালীর পাতা'। 'রূপালী' জীবনের স্বর্ণসম্ভাবনার প্রতীক। 'শীত' সেই প্রতিকূলতা যা গাছের পাতা ঝরিয়ে দেয়, জীবনের 'স্বর্ণসম্ভাবনাকে ধ্বংস করে। 'শীত' প্রতীকে সর্বজনীন ধারণা ছাড়াও আবেগ ও চিত্রকল্প আভাসিত হলেও 'রূপালী' প্রতীকে আবেগই প্রধান। তাতে আর আছে কবির ব্যক্তিগত ধারণা (individual concept)। সুযোগ সত্ত্বেও 'গাছ'কে রূপক (allegory) না ক'রে এখানে প্রতীক (symbol) করা হয়েছে এবং তাই কবিপুরুষের গোলাপের ডাল ধরার কথা এসেছে। কিন্তু গোলাপের ঐশ্বর্যময় সৌন্দর্য লাভ করেননি কবি, বরং কাঁটায় বিদ্ধ হয়েছেন — রক্তপাত ঘটেছে হাতে এবং মনেও। এভাবে ক্রমশঃ সুন্দরের জগৎ সমৃদ্ধির পৃথিবী উধাও হয়ে যায় চোখের সামনে থেকে; 'অন্ধ' হয়ে যেতে হয় তাই। এভাবেই 'দিন কাটে'। উত্তম-পুরুষের উক্তি (authorial discourse) হিসেবে রচিত এই কবিতায় কবির আশ্চর্য উচ্চারণ দেখি 'আলো' ছিঁড়ি অংশে। আলো এক শরীরী রূপ পায় সেখানে। কেন, ছিঁড়তে হবে আলোকে? বোধকরি তাঁর ভিতরকার উজ্জ্বলতর জ্যোতির সন্ধানে এই প্রয়াস, যে-জ্যোতির আছে এই অন্ধকার সত্যি সত্যি সত্যি দূর করার ক্ষমতা। কিন্তু সব প্রয়াস অর্থহীন হয়ে যায়, 'বরফের হাসি'র বিবর্ণতা পরিহাস করে তাই। এমনকি কবি-পুরুষের, এই সমস্ত প্রয়াসের, এই আলোকসন্ধানী ভ্রমণের যে-একতম নিদর্শন, 'পদছাপ', তাও মুছে দেয় 'মেঘ' — আরেক বিরূপ শক্তি। অতল কালো নিরাশার তিমিররেখায় সমগ্র এই কবিতাটি ফুটে উঠেছে যেন একটি প্রতীকী চলচ্চিত্র।
বাগানবাড়িতে
বাগানবড়িতে
শীতরাতের মেহর জ্যোৎস্না আছড়ে পড়ে বাগানবাড়ির পাথুরে প্রতিমার গায়ে; -
ভাস্কর্যের নিটোল গড়ন আজ ভাঙচুর হয়, বেরিয়ে আসে অন্য এক মূর্তি যার
কোনো ছায়া নেই। বাগানবাড়ির জমাট আবহাওয়ায়; জ্যোৎস্নার মাঝেই তার স্নান
হয়, স্রস্ত কাপড় ত্যাগ হয়, অবিন্যস্ত চুল রাত্রির মতো শুকিয়েও ওঠে...
অন্ধ ভাস্কর জানে, তাকে ছোঁয় আশ্চর্য ক্ষমতায়; স্পর্শ করে জ্যোৎস্নার লাবণ্য,
তারপর মাটিকে প্রণাম ক'রে ফিরে যায়
প্রেম ও প্রেমহীনতার দ্বন্দ্বে মেঘ ও দিগন্ত যখন আলোড়িত হয়, তখন-ই বাগান -
বাড়ির নাট্যশালায় এই সত্য ছবিটি দেখতে পাওয়া যায়।
বিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে মূল্যবান সাহিত্যদর্শন ব'লে স্বীকৃত যে-পরাবাস্তববাদ (Surrealism), তার প্রধান ঝোঁক মনের অবচেতনলোকে, যুক্তিময় বাস্তবের আড়ালে লুকিয়ে থাকা স্বপ্নবিশ্লেষণের ছবিতে ভরা জগতে। এই মতবাদ একরকম Superreality-র কথা বলে যার ভিতরে বাস্তব ও অবাস্তব, ধ্যান ও ক্রিয়া মিলে একাকার হয়ে যায় এবং জীবনের কাছে তা অনিবার্য সত্য বলে গণ্য হয়।। ঐতিহাসিক সূত্র জানাচ্ছে যে, ফরাসী কবি আদ্রেঁ ব্রেতোঁ ১৯২৩-১৯২৪ সালে শুরু করেন এই আন্দোলন।
'বাগানবাড়িতে' কবিতাটির প্রসঙ্গে এই সংক্ষিপ্ত ভূমিকাটুকু জরুরী, কেননা প্রায় রূপকথার মেজাজে স্বপ্নের ভিতর দিয়ে সত্যকে ছুতে চাইছেন কবি এখানে। এই স্বপ্নলোকে প্রবেশ করার চাবি যে-নিদ্রা, তা সাধারণ ঘুম নয়, তা আসলে নিজের মনের অবচেতনস্তরের আলোড়ন। এই আলোড়নে কিন্তু বিশৃঙ্খল কিছু প্রতীক উঠে আসেনি; বরং স'রে গিয়েছে একটি নাট্যশালার পর্দা যেখানে আশ্চর্য পারম্পর্যময় একটি নিঃশব্দ নাটক আমরা দেখতে পেলাম। নাটকটি সম্পূর্ণতঃ একটি গতিশীল ছবি যার বিস্তার প্রথম দুটি স্তবক জুড়ে। জ্যোৎস্না এই কবিতার সেই অলৌকিক পট রচনা করেছে যেখানে অবচেতনের আলো-আঁধারিতে কবিতার নাটকটি ক্রমশঃ এগিয়ে গিয়েছে। মনোবিজ্ঞানী সিগ্মুন্ড ফ্রয়েড স্বপ্নের ভিতরে যেমন দেখেছিলেন দমিত বাসনার বিশেষ উপায়ে পূরণ, এখানে তেমনি আছে বিশেষ এক ইচ্ছাপূরণের কথা। কবির উপস্থিতি এখানে সর্বজ্ঞ কথকের মতো হলেও নাটকে তাঁর প্রচ্ছন্ন অংশগ্রহণ অলক্ষ্য নয়। বস্তুতঃ; দ্বিতীয় চরিত্র 'ভাস্কর-এর সঙ্গে তাঁর আত্মীয়তা, এমন কি তাদাত্ম্য (identity) অসম্ভব নয়। বাগানবাড়ি এই কবির বাসভূমির প্রতিনিধি। রৌদ্রময় দিনের বেলায়, বুদ্ধিশাসিত ও যুক্তিগ্রাহ্য বাস্তবে যে-মূর্তি কেবলি এক নিটোল পাথুরে প্রতিমা; শীতরাতের মেদুর জ্যোৎস্নার গভীরে, শাসনহীন অবচেতনে, স্বপ্নে তার রূপ বদলায় — সেই মূর্তি তখন প্রাণ পেয়ে জেগে ওঠে। "বাগানবাড়ির জমাট আবহাওয়ায়" — বাস্তব পৃথিবীর মধ্যে তার সেই প্রাণ অলীক, তাই সেখানে তার কোনো ছায়া পড়েনা। প্রথম স্তবকে আছে এই প্রাণ পাওয়া, এই জেগে ওঠা।
দ্বিতীয় স্তবকে যে-ভাস্কর আসে তাকে কবির এক আত্ম-অভিক্ষেপ (self-projection) বলতে ইচ্ছে হয়। সে যে-কোনো মানুষ নয়, সে 'ভাস্কর'-এই তথ্য আমাদের অনুমানকে প্রশ্রয় দেয়। সে 'অন্ধ', কেন না দিনের আলোয়, বৃদ্ধির পৃথিবীতে সে ঐ মূর্তির সজীব রূপ দেখতে পায় না। এখন, এই জ্যোৎস্নার মায়ায় আশ্চর্য ক্ষমতায় সে ছু'তে পারে সেই প্রতিমাকে। সেই প্রতিমা হয়তো এই অন্ধেরই সৃষ্টি। তাই শুধু 'প্রতিমা' ও 'এক অন্ধ' না ব'লে চরিত্রদুটিকে 'ভাস্কর্য' আর 'ভাস্কর' বলা হয়েছে। কিন্তু ভাস্কর প্রতিমাকে ছোঁয় কেবল। উপনিষদে দুই পাখির রূপকে সংসারে দ্রষ্টা আর ভোক্তা-যে দুই শ্রেণীর কথা আছে, এখানে ভাস্করকে সেই দ্রষ্টার ভূমিকায় দেখতে পাই। সে তাই কাঙ্ক্ষিতকে ছোঁয়, তারপরে "মাটিকে প্রণাম ক'রে ফিরে যায়"। কোথায় ফিরে যায়? তার অন্ধত্বে, তার স্বাভাবিকতায়। এইখানে দেখতে পাই, অবচেতন এসে চেতনে মিশেছে। ভাস্করের এই আত্ম-নিয়ন্ত্রণ চেতনলোকের শাসন। যেন বা কোনো সচেতন অবচেতনের রঙে ভ'রে আছে এই কবিতার ছবিটি।
চেতন মনেরই কণ্ঠস্বর শুনি শেষ স্তবকে। বিশ্লেষণী মন্তব্যের মধ্য দিয়ে সেখানে নাটকটির সংঘটনের কারণ উল্লেখ করা হয়েছে। সে কারণ হলো মনো-ভূমিতে মেঘ ও দিগন্তের, অধরা ও ধরার, প্রেম ও প্রেমহীনতার দ্বন্দ্ব। অর্থাৎ স্বয়ংক্রিয় রচনা বা অটোমেটিক রাইটিং-এর মতো নয় এ-কবিতা। অত্যন্ত নির্বাচিত প্রতীকী শব্দ দিয়ে ছবিটি আঁকা হয়েছে এবং সেই চিত্রকল্প যে, সত্য', সে-কথা শেষ চরণে উচ্চারণ ক'রে বলা হয়েছে। এ-সত্য সাধারণ বাস্তবের সত্য নয়, বাস্তবের ভিতরকার বাস্তবের সত্য-রবীন্দ্রভঙ্গিতে বললে- "রামের জনমস্থান অযোধ্যার চেয়ে" সত্য।
ঝড়-বৃষ্টি-ভয়
ঝড়-বৃষ্টি-ভয়
১
যখনই ঝড় ওঠে আমি আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়াই। আকাশের বিভিন্ন কোণ
থেকে উঠে আসা কালো মেঘ, বড় মেঘ, হিংস্র মেঘ ছুটে আসে পরস্পর পরস্পরের
দিকে। প্রলম্বিত অস্তিত্বের ঠিকানা হারায় মেঘেরা; আমার তখন আরো ভয় হয়,
ছুটি আয়নার সামনে, আরো বেশি কারে দেখি সমস্ত অবয়ব। প্রতিরোধের জন্য
বর্ম চাই আয়নার কাছে।
২.
বৃষ্টি শুরু হয়। ঝুরঝুর বৃষ্টির কামড়ে মাটির নরম চামড়া কুঁচকে যায়। আমি তখন
আগুনের কাছে গিয়ে দাঁড়াই জোড় হাত নিয়ে, প্রার্থনার ভঙ্গীতে বলি-'হে সর্বভুক,
অনিন্দ্যকান্তি, আমার ব্রহ্মদেশ স্থির হোক তোমার দর্শনে।
৩
ঝড়বৃষ্টির সম্মিলিত সুরে আমার ভয় যখন তীব্রতা পায়, ঘুম আসে। ক্লাকাশের দিকে
তাকিয়ে খু'জি আয়না এবং আগুনকে। দেখি আয়ন। আগুনকে বুকে নিয়েছে অথবা
কোনো কোনো দিন আগুন আয়নাকে নিজের চাদরে ঢেকে রেখেছে। নিজস্ব
ভঙ্গীমায় নত হই তখন নিজেরই কাছে।
('বিচিত্রা', কবিতা-সংখ্যা, ১৯৮৯ থেকে পুনর্মুদ্রিত)
এ-কবিতাটিকে রবীন্দ্রনাথের ভাষায় বলতে ইচ্ছে করে "অবচেতনতত্ত্বে পাওয়া কবিতা"। অর্থাৎ 'বাগানবাড়িতে' কবিতার মতো এ-কবিতা পরাবাস্তবের। 'আকাশ' এ-কবিতার ব্যাপ্ত পটভূমি-যাবতীয়, ঘটনার সংঘটনস্থল। এই আকাশ আসলে কবিমনোভূমি অর্থাৎ সেই কেন্দ্রীয় প্রদেশ যেখানে দৃশ্যময়, দৃশ্যাতীত নানান কল্পনা-ভাবনার ছায়াপাত ঘ'টে চলে নিরন্তর। 'মেঘ'গুলি বিভিন্ন আবেগ, অনুভূতি। তারা কখনো বড়ো, কখনো কালো, কখনো বা হিংস্র। তারা যখন শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানে থাকে, তখন সমস্যা নেই। সমস্যা তৈরী হয় তখন, যখন তারা পরস্পরের বিরুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বিতা গ'ড়ে তোলে। তখন তাদের অস্তিত্ব অনিশ্চিত হয়ে ওঠে — প্রলম্বিত অস্তিত্বের ঠিকানা হারায়"। 'আয়না'। তখন হয়ে ওঠে আত্মবিশ্লেষণের, আত্মসমালোচনার সমার্থক এক উচ্চারণ যা দিতে পারে সমস্যার সমাধান- "প্রতিরোধের জন্য বর্ম"।
কবিতার দ্বিতীয়াংশের প্রথমেই "বৃষ্টি শুরু হয়" অর্থাৎ 'মেঘ'গুলি পারস্পরিক দ্বন্দ্বে শেষপর্যন্ত লিপ্ত হয়ে পড়ে। এইখানে বৈজ্ঞানিক সত্যের (মেঘেদের পারস্পরিক ঘর্ষণের ফলে বৃষ্টি) সঙ্গে উপলব্ধিগত, মননজাত সত্যের (মনের বিভিন্ন নানামুখী আবেগের পারস্পরিক সংঘাতে কান্নার এক সুমিত মিলন ঘটে যায়। অমিয় চক্রবর্তীর একটি সুখ্যাত কাব্যচরণ মনে আসছে 'অন্ধকার মধ্যদিনে বৃষ্টি ঝরে মনের মাটিতে”। সে-বৃষ্টি অবশ্য "সৃজনের অন্ধকারে" নেমেছিলে পৃথিবী জুড়ে এবং তা তীব্র মানসিক যন্ত্রণার কোনো ফল 'কান্না' নয়। বোধিসত্ত্বের এই কবিতায় দেখি, "ঝুরঝুর বৃষ্টির কামড়ে মাটির নরম চামড়া কুঁচকে যায়” অর্থাৎ অন্তর্মুখী প্রায় নিঃশব্দ কান্নার ক্ষয়ে মনোপ্রকৃতির সাম্য নষ্ট হয়ে গিয়েছে। এবারে এই কবিতার উত্তমপুরুষ, ধরে নিতে পারি ন্বয়ং কবিপুরুষ, আগুনের কাছে জোড়হস্ত প্রার্থনায় রত হন। তবে অবচেতন স্তরের প্রসঙ্গে 'আগুন। কিন্তু কোনো মাঙ্গলিক লক্ষণ নয়, নয় কোনো মুক্তির দিশারী। অবশ্য যে-আগুনের কাছে প্রার্থনা করা যায়, তাকে শৈত্যনিবারক, জীর্ণতাধ্বংসকারী, পাপদাহীরূপে' গ্রহণ করা যেতেই পারে। এক্ষেত্রে 'আগুন'-এর বিশেষণরূপে ব্যবহৃত 'সর্বভুক', 'অনিন্দ্যকান্তি” শব্দগুলি লক্ষণীয়। সেভাবেই আগুনকে গ্রহণ করতে হয় যদি, তবে বলতে হবে, এ-কবিতায় যেভাবে অবচেতনের প্রতীকগুলি পারম্পর্যে লগ্ন হয়ে আসছিলো, 'আগুন' সেই পরম্পরার বাইরে যেন এক ঈশ্বরী হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে।
কবিতাটি যে-তিন স্তরে বিভক্ত তার তৃতীয় তথা শেষ স্তরে "ঝড়বৃষ্টির সম্মিলিত সুরে সংকট আরো ঘনিয়ে আসে। আর তাই আয়না এবং আগুন তখন একই সঙ্গে জরুরী হয়ে ওঠে। আগুন আর আয়নার মধ্যেও চলে এক পরস্পরপ্রভাবী খেলা। তবে এ-দ্বন্দ্ব মেঘদের দ্বন্দের মতো বিবাদ নয়, বরং মিলন। তাই কখনো দেখা যায়, "আয়না আগুনকে বুকে নিয়েছে", আবার কখনো "আগুন আয়নাকে নিজের চাদরে ঢেকে রেখেছে"। এই আগুন, এই আয়না যে মানসিক উপাদানই কিংবা বলা যায়, এদের উদ্বোধন যে মনোপ্রকৃতি থেকেই চাওয়া হয়েছে, তা বোঝা যায় যখন কবিতার শেষ চরণটি ব'লে যায় "নিজস্ব ভঙ্গীমায় নত হই তখন নিজেরই কাছে"।
এক ঝড়ের বর্ণনা দিয়ে শুরু এ-কবিতার আর এ-কবিতার শেষ এক নতি দিয়ে। সে-ঝড় মানসিক। সে-ঝড় উত্তাল হয়ে উঠলেও প্রকৃতিকে সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত করতে পারলো না যে-প্রতিরোধী শক্তির কারণে, সেও মানসিক। এই ঝড় আর নতির মাঝখানে এ-কবিতায় আদ্যন্ত সংহত হয়ে আছে এক টান টান আততি (tension), পরতে পরতে অনুসৃত হয়ে আছে অন্তঃশীল এক প্রবল সংকটের ঘনিমা। সব মিলিয়ে "ঝড়-বৃষ্টি-ভয়' সুবিন্যস্ত একটি গদ্যকবিতা, ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে যার অন্যমাত্রিক বিশ্লেষণও অসম্ভব নয়। কিন্তু যেভাবেই দেখিনা কেন, এ-কবিতা আত্মবিশ্লেষণেরই নিভৃত উচ্চারণ। বিশ্লেষণেরই
এখন, আলোচ্য কবিতাগুলির নিরিখে, বোধিসত্বের কবিস্বভাব বিশ্লেষণ করতে চাই যদি, তবে প্রথমেই বলতে হয় তাঁর কবিত্বের কথা। বিরল এক স্বতঃস্ফূর্ত কবিত্বগুণের সঞ্চার দেখি তাঁর কবিতায়। বলতে চাই, এইখানেই বোধিসত্ত্বের সবচেয়ে বড়ো সার্থকতা যে, তাঁর কবিতাগুলি হয়ে-ওঠা, বানিয়ে-তোলা নয়। অবশ্য এই স্বতঃস্ফূর্ততা কতক আশঙ্কারও। কেননা আধুনিক কবিতার অপরিহার্য ধর্ম যে-সংহতি, তার সঙ্গে, যাকে বলে বাক্পরিমিতি, তার সঙ্গে এর অলিখিত এক বিরোধিতার সম্বন্ধ। এই কবি শব্দচয়নে আরো সযত্ব, কাব্যভাবগ্রন্থনে আরো সতর্ক হলে তাঁর কবিতা আরো দ্যুতিপ্রভ হবে, সন্দেহ নেই। বোধিসত্ত্ব কবিতা-চর্চায় নিষ্ঠাবান এবং নিবিষ্ট ব'লেই স্বভাবতঃ অন্তর্মুখী। সেই অন্তর্মুখী নিবিড়তার অবকাশে রচনায় যৌক্তিক পারম্পর্য মাঝে মাঝে স্খলিত হয়ে যেতে চায়। তবু কবি ভালোবাসায় জড়িয়ে রাখেন তাকে। বোধিসত্ত্বের যে-রোম্যান্টিকতা ("জলোচ্ছ্বাসে ধ্বসে গেছে", "রাখীদিকে"), যে-পরাবাস্তবচেতনা ("বাগানবাড়িতে", "ঝড়-বৃষ্টি-ভয়"), সে তার জীবনজিজ্ঞাসারই নানান প্রকাশ আর প্রকরণ। মননে ও মেধায় অনাগ্রহী নন তিনি। প্রতীক ব্যবহারে তাঁর ঝোঁক অলক্ষ্য নয়। অলক্ষ্য নয় প্রকরণউৎসুকতাও। প্রথম ও তৃতীয় কবিতা পয়ার বন্ধে রচিত অমিল চতুর্দশপদী আর বাকী দুটি গদ্যকবিতা। গদ্যিকা (free verse)র ব্যবহারে এই কবি স্বচ্ছন্দ। কিন্তু চতুর্দশপদীর গঠন আরো কুশলতার অপেক্ষা রাখে।
এ-আলোচনা অত্যন্ত বেশী অপূর্ণ থেকে যাবে, যদি না বলি এই কবির অস্থিরতার কথা, আশা-নিরাশার দোলাচলতার কথা, ক্ষোভময় ক্রোধের কথা আর প্রসার্যমান এক অসহিষ্ণুতার কথা। চেতন-অর্ধচেতন-অবচেতন জড়িয়ে বিস্তৃত হতে চায় তাঁর সেই চিন্তাশীল অস্থিরতা। কিন্তু সে কি কবিরই দোষ? শুধু কবিরই দায় তা! নাকি দায় তাঁর সমকালের, তাঁর প্রতিবেশেরও অনেক? সময়, শুধু সময়ই বলতে পারে সে-কথা। অমোঘ সেই স্রোতের কাছেই, দৃশ্যাতীত সেই প্রহরীর কাছেই সমর্পিত কবির যা-কিছু প্রাপ্তি আর অপ্রাপ্তি, দাহ আর দ্রোহ, প্রেম আর প্রেমহীনতা।🔅
বাক্-মঞ্জরীর ঘ্রাণ কবিতা সংকলনকে নিয়ে
কবি, অনুবাদক, প্রাবন্ধিক দীপক রঞ্জন ভট্টাচার্য্যের আলোচনা
এসো তুমি। আমার সঙ্গে এসো। হাত ধরো। তোমাকে আজ আমি অচেনা চরের দেশে নিয়ে যাব। উপরে শাশ্বত আকাশ। এ-আকাশ সে-আকাশ নয় আজ — থোকা থোকা করবী ফুটেছে সেখানে। এই চর, সোনালি বালির চর। নদীটির কবেকার কাকচক্ষু জলে সময়ের তিরতিরে খেলা। ওই দেখো দূরে চিরবিরহী গান ধরেছেন, 'মিলন হবে কত দিনে' — শুনতে পাও না কি সেই গান? দেখ না কি তার তন্ময় পাকে পাকে নিজের সব বাঁধন খুলে বিরাটের দিকে এগিয়ে যাওয়া? 'কীভাবে যে মিলন হবে!' কীভাবে যে মিলনের আগ্রহে, মন্থনে, কম্পনে বদলে যাবে মানুষ, তার পথ যাবে অন্য সকলের থেকে আলাদা হয়ে ! মিলন যদি-বা হল, সে তো আর সেই মানুষটাই নয় তখন! কাঁচা মাটিতে রং ধরেছে এবার। রাধাভাবে মিশে গেছে সে : 'যে যেমন এসেছিল/ ফিরে গেল/ ঘাস মাড়িয়ে মাড়িয়ে/ একাকী রাধার বুক ভেসে গেল মেঘে/ # মেঘের গভীরে বাজ/ যথারীতি বাজিয়েছে বাঁশি/# ছারখার পাঁজরের হাড় /# যত কথা, সুর সব পোড়া লাল মাটি!' (মাথুর)
নিজের চর্যা বা যাপনকে, অক্ষরপ্রণয়কে, পাওয়া বা না-পাওয়াকে একই সঙ্গে প্রকাশ ও গোপন করার দ্বন্দজটিল অভিপ্রায় নিয়ে হয়তো-বা লেখা হয়েছে এই কবিতাবইয়ের বেশিরভাগ কবিতাই। যা কিছু মানুষের নিজস্ব সত্য, সমাজ তার বেশিটাই জানে না। প্রকাশিত হয়েও তাই তা গোপন। চাপা কোনও বিদ্রোহের প্যামফ্লেটের মতো ইঙ্গিতময়। তাই তো সমস্ত রাত্রি রক্তক্ষরণের পরে হঠাৎ এক ভোরবেলায় শ্বেতপদ্ম ফুটে ওঠার খবর কেউ কোনোদিন জানবে না : 'শ্বেত-পদ্ম ফোটে/ নীরব সকালে/ প্রতি পাপড়িতে তার বাক্-মঞ্জরীর ঘ্রাণ' ( বাক্-মঞ্জরীর ঘ্রাণ-২) এ-পদ্ম যে হৃদয় আর মননের পাপড়ি দিয়ে গড়া। ‘কথা-র সুখ গড়িয়ে নামে তার পাপড়ি থেকে... বৌদ্ধ সহজযানে নির্বাণের অন্য নাম তো 'মহাসুখ।' সহজানন্দ লাভই সাধকের লক্ষ্য — ঈশ্বর নয়, মোক্ষ বা মুক্তি নয় — বোধিপদ্ম ফুটে ওঠে তখনই...'ওগো, যদি তুমি মৃগয়ায় যাও (বিষয়ের) পঞ্চহরিণ শিকার করো নিশ্চয়ই। মহাসুখের সেই পদ্মবনে একমনা হয়ে পথ হেঁটো। আহা জ্ঞানের ভোর ফুটে উঠেছে দেখো, অজ্ঞানের কালরাত্রি গেছে দূরে সরে' (২৩ নম্বর চর্যাগান) ... ‘ওগো (নৈরাত্ম)-যোগিনি! তোমাকে ছাড়া যে এক মুহূর্ত বাঁচাতে পারি না! সহজ আনন্দের মতো তোমার মুখ চুম্বন করে আমি বোধিচিত্তরূপ পদ্মরস পান করব।’ (গুণ্ডরীপাদানাম, চতুর্থ চর্যাগান) —এক দিকে তাঁর চর্যাগীতি, অন্যদিকে পদাবলী।
পাঠক নিশ্চয়ই খেয়াল করবে এই কবিতাবইয়ের বেশ কিছু শব্দের প্রথমে বসা 'মহা' পদটিকে। মহাসুখের দুই ডানা, শূন্যতা আর করুণা। কিন্তু সেই উড়ান কি একে আসে, একায় আসে? লাগে না তার দ্বিতীয়াকে? একায় কি আর চাষবাস হয় ! — 'বীজধান দিয়েছেন মহাজন।...অসহায় মাটিতে কোথায় হবে যে বীজতলা! হলুদ শাড়ির গন্ধমাখা হাওয়া এসে বলে হাহাকার-কথা!...ভালোবাসা ছড়িয়ে পড়লে বৃষ্টি তবে অনিবার্য ফল!' (চাষ) ‘অসহায়’ এই ‘মাটি’তবে কার? হাহাকার কার? কার কাছে বৃষ্টি ঝরে পড়ে? — যেন ঘুলঘুলি দিয়ে আলো আর অন্ধকার, না-পাওয়া আর পাওয়া, ব্যর্থতা আর বিশ্বাস সাইক্লোরামা এঁকে চলেছে। সেই দ্বিতীয়ের কাছে সব পাওয়া আর না-পাওয়া, সমস্ত অর্জিত বাক্ গচ্ছিত রাখতে হবে : 'সেই কথাটাই বলব। অনেক তরঙ্গ থেকে উঠে আসা ফেনার মতো শব্দগুলি ডুবে ভেসে কাদামাটি মেখে ঝিনুকের গন্ধ নিয়ে হাতে এসে পড়ে।... হাত পাতো, কথাগুলো রাখব।' (জোর)
একটি বিভ্রম বড়ো হয়ে উঠছে ধীরে ধীরে। তার ছায়ার নীচে কবির স্বপ্ন, কবির ঘর। ভরদুপুরেও সেখানে নূপুরের গান। এই নূপুর তো বলছে করুণা, তাই রুন রুন বেজে ওঠে সেটি। দুপুরের সঙ্গে কথা হতে হতে সারা আকাশ জুড়ে ঝরে পড়ে গান, প্রেয়সীভাবে আদর করে বর্ণমালা। 'বিভ্রম সুন্দর হয়েছে! তবে এইসব সাজানো বাগানে বিভ্রম ফুটে আছে! ' (বিভ্রম) কখনো আবার ব্যথায় ডুকরে কেঁদে ওঠে মন, 'কী হবে এখন? ছেঁড়া পর্দার পাশে দাঁড়িয়ে রুদ্ধশ্বাস, গোপনে দেখা ক্ষতবিক্ষত অক্ষর শরীর।' (সিদ্ধি) — অক্ষরে কি ক্ষত হয়, বলো তুমি ! কখনো ঘটের প্রয়োজন হলে যেমন কুমোরপাড়ায় দৌঁড়ে যাও তুমি, 'ও ভাই কুমোর, আমাকে একটি ঘট বানিয়ে দাও' — শব্দের প্রয়োজনে যাও না তো ব্যাকরণের কোনো কারিগরের কাছে! শব্দের কি ক্ষয় আছে, ক্ষয়ে যায় ব্যবহারের জীর্ণতা।
কবিতার মিনার কেমন হবে? সে কি দাঁড়িয়ে থাকবে টানটান হয়ে? সে কি আইফেল টাওয়ারের মতো এক বিপজ্জনক ভূমিগন্ধের টানে বিভ্রমের ভয়ানক মাধ্যাকর্ষণে ঈষৎ ঝুঁকে থাকবে চৈতন্যের সাততলা অবগাঢ় জলের তলায়? যারা সেই মিনারে যাবে, অদিতির ভালোবাসার সেই সামান্য ক'জন মানুষ — কেমন হবে-বা তাদের রুপোলি পোশাকের সাজ? কেমন তাদের উন্মুক্তবাহু আশরীর শব্দঘ্রাণে ভেজা ডানার পালক? — 'ভেজা ডানার ঝাপট দিলেই নামে বৃষ্টি'। এসো, ডুব দিই সেই 'মহা-দুপুরের' টলটলে জলে -- ডুব দিই 'তৃপ্তির' সঙ্গে --- 'মহাসুখ' থেকেই তৃপ্তি! 'কারণ থেকে মহাকারণের মধ্যে দিয়ে যেতে যেতে মহাভাবে তখন!' (পদাবলী)
কত-যে আগুন তাঁর লেখায় বসতি করে! আগুনের ফুলকি ছড়িয়ে যায় অক্ষরে অক্ষরে : 'অন্ধকার জ্বলে ওঠে। পরপর সাজানো কাঠ। হাড় পোড়ে, নাম ও ঠিকানা'। কেন এই আগুন ? 'অন্ধকার যত পোড়ে, ততই রক্তকরবীর হাসি উজ্জ্বল হয়' (দহন)। 'অগোছালো বর্ণমালা যথাযথ করার চেষ্টায়' এই আয়োজন -- 'একদিন / উথলে উঠবে বাঁশি' -- নিজেকে পুড়িয়ে দিন মাস বছরের সেই অপেক্ষা। 'চিরন্তনী কথা যেন নির্জীব' হয়ে না পড়ে, সেই আশঙ্কা। অগ্নিচয়ন করা কি এত সহজ! মনে নেই তোমার যমরাজের কাছে এক ছোট্ট শিশু নচিকেতার প্রার্থনার কথা — কী-হবে আমার দাসদাসী মণিমুক্তো আর তিনভুবনের ঐশ্বর্যে, যদি আমি আগুনকে না পাই! মনে পড়ে যায় অমিয় চক্রবর্তীর সেই মন্ত্রময় পঙ্ক্তি ( ওঁ কৃতং স্মর) "জ্বালানি কাঠ, জ্বলো/ জ্বলতে জ্বলতে বলো/ আকাশতলে এসে— " আঙার হল আলো/ আঙার হল আলো / পুড়ল কাঠের কালো / পুড়ল কাঠের কালো / নীল সন্ধ্যার শেষে।"
শ্বেতাশ্বতর উপনিষদ বলছে, 'বেদাহমেতং পুরুষং মহান্তম্/আদিত্যবর্ণং তমসঃ পরস্তাৎ।/তমেববিদিত্বাতিমৃত্যুমেতি/ নান্যঃ পন্থা বিদ্যতে অয়নায়॥' — তাঁকে জেনেই মৃত্যুর উপত্যকা পেরিয়ে যেতে হবে আমাদের। — এই বইয়ের বিভাব কবিতাটিতে কবি নিজেই এই মন্ত্রময়তার কাছে হাত পেতেছেন। ভাবো তুমি, 'সে' কে? চর্যাধারী তো ব্রহ্মকে চাইবেন না! কাকেই বা তবে জানতে হবে তাঁকে? মৃত্যুই বা কী? তবে কি বাক্, যাঁর মিলন-বিরহের ঘ্রাণ কবি রোজ বুক ভরে টেনে নেন, তিনিই তাঁর ঈশ্বর? তিনিই মহাসুখ! তাঁকে না পাওয়াই মৃত্যু? তাঁর আগুনেই অন্ধকার পুড়িয়ে নিরন্তর পথ চলা!
শব্দধানের শরীরে কি তার অর্থ থাকে শুধু, ভাব থাকে না! যে সেই শব্দ নিয়ে ওস্তাগরি করে, যে সেই ভাবের ভাবুক, সে তাতে বুনে দেবে বিষাদ আর সুখ, বাক্ যদি তার সখ্য মেনে নেয় — যদি মিলন হয় কোনোদিন । তাই তো তার আকুতি শোনা যায় অজানা চরের সেই তন্দ্রাচ্ছন্ন গানের মতো, 'মিলন হবে কত দিনে'! — 'কথা অশেষ।... সন্ত্রস্ত রাত তাকিয়ে থাকে কথার ফুল-ফল নৈবেদ্যের দিকে। ঈষৎ দূর থেকে পাওয়া যায় বাক্-মঞ্জরীর ঘ্রাণ।' (বাক্-মঞ্জরীর ঘ্রাণ-১) — কীভাবে তাঁর হাতে এসে পড়বে সেই মহাভাবের কথা তোমার আমার অভিধান জানে না। খবরের কাগজের একরোখা ক্যাপশন তার খবর পায় না। বহুদিন শিকড় ছড়াতে ছড়াতে হঠাৎ একদিন বাক্ অদিতির কর্ষণে ডালপালা মেলে দেয় কবিতায়। গাছে গাছে মউল আসে। বাক্-মঞ্জরির ঘ্রাণে মোহিত হয়ে ওঠে কবির এপার-ওপার।🔅
বোধিসত্ত্ব মুখোপাধ্যায়ের কবিতা নিয়ে
আলোচনা করেছেন পারমিতা ভৌমিক
কবি বোধিসত্ত্ব মুখোপাধ্যায় এর সঙ্গে আমার পরিচয় বেশ কিছুদিন আগের। আমি তখন সবেমাত্র লিখছি। আমার লেখা নিয়ে বন্ধু বোধিসত্ত্ব অনেক আশাবাদী ছিলেন। সেই থেকে বন্ধুত্ব গাঢ় হয়। আমি চিনতে পারি ওনার কবিসত্তাকে এবং ভালো লেখা সনাক্ত করণের মন ও চোখের দৃষ্টি কে।
বোধিসত্ত্ব মুখোপাধ্যায় কে কখনো দেখিনি। তবে বন্ধুত্বের নৈকট্য যে কোনো মানুষের শ্লাঘার বিষয় হতে পারে। তাঁর কাব্যগ্রন্থের একটি ব্লার্বে অদ্ভুত কিছু কথা পেয়েছি যা কবি বোধিসত্ত্বের মতো প্রিয় ব্যক্তিত্বকে আমাদের কাছে প্রতীয়মান করে দেয় —
"... কম্পিউটার শাসিত এই অদ্ভুত সময়েও ভূতগ্রস্তের মতো তাঁর রচনা পাঠককে অনিবার্যতঃ বিস্মিত করে।
অন্তর্গত এই আত্মমগ্নতা কবি বোধিসত্ত্বের স্বভাব ও স্বধর্ম।...
আবেগের এই অধুনা বিরল বিশুদ্ধতাই এই কবির রচনার প্রধান গৌরব।
গদ্যরীতিতে এই কবি স্বচ্ছন্দ প্রায় প্রথম থেকেই।...
বোধিসত্ত্বের কবিতা কেবল যাপিত জীবনের কাল্পনিক ধারাবিবরণী নয়, সে তাঁর আত্মানুসন্ধানের, আত্মবিশ্লেষণের, আত্মোপলব্ধির অনন্য মাধ্যম।...”
কবি রমাপ্রসাদ মিত্রের সঙ্গে আমরা একমত।
এইসব কথা যথেষ্ট প্রণিধানযোগ্য হয়ে ওঠে যখন আমরা তাঁর কাব্যগ্রন্থ "চন্দ্রাহত শিলালেখ" পড়ি।
একটি কবিতা অন্তরকে অভিভূত করে-----
"সাদাপালক"
যখনই কবি বলছেন -----
"সাদাপালক তিমিরহরণ"
কিম্বা
"সাদাপালক আয় জ্যোৎস্না কুড়ুই, কাঠকুডুনি জ্যোৎস্না তোর গায়!"
তখন চৈতন্যের দাঁড়ে দোলা লাগে। মনে হয় সাদাপালক তাহলে স্বরূপতঃ কি?
সে কেমন পালক যাকে কবি বলেছেন তিমিরহরণ?
সেই কি মিস্টিক আলো ? জ্যোৎস্না যা অন্ধকারের কালো কে ফিকে করে দেয়?
যার পালক আছে তার উড়ান আছে। জোছনায় চন্দন মাখানো উড়ান।
পাঠক লক্ষ্য করুন কবি আমাদের অলৌকিক স্পেস এর দিকে দিকনির্দেশ দিচ্ছেন। লোক অলোকের ঐ মিলনস্থল কবি চেতনার মিস্টিক জোন।
কবি রমাপ্রসাদ আমাদের বোধ হয় ঠিক ঐ অঞ্চলে এনেছেন।
আসতে আসতে জ্যোৎস্না শরীর হয়ে উঠেছে। বনানী-দেহ। কবি বোধিসত্ত্বর মনে হচ্ছে —
"আমের বকুল বুকের পাঁজর পলাশ বুঝি হাত!"
" বটের পাতার মুকুট পাবি ভাঙবো ঝড়ের রাত!"
— আশ্চর্য অঙ্গ প্রত্যঙ্গ সংগঠন। আমের বকুল ও জ্যোৎস্না সুন্দরীর বুকের পাঁজর। পলাশ হয়েছে হাত। আশ্চর্য সমাপাতন — সাররিয়্যাল সংস্থাপনে ও ডায়নামিক ইমেজ প্রতিস্থাপনে প্রাণ অপ্রাণের ভেদরেখা মুছে গিয়ে জ্যোৎস্না ক্রমশঃ হয়েছে মানসসুন্দরী।
এরপর অন্য বৈপরীত্যে ঐ সাদা পালক কেমন মৃত্যুময় হয়েছে — পাঠক পড়বেন সম্পূর্ণ কবিতাটা।
সাদাপালক
সাদাপালক তিমিরহরণ সাদাপালক আয়
জ্যোৎস্না কুড়ুই, কাঠকুডুনি জ্যোৎস্না তোর গায়!
আমের বকুল বুকের পাঁজর পলাশ বুঝি হাত!
বটের পাতার মুকুট পাবি ভাঙবো ঝড়ের রাত!
সাদাপালক, ভীষণ অসুখ, শ্মশানবন্ধু নেই
যারা ছিলো আগুন খেলো, হারিয়ে দিলো খেই।
বৃষ্টি তখন মধ্যরাতে দুয়ার ছিল খোলা
এক চিলতে মেঘের মতো বাতাস দিলো দোলা।
ঝাপ্টে এসে বিছানাতে আসন নিলো শিল
চোখের মণি জ্বলতে জ্বলতে দর্জা দিলো খিল
খিল পড়লো বাইরে তবু পদ্মদীঘির চুল
জড়িয়ে এলো, ঘরের ভেতর ভয়ে ভাঙলো কূল।
সাদাপালক, রাত্রিব্যাপী কূল ভাঙছে দেখি
বালিশ দিলাম তাও হলো না শরীর মুচড়ে বেঁকি।
বেঁকতে বেঁকতে প্রণাম হলাম, প্রণত ধরিত্রী
কে যে আগুন, কে কুটোটি, কেই বা সৎ-সতী!
তিমিরহরণ সাদাপালক, বিকেল হলেই আয়
বাবার দেওয়া উড়নি দেবো জড়িয়ে তোর গায়!
চন্দ্রাহত শিলালেখ কাব্যগ্রন্থ থেকে বেরিয়ে এল আরেকটা কবিতা। নাম "মিলন".......
"আলোবাতাসের মতো এ মুহূর্তে জেগে আছো বলে কুণ্ড ঘিরে তোমারই তো স্তব।"—পংক্তিগুলোতে জেগে ওঠে মহাকৌল তান্ত্রিকের স্তব।
এ শক্তির আরাধনা। আলো শক্তি। বাতাস শক্তি। ভূত চতুষ্টয়ের আসন পাতছেন কবি। সব শবসাধনাই মিলন সাধনা। স্পিনোজার পরমতত্ত্ব। রবীন্দ্রনাথ কি এই অধিশীর্ষীয় বোধে পৌঁছে লিখেছিলেন —"কার মিলন চাও বিরহী "!
আসলে মহিম সৎ (existence absolute) থেকে বিচ্যুত এই সৃষ্টি খণ্ড প্রকাশ। তাই শেষ পর্যন্ত খণ্ড চাইবেই অখণ্ড কে। মিলন সেই পথ। সে পথেই বোধিসত্ত্ব দেখেছেন অন্য উড়ান —
"তোমার নামেই পাখিদের বিশ্ব-পরিক্রমা দেখি"
শুধু তাই নয় সূক্ষ্মে স্থূলে সে এক অভূতপূর্ব বন্ধনদশা দৃশ্য হচ্ছে — কখন?
"যখন তোমার ছায়া কদমশাখায়, আর যমুনা-প্রবাহে ভাসে" —কবি অলক্ষ্যে আনলেন কৃষ্ণ মিথ। রাধার ছায়া কদমশাখা যমুনা প্রবাহ এল।
তখনই " বিকেলের শান্ত চোখের টানে যেন মনে হয় বলি, "কাছে এসো, ভুলে যাই মুত্যুর কথা।"— মৃত্যু তো মৃত্যু নয়। বিনাশ নয়। মৃ ধাতু নিষ্পন্ন পদ মৃত্যু। মৃ মানে ঝলমল করা। হ্যাঁ। "বেদ" বলেছেন। তাই স্থূল দেহ মৃত্যু ভুলতে পারলেই অমৃতময় জীবন যাপন সম্ভব। জীবাত্মা পরমাত্মার মিলন।
এইভাবে —"রোমাঞ্চিত, স্বপ্নে ডুবি তলহীন পারাবারে মাটি জলে তোমারই তো আমি!" — নামকরণ এখানেই সর্বাংশে সার্থক হল।
জন্মান্তর — আর একটি কবিতা যেখানে মুদ্রিত আছে কবির লিখন শৈলী ও শৈল্পিক ভাবনা।
অবাক করে যখন কবি লেখেন—
"বিশ্বাসের পর্দায় নীলরেখা আরো স্পষ্ট হলো আজ" — ইমপ্রেসনিস্ট কবি বিশ্বাসকে দেখেছেন পরম সত্য হিসেবে। কিন্তু তার নীল বিকিরণ একটা মিশ্র ধোঁয়াশার কথা বলে। এখানে একটা ছবি ভেসে ওঠে। সে ছবি ভ্যান গখ এর নীলে মাখামাখি হয়ে সামনে এসে দাঁড়ায়। শুধু তাই নয় —
"তার কান্নার ভিতর যেন মৌমাছির গুঞ্জন সেই গুনগুন্ স্বরে আত্মাহুতি দিয়ে আমি স্থির বিন্দু বিন্দুবলয়ের চারিদিকে কিছু নেই, কিছু নেই, এই রূপের ভিতর আমি একা তার হয়ে আছি তার কান্না জন্ম দিচ্ছে আমায়" — ঐ সব থেকে তৈরি হয় বিরাট শূন্যতা। তুমি নেই আমি নেই কেউ নেই কিছু নেই।
সৃষ্টির পূর্বলগ্নের একের স্থিতিবিলাস।
সেই শূন্যতা পার্সোনিফায়েড হলে কবি পাঠকদের দেখান—
"ভোরের আলোয় সে আমার বুকে মুখ রেখে কাঁদছে"
আর
"জন্ম হচ্ছে তার জন্ম হচ্ছে আমার ঊষার মতো অস্পষ্ট তন্দ্রালীনতায়"
এই সৃষ্টির ভ্রূণে জন্মরহস্যছবির ফুটে ওঠা।
পাঠকের কাছে অনুরোধ করছি বাকিটা পড়ুন —
"বিশ্বাসের পর্দায় নীল রেখা আরও স্পষ্ট হলো আজ
তার কান্নার ভিতর যেন মৌমাছির গুঞ্জন
সেই গুনগুন স্বরে আত্মাহুতি দিয়ে
আমি স্থির বিন্দু
বিন্দুবলয়ের চারদিকে কিচ্ছু নেই ,
কিছু নেই ,
এই রূপের ভিতর আমি একা , তার হয়ে আছি
তার কান্না জন্ম দিচ্ছে আমায়
ভোরের আলোয় সে আমার বুকে মুখ রেখে
কাঁদছে আর জন্ম হচ্ছে তার ;
জন্ম হচ্ছে আমার ;
উষার মতো অস্পষ্ট তন্দ্রালীনতায়”
এরপর আমি আরও একটি কবিতা পড়ে শেষ করব আমার বলা।
কবিতার নাম — "মধু "
স্মৃতির আকাশ ভেঙে নামে জল-ঘূর্ণির হাওয়া
বুকটান , শ্বাস গেঁথে দেখি বড় আঁধার যামিনী
ব্রহ্মাণ্ড ছিল না যখন , কিছু বীজ ছিল না কি
শিমুল তুলোর মতো , এলোমেলো উঠোনে বসলো
অখিল আলোয় স্নাত বীজ ফেটে কিছু গাছ
শোভনীয় ফুল-ফল আর প্রবাহের হাতে
কিছু উপশম লেগেছিলো হয়তো বা l
কঠিন পেলব হাতে কিভাবে যে ধরে আছো--
ঘূর্ণি হাওয়ার স্মৃতি ,
কীভাবে বাজাও যন্ত্রে ' মধুবৎ পার্থিবং রজঃ'
আমার কাছে এ কবিতা যেভাবে ধরা দিয়েছে বলছি —
"স্মৃতির আকাশ ভেঙে নামে জল-ঘূর্ণির হাওয়া
বুকটান ," — কবির ধ্রুবা স্মৃতি সংস্কার হয়ে সঞ্চিত ছিল আকাশে (space-এ)
মনাকাশ দেহাকাশ গৃহাকাশ মহাকাশ — সর্বত্রই ছিল নেগেটিভ এর মত। ছায়াময়। পরে নেমেছে পদার্থিক ক্ষেত্রে (field ) — জল ঘূর্ণি হাওয়ায় বুকটান। তারপরেও কথা থাকে। কবিকথায় শুনি—
"শ্বাস গেঁথে দেখি বড় আঁধার যামিনী
ব্রহ্মাণ্ড ছিল না যখন ," — এমন অমোঘ বিজ্ঞান চেতনার প্রকাশ মনে করিয়ে দেয় কুম্ভকে ধরা পড়া এক অসীমার ধারণা। তবু কবি জেনেছেন, এও তো সত্য যে, কিছু বীজ ছিল শিমুল তুলোর মতো, এলোমেলো উঠোনে। সেই আদিত্যবর্ণ বীজই অখিল আলোয় স্নাত রূপান্তরের আবেগ ফেটে কিছু গাছ
শোভনীয় ফুল-ফল আর প্রবাহের হাতে আশ্চর্য প্রাণনায় কিছু উপশম হয়েছিলো হয়তো বা তবুও এভাবেই কবির মেধাদ্রীপ্র চৈত্যসত্য জেনেছিল,
"কঠিন পেলব হাতে কিভাবে যে ধরে আছো--
ঘূর্ণি হাওয়ার স্মৃতি ,
কীভাবে বাজাও যন্ত্রে ' মধুবৎ পার্থিবং রজঃ' !"
কবি জানেন এ পৃথিবী বারবার মধুপর্ণা হবে।🔅
।।
ছবিতে কবি বোধিসত্ত্ব মুখোপাধ্যায়।।
![]() |
যুবক বোধিসত্ত্ব কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে শান্তিনেকেতনে। অন্যরা ১ - অরূপ সেনগুপ্ত (আবৃত্তি শিল্পী), ২- অভিজিৎ চক্রবর্তী (ঋদ্ধি পত্রিকার সম্পাদক) |
![]() |
| পুরুলিয়ার কবি নির্মল হালদার ও তার সঙ্গীদের সঙ্গে |
![]() |
| বন্ধুবৃত্তে |
![]() |
| সাইন্যাপস্ পত্রিকার সম্পাদক মৌসুমী ঘোষের সঙ্গে |
.png)











