মৌসুমী ঘোষ সম্পাদিত ছোটোদের সাইন্যাপস্
শ্রাবণ ১৪৩৩ ।। অগাস্ট ২০২৬
স ম্পা দ কী য়
শ্রাবণ মানেই ঘ্যান ঘ্যানে বৃষ্টি। ঝমঝম করে বৃষ্টি। মেঘ ভাঙা বৃষ্টি। রাস্তাঘাটে জল দাঁড়িয়ে যাওয়া বৃষ্টি। আর শ্রাবণ মানে ব্যাঙেদের হৈ হৈ করার দিন। এই ব্যাঙেদের নিয়ে গল্প লিখেছেন রুমা আন্টি।
আমাদের ছোটোবেলায় শ্রাবণের সন্ধে মানেই ছিল লোডশেডিং। তারমানে কিন্তু মজা কম হতো তা কিন্তু নয়। হ্যারিকেন জ্বালিয়ে কতক্ষণ আর পড়া যায়! বাড়ির বারান্দায় বেরিয়ে পাশাপাশি বাড়ির সকলে গান-ছড়া-গল্পে মেতে উঠতাম মনে আছে। ঠিক আমার ছোটোবেলার মতো তোমরাও যাতে ছড়া পড়ে মেতে উঠতে পারো তাই রামকিশোর জেঠু, হরিৎ আঙ্কেল, বিনোদ আঙ্কেল আর দীপঙ্কর আঙ্কেলের ছড়া পড়ে তোমরা বর্ষার বৃষ্টি উপভোগ কোরো। সবে বিশ্বকাপ শেষ হয়েছে। তোমাদের ছড়াকার বন্ধু শৌর্য্য কিন্তু এখনো খেলায় ডুবে আছে সেটা ওর ছড়া পড়ে তোমরাও আমার সঙ্গে একমত হবে। দৃপ্ত আর তানিশী-র আঁকা দেখে জানিও কেমন লাগল।
সামনেই শিক্ষক দিবস মনে আছে তো? এবারের সংখ্যায় ধ্রুবজ্যোতি জেঠুর কলমে নির্মল স্যারের ক্লাস করে বিজ্ঞানের অনেক জানা অজানা কথা জেনে নাও। তোমাদের যদি নির্মল স্যারের ক্লাস পছন্দ হয় তবে আমি ধ্রুবজ্যোতি জ্যেঠুকে বলব, নির্মল স্যার যেন মাঝে মাঝেই তোমাদের ক্লাস নিয়ে নেন ছোটোদের সাইন্যাপস্-এর পাতায়। এবারের সংখ্যায় জ্ঞান বিজ্ঞান ছাড়াও আছে শব্দ-জব্দের ছক। সুব্রত আঙ্কেলের তৈরি করা ছক পূরণ করে নাও। আর পরের সংখ্যা দেখে বার করে নাও তোমাদের শব্দের ভান্ডারের ফান্ডা।
শ্রাবণের সন্ধেতে ঘরে বসে থেকে বৃষ্টি থামার অপেক্ষা না করে আমরা ছোটোবেলায় ভূতের গল্প পড়ে ফেলতাম। এবারের সংখ্যায় সিক্তা পিসি তোমাদের সেরকম একটা গল্প শুনিয়েছে। তবে শ্রাবণ চলে গেলেই শরৎ আসে। শরৎ মানেই দুর্গাপুজো। পুজোয় যারা বেড়াতে যাবে প্ল্যান করছো তাদের জন্য স্বপ্নময় দাদা খুব সুন্দর সুন্দর জলপ্রপাতের ছবি পাঠিয়েছে।
এমন শ্রাবণ দিনে পাঁচটি পাঠপ্রতিক্রিয়া আষাঢ় সংখ্যার কথা বলে আমাদের নস্টালজিক করে দিয়েছে। তোমরাও শ্রাবণ সংখ্যা পড়ে এমন মূল্যবান পাঠ প্রতিক্রিয়া লিখে পাঠাবে এই আশা রাখি। এসো এবার সকলে মিলে শ্রাবণ সংখ্যার লেখাগুলোর মধ্যে ডুব দিই। — মৌসুমী ঘোষ
।।। । কবিতা ও ছড়া ।।। ।
ইচ্ছেরঙের বিকেল
রামকিশোর ভট্টাচার্য

বিচ্ছু হাওয়ারা সঙ্গী তার,
রঙের বাক্স মেলে দিলে ডানা,
মন যে থাকে না এ ঘরে আর।
সবুজ মলাটে আঁকার খাতা যে
সাঁঝের পাখিটি হয়ে যায় ঠিক,
সিঁদুর মাখানো রোদ গায়ে দেখি,
বুড়ো বটগাছ হাসে ফিকফিক।
ইচ্ছেরঙের এমনই বিকেলে
বইরা শুয়েছে ক্লান্ত খুব,
অঙ্কের খাতা ঢুলে পড়ে ঘুমে,
আমিও দিয়েছে ভাবনায় ডুব।
একটা জোনাকি মিটি মিটি হেসে
যেই এসে বসে এ মনের গায়ে,
টুই টুই টুই পাখির ছানাটি —
চাইছে যে দেখি আদর মায়ের।
পড়ার ভূত
হরিৎ বন্দ্যোপাধ্যায়
যাই যে সময় ভুলে
না পড়লেও পড়িয়ে নেবে
জোরসে কানটি মুলে ।
সবাই বলে পড়ার ভূত
চাপে আমার মাথায়
আমিও দেখি ঘোরের বশে
লিখি কী সব খাতায়।
যা কিছু সব খাতায় লিখি
একটাও নয় ভুল
সবাই বলে খুব মেধাবী
সব মার্কসই ফুল।
ভূত যদি হয় এমনধারা
সবার মাথায় চাপুক
ভবিষ্যৎটা শক্ত হবে
যতই বাধা আসুক।
ভূত মানে যা তোমরা বোঝো
এটা তেমন নয়
চোখ খুললেই ভূতের মিছিল
এমন যেন হয়।
ইচ্ছে করে
দীপঙ্কর বেরা
ছোট্টো খোকার ইচ্ছে করে
গাছের ডালে ফুলের মতো
পাখির মতো ডানা মেলে
মাছের মতো সারাটা দিন
খোকার মনে এমন কত
আক্ষেপ
বিনোদ মন্ডল
জঙ্গলেতে জাগলো যে প্রাণ
কিচিরমিচির তরজায়।
কান খাড়া সব খরগোশে
লুকোয় ভয়ে গর্তে
শেয়াল ডাকে — হুক্কা হুয়া
বার্তা ছড়ায় মর্ত্যে ।
জানোয়ারের জীবজগতে
এমনিতে সব ঠিকঠাক
সাতচড়ে কেউ রা কাড়ে না
যা হচ্ছে হোক — নির্বাক।
কিন্তু দেখি — হঠাৎ একি —
আকুল পক্ষিকুল
চিল শকুনের সঙ্গে সামিল
মুনিয়া বুলবুল ।
গাছ কেটে বন করছে সাবাড়
হারায় বাসা যতো
মানুষ এখন সব খেতে চায়
দাবানলের মতো!
পশুরাজের জবাব শুনে
থ' বনে সব পাখি
রাজাকে কি বোকা ভাবিস
ওদের খবর রাখি!
পরের বাসা কাড়তে গিয়ে
মানুষ আলাদিন
দেশে দেশে করছে লড়াই
নিত্য গৃহহীন !
হাহাকার আর আর্তনাদে
ব্যাকুল ধরাতল ;
মানুষ যদি মানুষ না হয়
কী আর করি বল !
রংবিহারী
শৌর্য্য পাল
আমাদের পাড়ায় সেবার
রোদ ঢালা মাঠের পাশে
ছেলেদের হট্টমেলা।
এ পাড়ার রংবিহারী
ছিল 'বে-রঙিন' টিমে
সাদা-কালো জার্সি ছিল
টিমটিমে, বড্ড ঝিমে।
অপোনেন্ট প্লেয়ারগুলোর
জার্সি যে রংচঙে বেশ
লাল নীল হলুদ সবুজ
রামধনু ছড়াচ্ছে রেশ।
স্ট্রাইকার রংবিহারী
ঝলমলে পছন্দ তার
সাদা-কালো জার্সি পরে
মাঠে নেমে খেলবে কি আর!
ম্যাচে যেই টিম আপ হলো
রেফারি হলেন কাবু
লাল নীল জার্সি পড়েই
নেমেছেন 'রঙিন' বাবু।
রেফারি প্রশ্ন ছোঁড়েন-
'এ কেমন কেলেঙ্কারি!
অপোনেন্ট জার্সি গায়ে
মাঠে কেন রংবিহারী?'
হেসে হেসে জবাব এলো-
'রেফারি, নেভার মাইন্ড
আমি সেই জন্ম থেকেই
একেবারে কালার ব্লাইন্ড।
।।। । বিজ্ঞান সচেতনতার গল্প।।। ।
নির্মল স্যারের ক্লাস (পর্ব ‘ক’)
সে কোন গাছের খোঁজে
ধ্রুবজ্যোতি দে
(এক)
অক্ষয় আদর্শ বিদ্যানিকেতন। প্রায় শতবর্ষের পুরানো স্কুল। এই স্কুলেরই লাগোয়া একটি ছোট মাঠ। আশপাশের ছোট ছেলেরা রোজ বিকেলে এখানে বল খেলতে আসে। এই পাড়াতেই থাকে পঞ্চম শ্রেণীর তপন। এক শনিবার বিকেলে সে তার ক্লাসের বন্ধু মানিককে মাঠে আসতে বলে। মানিকের বাড়ি কিছুটা দূরে। অন্যদিন স্কুলের পর বাড়ি গিয়ে ফের আসতে দেরি হয়ে যায়। তাই সে কেবল শনিবার আসে। মানিক আসতে তপন বলে, “দ্যাখ, সেদিন পরিবেশ ক্লাসে নির্মল স্যার বিজ্ঞানী গোপালচন্দ্রের গপ্প বলার সময় আলো দেওয়া গাছের কথা বললেন। আমাদের চারপাশে তো কত পোড়ো ভিটে, জলা, জঙ্গল আছে। আমি ভাবছি ওরম গাছ এখানে আছে কিনা খুঁজবো। তুই থাকবি আমার সঙ্গে?”
মানিক বলে, “স্যার তো বললেন, প্রকৃতিবিজ্ঞানী গোপালচন্দ্র আলো দেওয়া গাছ দেখেছিলেন বর্ষার রাতে ভিজে পচা গাছপালার মধ্যে। তাছাড়া সেটা তো ছিল ছত্রাক। আর সে অনেককাল আগের কথা, এখন তা পাওয়াও যায় না।” তপন অধৈর্য্য হয়ে বলে, “আরে এখন কি কেউ খুঁজেছে নাকি? আর খুঁজবো তো বিকেলের পর, রাত নামলে, অন্ধকারে।” মানিক ঘাবড়ে গিয়ে বলে, “না বাবা, রাতে বাইরে ঘুরলে বাবা মারবে। বাবা তো কাজ সেরে বিকেলেই বাড়ি চলে আসে।” তপন হতাশ হয়, “আমার তো বাবা নেই, আর মা সকাল বিকেল বসাক দাদুর বাড়ি রাঁধতে যায়, ফেরে সন্ধ্যের পর। তাই মার খাওয়ার ভয় নেই। ওরাম গাছ পেলে বরং তোকে রাখতে দোবো। আমার তো জায়গা নেই, তোর বাগানে রেখে দিবি। রাখবি তো? তুই কিন্তু কাউকে বলবি না।” মানিক রাজি হয়।
তপনদের স্কুল মফস্বল শহরটার একেবারে একধারে বড় রাস্তার পাশে। তার ওপারে চাষের ক্ষেত, কয়েকটা পুকুর, খানিকটা জঙ্গল মতো জায়গা; এদিকে একপাশে মাঠ, তারপরে গ্রাম। সেখানে তপনদের ছোট মাটির ঘর। তপনের মা পদ্মা সকাল বিকাল দুই বেলা বসাকবাবুর বাড়ি রান্না করতে যান। তাই খাবার জোগাড় ও ঘরের কাজ করে তপনের ব্যাপারে আর বিশেষ খেয়াল রাখতে পারেন না। সেও মা ঘরে না থাকলে স্কুল বাদে বাকি সময় আপন মনে এধার ওধার ঘুরে বেড়ায়। একাই, সঙ্গী বলতে পাড়ার কুকুর ভুলো। মা বসাক বাড়ি থেকে রাতের খাবার নিয়ে এলে তার থেকে ভুলো একটা রুটি পায়। রুটি খেয়ে সে তপনদের ঘরের দরজায় শুয়ে থাকে। পরের শনিবার তপন মানিকের অপেক্ষায় মাঠে বসেছিল। ভুলো নিজের মতো মাঠে ঘুরছিল।
মানিক এসে তপনের পাশে বসল। তপনের সামনে একটা
মাটির ছোট হাঁড়িতে একটা চারা গাছ। মানিক জানতে চাইল, “এটা কী গাছ? আলো দেবে?” তপন
হেসে বলে, “নারে, দ্যাখ একটু ছুঁলেই ঝিরি ঝিরি পাতাগুলো কীরাম মুড়ে যায়। আর কীরাম
সুন্দর গোলাপী রঙের রোঁয়া রোঁয়া মতো ফুল। তুই এটা নিয়ে যাবি।” মানিক জিজ্ঞাসা করে,
“গাছটা কোথায় পেলি?” তপন দূরে আঙুল দিয়ে দেখায়, “ওই জঙ্গলে। মেলা আছে। যাবি,
দেখতে?” মানিক বলে, “জঙ্গলে গেছি জানলে মা বাবাকে বলে দেবে। সেবারে বাড়িতে সাপ
বেরোনোর পর মা সাবধান হয়ে গেছে। হাঁড়িটা কোথায় পেলি?” “কুমোর পাড়ায়, চাইতে দিয়ে
দিল।” বলে তপন ভুলোকে ডাকল। বলল “চল্ ঘরে যাই।” শরতের বিকেলে কমলা আলোতে তিন বন্ধু খুশি মনে বাড়ির পথ ধরে।
মানিক যখন গাছ নিয়ে চুপি চুপি
বাড়ি এসে বাগানে রাখতে গেল তার মা অবাক হয়ে বললেন, “কোত্থেকে
আনলি লজ্জাবতী গাছ?” মানিক বলল, “তপন দিয়েছে। এর নাম লজ্জাবতী?” মানিকের বাবা অজয়বাবু বাড়ি ছিলেন। বললেন, “ও, তার বুঝি এখন গাছে শখ হয়েছে। তা ভাল,
একটা কিছু নিয়ে থাকবে। নাহলে দেখি খামখা রাস্তায় মাঠে ঘাটে ঘুরে বেড়ায়।” মা বললেন, “হ্যাঁ, কেমন যেন উড়নচন্ডী বাউন্ডুলে
ধরন। লেখাপড়া কেমন করে কে জানে।” মানিক তাড়াতাড়ি বলে ওঠে, “তপন খুব ভাল ছবি আঁকে,
হাতের লেখাও দারুন। ওর বাবা শিখিয়েছেন, ও বলে।” “ওর বাবা সুশীল খুব ভাল মানুষ ছিল,
ভাল ঠাকুর গড়ত। বড় রাস্তায় লরির ধাক্কায় সাইকেল থেকে পড়ে ...” — বলে অজয়বাবু
মানিকের দিকে তাকিয়ে চুপ করে গেলেন।
(দুই)
মানিক যা আশঙ্কা করছিল তাই হল। তার ক্লাসের
বন্ধু প্রতিবেশী মিঠুকে মা জানিয়ে দিলেন গাছের কথা। তার থেকে ক্লাসের সবাই জানল।
নির্মল স্যারও শুনলেন। মানিক তপনকে নিশ্চিত করে যে সে আলো দেওয়া গাছ খোঁজার কথা
বলেনি। স্যারের কথায় মানিক একদিন স্কুলে আনল গাছটা। কেউ কেউ চিনত, যারা চিনত না
তারা হাত দিয়ে পরীক্ষা করল। স্যার জানালেন, “এটা মোটেই চারা গাছ নয়, এই ছোট ঝোপের
মত গাছগুলোকে বলে গুল্ম। আর ক’মাস পরে তোমরা সিক্সে উঠবে। সেখানে পরিবেশ বইয়ে পাবে
গুল্মের কথা। এর ফুল
বলে যেটা দেখছো সেটা পুষ্পমঞ্জরি। এর সব কটা গোলাপি সুতোই এক একটা ফুল। এই যে ছোট ছোট
পাতা মতো এগুলো কিন্তু পাতা নয়, পত্রফলক। সবগুলো ফলক নিয়ে একটা পাতা। কিন্তু এর মজা হল কোনও কিছু ছুঁলে
পাতাটার ফলকগুলো ভাঁজ হয়ে যায়। যেন লজ্জা পাচ্ছে, তাই এর নাম লজ্জাবতী। হিন্দিতে ‘ছুঁইমুই’,
ইংরাজিতে ‘টাচ-মি-নট’। অন্য অন্য ভাষায় আরও নানারকম নাম আছে। সারা
পৃথিবীর সব
বিজ্ঞানীরা যাতে এক নামে চিনতে পারেন তাই এর বৈজ্ঞানিক নাম ‘মাইমোসা পুডিকা’।
মিঠু জানতে চায়, “স্যার, বিজ্ঞানীরা ওরকম নাম দেন কেন? মাইমো… না কী যেন!” নির্মল স্যার উত্তর দেন, “‘মাইমোসা’ গ্রীক ভাষা, মানে নীরব অভিনয় বা মূকাভিনয়। আর ‘পুডিকা’ ল্যাটিন ভাষা, মানে ‘লাজুক’। বিজ্ঞানীরা একমত হয়ে উদ্ভিদ আর প্রাণীদের প্রধান বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী এভাবেই নাম দেন।” তারপর তপনকে বলেন, “তুই বরং একটা খাতা তৈরি কর। ক্লাসের পরিবেশ বইয়ের পাতায় কেবল একটা গাছের ছবি আঁকতে দেওয়া আছে। এখানে প্রতি সপ্তাহে প্রত্যেক পাতায় চেনা অচেনা এক একটা লতা বা গুল্ম গাছের পুরো ছবি আর আলাদা করে পাতা ও ফুলের ছবি এঁকে রাখবি। তার নীচে নাম জেনে লিখে রাখবি। আর একটা মজার কাজ করতে পারিস। যে গাছের ছবি আঁকলি তার একটা ছোট ডাল পুরোনো খবরের কাগজের ভেতর সমান করে পেতে ভারি কিছু দিয়ে চাপা দিবি। তারপর শুকিয়ে গেলে একটা কাগজে এঁটে রাখবি। একে এক ধরণের হার্বেরিয়াম শিট্ বলতে পারো। আসল ‘হার্বেরিয়াম শিট্’ কীরকম হয় বটানিক্যাল গার্ডেনে গিয়ে দেখতে চাইলে ওরা দেখিয়ে দেবে। কাছে পিঠের কলেজে বটানি ডিপার্টমেন্টে গেলেও দেখতে পাবে।”
তপন জিজ্ঞাসা করে, “পোকা লাগবে না?” নির্মল স্যার বলেন, “সে আমি ব্যবস্থা
করে দেব। এভাবে একদিন দেখবি তোর সন্ধানে অনেক গাছের খবর থেকে যাবে। তাহলে তুই বড় হয়ে উদ্ভিদ বিজ্ঞানী হতে পারবি।” শুনে তপনের চোখ উজ্জ্বল হয়ে
ওঠে। ক্লাসের অনেকেই বলে ওঠে, “আমরাও করব স্যার।” নির্মল স্যার বলেন, “খুব ভাল। তোরা
তো পরিবেশ বইয়ের পাতায় কাজ হিসেবে কুলেখাড়া, হেলেঞ্চা, ব্রাহ্মী, আর ঢেঁকি শাক সম্পর্কে
লিখেছিস। গাছগুলো আমি ক্লাসে এনেওছিলাম। এবার দ্যাখ কে কী গাছ চিনতে পারিস।” মানিক
বলে, “বইতেই আছে স্যার, ‘গাছ চেনা সহজ। গাছ তো আর ছুটে পালাতে পারে না’ !” নির্মল স্যার বললেন, “ঠিক কথা। তবে মনে রেখো, কিছু মানুষের মতো কিছু গাছও দুষ্টু
থাকে। তাদের ছোঁয়া পেলে বিপদ হয়। কে বলবে এমন কোনও গাছের কথা?”
তপন হঠাৎ বলে উঠল, “আমি জানি, বিচুটি গাছ।”
নির্মল স্যার অবাক হয়ে বললেন, “হ্যাঁ বিছুটি, যার পাতার রোঁয়াগুলোতে থাকে বিষাক্ত রাসায়নিক।” কথার মাঝে স্বপ্না জিজ্ঞাসা করল, “বিছুটি মানে কী স্যার?” স্যার
উত্তর দিলেন, “বিছুটি পাতার
গাছ কথাটি এসেছে সংস্কৃত ‘বৃশ্চিকাপত্রী’ থেকে। বৃশ্চিক মানে বিছে, তাই থেকে মনে
হয় বিছুটি। কিন্তু তুই কীভাবে বিছুটি গাছ জানলি তপন?” সে বলল, “পুকুর পাড়ে, পায়ে লেগেছিল।”
স্যার — “তারপর?” তপন জানাল, “দেবুদা সাইকেলে আসছিল, দেখে জল দিয়ে ধুতে বলল। তাতে
জ্বালা আরও বেড়ে গেল। ঘরে ফিরতে মা খুব বকল। তারপর চুন-হলুদ চাপিয়ে বেঁধে দিল।
পরের দিন একটু জ্বর হল। তারপর ঠিক হয়ে গেছে।” সেদিন নির্মলবাবুর মনে হয়েছিল
তপনের এই কথার পিছনে আরও ঘটনা আছে। ছুটির পরে তপনকে ডেকে সবটা শুনেছিলেন তিনি।
আসল ঘটনা হল, তপনের পরামর্শে মানিক নির্মল
স্যারের কাছে বিজ্ঞানী গোপালচন্দ্র ভট্টাচার্যের বই চেয়েছিল। তাঁর ‘বিজ্ঞান অমনিবাস’ বইটি
স্যার পড়তে দিয়েছিলেন। তপন জানতে চেয়েছিল গোপালচন্দ্র আর কোথায় কোথায় আলো দেওয়া ছত্রাক
দেখেছিলেন। মানিক বইয়ের ‘ভৌতিক আলো’ লেখাটি পড়ে তপনকে জানিয়েছিল গোপালচন্দ্র একবার
আস্তাকুঁড়ে পচা চিংড়ির খোসার মধ্যে নীলাভ আলো দেখেছিলেন। এরপর তপন একটা দুঃসাহসিক
কাজ করে। সন্ধ্যা নামলে তপন ওরকম আলো খুঁজতে ভাগাড়ে হাজির হয়। হাতে গাছের ডাল ভাঙা
লাঠি, সঙ্গে ছিল
কেবল ভুলো। অবশ্য ভাগাড়ে তপন কিছু পেল না। চুপি চুপি
ঘরে ফিরে দেখে মা কাজ থেকে এসে গেছেন। তপন আর ভুলোর পায়ে নোংরা দেখে
ভীষণ রেগে চেঁচিয়ে উঠলেন, “কী করতে ভাগাড়ে গিয়েছিলি তুই? শিগগির পুকুরে গিয়ে পা
ধুয়ে দরজার বাইরে দাঁড়াবি। মাথায়
জল ঢালব। ওটাকেও নিয়ে যা।” শুনেই ভুলো পুকুরের দিকে দৌড় দিল।
পুকুর থেকে পা ধুয়ে দু’জনে উঠে আসছে। তপনের
পায়ে বিছুটির ছোঁয়া লাগল। সে বুঝতে পারল না কী হল। প্রথমে চুলকানি, তারপর জ্বালা।
এমন সময় বসাক দাদুর নাতি দেবু সাইকেলে আসছিল। সে আবার জল দিয়ে ধুতে বলে। তাতে
জ্বালা আরও বেড়ে জায়গাটা লাল হয়ে ফুলে গেল। ঘরে এসে আর থাকতে না পেরে মাকে জানালে
তিনি স্নান করিয়ে তাঁর চিরাচরিত টোটকা চুন-হলুদ মোটা করে লাগিয়ে দেন। তারপর ছেলেকে
খাইয়ে দিতে বসে মাথায় হাত বুলিয়ে বলেন, “ভর সন্ধ্যেবেলা কেউ ভাগাড়ে যায়? ওখানে
গো-ভুত আছে।” তপনের চোখ উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। জিজ্ঞাসা করে, “সেই ভুতের কি নীলাভ আলো
থাকে?” মা অবাক হন, “কেন, আলো থাকবে কেন? ওরকম কিছু না। মরা গরু ভাগাড়ে পড়লে,
গো-ভুত হয়।” তপন বলে ওঠে, “ওসব ভুল কথা। তাহলে তো কুকুর-ভুত, বেড়াল-ভুতও থাকত।” মা
হেসে বলেন, “পাজি ছেলে।”
(তিন)
কয়েকদিন পরে ‘টিচার্স রুম’-এ শিক্ষক শিক্ষিকাদের মিটিং
শেষ হলে নির্মলবাবু তপনের ঘটনাটি বলছেন, এমন সময় স্কুল কমিটির সভাপতি প্রবীণ
ডাক্তার অমলেন্দু মাইতি উপস্থিত হলেন। এই স্কুল তাঁর ঠাকুরদাদা অজয় মাইতি প্রতিষ্ঠা
করেন। তিনি ছিলেন ব্রাহ্ম সমাজ সংস্কারক। অজয়বাবুর বাবা ছিলেন অক্ষয় মাইতি। কিন্তু অজয়বাবু তাঁর বাবার নামে নয়; বরং
প্রখর যুক্তিবাদী, বিজ্ঞান লেখক ও বিদ্যাসাগরের অভিন্ন বন্ধু অক্ষয় কুমার দত্ত
মহাশয়ের আদর্শ প্রতিষ্ঠার জন্য এই ‘অক্ষয়
আদর্শ বিদ্যানিকেতন’ স্থাপন করেন। তারপর তাঁর ছেলে ডা. অমরেন্দ্র ও নাতি ডা. অমলেন্দু সেই আদর্শেই স্কুল
পরিচালনা করেছেন। প্রথমদিকে এই আদর্শে উদ্বুদ্ধ শিক্ষক শিক্ষিকা নিয়োগ করা হত। পরে
স্কুল সার্ভিস কমিশন থেকে এলেও কমিটি নতুনদের অনুপ্রেরণা দিতে চেষ্টা করে।
অমলেন্দুবাবু তপন-দেবুর ঘটনা শুনে বললেন, “বিছুটি পাতার রস গায়ে লাগার পর জল দিয়ে
ধুলে বিষাক্ত রাসায়নিক বেশি এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে আর সহজে চামড়ার ভেতরে চলে যায়।
কথাতেই আছে ‘জল-বিছুটি’। এখন প্রশ্ন হল, বসাকদার নাতি দেবব্রত কি জেনে তপনকে এই
বুদ্ধি দিয়েছিল আর তপনই বা কী গাছ খুঁজে চলেছে?”
স্কুল সভাপতি ডা. অমলেন্দু
নির্মলবাবুর কাছেই এই প্রশ্নের উত্তর জানতে চাইলেন। নির্মলবাবু পঞ্চম শ্রেণীতে
বিজ্ঞানী গোপালচন্দ্রের আলো দেওয়া ছত্রাক খুঁজে পাওয়ার গল্প বলা, তপনের ঐরকম
উদ্ভিদ খোঁজা এবং তা গোপন করার মরিয়া চেষ্টা, সব জানালেন। তারপর বললেন, “তপনের
অবস্থা যেন ‘খ্যাপা খুঁজে ফেরে পরশপাথর’। ওর এই উৎসাহ গাছের তথ্য সংগ্রহে পালটে
দিতে আমি ওকে একটা খাতায় গাছটার ছবি এঁকে রাখা আর হার্বেরিয়াম তৈরির পরামর্শ দিই। প্রাণের
বন্ধু মানিককে নিয়ে ও তা করছেও। ওর দেখাদেখি ক্লাসের আরও কিছু পড়ুয়াও করছে। তবে
তাদের আগ্রহ কতদিন থাকবে বলা যায় না। কিন্তু ক্লাস এইট-এর দেবু কেন এমন করল তা
বলতে পারব না।” সভাপতি অমলেন্দুবাবু বললেন, “ক্লাস এইট, মানে বয়ঃসন্ধির সময়। তাই
না জেনে দেবব্রত এরকম করে থাকলে হতে পারে এটা একরকম ‘দাদাগিরি’, যদিও তা হওয়া ঠিক
ছিল না। আর যদি জেনে করে থাকে তবে তো ওর ভেতরে এক ধরনের হিংসাত্মক মন জন্ম নিচ্ছে।
সেটা আরও মারাত্মক।” তারপর জিজ্ঞাসা করে জানলেন ওদের ক্লাসে ‘পরিবেশ ও বিজ্ঞান’
পড়ান সোমা ম্যাডাম। অমলেন্দুবাবু বললেন, “সোমা, আপনি কি বইয়ের ‘অন্তক্ষরা তন্ত্র ও
বয়ঃসন্ধি’ চ্যাপ্টার পড়িয়েছেন?” সোমা মাথা নেড়ে ‘না’ বলেন। অমলেন্দুবাবু
বলেন, “দেখুন
ওদের পাঠ্যপুস্তকে হরমোনের কারণে শরীর মনের
পরিবর্তন, আচরণের সমস্যা, আর তা সামলানোর উপায় আলোচনা করা হয়েছে কেবল প্রশ্নোত্তর
ও পরীক্ষার জন্য নয়, বরং কীভাবে ছেলেমেয়েরা নিজে নিজে তা সামলাতে পারে তাই শেখানোর
জন্য। আপনার যদি আপত্তি না থাকে তাহলে এই বিষয়টা আমি দু’দিন ওদের ক্লাসে গিয়ে
পড়িয়ে আসতে পারি।” সোমার সঙ্গে হেড মাস্টারমশাই সহ সব শিক্ষক সমস্বরে বলে ওঠেন,
“কী বলছেন ডাক্তারবাবু, এ তো আমাদের সৌভাগ্য !”
“এখন তো আর স্কুলগুলোতে ইন্সপেক্টর আসে না,
আমিই না হয় ওদের সঙ্গে দু’এক ঘণ্টা কাটালাম। ২০১১ সালের সিলেবাস কমিটি স্কুলের
প্রাইমারি ও আপার-প্রাইমারির জন্য এই পাঠ্যবইগুলো পরিকল্পনা করেছিল যাতে
ছাত্রছাত্রীরা যুক্তিসম্মতভাবে বিজ্ঞানমনস্ক ও পরিবেশমনস্ক হয়ে অন্বেষণ প্রক্রিয়ায়
যুক্ত হয়। আমার তো মনে হয়
অক্ষয়কুমার দত্ত-র আদর্শে শিক্ষাদানের পক্ষে
একেবারে উপযুক্ত এই সিলেবাস।”— মন্তব্য করলেন অমলেন্দুবাবু। সোমা মাত্র কয়েক বছর স্কুলে যোগ দিয়েছেন। কৌতূহলী হয়ে বললেন, “স্যার,
অক্ষয়কুমারের পর দেড়শো বছরের বেশি সময় পেরিয়ে গেছে। এখনও কেন তাঁকে আমরা এত
গুরুত্ব দিচ্ছি?” অমলেন্দুবাবু
বললেন, “কারণ তিনি প্রথম আমাদের সহজ ভাষায় বিজ্ঞানের পাঠ দিয়েছেন, যুক্তিসম্মতভাবে
বিজ্ঞান পরিবেশ ও সমাজ চর্চা করতে শিখিয়েছেন। সেই ১৮৫৬ সালে বাংলা ভাষায় প্রথম
‘পদার্থবিদ্যা’ বই লিখেছিলেন। তিনিই প্রথম পরমাণু, মাধ্যাকর্ষণ, জ্যোতির্বিজ্ঞান,
দূরবীক্ষণ, স্থিতিস্থাপকতা, ইত্যাদি বিজ্ঞানের অজস্র বাংলা প্রতিশব্দ তৈরি করে
গেছেন, যা না থাকলে আজ বাংলায় বিজ্ঞান লেখা অসম্ভব হয়ে পড়ত।” এর পর ডা. মাইতি দুটি শনিবার অষ্টম শ্রেণীতে হরমোন ও বয়ঃসন্ধি বিষয়ে ক্লাস নেবেন
ঠিক হল। সোমাও সেই ক্লাসে থাকার অনুমতি চেয়ে নিলেন।
(চার)
আশ্বিন মাস। দুর্গাপুজার ছুটি পড়তে দু’একদিন দেরি
আছে। পরীক্ষা হয়ে গেছে। শনিবারের বিকালে তপন আর মানিক স্কুল মাঠে বসে গল্প করছিল।
তপন মানিককে বলল, “চল্ তোকে একটা আশ্চয্যি রকম গাছ দেখাবো।” মানিক — “কোথায়?” তপন
জানায়, “ঐ যে পশ্চিম দিকে, মজা নদীর পাড়ে রফিক স্যারের বাড়ির পেছনে বড় নালাটার
পাশে যে ঘাসের ঝোপ জঙ্গল মতন আছে ঐখানে।” মানিক জানতে চায়, “আলো দেয়?” তপন মানিকের
হাত ধরে তোলে, “চল্, দেখতেই পাবি। সন্ধ্যে হয়ে গেলে তো তুই থাকতে পারবি না।”
তারপর তারা রফিক স্যারের বাড়ির দিকে চলল। ভুলোও পিছু নিল। সেখানে অজস্র ঘাসের
জঙ্গলে দেখা গেল কয়েকটা ছোট ছোট শুঁড়ওলা গাছ। আধ হাত মতো মাপের গাছের পাতাগুলো
রোঁয়াওলা শুঁড়ের মতো, যাদের কিনারায় যেন অজস্র ছোট ছোট হীরের কুঁচি পড়ন্ত সূর্যের
আলোয় জ্বলছে। তপন একটা গাছের মধ্যে কী যেন খুঁজতে লাগল।
মানিক জিজ্ঞাসা করে, “কী খুঁজছিস?” তপন — “এই
গাছে কাল দেখেছি একটা নীল পোকা একটা শুঁড়ে বসতেই আটকে গেল। আজ আর সেটাকে দেখছি
না।” তপনের সঙ্গে মানিকও খুঁজতে লাগল, কিন্তু পেল না। বরং অন্য দু’একটা গাছের শুঁড়ে মাছি আটকে আছে
দেখা গেল। তপন পকেট থেকে একটা প্লাস্টিকের ক্যারি ব্যাগ বার করে মানিকের হাতে দিল।
তারপর একটা ভাঙ্গা ডাল দিয়ে মাটি খুঁড়ে একটা গাছ তুলে মানিকের হাতের থলিতে ভরে
দিল। এমন সময় একজন বয়স্কা মহিলার গলা শোনা গেল, “কেডারে ওহানে? অ মা, এযে দেহি দুটা
ছোটো মানুহ্।” বাড়ি থেকে বেরিয়ে এসেছেন রফিক স্যারের মা। এবারে আশ্বিন মাসে ঈদ।
ইফতারের তোড়জোড় চলছে। “তরা খাড়াইয়া থাক” বলে তিনি ভিতর থেকে দুটো আপেল এনে দিলেন।
রফিক স্যার ওদের দেখে পৌঁছে দিতে চাইছিলেন। কিন্তু ওরা যেতে পারবে বলে বেরিয়ে এল।
তপনই মানিককে কিছুটা এগিয়ে দিয়ে বলল, “কাল সকালে তোর বাড়ি
আসব।”
পরদিন সকালে তপন এলে মানিকের মা সন্ধ্যা
জিজ্ঞাসা করলেন, “সকালে কিছু খেয়েছিস?” তপন
বলল, “খেয়েছি, মুড়ি আলু সেদ্ধ, কাঁচা লঙ্কা পিঁয়াজ দিয়ে।” সন্ধ্যা বললেন, “বসে যা,
ডিম ভাজা করছি, খেয়ে যাবি।” তপন ততক্ষণে তার ছবির খাতা বার করে নতুন গাছের ছবি
আঁকতে শুরু করল। মানিক জানাল আজ সকালেও রোদ্দুর
উঠলে গাছের শুঁড়গুলোতে কালকের মতো সারি সারি আলোর ফোঁটা দেখতে পেয়েছে। মানিকের
বাবা অজয়বাবু তাদের দেখে বললেন, “তোদের এই গাছের খ্যাপামিতে বাড়িতে এত পোকা বেড়েছে
যে মানিকের মা আমাকে জালের আলমারির অর্ডার দিয়েছে। অজয়বাবু কাঠের আসবাব তৈরি করেন।
আজ রবিবার বাড়িতে সেই কাজে লেগে পড়েছেন। মানিক লক্ষ্য করল গাছটার শুঁড়ে একটা হলুদ ফড়িং
আটকে পড়েছে। সে ছাড়াবার চেষ্টা করল। কিন্তু তপন বারণ করল। বলল, “কি জানি, যদি
বিছুটির মতো বিষাক্ত রস থাকে। তার চেয়ে চ’ আমরা গাছটা নির্মল স্যারের বাড়ি নিয়ে
যাই।” তাই শুনে অজয়বাবু বললেন, “সে তো এখান থেকে অনেক দূর। তোরা খেয়ে নে, আমি
বাইকে তোদের নির্মলবাবুর বাড়ি ঘুরিয়ে আনব।” নির্মলবাবু গাছটা দেখে অবাক হয়ে বললেন,
“এই গাছ এখানে তোরা কোথায় পেলি?” তারপর পর্যবেক্ষণ করতে হবে বলে রেখে দিলেন।”
সোমবার স্কুলে নির্মল স্যার গাছটা এনেছেন। সব
শিক্ষক শিক্ষিকা কৌতূহলী হয়ে গাছটি দেখেছেন। এবার স্যার সেটা ক্লাসে এনে তপনকে
বললেন, “তোদের আনা এই গাছটা মাংসাশী। আমাদের জেলায় এই গাছ আছে জানতাম না। তোরাই প্রথম এর সন্ধান পেলি।” স্যারের কথা
শুনে ক্লাস শুদ্ধ অবাক। গাছ মাংস খায়! স্বপ্না বলে ওঠে, “স্যার, আপনি বলেছিলেন
যেসব প্রাণীরা শুধু প্রাণী খায় তারা মাংসাশী আর যারা শুধু গাছ খায় তারা তৃণভোজী। মানুষের বেলায় আমিষাশী আর নিরামিষাশী। কিন্তু গাছেরা তো জল, সার আর আলো দিয়ে তাদের খাবার তৈরি করে। তাহলে গাছ
কীভাবে মাংসাশী হবে?” নির্মল স্যার বোঝালেন, “এটাই প্রকৃতির আজব খেলা। যেখানে মাটি
থেকে গাছ সারবস্তু, মানে পুষ্টি পায় না, তখন কোনও কোনও গাছ পোকা ধরে তার থেকে পুষ্টি নেয়। আর এভাবে তারা প্রতিকূল পরিবেশে টিকে থাকে।”
মিঠু জানতে চায়, “স্যার এই গাছের নাম কী? কীভাবে এরা পোকা খায়? এদের মুখ কোথায়?” নির্মল স্যার বললেন, “এদের নাম ‘সূর্যশিশির’, ইংরাজিতে ‘সানডিউ’। ভারতে দু’রকম সূর্যশিশির পাওয়া যায়। এটার বৈজ্ঞানিক
নাম ‘ড্রসেরা ইন্ডিকা’। ড্রসেরা কথাটা এসেছে গ্রীক ‘ড্রোসোস’ শব্দ থেকে, যার মানে
শিশির। আর ইন্ডিকা তো ইন্ডিয়া থেকে এসেছে। এর শুঁড়ের মতো পাতার আঠালো রোঁয়াগুলো
থেকে মিস্টি রস বের হয়, যার ওপর রোদ্দুর পড়লে শিশিরকণার মতো ঝিকমিক করে। আর এর
আকর্ষণে ছোট ছোট পোকারা এসে রোঁয়াগুলোতে আটকে পড়ে। পাতাটা তখন ধীরে ধীরে মুড়ে যায়।
তার থেকে হজমি রস বের হয়ে পোকাটাকে হজম করে নেয়। তাই পোকা খেতে ওদের মুখ দরকার পড়ে না।” সেদিন ছুটির পর গাছটা নিয়ে বাড়ি যাওয়ার সময় মানিক তপনকে বলল, “বাড়ি ফিরে
মাকে বলব পোকা ধরার পাহারাদার এসে গেছে। আর শোন, কাল মা তোকে ডেকেছে, আমাদের বাড়ি
নেমন্তন্ন।
(পাঁচ)
মঙ্গলবার একটা পিরিয়ডের পর স্কুলের পুজাবকাশের ছুটি পড়ে গেলে তপন মানিকের বাড়ি এল। এদিকে স্কুলের টীচার্স রুমেও শিক্ষক শিক্ষিকারা একত্র হয়েছেন। স্কুল সভাপতি অমলেন্দু ডাক্তারবাবুও এসেছেন। তাঁর কাছে সোমা, নির্মল, এমনকি হেড স্যারও একবাক্যে স্বীকার করলেন অষ্টম শ্রেণীতে তাঁর ক্লাস খুব উপকার দিয়েছে। ওঁরা জানালেন যেসব ছেলেমেয়ে নিজেদের অসুবিধার কথা বলতে না পেরে ভুল করলে চুপচাপ বকুনি সহ্য করত, তারা এখন স্পষ্ট কথা বলে। আর দেবুর মত ছেলে যারা পিছনে বসে গল্প করত, ক্লাসে আওয়াজ করত, তারাও শান্তভাবে পড়া বোঝার চেষ্টা করে। সবচেয়ে বড় কথা তারা প্রত্যেকেই লেখাপড়ার বাইরে একটা কিছুতে, যেমন স্পোর্টসে, ফুটবলে, ভাল করার চেষ্টা করছে। অমলেন্দুবাবু বললেন, “হ্যাঁ, বসাকদা সেদিন আমার চেম্বারে এসে বলে গেলেন, ‘আমার নাতিকে তুমি কী করেছ। এমন ভদ্র তাকে কোনোদিন দেখিনি’। কিন্তু ‘বায়োলুমিনিসেন্ট’ গাছ খোঁজা ছেলে দুটোর কী খবর? মানিক ছেলেটা অবশ্য সর্দি কাশিতে বেশ ভোগে। ওষুধ দিয়ে কিছুদিন ভাল রাখি, ক’দিন পর দেখি আবার একইরকম।” তারপর তাদের জেলায় প্রথম সূর্যশিশির গাছ খুঁজে পাওয়ার গল্প শুনে বললেন, “সাবাস, এতো দারুন ব্যাপার। আমি এখানকার সাপ্তাহিক ‘নবীন বার্তা’র সম্পাদক দীপঙ্করকে বলছি ছবি সমেত ওদের একটা সাক্ষাৎকার ছাপাতে।” শুনে নির্মলবাবু অনুরোধ করলেন ওদের ছবি ছাপুক, কিন্তু গাছের ছবি যেন না ছাপে। কারণ তাতে অতি উৎসাহীদের কবলে পড়ে জেলা থেকে গাছটা অবলুপ্ত হতে পারে।
মানিকের বাড়ি তপন এলে সন্ধ্যা দুই ছেলেকে
পাশাপাশি খেতে বসালেন। ভাত, ডাল, ঝুরো আলুভাজা, পোনা মাছের কারি, চাটনি, ঘরে
পাতা
দই। তপন মাছ খেতে অভ্যস্ত নয়, ভালও বাসে না। সে হাত গুটিয়ে বসে থাকে। সন্ধ্যা
বললেন, “কিরে খাইয়ে দেব?” তপন লজ্জায় মাথা নাড়ে। সন্ধ্যা বুঝতে
পেরে মাছ বেছে দিতে দিতে জিজ্ঞাসা করলেন, “হ্যাঁ রে পুজোয় নতুন জামা হয়েছে?” তপন জানায়, “বসাক
বাড়ি থেকে আমায় দুটো জামা প্যান্ট আর মাকে দুটো শাড়ি দেয়। আগে বাবা যখন ছিল, বসাক
বাড়ির ঠাকুর তৈরি করত, তখন টাকা পেলে বাবা নতুন জামা প্যান্ট আনত আর বসাক বাড়ি থেকে একটা দিত। আর বাবা যেদিন নতুন জামা আনত সেদিন রাতে
রবি ঠাকুরের ‘পুজার সাজ’ কবিতাটা শোনাত। ঐ যে মধু বিধু দুই ভাইয়ের গল্প।” সন্ধ্যা জিজ্ঞাসা করেন, “মুখস্ত?” তপন — “হ্যাঁ। মাঝে
মাঝে আরও শোনাত, ‘জুতা আবিষ্কার’, ‘বীরপুরুষ’, ‘লুকোচুরি’। শুনে শুনে আমারও
অনেকগুলো মুখস্ত হয়ে গেছিল”। সন্ধ্যা — “শোনাতে পারবি?” তপন রাজি হয়। সন্ধ্যা বলেন,
“বিকেলে মানিকের বাবা বাড়ি ফিরলে শোনাস। এখন তোরা গল্প
কর।”
বিকালে সকলে বসে তপনের ছবির খাতা দেখতে দেখতে
গল্প করছিল। সন্ধ্যা তপনকে জিজ্ঞাসা করলেন, “পুজোয় মণ্ডপে যাস?” তপন বলে “ওই নতুন
জামা প্যান্ট পরে একবার বসাকবাড়ি ঠাকুর প্রণাম করে আসি। আমার বেশি ভাল লাগে মাঠের
ধারে ঘুরতে। কেমন নীল আকাশ, ছোট ছোট সাদা মেঘ, কখনও রোদ আসে, আবার চলে যায়। পুকুরে তার ছায়া পড়ে। আকাশে অনেক উঁচুতে চিল ঘুরপাক
খায়। মাঠের ধারে কাশ ফুল ফুটে থাকে। দু’একটা ছেলে লাল নীল ঘুড়ি ওড়ায়। এইসব দেখতে বেশি
ভাল লাগে।” এবার সন্ধ্যা মনে করিয়ে দিলে
তপন একবারও না আটকে পুরো আবেগ দিয়ে স্পষ্ট উচ্চারণে আবৃত্তি করল ‘পুজার সাজ’ - ‘আশ্বিনের মাঝামাঝি, উঠিল বাজনা বাজি...’, তারপর ‘লুকোচুরি’। শুনে সন্ধ্যা আঁচলে চোখ মুছলেন। অজয়বাবু বললেন, “একেবারে বাবার গুণগুলো
পেয়েছে। শীতকালে সুশীল গ্রামের ছেলেদের নিয়ে যাত্রাপালা করাতো। কী দারুন গলা ছিল। ও চলে যাওয়ার পর সে সব বন্ধ হয়ে গেছে”।
মানিক তপনকে নিয়ে পাড়াটা ঘুরতে বার হল। তারা
মিঠুর বাড়ি গেল। কিন্তু মিঠু খেলতে বেরিয়ে গেছে। ফেরার সময় মানিকের বাড়ির পাশে
পোড়ো জমিতে তপন একরকমের অনেক গুল্ম দেখল। পাতাগুলো গাজর গাছের মতো। ছোট ছোট সাদা
ফুল দেখে তার মায়ের তুলে রাখা নাকছাবিটার কথা মনে পড়ল। তপন কৌতূহলী হয়ে একটা গাছ
তুলে নিয়ে বলল, “বেশ মজার গাছ। নির্মল স্যারের বাড়ি যাই, দেখাতে হবে।” শুনে
অজয়বাবু বললেন, “পাগল নাকি। হেঁটে গেলে ফিরতে অন্ধকার হয়ে যাবে। কাল যাবি।” তপন
জিদ ধরল, “কাল গাছটা শুকিয়ে যাবে। এখনি যেতে হবে।” অগত্যা অজয়বাবু দুই ছেলেকে
বাইকে চাপিয়ে নির্মল স্যারের বাড়ি গেলেন।
(ছয়)
নির্মল স্যার গাছটা দেখে বললেন, “কী সর্বনাশ !
এ তো পার্থেনিয়াম ! পার্থেনিয়াম হিস্টেরোফোরাস! শিগগির মাটিতে ফ্যাল। এর রেণু,
পাতার রস থেকে অ্যালার্জি, হাঁপানি, এইসব ছড়ায়। এটাকে এখুনি পুড়িয়ে ফেলতে হবে।
ডাক্তারবাবু বলছিলেন মানিকের সর্দি কাশি সারানো যাচ্ছে না। সেটা তাহলে এইজন্যে!
আপনার বাড়ির পাশে এই গাছ অনেক আছে অজয়বাবু?” প্রশ্ন করে নির্মল স্যার বাড়ির ভিতর থেকে
কেরসিন এনে তার ওপর ছিটিয়ে অজয়বাবুকে দেশলাই দিয়ে আগুন ধরাতে বললেন। তারপর ডাক্তারবাবুকে
ফোন করে সব জানালেন। তিনি অবিলম্বে পার্থেনিয়ামের ঝাড় নষ্ট করে দিতে বললেন। অজয়বাবু
জানতে চাইলেন, “তাহলে কী করব? আগুন লাগিয়ে দেব?” নির্মল স্যার তৎক্ষণাৎ বললেন,
“না, ওতে দূষণ হবে। একটা দশ লিটারের প্লাস্টিকের বালতিতে দু’ কিলো লবণ জলে গুলে দিনের
বেলা গাছগুলোতে স্প্রে করে দেবেন। লবণ-জলের
ঘনত্ব গাছগুলোর ভেতরের জল টেনে শুকিয়ে মেরে দেবে। এটা সহজ উপায়। না হলে অন্য পথ
আছে।”
পরের দিন তপন ভোর বেলা মানিকের বাড়ি গেল। অজয়বাবু পাড়ার মুদিখানা থেকে দু’কিলো নুন কিনে রেখে কাজে বেরিয়ে গেলেন। আজ কিছু আসবাব ডেলিভারি হবে। তপন আর মানিক একটা প্লাস্টিকের বালতিতে জলে নুন গুলে ফেলল। তপন একটা প্লাস্টিকের বোতলের ছিপি ফুটো করে তাতে জল ভরে মানিককে দিয়ে বলল, “তুই দূর থেকে ভাল করে দিতে থাক।” তারপর বন্ধুকে ভাল রাখতে প্রবল উদ্যমে হাতে একটা লাঠি নিয়ে গাছগুলোকে এপাশ ওপাশ করে দিতে লাগল যাতে তারা ভাল ভাবে ভিজে যায়। কাজ হয়ে গেলে তপন ঘরে গেল। কিন্তু পার্থেনিয়াম গায়ে লাগায় তপনের হাতে পায়ে লাল র্যাশ দেখা দিল, সঙ্গে শ্বাস কষ্ট, জ্বর। পদ্মা আতান্তরে পড়লেন। সকালেই তপনকে নিয়ে অমলেন্দুবাবুর চেম্বারের নিয়ে গেলেন। মানিকের অসুস্থতা বেড়ে যাওয়ায় সন্ধ্যাও তাকে এনেছেন। ডাক্তারবাবু তাঁর স্যাম্পল থেকে ওদের ওষুধ দিয়ে সাত দিন পর দেখবেন জানালেন। পদ্মা -—“কী বিপদে পড়লাম। এদিকে পুজো বাড়ির কাজ। এখন কি ছেলে কোলে বসে থাকার সময়?” শুনে সন্ধ্যা বললেন, “বোন, ও কদিন আমার কাছে থাকুক। আমি সামলে নেব।” তপন একা থাকতে পারবে বললেও তার মানিকদের বাড়ি থাকারই ব্যবস্থা হল। পদ্মা প্রেসক্রিপশন সমেত তপনকে রেখে গেলেন।
একদিন সকালে তপন দেখল ভুলো খুঁজে খুঁজে তার কাছে চলে এসেছে। তপনকে দেখে সে খুব লেজ নাড়ল। মানিক তাকে দুটো বিস্কুট দিল, কিন্তু সে খেল না। চুপ করে মানিকের বাগানে বসে রইল। তারপর সে রোজ আসে আর দুপুরে তপনকে তার মা দেখতে এলে তাঁর সঙ্গে ফিরে যায়। জানা গেল রাতে সে রুটি খেয়ে তপনদের ঘরের দরজাতেই শুয়ে থাকে। সাত দিন হতে তপন ও মানিক দু’জনেই সুস্থ হয়ে গেল, তবে বেশ দুর্বল ছিল। দুপুরে অমলেন্দু ডাক্তারবাবু নিজেই মানিকের বাড়ি এলেন। সঙ্গে ‘নবীন বার্তা’র সম্পাদক দীপঙ্কর। তিনি ওদের ছবি তুলে কথাবার্তা বলে চলে গেলেন। জানিয়ে গেলেন আগামী দীপাবলী সংখ্যায় এই খবর প্রকাশ হবে। এবার ডাক্তারবাবু দুই মাকে বললেন, “আর ক’দিন বিশ্রাম নিলে ওদের শরীর ভাল হয়ে যাবে। কিন্তু এই অসুস্থতার কারণে ওদের মনে যে ধকল পড়েছে দু’-একদিন বাইরে ঘুরে এলে তা চাঙ্গা হয়ে যেত। আমি দীপাবলীতে সস্ত্রীক মেয়ে জামাই নাতিকে নিয়ে দু’দিনের জন্য মন্দারমণি যাব।
আপনারা
অনুমতি দিলে দু’দিন ওদের ঘুরিয়ে নিয়ে আসব। ওদেরও সমুদ্র দেখা হবে।”
ডাক্তারবাবুর
প্রস্তাব শুনে পদ্মা কেঁদে ফেলেন। বললেন, “তপন আমার সবেধন নীলমণি, একমাত্র
অবলম্বন। দু’দিন ওকে দেখব না ভাবতে পারছি না।” সন্ধ্যা মানিকের বাবার সঙ্গে কথা বলে
জানাবেন বললেন। ডাক্তারবাবু বললেন, “রবিবার দুপুরে আমার চেম্বার খালি থাকে। ঐ সময়ে
আপনারা সবাই আসতে পারলে কথা হবে।” রবিবার চেম্বারে বসে ডাক্তারবাবু বললেন, “মেয়ে
জামাই কলকাতায় থাকে। এইসময়ে বাজি আর ডিজে-র আওয়াজে অতিষ্ঠ হয়ে যায়। ওদেরই আবদারে আমি দুদিনের জন্য
নিরিবিলিতে দুটো কটেজ নিচ্ছি। চারটে ঘরের একটা খালি থাকবে। তাই তপন মানিকের সঙ্গে
ওদের গার্জেন কেউ যেতেই পারেন। সব দায়িত্ব আমার।” কিন্তু দেখা গেল কাজ ফেলে
অভিভাবকদের কারোর পক্ষেই যাওয়া সম্ভব হবে না। আবার ছাড়তেও মন চাইছে না।
ডাক্তারবাবু বললেন, “ওদের সঙ্গে নির্মলবাবু গেলে কি আপনারা মন থেকে ছাড়তে পারবেন?
সে একা মানুষ, পরিবার নেই। অনুরোধ করলে হয়ত রাজি হবে।” সকলে সহমত হলে ফোন করে নির্মলবাবুকে
অনুরোধ করলে তিনি একটু চিন্তা করে অবশেষে রাজি হয়ে গেলেন।
(সাত)
মন্দারমণি যাওয়ার দিন এসে গেল। তপন ও মানিক
সমুদ্র দেখার আনন্দে উত্তেজিত। তাদের ইচ্ছে না থাকলেও অল্প মুড়ি আর বিস্কুট
খাওয়ানো হয়েছে। দু’জনের কাঁধে দুটো ব্যাগ। ভোরবেলা সবাই ডাক্তারবাবুর বাড়ির নিচে
চেম্বারের সামনে উপস্থিত। নির্মলবাবু এসে
গেছেন। ডাক্তারবাবু ও তাঁর মেয়ে-জামাইয়ের গাড়ি দুটো ড্রাইভার সমেত অপেক্ষা
করছে। মানিকের বাবা নির্মলবাবুকে বললেন,
“স্যার, এই দু’দিন আপনিই ওদের গার্জেন। চোখে চোখে রাখবেন। আর সমুদ্রে যেন না
নামে।” সন্ধ্যা ও পদ্মা ছলছল চোখে চেয়ে আছেন। ইতিমধ্যে ডাক্তারবাবু সপরিবারে
নীচে নেমেছেন। অজয়বাবু ও দুই মাকে চিন্তা করতে বারণ করে তপন, মানিক ও নির্মলবাবুকে
নিয়ে একটা গাড়িতে আর অন্যরা অপর গাড়িতে উঠলেন। গাড়ি দুটো ছেড়ে দিল। পদ্মা মুখে কাপড় চাপা দিলেন।
ঘন্টা তিনেক পরে দিঘা রোড ছেড়ে মন্দারমণির
রাস্তা ধরার আগে মেয়ের অনুরোধে গাড়ি থামিয়ে জলখাবার খাওয়া হল। তার আগে গাড়িতে বসেই
টুকটাক খাওয়া চলেছে। মন্দারমণি পৌছে সমুদ্রের জলোচ্ছাস ও তার আদিগন্ত বিশালতা দেখে
তপন মানিক স্তব্ধ হয়ে গেল। তাদের
পা যেন চলছে না। তারপর ঘরে এসে স্নান
সেরে জামাকাপড় পালটে কটেজের বারান্দায় এসে সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে বসল সবাই। খানিক
পরে ওদের দুপুরের খাবার খেয়ে শুয়ে পড়তে বললেন নির্মল স্যার। ডাক্তারবাবুর চার
বছরের নাতিকেও খাইয়ে ঘুম পাড়িয়ে দিলেন তাঁর মা শুভস্মিতা। বিকালে সমুদ্রের পাড়ে
অল্প ঘুরে সন্ধ্যায় সবাই বারান্দায় বসে পকোড়া খাচ্ছেন। ছেলেকে বাবা-মার কাছে রেখে
মেয়ে জামাই, শুভস্মিতা-সুদীপ্ত, আর একবার বেরিয়েছেন সন্ধ্যার সমুদ্র দেখবেন বলে। ওরা ফিরলে সবাই তাড়াতাড়ি রাতের খাবার
খেয়ে শুয়ে পড়বেন ঠিক করেছেন। পরের দিন ভোরে দীঘা
ঘুরতে যাওয়া হবে। এমন সময় শুভস্মিতারা ছুটতে ছুটতে এসে
বললেন, “সবাই শিগগির দেখবে চলো। কী অদ্ভুত নীলাভ
আলোয় সমুদ্রের ঢেউগুলো পাড়ে এসে ভাঙছে।”
সবাই বেরিয়ে এসে অবাক চোখে দেখলেন কেবল ঢেউ নয়, অমাবষ্যার নিকষ অন্ধকারে সাগরতটের কিনারা বরাবর
বিছিয়ে রয়েছে হালকা সবুজ নীলাভ আলো। ধীরে ধীরে মিলিয়ে
গেলেও পায়ের চাপে আবার জেগে উঠছে। তীর থেকে বালি তুলে
ছুঁড়লেও ছড়িয়ে পড়ছে সেই অপূর্ব রঙীন আলো। শুভস্মিতা বললেন, “শত কোটি আতসবাজির
থেকেও সুন্দর।” তারপর ক্যামেরায় ছবি ও ভিডিও তুললেন। নির্মলবাবু স্বগতোক্তি করলেন,
“বায়োলুমিনিসেন্ট ফাইটোপ্ল্যাঙ্কটন।” তপন মানিক সমস্বরে জিজ্ঞাসা করল “সেটা কী
স্যার?” নির্মলবাবু বললেন, “আলো দেওয়া সামুদ্রিক শ্যাওলা।” সুদীপ্ত বললেন, “যদিও
পর্যটন দপ্তরের ওয়েবসাইটে লেখা আছে, তবু কোনোদিন কেউ দেখেছে বলে শুনিনি।” কটেজের ম্যানেজার
জানালেন তাঁরও চোখে পড়েনি কখনও। ঘরে ফিরে নির্মল স্যার তপন মানিককে বললেন, “তাহলে
তোরা নিজেদের চোখে দেখলি তো আলো দেওয়া উদ্ভিদ।” হতবাক তপন ও মানিক কেবল নীরবে মাথা
নেড়ে ‘হ্যাঁ’ বলল।
পরদিন সকালে সবাই দীঘা ঘুরছেন, এমন সময় নির্মল
স্যারের হোয়াট্সঅ্যাপে অজয়বাবুর মেসেজ এলো। লেখা, এইমাত্র দীপঙ্করবাবু ছ’কপি রেখে
গেলেন। আর একটা ছবি, ‘নবীন বার্তা’র পাতায় তপন-মানিকের ছবি সমেত প্রতিবেদন।
শিরোনাম, “পঞ্চম শ্রেণীর ছাত্র জেলায় খুঁজে পেল মাংসাশী গাছ”। সঙ্গে বিবরণ, কীভাবে
আলো দেওয়া উদ্ভিদ খুঁজতে গিয়ে এরা পোকা ধরা গাছ খুঁজে পেয়েছে। কীভাবে তারা
পার্থেনিয়াম ধ্বংস করতে গিয়ে অসুস্থ হয়েছে। শেষে আশা করা হয়েছে একদিন ওরা নিশ্চয়
খুঁজে পাবে আলো দেওয়া গাছ। ডাক্তারবাবু বললেন, “দীপঙ্কর জানে না, সে আশা পূর্ণ
হয়েছে। ওকে আরও একটা প্রতিবেদন করতে হবে পরের সংখ্যায়।” তারপর মেয়েকে বললেন, “শোন,
আজই লাঞ্চ সেরে আমরা ফিরে যাই। এই লেখা পড়ে ওদের মায়েদের মন নিশ্চয় ছটফট করছে ওদের
দেখার জন্যে। তোরা বরং বাকি দু’দিন আমার কাছে থাক।” মেয়ে-জামাই রাজি হয়ে যেতে সবাই
সেদিন দুপুরে বেরিয়ে পড়লেন। ওঁরা আসছেন জেনে দুই পরিবার বিকালে ডাক্তারবাবুর
চেম্বারের সামনে অপেক্ষা করছিল। গাড়ি থেকে নেমে ডাক্তারবাবু বললেন, “আপনাদের জন্যে
সারপ্রাইজ আছে।” শুভস্মিতা হেসে তপন মানিকের আলো দেওয়া প্ল্যাঙ্কটন ওড়ানোর ছবি
দেখালেন। ডাক্তারবাবু তাদের মাথা নেড়ে দিয়ে বললেন, “এরা তো বীরপুরুষ, একদিন
বিশ্বজয় করবে।” দুই মা সন্তানদের বুকে জড়িয়ে একসাথে বলে উঠলেন, “জানি তো।”
।।। । গল্প ।।। ।
অদ্ভুত
সিক্তা গোস্বামী
মাঘ মাসের শীতটা বেশ জাঁকিয়ে পড়েছে। ট্রেনে উঠেই টাইম দেখে নিল নিলয়। সাড়ে নটার বাসটা না পেলে আজ আর বাড়ি ফেরা হবেনা। চুঁচুড়া স্টেশনে নেমে পড়ি কি মরি করে ছুট লাগালো নিলয়। কন্ডাক্টার বাসের গায়ের থাবড়া মেরে মেরে যাত্রী তুলছে। আর হাঁকছে "লাস্ট বাস, লাস্ট বাস"। কপাল ভালো নিলয় ছুটে গিয়ে বাসে উঠলো। এত বড় বাসটায় মাত্র পাঁচ জন যাত্রী। একটু চোখ বুলিয়ে নিল নিলয়। যদি ওর গ্রামের চেনা কেউ থাকে। কিন্তু না, চেনাই যাচ্ছে না কাউকে। কেউ চাদরে, কেউ হনুমান টুপিতে মুখ ঢেকেছে। চেনা কাউকে পেলে ভালো হতো। বাস স্টপেজ থেকে ওর গ্রাম প্রায় তিন কিলোমিটার দূর। এই শীতের রাতে কোন যানবাহন পাওয়ার সম্ভাবনা নেই। রাস্তার পোস্টে আলো নেই। সেরকম হলে হেঁটেই যেতে হবে। আসলে গলাকাটা পুলের পাশ দিয়ে যাবার সময় কেমন যেন গা ছমছম করে। আগেও গেছে। কোনদিন কিচ্ছু হয়নি। তবু নামটাতেই একটা গা শিরশির ভাব আছে।
বাসটা ফাঁকা রাস্তা পেয়ে হু হু করে
ছুটছে। ফাঁকা বাসের বন্ধ জানলা গুলো ঠোকাঠুকিতে খটখট শব্দ হচ্ছে বেশ উচ্চ গ্রামে। আর
প্রতিটা স্টপেজ আসার আগে কন্ডাক্টরের "অমরপুর, আলিনগর, কাশ্বাড়া" অহেতুক
চিৎকার অসহ্য লাগছে। ঝরঝর শব্দে লজঝরে বাস এগিয়ে চলল।
![]() |
| বাসটা ফাঁকা রাস্তা পেয়ে হু হু করে ছুটছে |
কয়েকবার মোবাইলে বাড়িতে রিং করার
চেষ্টা করল। যদি কেউ সাইকেল বা মোটরবাইক নিয়ে এসে নিয়ে যায়। তবে গ্রামে মোবাইলের
টাওয়ার পাওয়া আর ভগবানের সাক্ষাৎ পাওয়া একই ব্যাপার। এখন মনে হচ্ছে বাড়িতে না জানিয়ে
হঠাৎ আসাটা ঠিক হয়নি।
অবশেষে নিলয় একাই পা বাড়ালো গ্রামের
দিকে। সেলিমের সাইকেল গ্যারেজ, রবির পান বিড়ির দোকান, কয়েকটা বাড়ি পেরিয়ে ধান ক্ষেত।
রাস্তার দু'পাশে বিস্তীর্ণ ধান ক্ষেত। দুদিকে
যতদূর চোখ যায় চাঁদের আলোর ঢেউ উঠেছে। চাঁদের
আলোয় একটা অদ্ভুত শান্তি আছে, একটা মায়া আছে। নিলয় ছোট থেকে এইসব দেখেই বড় হয়েছে। তবু রোজ এই গ্রামের প্রকৃতিকে ওর নতুন লাগে।
বেশ অনেকটাই চলে এসেছে। অকারণ ভয় পাচ্ছিল নিলয়। নিঃসঙ্গতা মানুষের মনকে বড় দুর্বল করে দেয়। মনে সাহস সঞ্চয় করে আবার হাঁটায় মন দিল। এই মুখটা ঘুরলেই 'গলাকাটা পুল'। হঠাৎ নিজের অজান্তেই
'গলাকাটা পুল' কথাটা মুখ দিয়ে শব্দ করে বেরিয়ে এলো। নিজের গলার শব্দ নিজের কানেই
অদ্ভুত শোনালো। একটু থমকে দাঁড়ালো নিলয়।
শিরশির করে উঠল শরীরটা। ছোটবেলা থেকে
গলাকাটা পুলের কথা শুনে আসছে। দাদু বলেছিল
বহুদিন আগে ওই পুলের তলায় দুটো গলাকাটা মৃতদেহ পাওয়া গিয়েছিল। তাই মুখে মুখে ওর নাম 'গলাকাটা পুল' হয়েছিল। ওখানে
ভয়ের কিছুই নেই। কেউ বাইরে থেকে মেরে এনে
মৃতদেহ ফেলে গিয়েছিল। সেও অনেকদিনের
কথা। কিন্তু ছোটরা দুষ্টুমি করলে বড়রা বলতো
'গলাকাটা পুলে' রেখে আসব। গ্রামে গঞ্জে ওই পুল নিয়ে অনেক ভৌতিক কাহিনী ও প্রচলিত আছে।
ওখানে নাকি নিশুত রাতে তেনাদের দেখা যায় ।
নিলয় জানে ওসব আজগুবি বানানো কাহিনী।
নিলয় আধুনিক বিজ্ঞানমনস্ক মানুষ। ওসব হেসেই উড়িয়ে দেয়। কিন্তু আজ আর হাসি পাচ্ছে
না। পা টা ভারী হয়ে আসছে। এই মোড়টুকু ঘুরতে
ইচ্ছে করছে না। বেশ ভয় ভয় করছে। এই শীতেও
যেন ঘাম হচ্ছে। কিছু করার নেই। নিজের মনকে শক্ত করে্ আটকে যাওয়া পা কে টেনে তুলল। একপা একপা করে এগিয়ে চলল পুলের দিকে। না কোথাও
কিচ্ছু অশরীরী চোখে পড়ল না। মনের সাহসটা একটু
একটু করে ফিরে আসছে মুক্তমনে গান গাইতে গাইতে এগোতে লাগলো নিলয়।
হঠাৎ দূর থেকে একটা অদ্ভুত শব্দ কানে আসতে লাগলো ক্কঁখ ক্কঁখ ক্ককঁখ। কোথা থেকে আসছে শব্দ? কিসের শব্দ? নিলয়ের নাড়ির গতি চঞ্চল হল। ঘামতে লাগল শরীর। চোখ গেল একটা দশ ফুট লম্বা সাদা কি যেন এগিয়ে আসছে উল্টো দিকের রাস্তা দিয়ে। এবার সত্যিই ভয় পেল নিলয়। হাত পা অবশ্ হয়ে আস্যে। হৃদপিণ্ডটা এত জোরে ধক ধক করছে মনে হচ্ছে বুকের খাচা ভেঙ্গে বেরিয়ে আসবে। ধীরে ধীরে এগিয়ে আসছে নিলয়ের দিকে যত এগোচ্ছে শব্দটাও বাড়ছে। ক্কঁখ ক্ককঁখ ক্কঁখ। কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম। তবে কি প্রচলিত গল্পগুলো সব সত্যি! ওই অশরীরী কি ধীরে ধীরে ‘গলাকাটা পুলে’র নিচে মিলিয়ে যাবে? কোন রকমে শরীরটা টেনে গাছের আড়ালে দাঁড়াল নিলয়। চোখের পলক পড়ছে না। গলা শুকিয়ে কাঠ। দূরত্ব আরো কমে আসছে। এবার স্পষ্ট হল তাঁবুর খুঁটির মতো মাঝখানটা উঁচু ক্রমশ ত্রিভুজাকৃতি হয়ে নিচের দিকে লতপত করে ঝুলছে একটা সাদা চাদরের মত কিছু। এ তো মানুষ কোনভাবেই নয়। তবে… তবে কি…! এবার আরো কাছে। নিলয়ের অস্তিত্ব নিশ্চয়ই বুঝতে পারছে। নিলয়ের গলায় একটা ভয়ার্ত শব্দ বেরিয়ে এলো। কোনরকমে গাছের কান্ডটা জড়িয়ে ধরে নিজেকে সামলে রেখেছে। অবিকল মানুষের গলায় অশরীরী বলল “কে? ওখানে কে?” নিলয় কোনরকমে গাছের আড়াল থেকে বেরিয়ে এলো।
গোপাল কাকা ধরে না ফেললে পড়ে যেত নিলয়। “একি! ছোট বাবু না? এত রাতে? আমি তো ভয় পেয়ে গেছিলাম।” গলাকাটা পুলে শুনেছি তেনাদের সাক্ষাৎ পাওয়া যায়। আমি তো তাই ভেবে।….
“তুমি কোথা থেকে আসছ?”
“আমি তো চড়কপুর
গ্রামের হাট থেকে ফিরছি। রাত হয়ে গেল গাড়ি
পেলাম না।
“ওই শব্দ-টা কিসের?
“ওহো! ওই দেখো দেখিনি।
ও তো মুরগি। হাটে বেচতে নিয়ে গেছিলাম। তেমন বিক্রি বাটা নেই। আবার নিয়ে ফিরছি।
“আর সাদা লম্বা
আলখাল্লার মতো। ওটা কি?
“ওমা তুমি তো গ্রামেরই ছেলে। মুরগির ঝাঁকার মাথায় খুঁটির সঙ্গে
জাল দেওয়া থাকে জানো না? এই ভরা মাঘের শীতে মুরগিগুলোর ঠান্ডা লেগে যাবে। তাই তার
উপর দিয়ে চাদর বিছিয়ে দিয়েছি গো।
“উফ!” একটা দীর্ঘ শ্বাস বেরিয়ে এলো নিলয়ের বুক থেকে। কিন্তু ভয়ের কাঁপুনিটা এখনো থামেনি।
ব্যাঙের বাসা বদল
রুমা মুখার্জি
ছোট্ট এক গাঁয়ে তার ছোট্ট ডোবার ধারে, টোপাকুল গাছের নিচে ছিল এক কুনো ব্যাঙের বাসা। সে তার বৌ ছানাপোনা নিয়ে সেখানে থাকতো। তখন শীতকাল; ব্যাঙেরা কেউ আর বাইরে বেরোচ্ছে না। সারাদিন বাসায় বসে হয় ঘুমানো, নয় শীত গেলে কী করবে না করবে, এইসব ভেবে সময় কাটানো।
একদিন এমনই এক ঝিমানো দুপুরে,ঢুলতে
ঢুলতে ব্যাঙ শুনলে, একজোড়া লাল ঝুঁটি ভুতিহাঁস ডোবায় সাঁতার কাটতে কাটতে নিজেদের
মধ্যে গল্প করছে। ব্যাঙ লক্ষ্য করেছে যে, কদিন আগেই ওরা এই ডোবায় এসেছে।
পরিযায়ী পাখিরা প্রতিবছর শীতের শুরুতে
সুমেরু বা হিমালয়ের মতো কনকনে ঠাণ্ডার দেশ থেকে মাইলের পর মাইল উড়ে, দক্ষিণ এশিয়ার
গরমের জায়গায় চলে আসে। ভুতি হাঁসের এই জুটিটা তেমনই এক দলছুট পরিযায়ী পাখি।
ব্যাঙ শুনলে ভুতি কত্তা সাঁতার কাটতে কাটতে তার বৌকে বকাবকি করছে, "এত জায়গা থাকতে বৌ, তোর এই ছোট্ট ডোবাটা যে কেন পছন্দ হলো জানি না। কী আছে এখানে? ওই তো খালি চাঁদা মাছ,গাপ্পি মাছ আর গেঁড়ি গুগলি। এসে থেকে এই একঘেয়ে খাবার রোজ খাচ্ছি। গরমের দেশে এসে কোথায় একটু ভালো মন্দ খাবো, তা নয়...ফিরে গিয়ে আবার তো সেই বরফে জবুথবু থাকতে হবে।"
ভুতি গিন্নি ছেলে ভোলানো নরম স্বরে
বলে,"দাঁড়াও না, ডোবার স্থির জলে আগে ডিমটা পেড়ে নিই। দেখছো না, এখানে কত সুন্দর
কচুরীপানা। আমাদের বাসা বানানোর জন্য একদম খাসা। তারপর ডিম ফুটে ছানা বড়ো হলে তো উড়ে
যাবোই নদীর ধারে। সেখানে তখন পেটপুরে খেও রকমারি খাবার।"
ভুতি কত্তা বলে,"শুধু কি খাওয়া
দাওয়া? কতো বড়ো জায়গায় থাকতে পারবো বল তো! নদীর ঢেউয়ে ভাসতে পারবো, উফ্ ওখানে
মজাই আলাদা। আসলে আমরা তো দূর পাল্লার উড়ান পাখি, কুনো ব্যাঙ হয়ে জলার ধারে থাকতে
একদম ভালো লাগে না। যাকে বলে 'কূপমন্ডুক'।" সাঁতার কাটতে কাটতে কঁক কঁক করে হেসে
ওঠে লাল ঝুঁটি ভুতিহাঁসের জুটি।
এদিকে এই 'কূপমন্ডুক' কথাটা শুনে ব্যাঙের আঁতে ঘা লেগেছে। গজগজ করে সে বৌকে বলে, "দেখলে গিন্নি দেখলে, ওরা আমাদের কূপমন্ডুক বললে।"
ব্যাঙ গিন্নি হেসে বলে, "তাতে
কি হয়েছে? আমরা যা, ওরা তাই তো বলেছে।"
"তাই বা বলবে কেন?"
"এই দেখো আবার তুমি রেগে যাচ্ছে।
আচ্ছা ওরা যে আমাদের কূপমন্ডুক বলছে, আমাদের তো তবু স্থায়ী একটা আস্তানা আছে। ওদের
কি আছে? আজ এখানে কাল ওখানে। ওদের বাসার কোনো ঠিক আছে? ওদের কথা কেউ ধরে নাকি? নাও
আর রাগ করে পেট গরম করতে হবে না। পিঁপড়ের চাটনি করে রেখেছি খেয়ে মাথা ঠাণ্ডা কর।"
ব্যাপারটা তখনকার মতো মিটলেও ব্যাঙের
মনে খচ্খচানিটা রয়েই গেল।
রাতে সে স্বপ্ন দেখলে, নদীর পাড়ে
তার খাসা এক বাসা হয়েছে। বাসা না তো যেন কেল্লা! সেখানে সে তার বৌকে নিয়ে বসে আছে
মস্ত বড়ো সিংহাসনে। নদীর ফুরফুরে মিঠে বাতাস এসে লাগছে তাদের গায়। আর তাদের ছানাপোনারা
বিশাল বাগানে লাফিয়ে খেলে বেরাচ্ছে। কি আনন্দ! কি আনন্দ! ঘুমটা ভেঙে গিয়ে সে ভাবে,আহা
সত্যি যদি এমন হতো!!
ব্যাঙ শুয়ে শুয়েই সিদ্ধান্ত নিয়ে
নিল যে, নদীর ধারে তাকে ঘর বানাতেই হবে।সে বৌয়ের বারণ শুনলে না। পাড়া প্রতিবেশীদের
কারো কথা মানলে না।চললো নদীর তীরে বাসা বানাতে।
ভুতি হাঁসেরা তো ডিম পেড়ে ছানা ফুটিয়ে একটু বড়ো হতেই নদীর তীরে চলে গিয়েছিল, এখন শীত কমতে ব্যাঙও চললো নদীর ধারে ঘর বানাতে। বেচারা বৌ আর কি করে ,কদিন ঘ্যানঘ্যান প্যানপ্যান করে শেষে সেও চললো ব্যাঙের সাথে, তাকে সাহায্য করতে। কদিন খুব মেহনত করে তারা বানিয়ে ফেলল খাসা এক বাসা। তারপর তারা খুব আনন্দে সেখানে বসবাস করতে শুরু করলো।
গ্রীষ্মের দিন, ফুরফুরে হাওয়ায় মেঘেদের
ছায়া ভাসে নদীর জলে। ছলাৎ ছলাৎ ঢেউয়ে দুলে দুলে নৌকা বেয়ে যায় মাঝি। কত রং বেরঙের
পাখির ঝাঁক উড়ে যায়, ঘুরে বেড়ায়, নদীতে চান করে। ব্যাঙ দুচোখ ভরে সেসব দেখে।
'সত্যি নদী কত বড়ো! এপাড়ে দাঁড়িয়ে
ওপারের তো কিছুই দেখা যায় না।' ব্যাঙ বিস্ময়ে হাঁ হয়ে থাকে। মনে মনে ভাবে, 'এতদিন
যে কেন ডোবার পাড়ে ছিলাম!! ভুতিহাঁস যাহোক আমার চোখ খুলে দিয়েছে।' ব্যাঙের দিনগুলো
সুখেই কাটতে লাগলো।
দেখতে দেখতে গ্রীষ্ম গিয়ে বর্ষা এলো। ব্যাঙেদের তো দারুণ আনন্দ। এই ঋতুটার সঙ্গে তাদের অনেক দিনের সুসম্পর্ক। ব্যাঙ মনের আনন্দে গ্যাঙর গ্যাঙর করে গান গাইতে শুরু করলো।
এমনই এক বাদলা দিনে বাইরে ঝোড়ো হাওয়া
বইছে, ঘন ঘন বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে বাজ পড়ছে। সাথে জোর বৃষ্টি নেমেছে। যথারীতি ব্যাঙ বৃষ্টিতে
ভিজবে বলে নিজের বাসা ছেড়ে খোলা মাঠে গেছে। হঠাৎ গুম গুম ঝুপ ঝুপ আওয়াজ এলো কানে।
সাথে সাথেই বৌয়ের আর্তনাদ। 'কী হলো? বৌ কেন
চেঁচায়? '
কাছাকাছি আসতে যা দেখলো, তাতে ব্যাঙের
চোখ কপালে উঠলো। 'হায় হায় আমার বাসা? আমার সাধের বাসা কোথায় গেল?'
ব্যাঙ দেখলো নদীর ঢেউ সাপের ফনার মতো
ফুঁসছে। জল ফেঁপে ফুলে উঠে গাছপালা, বাসা সমেত পুরো পাড়টা ভেঙে উদ্দাম স্রোতে ভাসিয়ে
নিয়ে যাচ্ছে। সর্বনাশ! ছেলেপুলে তো সব ঘরেই ছিল। তাহলে! ঘাড় ঘোরাতে দেখে, বৌ ফুঁপিয়ে
ফুঁপিয়ে কাঁদছে। ভয়ে ভয়ে ব্যাঙ বৌকে জিজ্ঞেস করে," বৌ, আমাদের ছেলেপুলেরা কোথায়?
"
বৌ এবার কান্না টান্না ভুলে রণচন্ডী
হয়ে ওঠে।
"ছেলে পুলে? কার ছেলেপুলে? সত্যি
তোমার ছেলে হলে এমন নদীর তীরে বাসা বানাতে? সবাই বারণ করেছিলাম। কথায় আছে "নদীর
তীরে বাস, দুঃখ বারোমাস"। শুনেছিলে তখন কথা? এখন হায় হায় করে কি হবে? ভুতিহাঁসের
কথা শুনে, উনি এলেন নাচতে নাচতে নদীর ধারে বসত করতে। আরে ভুতিহাঁসেরা কি কোনদিন বর্ষায়
এদেশে থাকে? চলে যায় নিজেদের দেশে। ওরা কি জানবে বর্ষায় এদেশের নদীর সর্বনেশে রূপ?
তোমার দুর্বুদ্ধিতে আমার কোল শূন্য হলো। হায় হায় কোথায় চলে গেলি রে আমার দুধের বাছারা",বৌ
কপাল চাপড়ে কাঁদতে থাকে, কাঁদতেই থাকে।
![]() |
| বৌ এবার কান্না টান্না ভুলে রণচন্ডী হয়ে ওঠে |
ব্যাঙ বুঝলো, ভালো মন্দ বিচার না করে অন্যের কথায় নাচাটা খুব ভুল হয়েছে। সে বৌয়ের কাছে নিজের ভুলের জন্য ক্ষমা চায়। আর মনের দুঃখ মনে চেপে রেখে, বৌকে নিয়ে ফিরে যায় তার পুরোনো বাসায়, সেই ছোট্ট গাঁয়ে ছোট্ট ডোবার ধারে, কুলগাছের নিচে।
।। এবারে ট্রাভেল ব্লগার স্বপ্নময় গায়েন-এর ক্যামেরায়
বর্ষায় ঝাড়খন্ডের জলপ্রপাতের রূপ।।
![]() |
| সীতা জলপ্রপাত |
![]() |
| জোনহা জলপ্রপাত |
![]() |
| দশম জলপ্রপাত |
।। । । ছবির পাতা।।। ।
![]() | ||||
|
![]() |
| তানিশী মিত্র।। বয়স ৯।। চতুর্থ শ্রেণি |
।। । । ছোটোদের সাইন্যাপস্।। শব্দছক শ্রাবণ ১৪৩৩।।। ।
নির্মাতা : সুব্রত দেব
সূত্র :
৫) "শ্যামল শোভন শ্রাবণ,তুমি --- --- গেলে"( রবীন্দ্রনাথ)
৭) সত্যজিৎ কাহিনি ফটিকচাঁদ এর জাগলার
৯) প্রেমেন্দ্র মিত্রর কবিতা বেনামী -----,জাহাজঘাটা
১১) হঠাৎ ঘুরে সাহস পেলে!
১২) সুকুমার রায়ের কবিতায় সাপুড়ে
১৩) ঠাকুর পরিবারের আগের পদবি
১৪) দস্যু মোহন এই দত্ত সাহিত্যিকের সৃষ্টি, চাঁদ
সমাধান পরের সংখ্যায়
------------------------------------
ছবিটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে বানানো।
---------------------------------------------------------------
ছোটোদের সাইন্যাপস।। শ্রাবণ ১৪৩৩।। অগাস্ট ২০২৬।। পাঠপ্রতিক্রিয়া
পাঠপ্রতিক্রিয়া_১
আলোচক - সুস্মিতা অধিকারী
আষাঢ়ের দুষ্টু মিষ্টি মেঘের এই প্রচ্ছদটি অত্যন্ত মনকাড়া। কোঁকড়ানো চুলের মতো এক ঝাঁক জলভরা মেঘের নিচে হাসি হাসি মুখ, মানুষ, প্রকৃতি, বাচ্চাদের আনন্দ মুহূর্ত প্রচ্ছদ টিকে এক আলাদা মাত্রা দিয়েছে, সুন্দর প্রচ্ছদ আকৃষ্ট করে মন, আর সম্পাদিকা মহাশয়া অত্যন্ত বিচক্ষণতার সাথে এটির সফল প্রয়োগ করেছেন।মৌসুমী ঘোষ সম্পাদিত ছোটদের সাইন্যাপস আষাঢ় ১৪৩৩ সংখ্যাটিতে ছ'টি কবিতা একটি গদ্য, একটি গল্প ও দুটি বাহারি ছবির পাতা আছে। সচেতন বুদ্ধি দিয়ে, সযত্নে তৈরি হয়েছে এই পত্রিকা। হাতে মোবাইল থাকলে রিল না দেখে পত্রিকা পড়বে এমন মানুষের সংখ্যা কম, বলা বাহুল্য ধৈর্য কম কিন্তু সম্পাদিকা মহাশয়াও ছাড়বার পাত্র নয়, লড়াই চালালেন সমানে সমানে বেশি কিছুর ভিড় নয় মনের পাত্রখানিতে খানিকটা হাসি, একটু খেলা আর বেশ কিছুটা রং ঢেলে দিলেন আর কার সাধ্য তা উপেক্ষা করবে।
এইতো আবেশ বাবুর গদ্যেই দেখুন না। খেলোয়াড়দের রঙিন ছবি সমেত খুঁটিনাটি তথ্য। ৯০ দশক থেকে অনায়াসে এনে ফেললেন ২০২৬ এ। বহুদিন পর কিছু হারিয়ে যাওয়া সমাজ চিত্র উঠে এসেছে এই গদ্যে যা আমাদের সময় ছিল জীবন্ত। তথ্যসমৃদ্ধ এই গদ্য আমাদের অনেক অজানাকে জানার জন্য যেন দরজা খুলে দিল।
হি হি করে হাসাতে হাসাতে সুদেষ্ণা দি নিয়ে চলে গেলেন এক কল্প বিজ্ঞানের গল্পে, পড়তে পড়তে আবোল- তাবোল টা যেন একবার রিভিশন হয়ে গেল। হিহি করে অনেকটা হেসেও নিলাম। হোৎকার দল মনে এক পশলা সুড়সুড়ি দিয়ে গেল। চোখ গেল রঙিন ছবিতে। সোদপুরের জয়দীপ এর কারুকার্যে ভরা যেন এক জীবন্ত ছবি। চোখ স্হির থাকে বেশ কিছুক্ষণ।জয়দীপের এই সুন্দর আঁকা তে মেন্ডেল আর্টের কানের দুলটি আমার অত্যন্ত পছন্দ হয়েছে। খুব সুন্দর নিখুঁত একটি কাজ।
হুগলির সায়ন্তনীর ছবি দেখে আনন্দও হলো আবার মনটা উদাসও হয়ে গেল কারণ আমিও ছোটবেলায় বাবার সাথে ঘুড়ি উড়াতে মাঠে যেতাম। আজ তিন মাস হল বাবা ওই আকাশের দেশে এই ছবিটা আমার কাছে ছবি নয় আমার ছোটবেলার জীবন্ত স্মৃতি এক। জয়দীপ এবং সায়ন্তনীর জন্য রইল অনেক আশীর্বাদ ও শুভকামনা।
ছড়া গুছিয়ে পড়বো বলেই শেষ পাতে রেখেছিলাম। কবি বিপ্লব গঙ্গোপাধ্যায়ের "বৃষ্টি যখন" কবিতা পড়তে পড়তে স্মৃতির ভেতরে ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি নামলো। শুধু ছোটবেলা নয় বড়ো বেলাও অনেক স্মৃতি মনে পড়ল। হৃদয়ে জলোচ্ছ্বাস বজ্র ভরা মন কে কিছুটা হলেও ভিজিয়ে দিয়েগেল। রাজর্ষি বাবুর" বৃষ্টি নামে" খুব সুন্দর একটি ছড়া। পড়ার সময় যে অন্তমিল পেলাম ঘুমে- ঝুমে, মাঝে- কাজে, পারে -ভারে, পথে- রথে, অত্যন্ত চমৎকার। খুব সুন্দর একটি সুখ পাঠ্য ছড়া পড়লাম। খুব ভালো
লেগেছে। কবি আর্থিতার টাপুর টুপুর জলের ঘুঙুর উচ্চারণ করতেই করতেই মজা লাগছে। অন্ত মিলে সাথে সাথে মা মেয়ের আদর মাখানো একটি কবিতা। খুব ভালো লেগেছে "টুপটুপিয়ে ডাকে" এই শব্দ নির্বাচন অনন্য, আধুনিক। বেশ
ভালো লাগলো। বর্ষাকালে মেঘের এক অপূর্ব চিত্র অঙ্কন করেছেন কবি তনুজা চক্রবর্তী তাঁর কবিতায়। বাঙালির প্রিয় খাবার ইলিশ মাছের কথাও বলেছেন বাংলা মায়ের সিগ্ধ শ্যামল সবুজ রূপ বর্ষাকাল না এলে বোঝাই যেত না। কবি অর্ঘ্য দে র কবিতা টি সুর করে পড়লাম। বাইরে তখন অঝোরে বৃষ্টি। বৃষ্টির ছন্দে মিশে গেল কবিতার সুর। তবে বাঁশ বাগানে ঘনকালো মেঘের রূপ কল্পনা করতেই শিহরিত হলাম। কবিতা শেষে শীর্ণ নদীর সাথে সাথে হারিয়ে যাওয়া মনের দুকুল ভেসে গেল। রেনেসাঁ দাদ্বশ শ্রেণীর ছাত্রী হয়েও এতো সুন্দর কল্পনা করে লিখেছে যা সত্যিই প্রশংসনীয়। অত্যন্ত ইতিবাচক একটা কবিতা।যা ভালো সাহিত্যের অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য। কান্না, ঘাম, নদী, সমুদ্দুর এসবের সাথে পাল্লা দিয়ে থাকবে বেঁচে থাকার সুন্দর স্বপ্ন। আকাশের গান, উজ্বল আলো রেনেসাঁর কলমে বারবার ধরা দিক। সাহিত্য আরো সমৃদ্ধ হোক কচিকাঁচা দের স্পর্শে।
পাঠপ্রতিক্রিয়া_২
আলোচক - শুভাশিস ঘোষ
পড়ে ফেললাম ছোটোদের সাইন্যাপস্ আষাঢ় সংখ্যা। পড়া নয় তো, এক ঝলক ফিরে যাওয়া শৈশবে। শৈশব ঠিক না, বলা ভাল কৈশোরে। পত্রিকার পাতায় যখন চোখ, মন তখন অনেক দূরে। সেই কোন ছেলেবেলায়। রামগরুড়ের ছানাদের ছেড়ে অন্য দেশে।
সবার আগে চোখ আটকে গেল প্রচ্ছদে। যদিও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কেরামতি, কিন্তু তাকে তো প্রম্পট দিতে হয়েছে, আর সেখানেই তো বাহাদুরি। এমন আষাঢ়ের জলছবি দেখলে কার না মনের সেই দরজাটা খুলে যায়, যেটা পেরলে সটান
পৌঁছে যাওয়া যায় ছেলেবেলায়? হ্যাঁ, আমাদের ছেলেবেলায় একটা পত্রিকা ছিল, নাম তার 'চাঁদমামা'। তার ছবিগুলোর আকার আকৃতির একটা বিশেষত্ব ছিল। সে সব ছবি কে বা কারা আঁকতেন জানি না, তবে ছবির রেখাগুলোর একটা নিজস্বতা ছিল। যাদের সঙ্গে চাঁদমামা'র পরিচয় তখন ঘটেছে, তাদের স্মৃতিতে টোকা মারলেই ফুটে উঠবে সে সব ছবি। প্রচ্ছদে আঁকা আষাঢ়ের মেঘ আর কাগজের নৌকার আদল মনে পড়ায় আমাদের ছেলেবেলার সেই পত্রিকার কথা। এআই ভায়ার সঙ্গে রাজীব কুমার ঘোষের জন্যও রইল অভিনন্দন।
মৌসুমী ঘোষের সম্পাদকীয়'র কথা আলাদা করে বলতেই হয়। ছোটদের জন্য লেখার কাজটা যেমন খুব কঠিন, তেমনই ছোটদের পত্রিকার সম্পাদনাও তার থেকে ঢের শক্ত কাজ। একটা চমৎকার শিশুমন না থাকলে ছোটদের জন্য লেখা এবং সম্পাদনা, কোনোটাই যে হয় না, তা বোঝা যায় সম্পাদকীয় পড়ে।
নিজের মনের বয়স কমিয়ে ছোটদের জন্য কলম ধরে বর্ষার কবিতা ও ছড়া যাঁরা লিখলেন, তাঁদের প্রতি আমার অশেষ শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। বিপ্লব গঙ্গোপাধ্যায়, রাজর্ষি মণ্ডল, অর্থিতা মণ্ডল, তনুজা চক্রবর্তী ও অর্ঘ্য দে র লেখা পড়তে পড়তে ছেলেবেলার সেই বর্ষায় ভিজে চুপচুপে হয়ে যাই বইকি! দ্বাদশ শ্রেণির রেনেসাঁ গঙ্গোপাধ্যায়ের কবিতা 'কত যে স্বপ্ন' বেশ ভালো লাগল।
এ সংখ্যার লাইম লাইটে ছিল অবশ্যই আবেশ কুমার দাসের 'বড় হতে হতে বিশ্বকাপের সঙ্গে'। মাসটা যেহেতু ছিল বিশ্বকাপের, আর বিশ্বকাপটা ছিল সেই আবেগের, যাকে ইংরেজিতে বলা হয়,' গ্রেটেস্ট ইভেন্ট অব দ্যা আর্থ', তাকে নিয়ে লেখা তো একটু বড়সড়োই হওয়া উচিত। হয়েছেও তাই। লেখক চারটি পর্বে ভাগ করেছেন তাঁর লেখাটি। নিজের দেখা ১৯৯০ র প্রথম বিশ্বকাপ ফুটবলের স্মৃতি দিয়ে শুরু করেছেন তাঁর প্রবন্ধ। খেলার মতোই ধীরে ধীরে গতি পেয়েছে লেখা। ব্যক্তিগত স্মৃতির সঙ্গে বিশ্বকাপের তথ্য পরিসংখ্যানরা হাত ধরাধরি করে এগিয়েছে এ লেখায়। অসংখ্য অজানা তথ্য আর অশ্রুত ঘটনার উল্লেখে সমৃদ্ধ হয়েছে পত্রিকার পাতা। ফুটবলের সঙ্গে রাজনৈতিক ইতিহাস, ভূগোল সব একাকার হয়ে যায় এখানে। কত দেশের নাম আর অস্তিত্ব এক সময় স্বমহিমায় জাহির হত, আজ তারা অস্তিত্বহীন! আবার কত দেশের নাম বা চিহ্ন পুরনো মানচিত্রে তন্ন তন্ন করে খুঁজলেও মিলবে না, কিন্তু আজ তারা বিশ্বফুটবলের শ্রেষ্ঠ আসরে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। এমন অসংখ্য না জানা তথ্যের হদিস মেলে এ লেখায়। ফুটবলারদের ব্যক্তিগত ও দলগত বিভিন্ন তথ্য, পরিসংখ্যান ও রেকর্ড পরিবেশিত হয়েছে সুখপাঠ্য এ প্রবন্ধে। একঘেয়েমি তথ্যের ভারে কোথাও ভারাক্রান্ত যেমন হয়নি, তেমনই কথকঠাকুরের মতো কেবল গল্প শুনিয়ে যাননি লেখক। চমৎকার ভারসাম্য রেখে বিশ্বকাপের বিভিন্ন ইতিহাসের গল্প বুনেছেন পত্রিকার পাতায়। লেখাটির জন্য বিশেষ ধন্যবাদ প্রাপ্য আবেশবাবুর। এ লেখা আগ্রহী তরুণ কিশোরের দল হয়তো সংরক্ষণ করতে চাইবে। আর তা যদি হয়, সেখানেই তো লেখকের সাফল্য। সেটাই তো লেখার সার্থকতা।
বেশ লাগল সুদেষ্ণা মৈত্রর গল্প 'হি হি'। ছোটদের জন্য লিখতে গেলে বিশেষ মানসিক প্রস্তুতির দরকার হয় তা আমরা জানি। কেবল একটা কিছু গল্প বলে ফেলাই নয়, তার মধ্যে অনেক উপাদানের মিশ্রণ থাকা উচিত একটি আদর্শ শিশু সাহিত্যে। নৈতিকতা, আদর্শ বোধ ইত্যাদির শিক্ষা এই ধারার সাহিত্যে পরতে পরতে মিশে থাকে। কখনো আবার রূপকথা, ফ্যান্টাসির মোড়কে নৈতিক শিক্ষার কথাও ভাবেন লেখকরা। এ ক্ষেত্রেও তার ব্যত্যয় হয়নি। দুই কিশোর বাদল আর বিলুর হঠাৎ বন্ধুত্ব। এই বর্ষায় হাঁটু ডোবা জলে পড়ে বিপত্তির মধ্যেই অচেনা সাথির পাশে দাঁড়িয়ে বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়ে দেওয়ার গল্প। তার পর সেই রহস্যময় হি হি-র সন্ধান পাওয়া। সকলের প্রিয় 'আবোল তাবোল'এর সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়ে গড়ে ওঠা এ গল্প বেশ ভালো লাগল।
সব শেষে ছবির পাতায় দশম শ্রেণির জয়দীপ সাহা ও নবম শ্রেণির সায়ন্তনী আদিত্যর ছবি চোখ টেনেছে। জয়দীপের ছবির মধ্যে বিশেষ বৈশিষ্ট্য আছে। তার রেখায় ফুটে উঠেছে ভবিষ্যতে বড়ো শিল্পী হওয়ার সব সম্ভবনা।
সব শেষে এমন একটি চমৎকার সংখ্যা ছোটোদের উপহার দেওয়ার জন্য সম্পাদক মৌসুমী ঘোষকে জানাই অভিনন্দন। ছোটোদের সাইন্যাপস্ আকাশ ছোঁয়ার স্পর্ধা রাখুক।
আলোচক - স্বাগতা ভট্টাচার্য
বিশ্বকাপ ফুটবল সদ্য শেষ হয়েছে, আর
এই সংখ্যায় আবেশ কুমার দাসের "বড় হতে হতে বিশ্বকাপের সঙ্গে" একটা দারুণ
সুন্দর তথ্য সমৃদ্ধ লেখা, ছোট দের সাথে আমাকেও
অনেক নতুন তথ্য জানালো এই বিশ্বকাপ ফুটবল সম্বন্ধে। আমি যখন ছোট ছিলাম আমাদের বাড়িতেও টিভি ছিল না। বড় হবার পরে বেশ কয়েকবার ফুটবল এবং ক্রিকেট বিশ্বকাপ দেখার সুযোগ পেয়েছি। তখনও
আমরা মফঃস্বলে দল বেঁধে খেলা দেখতাম! সে সত্যিই এক অন্যরকম আনন্দ, এই বছর অবশ্য দেখলাম
ঢাউস টিভিতে অনেক জায়গায় সমবেত হয়ে অনেকজন খেলা দেখছেন, প্রিয় দল হারলে কষ্ট হয় আর
জিতে গেলে তো দারুণ আনন্দ... মনে থেকে যায় কিছু সুন্দর খেলা, পা দিয়ে যেন ছবি আঁকা হয়ে যায়। এত সহজ সুন্দর
ভাবে বিশ্বকাপ ফুটবল নিয়ে তথ্য সমৃদ্ধ লেখা আগে পড়েছি বলে মনে হয় না। সুদেষ্ণা মৈত্র
র লেখা "হিহি "গল্প টা সত্যি অন্যরকম..কোথাও যেন কল্পবিজ্ঞান আর সুকুমার
রায় মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে। দারুণ উপভোগ করলাম। ছবির পাতায় আছে জয়দীপ সাহা ও
সায়ন্তনী আদিত্য র দুটি সুন্দর হাতে আঁকা ছবি, সব কিছু মিলিয়ে অনবদ্য এই জুলাই সংখ্যা...আরো
অনেক পথ এগিয়ে চলুক এই পত্রিকা ...এই কামনা করছি।
পাঠপ্রতিক্রিয়া_৪
আলোচক - সুনন্দা বোস
ছোটদের সাইন্যাপস, ছোটদের জন্য ভাবনা। পৃথিবী জুড়ে যখন যুদ্ধের দামামা। একদিকে জ্বলে হিংসার আগুন ,অপরদিকে প্রতিবাদী ঝড়। এই দুয়ের সাঁড়াশি আক্রমণে সাধারণ মানুষের বেঁচে থাকা দায়।
সেই সময় দাঁড়িয়ে এই সাইন্যাপস্ পত্রিকার
লিঙ্কটা হাতে পেয়ে মনে হয়ে ছিল ঠিক তীব্র গরমের দিনে বিকেলে ছাদে উঠে যেন হঠাৎ করে
চারিদিক কালো করে দমকা ঠান্ডা বাতাস চোখে মুখে লাগার মতো স্বস্তি। চারিদিকের গুমোট
আবহাওয়ায়, গুরুগম্ভীর পরিস্থিতির বাইরে এসে ছোটদের এই পত্রিকা পড়ে নিজেকেও হারিয়ে
ফেলেছিলাম নিজের শৈশবে। এ তো গেলো পাঠক হিসেবে একান্ত ব্যক্তিগত ভাবনা। এর বাইরে মৌসুমী
ঘোষ সম্পাদিত সাইন্যাপ্স পত্রিকা তে মজার ছড়া,ছোটদের জন্য গল্পের যে সংকলন থাকে সে
মনে হয় আজকের শৈশব , কৈশোর কেও পাঠমুখী করে। আজকের এই সহজলভ্য ইন্টারনেটের যুগে যা
ভীষণ ভাবে কাম্য। একটা ক্লিক এ এখন সব তথ্য পাওয়া যায়। এযুগের শিশুরা বড্ড বেশি সহজেই
সব পেয়ে যাচ্ছে হাতের মুঠোয়। এরা অনেক সচেতন, অনেক সফল কিন্তু কোথাও গিয়ে যেনো অনুভূতিটা
কিছু কম,ধৈর্য কম। পড়ার অভ্যাস ই পারে এই ধৈর্য এবং অনুভূতি ফিরিয়ে আনতে।সিলেবাস
মুখস্ত করার বাইরেও কিছু পড়া। এবং সেটা সময়োপযোগী হলে স্বভাবতই আগ্রহ বাড়ে। সাইন্যাপস্ এমন একটি পত্রিকা, যেখানে গল্প, ছড়া সবই ছোটদের জন্য, তবুও অলীক নয়, অনেক বাস্তব
মুখী। কুর্নিশ জানাই মৌসুমী ঘোষকে ছোটদের নিয়ে এই ভাবনার জন্য। আর শুধু ছোটরা ই বা
কেনো, বড়দেরও হাফ ধরা জীবনে এক ঝলক ঠান্ডা হাওয়া দেওয়ার জন্য।
সাইন্যাপস্-এর আষাঢ় সংখ্যায় বৃষ্টির দিনে বৃষ্টিভেজা কিছু সুন্দর অনুভূতির ছবি এঁকেছেন কবিতায় বিপ্লব বন্দ্যোপাধ্যায়, রাজর্ষি মন্ডল, অর্থিতা মন্ডল,তনুজা চক্রবর্তী, অর্ঘ্য দে প্রমুখ। রেনেসাঁ গঙ্গোপাধ্যায় এর স্বপ্ন ছুঁয়ে উড়াল শিশু ,কিশোর মন কে প্রভাবিত করে।
কিছুদিন আগে শেষ হওয়া ফিফা বিশ্বকাপ
এর কথা মাথায় রেখে, নিজের বিশ্বকাপ দেখে বেড়ে ওঠার স্মৃতি উজাড় করে আবেশ কুমার দাস
ভরিয়ে দিয়েছেন একটি সুন্দর মুক্তগদ্য। যা আজকের শিশু কিশোর কে খেলা দেখতে আগ্রহী
করে।
এতসব কিছুর পরেও আছে সুদেষ্ণা মৈত্রের
গল্প হিহি। গল্পটি পড়ে ভালো লাগার সাথে সাথে মনে হচ্ছে, মাঝে মাঝে আমাদের সবার জীবনে
যদি হিহি র আগমন হতো তো বেশ হতো।
সবশেষে যা না বললেই নয় মৌসুমী ঘোষ সম্পাদিত সাইন্যাপ্স পত্রিকার আসার সংখ্যা
বৃষ্টিদিন এ কাগজের নৌকা বেয়ে যেনো নৌকা ভর্তি আনন্দ দিয়ে গেলো।
পাঠপ্রতিক্রিয়া_৫
আলোচক - রত্না মুন্সী
ছোটদের মনের খবর রাখা, তাদের ইচ্ছে স্বপ্ন সাধ কল্পনাকে প্রশ্রয় দেওয়া ও পোষণ করা খুব সামান্য কাজ নয়। ছোটদের সাইন্যাপস পত্রিকার সম্পাদিকা মৌসুমী ঘোষ এই পত্রিকা প্রকাশের মাধ্যমে সেই গুরুদায়িত্ব পালন করছেন ও সৃষ্টির কাজে ছোটদের উৎসাহিত করছেন এই জন্য তাকে অভিনন্দন।
আষাঢ় সংখ্যায় রিমঝিম বর্ষার রাগিণী যে বাজবে
সে তো জানা কথা। কবিতা লিখেছেন বিপ্লব গঙ্গোপাধ্যায়, রাজর্ষি মণ্ডল, অর্ঘ্য দে। সেই
একই মেঘ বৃষ্টি, একই সজল হাওয়া আর বিদ্যুতের ঝলক, একইভাবে নদী নালা দীঘিতে জলের প্লাবন,সব
বর্ষার পরিচিত উপকরণ। কিন্তু এক একজন কবির
এক একরকম কল্পনার রঙ লেগে বর্ষার ভিন্ন ভিন্ন রূপ ফুটে উঠেছে। অর্থিতা মণ্ডলের
কবিতায় বৃষ্টির অনুষঙ্গে পুরোনো দিনের স্মৃতি ভেসে এসেছে। জলপরিদের মেয়ের সাথে মিশে
গিয়েছে তিন্নির মায়ের মুখ, মায়ের ছোটবেলার
কথা। আবার তনুজা চক্রবর্তী গুড়ি গুড়ি বৃষ্টির সাথে ইলিশ মাছের ভাপার কথা বলে রসনা
আর কবিতা উপভোগের বাসনা দুটোরই পরিতৃপ্তি ঘটিয়েছেন। রেনেসাঁ গঙ্গোপাধ্যায়ের
"কত যে স্বপ্ন" সুন্দর উপলব্ধি ফুটিয়ে তুলেছে। স্বপ্নকে সত্যি করতে অনেক
কান্না ঘাম ঝরাতে হয়। স্বপ্নকে বাচিয়ে রেখো রেনেসাঁ। জীবনে সার্থকতা লাভের পেছনে
স্বপ্ন প্রেরণা হয়ে থাকে। সুদেষ্ণা মৈত্রের হি হি গল্পটিতে সুকুমার রায়ের আবোলতাবোলের
নানা চরিত্র ও প্রসঙ্গ আনা হয়েছে। গল্পটি শুধু ছোটদের কাছে নয় বড়দের কাছেও উপভোগ্য
হয়ে উঠেছে।
ফুটবল নিয়ে আবেশ কুমার দাসের লেখা "বড়
হতে হতে বিশ্বকাপের সঙ্গে" অনবদ্য ও তথ্যসমৃদ্ধ। ফুটবল নিয়ে উৎসাহী ছোটরা অনেক
কিছু জানতে পারবে। আমার ভালো লেগেছে শুরুটা। পুরনো কথা মনে পড়ে গেল। সেই প্রথম দূরদর্শনের
আগমনের সময় সারা পাড়ায় দুটো একটা বাড়িতে দূরদর্শন এসেছে এই বিশ্বকাপ বা এশিয়াড
উপলক্ষে আর তাকে ঘিরে পাড়ার ছোট থেকে বড় সকলের সমাগম, হাসি গল্প, মুড়ি তেলে ভাজা
খাওয়া। সে একটা টিভিকে কেন্দ্র করে সত্যি চমৎকার সব মিলনমেলার দিন গেছে। আজকের ছোটরা
এই রকম মিলনমেলা থেকে বঞ্চিত। তবে, তোমরা ছোটরা গল্প পড়ে জানতে পারবে কেমন ছিল সে
সব দিন। সকলের সাথে মিলে মিশে আনন্দ ভাগ করে নেওয়ার আবেগটা জীবনকে সুন্দর করে তোলে।
লেখক নিজের গল্প বলে উসকে দিতে চেয়েছেন ছোটদের
জানার ইচ্ছেটাকে। কত দেশ যোগ দিয়েছে খেলায়। কিছু জানা, কিছু অজানা। অজানা দেশের খোঁজে
যখন পৃথিবীর মানচিত্রে চোখ রাখবে তোমাদের আবেশ আঙ্কেলের কলম চালানো সার্থক হবে। সিলেবাসের
বাইরেও অনেক কিছু জানার আছে, সে সব জানার আগ্রহ যেন কখনও তোমাদের কম না হয়। খেলার
মাঠে কত আশ্চর্য ঘটনা ঘটে। যেমন অনামা ছোট দেশ প্রথম খেলতে এসে বড় নাম করা দেশকে নাস্তানাবুদ করে দিল। তার মানে ইচ্ছে আর সঙ্কল্পের
জোর থাকলে অনেক অসাধ্য সাধন করা যায়।
সবশেষে ছবির পাতার কথা বলি। দুটো ছবি ই চমৎকার
হয়েছে। জয়দীপ সাহার ছবিতে সাদা কালোর মধ্যে
লাল রঙের ব্যবহার সুন্দর বৈপরীত্যের
সৃষ্টি করেছে। সায়ন্তনীর ঘুড়ি ওড়ানোর ছবিও সুন্দর।
সেও রঙের বৈচিত্র্যে আকাশ মাটি মানুষ সবাইকে নিয়ে সুন্দর আবহ সৃষ্টি করেছে। তোমরা আরও
এগিয়ে যাও।
পত্রিকার শ্রীবৃদ্ধি কামনা করে শেষ করলাম।
![]() |
| ছবিতে ক্লিক করলে পড়া যাবে আষাঢ় সংখ্যাটি |
.png)

























