মৌসুমী ঘোষ সম্পাদিত ছোটোদের সাইন্যাপস্
আষাঢ় ১৪৩৩ ।। জুলাই ২০২৬
স ম্পা দ কী য়
।।। । কবিতা ও ছড়া ।।। ।
বৃষ্টি যখন
বৃষ্টি যখন পড়ল বেগে স্মৃতির ভেতর ঝমঝমিয়ে
বানের জলে উথালপাথাল মাঝনদীতে নৌকা ভাসে
বৃষ্টি নামে
শালিক লুকায় ছাতার লুকায়
বৃষ্টি নামে কদম কেয়ায়
বৃষ্টি নামে নদী নালায়
টাপুরটুপুর জলের ঘুঙুর
তনুজা চক্রবর্তী
কাঁদবে ওরা সুযোগ পেলেই ভরবে চারিধার।
কান্না মাখে অবুঝ সবুজ শুকনো মাঠে ঘাটে
বর্ষাতিটা ভিজলে খুশি শীতল জলের ছাঁটে।
গরম ভাতে ইলিশ ভাপা বৃষ্টি গুঁড়ি গুঁড়ি
মজবে ঘ্রাণে শিশু কিশোর তরুণ বুড়োবুড়ি।
বুনবে মাঠে ধানের চারা চাষির মুখে হাসি
মাটির বুকে পড়বে ঝরে বকুল রাশি রাশি।
মাথায় ছাতা কচুর পাতা কচিকাঁচার খেলা
মায়ের ডাকে সাঙ্গ হবে কত হল বেলা?
ময়ুর নাচে পেখম মেলে ধারাপাতের তালে
পাতার ফাঁকে হলুদ সাদা কদম ডালে ডালে।
বর্ষা দিনে ফর্সা আকাশ কেউ যদি বা ভাবে
বাংলা মাকে শ্যামল রূপে দেখতে কী আর পাবে?
পুকুর ডোবা আবর্জনায় কেবল ঢাকে যারা
জল না পেয়ে চাতক হবে দেবেনা কেউ সাড়া।
বর্ষা আসে
সুনীল আকাশ ঢাকল বাদল
।।। । গদ্য ।।। ।
বড় হতে হতে বিশ্বকাপের সঙ্গে
আবেশ কুমার দাস
১.
বিয়োগ করে দেখছি সে পাক্কা ছত্রিশ বছরের মামলা। ২০২৬ থেকে ১৯৯০
বাদ দিলে তা-ই তো আসে। চার দিয়ে ভাগ দিলে মিলেও যায় দিব্যি। আজকের তেতাল্লিশের আমি
সেদিন মাত্রই সাত। পড়ি ক্লাস টু-তে। তা অফসাইড বা কর্নার বোঝার আগেই মজে গেলাম ভূগোলে।
সৌজন্যে ১৯৯০-এর ফিফা বিশ্বকাপ।
অবাক লাগছে তো খুব?
গোড়া থেকেই বলি তাহলে।
আজকাল মনে হয়, সে নির্ঘাত অন্য দুনিয়া ছিল এক। মানে যে কালের
কথা বলছি। মফস্সলের পাড়ায় পাড়ায় ওই এক-আধখানা বাড়ির ছাদ থেকেই উঁকি দিত অ্যান্টেনারা।
বেশ বড়লোকই ভাবা হত সেসব বাড়িদের। যদিও বড়লোক বলে দূরে দূরে সরে থাকার জো-টি ছিল না।
জানাই থাকত যে রবিবার সকালে ‘ম-হা-ভা-র-ত’-এর বাঁশিটা শুরু হলেই গোটা পাড়া ভেঙে পড়বে
টিভির সামনে। অভিমন্যুবধ বা কর্ণার্জুনের যুদ্ধকে কেন্দ্র করে ওই একটি ঘণ্টা রথদোলের
ভিড় জমে যাবে বাড়িতে। স্টিলের বড় ডেচকিতে মাখতে হবে মুড়ি-চানাচুর। এসব যে হবেই, একপ্রকার
অলিখিত সামাজিক নিয়মের মধ্যেই ধরা থাকত। আসলে পালাপার্বণে জনসমাগমে খুশিই হত সেকালের
মানুষ। তাই সাত রাজার ধন এক মানিক সেই টিভিটাকেও রাখা হত বাড়ির কোনও বড় ঘরেই।
এই আবহেই এসে পড়ল সেবারের বিশ্বকাপটা।
আমার জ্ঞানত দেখা সেই প্রথম বিশ্বকাপ।
বলে রাখি, ১৯৮৬-র আসরের কোনও স্মৃতিই থাকা সম্ভব ছিল না আমার।
পায়ের জাদুতে মাঝমাঠ থেকে পাঁচ-ছ’জনকে পরপর কাটিয়ে দিয়েগো মারাদোনার বলটাকে নিয়ে গিয়ে
ইংরেজদের জালে জড়িয়ে দেওয়ার মুহূর্তে মোটে তিন আমি। তবে মনে পড়ে, ১৯৮৯-৯০ নাগাদও মানুষের
মুখে মুখে ফিরত সেই গোলের কথা। আর মারাদোনার নামটা। তোমরা এই যেমন পড়ছ ‘ছোটোদের সাইন্যাপস’,
সেই বয়সে আমিও পড়তাম ‘শুকতারা’। মনে আছে মোটামুটি ১৯৯০-এর আশপাশেই সেই পত্রিকার পাতায়
পড়া এক কবিতাকে। বিগত বিশ্বকাপকে নিয়ে লেখা। পুরোটা অবশ্যই মনে নেই আজ আর। শুধু মাথায়
থেকে গিয়েছে দু’টি লাইন— ‘সকলের আরাধনা, হব মারাদোনা/ শুরু থেকে বুরুচাগা দেয় গোলে
হানা।’
তো এমন আবহেই এসে পড়েছিল ১৯৯০ বিশ্বকাপটা।
তার ঠিক মাসখানেক আগেই টিভি ঢুকল আমাদের বাড়িতে। এবং একেবারে
রঙিন টিভি। নেলকো-র। না, মোটেই বড়লোক ছিলাম না আমরা। অনেক হিসেব করেই পুরোতে হত মাস।
সেভাবেই ইনস্টলমেন্টে টিভিটা কিনেছিলেন বাবা। পুরো তিন বছর লেগেছিল তারপর টাকা শুধতে।
মানে যতদিনে বেজে ওঠে আর-একটা বিশ্বকাপের দামামা। যাক, তার আগে টিভি ছিল আমাদের পাড়ায়।
তবে রঙিন নয়। তো সবুজ মাঠে হলুদ-নীল-লাল জার্সি গায়ে চড়িয়ে বিশ্ববরেণ্য খেলোয়াড়দের
ছুটোছুটির মজা কি আর পুরোপুরি মেলে সাদাকালো পর্দায়? ফি রাতে তাই ভিড় জমতে লাগল আমাদের
ছোট্ট ঘরখানাতেই। আগেই বলেছি, সেকালের মানুষজন খুশিই হত বাড়িতে পাঁচটা লোকের আনাগোনায়।
সেভাবেই বেজায় আনন্দ হল আমারও। সে যদিও তালেগোলে পড়াশুনোয় খানিক ছাড় পাওয়ার দৌলতে।
যাঁরা খেলা দেখতে আসেন, প্রায়দিনই তাঁদের মুখে শুনি কোথাকার
কীসব আশ্চর্য দেশের নাম। আর্জেন্টিনা। ক্যামেরুন। বা, চেকোশ্লোভাকিয়া। কোথায় এসব দেশ?
ক্লাস টু-তে পড়ি তখন। বিলেত বা আমেরিকার নাম বিলক্ষণ জানা ছিল। কিন্তু এরা আবার কোথায়
রে বাবা? কোন ভাষায় কথা বলে সেখানকার মানুষজন? কোন সাগর কোন মহাসাগরের তীরে থাকে তারা?
কোথাকার মানুষ রজার মিল্লা? মেজোজেঠুমণির ঘরে দেখা সেই ঢাউস গ্লোবটাকে ধরে একপাক দিলে
কেমন দেখাবে তাঁর দেশের চেহারাখানা? আধখাওয়া পরোটার মতো, নাকি এই একটুখানি বিন্দুর
আকৃতির? আরও ছিল! গেরুয়া আর সবুজের মধ্যিখানের সাদা পটিতে নীলে আঁকা অশোক চক্রওয়ালা
আমাদের পতাকাটাকে তো চেনাই ছিল। রঙিন টিভির দৌলতে সেই প্রথম দেখা হল রংবেরঙের আরও কত
না পতাকাদের। জানলাম, পৃথিবীর প্রত্যেকটি দেশেরই থাকে অমন নিজস্ব রংঢঙের জাতীয় পতাকা।
সেই আমার প্রথম বিশ্বকাপ-স্মৃতি।
খেলার রোমাঞ্চের চাইতেও যা বেশি করে মনে উশকে দিয়ে গিয়েছিল
একরাশ কৌতূহল।
সেই অনুভূতির রেশ বয়ে চলেছি আজও। তাই যখনই আবার বেজে ওঠে বিশ্বকাপের
দামামা, খবরের কাগজের পাতায় চোখ রাখি (একালে তো ইন্টারনেটও আছে), কী কী নতুন নতুন দেশ
খেলতে আসছে এবার। চুরাশিটা দল আজ অবধি যোগ্যতা অর্জন করেছে বিশ্বকাপে খেলার। পৃথিবীতে
দেশ আছে তার দ্বিগুণেরও বেশি। আমার দেশ ভারতবর্ষের মতোই আরও বহু দেশই তার মানে আপ্রাণ
চেষ্টা চালিয়েই যাচ্ছে সমানে (যদিও ফিফার তরফে ১৯৫০ ব্রাজিল বিশ্বকাপে অংশগ্রহণের আমন্ত্রণ
এসেছিল ভারতের কাছে। বুট পরে খেলার বাধ্যবাধকতায় উৎসাহ দেখাইনি আমরা। দেশীয় কাদামাঠে
খালি পায়ে খেলার অভ্যাসে বিশ্বমঞ্চেও যেহেতু ওভাবে খেলতেই স্বচ্ছন্দ ছিলাম। দলের প্রত্যেকেরই
বুট থাকা সত্ত্বেও যার দরুণ ১৯৪৮-এর লন্ডন অলিম্পিক্সে ফ্রান্সের বিরুদ্ধে ‘বেয়ারফুট’
নামার সিদ্ধান্ত নেন শৈলেন মান্নারা। তাছাড়াও অলিম্পিক্সকে বিশ্বকাপের চাইতে বেশি গুরুত্ব
দেওয়াও একটা কারণ ছিল সেবার ব্রাজিলে দল না পাঠানোর।)। শৈল্পিক ফুটবলের ধাত্রীভূমি
ভাবা হয় যে মহাদেশকে, সেই লাতিন আমেরিকাতেই যেমনি আছে এমন এক দেশ, যারা এখনও অবধি কোয়ালিফাই
করতে পারেনি বিশ্বকাপে। ভেনিজুয়েলা।
তাই আগ্রহ নিয়ে খোঁজ রাখি আজও। কোন কোন দেশ প্রথম খেলতে আসছে।
নাম শুনেছি নাকি তাদের। স্বীকার করতে লজ্জা নেই, প্রায়শই টের পাই জানাশুনোর কত বাকি
রয়ে গেল এখনও। ঘরের মধ্যেই থাকা সেই ঢাউস গ্লোবখানার গায়ে এখনও লেগে আছে কত না দেশ,
যাদের দিকে চোখই পড়েনি এতকাল। একযোগে কানাডা, আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র ও মেক্সিকোতে বসা
চলতি আসরেই যেমন খেলতে এসেছে চার-চারটি নতুন দেশ: জর্ডন, কুরাসাও, কাবো ভার্দে ও উজবেকিস্তান।
যার মধ্যে প্রথম ও শেষোক্ত নাম দু’টি শোনা থাকলেও বাকি দুই দ্বীপরাষ্ট্রের অস্তিত্বের
কথা জানতামই না। আবার পাক দিলাম গ্লোবখানায়। চোখে পড়ল ক্যারিবিয়ান সাগরে অবস্থান কুরাসাও-এর।
আর, পশ্চিম আফ্রিকার উপকূল থেকে খানিক দূরত্বে আটলান্টিক মহাসমুদ্রের বুকে ভেসে আছে
কাবো ভার্দে। আবির্ভাবেই যারা নাকি গ্রুপ স্তরে অপরাজিত থেকে উঠে পড়েছিল এবার নক-আউট
রাউন্ডে। সেখানেও জিভ বের করেই দিয়েছিল লিওনেল মেসিতে সমৃদ্ধ আর্জেন্টিনার। এমনি অকুলীনরা
মহাশক্তিধরদের বেগ দিলে বরাবরই বেজায় আনন্দ হয় আমার।
মনে পড়ে যায় অনেক হিসেব করে মাস চালানোর বাধ্যবাধকতার মধ্যেও
বাবার সেই রঙিন টিভি কিনে ফেলার কথা।
তা কুরাসাও বা কাবো ভার্দের নাম জানা ছিল না বটে। তবে আর-একটা কথাও বলে নেওয়া দরকার এই প্রসঙ্গে। ঘরের মধ্যে গ্লোবখানা থাকতেও বহু দেশের নামই যে এখনও জানি না, সে কিন্তু পুরোপুরি দোষও নয় আমার। সেই কবে কলেজ স্ট্রিট থেকে কেনা গ্লোবটারও বয়স হচ্ছে। সতত পরিবর্তনশীল পৃথিবীটার সঙ্গে ঠিক মানিয়ে চলতে পারছে না ও-ও আর।বিশ্ব ফুটবলের একদা পরাশক্তি তথা আমার দেখা সেই ১৯৯০ বিশ্বকাপেই অন্তিমবার খেলে যাওয়া যুগোস্লাভিয়ারই যেমন আর অস্তিত্বই নেই পৃথিবীতে। ১৯৯১-এর পর সে ভাঙতে শুরু করে অনেকগুলো ছোট ছোট দেশে। যাদের কেউ কেউ আবার নতুন নামে খেলেছে বিশ্বকাপে। যেমন, ক্রোয়েশিয়া (আবির্ভাব ১৯৯৮; ২০১৮-য় রানার্স-আপ), স্লোভেনিয়া (আবির্ভাব ২০০২), সার্বিয়া ও মন্টেনেগ্রো (মাত্র একবারই অংশগ্রহণ ২০০৬-এ, তারপরই দেশটা আবার টুকরো হয়ে যায় দু’ভাগে), সার্বিয়া (আবির্ভাব ২০১০; সাবেক দেশটির বিযুক্তিকরণে জন্ম) বা বসনিয়া ও হার্জেগোভিনা (আবির্ভাব ২০১৪)। আবার উত্তর ম্যাসিডোনিয়া, মন্টেনেগ্রো বা কসোভোর মতো কেউ কেউ এখনও চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে কোয়ালিফাই করার।
পুরনো গ্লোবখানার গায়ে এরা কেউ নেই।
টিকে আছে যুগোস্লাভিয়া।
![]() |
| Erling Haaland এ আই সহায়তায় |
২.
ততদিনে বড় হয়েছি একটু। দেখি অ্যান্টেনারাও ইতিমধ্যে ছেয়ে গিয়েছে
মফস্সলের ছাদে ছাদে। ঘরে টিভি থাকা আর তেমন কিছু আভিজাত্যের চিহ্ন নয়। খেলা দেখা তখন
অনেক সহজ। দেখছি। মাঠের উত্তেজনাও টের পাচ্ছি বেশ। ক্লাস সিক্সে পড়ি যে। উপরন্তু ‘শুকতারা’-র
কল্যাণেই পরিচয় ঘটে গিয়েছে সেই অদ্ভুতুড়ে বুটের মালিক বিলির সঙ্গে। আর খেলাপাগল সেজোদাদু
আর বিল্টু-মন্টুরা। এমনি সময় এসে পড়ল ১৯৯৪ বিশ্বকাপটা। জানলাম আমেরিকার মাটিতে সেই
প্রথম বসতে চলেছে আসর।
ঠিক তখনই জেনেছিলাম সেই দেশটার নাম।
ডাচ ইস্ট ইন্ডিজ।
না, ভূগোলকের গায়ে আর খুঁজে পাওয়ার উপায় নেই ওই নামের কাউকে।
দুশো বছরের কাছাকাছি আমরা যেমনি ছিলাম ব্রিটিশের শাসনে, অধুনা ইন্দোনেশিয়া ছিল অমনি
ডাচ উপনিবেশ। রাজধানী ছিল বাটাভিয়া (অধুনা জাকার্তা)। ১৯৪৯-এ স্বাধীনতার আগে অবধি ডাচ
ইস্ট ইন্ডিজ নামেই যারা পরিচিত ছিল বিশ্বমঞ্চে। সেই নামেই যোগদানের সুযোগ আসে ফ্রান্সে
অনুষ্ঠিত ১৯৩৮-এর আসরে।
দু’টি ভিন্ন ভিন্ন কারণে বিশ্বকাপের ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে আছে
ডাচ ইস্ট ইন্ডিজের নামটা। প্রথমত, সেবার গোটা টুর্নামেন্টই নক-আউট পদ্ধতিতে হওয়ায় এবং
প্রতিপক্ষে সমসাময়িক ইউরোপের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফুটবল-মহাশক্তি (তথা সেবারের রানার্স-আপ)
হাঙ্গেরিকে পাওয়ায় ওই একটি ম্যাচই খেলার সুযোগ হয়েছিল বিশ্বকাপে তাদের। এবং, ৬-০ ফলাফলে
পরাজিত হয়ে আজ অবধি বিশ্বকাপের আসরে সব চাইতে কম সংখ্যক ম্যাচ খেলা দেশ হিসেবে চিহ্নিত
হয়ে আছে ডাচ ইস্ট ইন্ডিজ। আবার, প্রথম এশীয় দেশ হিসেবেও ফুটবলের এই মহাযজ্ঞে যোগদানের
নজির রয়ে গিয়েছে বিশ্বকাপে লুপ্ত সে দেশেরই।
এই দুটো তথ্য সেই বয়সে জানতে পারি, যখন খবরের কাগজের খেলার
পাতাটা আর ‘শুকতারা’-য় শান্তিপ্রিয় বন্দ্যোপাধ্যায়ের খেলা বিষয়ক লেখালিখি সমান তালে
গিলছি স্রেফ।
নিজের দেশকে খেলাধুলোর এত বড় আসরে না দেখতে পাওয়ার খেদ তো ছিলই।
এবার কী হয়, এই জাতের কিছু খেদ থাকলে মনে মনে গণ্ডিটা একটু বাড়িয়ে নেয় কেউ কেউ। এ বছর
মাধ্যমিকে আমার স্কুলের ফলাফল তত ভাল নয়? দেখি আমার শহর কেমন করল। তাতেও আশ মিটল না
তো নজর রাখি জেলার ফলাফলে। আমার বেলাতেও অমনি হয়েছিল খানিক। তাতে আবার ইন্ধন জুগিয়েছিল
ওই ডাচ ইস্ট ইন্ডিজ।
আসি সেই কথায়।
আগেই বলেছি সময়টা ১৯৯৪ সাল। ততদিনে পূর্বতন ষাট বছরের বিশ্বকাপের
(১৯৩০—১৯৯০) গুরুত্বপূর্ণ তথ্যগুলোর প্রায় সবই জানা হয়ে গিয়েছে। সৌজন্যে সেই খবরের
কাগজের খেলার পাতা আর শুকতারায় শান্তিপ্রিয় বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখালিখি। একটা বিষয় বেশ
খেয়াল করলাম। পরিসংখ্যানটা দিলে বুঝতে সুবিধে হবে তোমাদের।
ওই ষাট বছরের চোদ্দোখানা আসরে (দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কারণে
স্থগিত ছিল ১৯৪২ ও ১৯৪৬-এর আসর) চ্যাম্পিয়ন দেশগুলোর নাম ছিল যথাক্রমে: উরুগুয়ে (১৯৩০
ও ১৯৫০), ইতালি (১৯৩৪, ১৯৩৮ ও ১৯৮২), পশ্চিম জার্মানি (১৯৫৪, ১৯৭৪ ও ১৯৯০), ব্রাজিল
(১৯৫৮, ১৯৬২ ও ১৯৭০), ইংল্যান্ড (১৯৬৬) আর আর্জেন্টিনা (১৯৭৮ ও ১৯৮৬)। এর সঙ্গে রানার্স-আপদের
নামগুলোও জুড়ে নিলে পাওয়া যায়, আর্জেন্টিনা (১৯৩০ ও ১৯৯০), চেকোশ্লোভাকিয়া (১৯৩৪ ও
১৯৬২), হাঙ্গেরি (১৯৩৮ ও ১৯৫৪), ব্রাজিল (১৯৫০), সুইডেন (১৯৫৮), পশ্চিম জার্মানি (১৯৬৬,
১৯৮২ ও ১৯৮৬), ইতালি (১৯৭০) ও নেদারল্যান্ডসকে (১৯৭৪ ও ১৯৭৮)। অর্থাৎ দেশগুলো হয় ইউরোপীয়,
নয়তো লাতিন আমেরিকার। এমনকি ১৯৯০ অবধি আয়োজকদের তালিকায় চোখ রাখতে গিয়েও দেখি মাঝে
দু’বারের ব্যতিক্রম (১৯৭০ ও ১৯৮৬, দু’ দফাতেই আসর বসে মেক্সিকোয়) বাদ দিলে আবার বাকিদের
পাওয়া গেল ওই দুই মহাদেশ থেকেই। যথাক্রমে, উরুগুয়ে (১৯৩০), ইতালি (১৯৩৪ ও ১৯৯০), ফ্রান্স
(১৯৩৮), ব্রাজিল (১৯৫০), সুইৎজারল্যান্ড (১৯৫৪), সুইডেন (১৯৫৮), চিলি (১৯৬২), ইংল্যান্ড
(১৯৬৬), পশ্চিম জার্মানি (১৯৭৪), আর্জেন্টিনা (১৯৭৮) ও স্পেন (১৯৮২)। এই একচেটিয়া কারবারখানাই
চোখে লেগেছিল সেদিন। কোথায় গেল এশিয়া, আফ্রিকা বা ওশিয়ানিয়ার প্রতিনিধিত্ব? বিশেষ করে
আমার এশিয়ার। আসলে নিজের দেশকে না দেখতে পাওয়ার দৌলতেই মনে মনে গণ্ডিটা মহাদেশ অবধি
বাড়িয়ে নিয়েছিলাম।
এদিকে বিশ্বকাপ চলছে পুরোদমে। আচমকাই একদিন এক খবরের শিরোনামে
কাগজে আটকে গেল চোখ। মোটামুটি মনে আছে আজও: ‘আঠাশ বছর পর জয় এশিয়ার’। মনে রাখতে হবে,
ইন্টারনেটের যুগ তখন নয়। অনেক প্রশ্নের উত্তরই চটজলদি জানার কিছু উপায়ই ছিল না। মনে
আছে, খেলার পরিসংখ্যান সংক্রান্ত প্রশ্নের উত্তর পেতে অনেকে চিঠি পাঠাত শুকতারার দফতরে।
পরবর্তী কোনও সংখ্যায় হয়তো ছাপা হত সেসব। আমাকে অবশ্য সেসব কিছুই করতে হল না। ক’দিন
থেকেই যে প্রশ্নটা ঘুরছিল মাথায়, ওই শিরোনাম এবং ভেতরের খবর থেকেই আচমকাই মিলে গেল
জবাব।
আসলে হয়েছিল কি, এশিয়া থেকে সেবার দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গেই কোয়ালিফাই
করেছিল সৌদি আরব। এবং গ্রুপের খেলায় ২-১ গোলে তারা হারিয়েও দেয় মরক্কোকে। সেই খবরটাই
পরদিনের কাগজে ছাপা হয় অমন শিরোনামে (এবং এরপর বেলজিয়ামকেও ১-০ গোলে হারিয়ে সেবার নক-আউটেও
পৌঁছে গিয়েছিল সৌদি)। আর সেই আঠাশ বছরের মামলা? আসলে প্রথম এশীয় দেশ হিসেবে বিশ্বকাপের
আসরে কোনও খেলায় জিতেছিল উত্তর কোরিয়া। ১৯৬৬-তে ইতালিকে ১-০ গোলে হারিয়ে। যার দরুণ
তারা পৌঁছে যায় কোয়ার্টার ফাইনালেও। ১৯৯৪ অবধি যে কোনও এশীয় দেশের সর্বোচ্চ কৃতি ছিল
ওটাই। আর দেশকে বিশ্বকাপের আসরে দেখতে না পেয়ে সেদিনের ইন্টারনেটহীন জমানায় সেই ক্লাস
সিক্সের ছেলেটা আপ্রাণে খুঁজছিল নিজের মহাদেশের এমনি কিছু অতীত গৌরবের খতিয়ানই।
তারপর অবশ্য বিশ্বকাপের আসরে মাঝেমধ্যেই দেখা গিয়েছে এশীয় বিক্রম।
১৯৯৮ বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্যায়ের খেলায় ইরান ২-১ গোলে হারিয়ে দেয় আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রকে।
২০০২ বিশ্বকাপের নক-আউট রাউন্ডে পৌঁছয় জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়া দুই আয়োজক দেশই (তখনও
অবধি একটা রেকর্ড ছিল বিশ্বকাপে। আয়োজক দেশের অন্তত দ্বিতীয় রাউন্ড অবধি যেতে পারার।
ভাবা হচ্ছিল এবার বুঝি ভেঙে যাবে রেকর্ডটা। যদিও তেমন ঘটেনি সেই দফাতেও। তবে রেকর্ডটা
প্রথম ভাঙে ২০১০ দক্ষিণ আফ্রিকা বিশ্বকাপে। তারপর ২০২২-এ গ্রুপ পর্বের সব খেলায় হেরে
যায় কাতার।)। কোরীয়রা তো শেষ করে চতুর্থ হিসেবে। সব চাইতে অবিশ্বাস্য ঘটনাটা সম্ভবত
ঘটে ২০২২ বিশ্বকাপে। গ্রুপ লিগের খেলায় দুর্ধর্ষ আর্জেন্টিনাকে ২-১ গোলে হারিয়ে দেয়
আবার সেই সৌদি আরব। যে আর্জেন্টিনা সেবার চ্যাম্পিয়ন হয় শেষ অবধি।
বলা দরকার, দুই ফাইনালিস্টের নামের তালিকায় দুই মহাদেশের দাপট
সমানে চললেও (উপরন্তু আরও বাড়লেও ইউরোপীয় প্রভাব) আয়োজকের মৌরসিপাট্টা সত্যিই ভেঙেছে
এতদিনে। আগে বলে নিই ১৯৯০-পরবর্তী চ্যাম্পিয়ন ও রানার্স-আপদের নামগুলো। যথাক্রমে: ব্রাজিল
ও ইতালি (১৯৯৪), ফ্রান্স ও ব্রাজিল (১৯৯৮), ব্রাজিল ও জার্মানি (২০০২), ইতালি ও ফ্রান্স
(২০০৬), স্পেন ও নেদারল্যান্ডস (২০১০), জার্মানি ও আর্জেন্টিনা (২০১৪), ফ্রান্স ও ক্রোয়েশিয়া
(২০১৮) এবং আর্জেন্টিনা ও ফ্রান্স (২০২২)। বোঝাই যায় যে কাপ ঘরে তোলার বিষয়ে বরং আরও
দাপুটে হয়ে উঠেছে ইউরোপ। কিন্তু এরই পাশে চোখ রাখা যাক আয়োজকদের তালিকায়। নামগুলি যথাক্রমে:
আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র (১৯৯৪), ফ্রান্স (১৯৯৮), দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপান (২০০২), জার্মানি
(২০০৬), দক্ষিণ আফ্রিকা (২০১০), ব্রাজিল (২০১৪), রাশিয়া (২০১৮), কাতার (২০২২) এবং কানাডা,
আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র ও মেক্সিকো (২০২৬)।
নতুন শতকে এশিয়া ও আফ্রিকার মাটিতে যেমনি বসেছে বিশ্বকাপের
আসর, তেমনি দক্ষিণ কোরিয়া (২০০২) বা মরক্কোর (২০২২) মতো দেশও পৌঁছে গিয়েছে শেষ চারে।
![]() |
| Cristiano Ronaldo এ আই সহায়তায় |
৩.
লুসিয়ে লোহঁ-র (Lucien Laurent) নামটা কি কোনওভাবে জানা আছে
তোমাদের? না থাকলেও সমস্যা নেই। এই তো বলে দিলাম। ইংরেজি বানানও দিয়ে দিয়েছি। ইন্টারনেটে
কী না জানা যায় একালে?
১৯৯৮ সালের কথা যদিও অন্যরকম ছিল।
ততদিনে রোদেজলে জং পড়তে শুরু করেছিল সেই অ্যান্টেনাগুলোর শিকে।
নামিয়ে ফেলার কথাও মনে পড়েনি মানুষের। ছবি ঝিরঝির করতে লাগলেই ছাদে ছুটতে হত একদিন
যাদের পরিচর্যায়, দশক ফুরনোর আগেই দিন ফুরিয়েছে তাদের। মফস্সলেও ঢুকে পড়েছে কেবল লাইন।
অমনি সময়েই আবার কাঠি পড়ল ঢাকে। এবারের আয়োজক দেশ ফ্রান্স। আমার স্কুলজীবনে হওয়া সেই
শেষ বিশ্বকাপ। ক্লাস টেনে পড়তাম।
দু’-একটা কারণে আলাদা করে মনের কোনায় রয়ে গিয়েছে সেবারের স্মৃতি।
তার একটা অবশ্যই ওই লুসিয়ে লোহঁ।
কিন্তু কে তিনি?
অবশ্যই একজন ফুটবলার।
তা তিনি কি খেলেছিলেন সেবার?
প্রশ্নই ওঠে না। যেহেতু তখন তাঁর বয়স একানব্বই। কাগজে দেখেছিলাম
ছবি। আর সঙ্গের প্রতিবেদন থেকে পড়ার সুযোগ হয়েছিল তাঁর সম্বন্ধে। যার ছেঁড়া ছেঁড়া কিছু
অংশ আজও থেকে গিয়েছে স্মৃতিতে অমলিন।
লুসিয়ে লোহঁ-র কথা আজ বলতে হলে ফিরে যেতে হবে বহু দূর অতীতে।
প্রায় এক শতাব্দী আগে। সেই ১৯৩০ সাল। ফিফা সভাপতি জুলে রিমের উদ্যোগে সূচনা বিশ্বকাপের।
সেই উরুগুয়ে। তারিখটা ছিল ১৩ জুলাই। ফ্রান্স বনাম মেক্সিকোর খেলা দিয়ে শুরু হল পথ চলা।
এবং প্রথম গোলটা হল লুসিয়ে লোহঁ-র শটেই। মানুষটার বয়স সেদিন ছিল তেইশ। এই ঘটনার পাক্কা
আটষট্টি বছর পর যখন আসর বসল তাঁর স্বদেশেই, তখনও বেঁচে আছেন বিশ্বকাপের ইতিহাসের প্রথম
গোলদাতা লুসিয়ে লোহঁ। সাক্ষাৎকারের লোভে স্বভাবতই ছুটে গিয়েছিলেন সাংবাদিকরা।
জাহাজে করে ফ্রান্স থেকে উরুগুয়ে যাওয়ার গল্প শুনিয়েছিলেন লোহঁ।
নামতে হয় মন্টিভিডিয়োতে। আরও জানা যায় তাঁর স্মৃতিচারণা থেকে, বিশ্ব ফুটবলের সেই আদিপর্বে
খেলার মধ্যিখানে ফুটবলার বদলের সুবিধা পাওয়া যেত না। কেউ আহত হলেও দশজনেই খেলতে হত
সেই দলকে। সব চাইতে ঝামেলা হত গোলরক্ষককে মাঠ ছাড়তে হলে। একালে এমনকি লাল কার্ডও দেখতে
হলে গোলরক্ষককে, মাঠে নামানো যায় পরিবর্ত গোলরক্ষক। বদলে দলের অন্য কাউকে তুলে নিতে
হয়। সেদিন কিন্তু বাকি দশজনের মধ্যে থেকেই কাউকে হাতে দস্তানা গলিয়ে এসে দাঁড়াতে হত
বারের নীচে।
মজার কথাটা হল, জনৈক গোলরক্ষকের সূত্রেও আবার মনে রয়ে গিয়েছে
১৯৯৮ বিশ্বকাপটা। ২০০২ বিশ্বকাপেও খেলেছিলেন অবশ্য তিনি। তবে গোটা বিশ্ব তাঁকে চিনেছিল,
তাঁর কাণ্ডকারখানায় চমকে উঠেছিল সেই প্রথমবার। প্যারাগুয়ের গোলরক্ষক জো লুই চিলাভার্ট।
দস্তানা হাতে গোল বাঁচানোর সঙ্গে সঙ্গেই সেট পিস থেকে গোল দেওয়ার জাদুকরও ছিলেন মানুষটি।
ক্লাব ও দেশের হয়ে ফ্রি কিক বা পেনাল্টি থেকে বহু গোলের নজির রয়েছে তাঁর।
মনে আছে সেই সময় লেখালিখিও হয়েছিল কাগজে। বিশ্বকাপের আটষট্টি
বছরের ইতিহাসে যা ঘটেনি কখনও, তাই কি ঘটতে চলেছে এবার চিলাভার্টের দৌলতে? গোলরক্ষক
হিসেবে গোল করবেন খোদ বিশ্বকাপেই?
শেষ অবধি যদিও ঘটেনি তেমন কিছু। তবে তাক লেগে গিয়েছিল আমাদের।
দস্তানাধারী চিলাভার্টকে মাঝমাঠে উঠে এসে বিপক্ষের গোলমুখ লক্ষ্য করে অভ্রান্ত নিশানায়
ফ্রি কিক নিতে দেখে। শট নিয়েই আর কোনওদিকে না তাকিয়ে পড়িমরি ফিরে যেতেন নিজের জায়গায়।
কী হল তাঁর শটের পরিণাম, পিছন ফিরে দেখার দরকার মনে করতেন না।
বিশ্বকাপ এসে পড়া মানেই ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনা সমর্থকে আড়াআড়ি
ভাগ হয়ে যাওয়া বাঙালির। কিছু মানুষকে জার্মানির সমর্থক হিসেবেও অবশ্য চিনি আমি। চন্দননগরে
আলাদা অনুকম্পা থাকতে পারে ফ্রান্সের প্রতিও। ক্রোয়েশিয়াকে হারিয়ে ২০১৮-য় ফ্রান্স কাপ
পাওয়ার রাতে অনেক বাজি পুড়েছিল সে শহরের রাস্তাঘাটে। তবে প্যারাগুয়ের সমর্থক কাউকে
জানা নেই আমার।
বিশ্বকাপে কত খেলা! গ্রুপ লিগের খেলাগুলো চলার সময় এক-একদিনে
দুটো-তিনটে করেও ম্যাচ থাকে। সব খেলা কি সবাই দেখতে পারে রোজ?
কিন্তু চিলাভার্টের জন্য আমরা অনেকেই চোখ রাখতাম প্যারাগুয়ের
খেলাগুলোয়।
![]() |
| Kylian Mbappé এ আই সহায়তায় |
৪.
২০০২-এ কলেজে ঢুকে পড়েছি। সেবার বিশ্বকাপটা একটু বিশেষ ছিল
বটে। আমেরিকা ও ইউরোপের একাধিপত্য ভেঙে সেই প্রথম আসর বসল এশিয়ায়। আবার তাতেই খানিক
গোলমালও হয়ে গেল আমাদের।
কারণটা আর কিছু নয়।
সময়ের ব্যবধান।
সাহেবদের দেশে যখন চড়চড়ে দিনের আলো, আমাদের এখানে হয়তো মধ্যরাত্রি।
স্কুল-কলেজ, অফিস-আদালতের পাট চুকিয়ে নির্বিঘ্নে টিভির সামনে বসা যেত। বিশ্বকাপের আসর
দোরগোড়ায় এসে পড়তে দিনের বেলাতেই শুরু হয়ে যাচ্ছিল খেলাগুলো। আবার আজকের মতো সুবিধাও
তো আসেনি তখন। যে ট্রেনে-বাসে একটু ফাঁক পেলেই হাতের যন্তরটি মেলে ধরে চোখ রাখা যাবে
ছোট পর্দায়। সময়টা আসলে ছিল সন্ধিক্ষণ। পুরনো আর নতুন দুই যুগের মাঝে। তাই পাড়ায় পাড়ায়
অ্যান্টেনাগুলো ছাদ থেকে নেমে এলেও (এবং ক্ষেত্রবিশেষে ওজন দরে বিকিয়ে গেলেও টিনভাঙা
লোহাভাঙা শিশিবোতলের সঙ্গে) টিভি-র গুরুত্ব তখনও কমেনি।
বলা দরকার, আমাদের সেই নেলকো টিভিটা কিন্তু চলছিল তখনও।
খেয়েদেয়ে ভরদুপুরে দেখতে বসেছিলাম রোনাল্ডোর ব্রাজিল বনাম অলিভার
কানের জার্মানির মধ্যে চূড়ান্ত লড়াই।
সেবার ব্রাজিল ছিল দুরন্ত ছন্দে। বিশেষত তাদের চার ‘আর’— রোনাল্ডো,
রিভাল্ডো, রোনাল্ডিনহো ও রবের্তো কার্লোস। ফাইনালের চূড়ান্ত বাঁশি বাজার সঙ্গে সঙ্গেই
আরও একবার মিলে যায় সেই পুরনো মিথটা। তখনও অবধি ইউরোপীয় দলগুলো বিশ্বকাপ পেয়ে এসেছে
ঠিক যখন যখন আসর বসেছে ইউরোপেই। অন্যথায় শেষ হাসি হেসেছে লাতিন আমেরিকার দেশগুলো। একবারই
ঘটেছিল যার অন্যথা। সেটাও ইউরোপের দিক থেকে নয়। যখন ১৯৫৮-য় সুইডেন থেকে কাপ নিয়ে যায়
তরুণ পেলের ব্রাজিল।
বলা দরকার, সেই আসরের দু’টি নজির কিন্তু অক্ষুন্ন আছে আজও।
প্রথমত, ফাইনালের দিন সব চাইতে বেশি গোল হয় সেবারই। স্কোরলাইনটা ব্রাজিলের পক্ষে ছিল
৫-২। অন্য নজিরটাও গোল সংক্রান্তই। বলা ভাল, গোলের বন্যা বইছিল সেবার। ফ্রান্সের জ্যঁ
ফঁতে, সেই আসরের সর্বোচ্চ গোলদাতা, মাত্র ৬-টি ম্যাচ খেলেই ১৩ বার বল পাঠান প্রতিপক্ষের
জালে। কোনও একটি আসরে এত গোল ২০২২ অবধি করতে পারেননি আর কেউ। কাছাকাছি থাকবেন হাঙ্গেরির
স্যান্ডর কোসিস। বস্তুত, ১৯৫৪-র সুইৎজারল্যান্ড বিশ্বকাপে করা তাঁর ১১ গোলের নজিরই
অতিক্রম করেন ফঁতে।
প্রসঙ্গত বলে রাখি, লুসিয়ে লোহঁ-র নামটা যেভাবে বিশ্বকাপের
প্রথম গোলদাতা হিসেবে অমর হয়ে আছে ইতিহাসে, সেভাবেই ১৯৩০-এর আসরের সর্বোচ্চ গোলদাতা
(৮ গোল) হিসেবে স্মরণীয় হয়ে আছেন আর্জেন্টিনার গুইলারমো স্টেবাইল।
একাধিক সর্বোচ্চ গোলদাতাকে কি পেয়েছে কোনও আসর? হ্যাঁ, আছে
তেমন দৃষ্টান্তও। বস্তুত তিন-তিনবার ঘটেছে ঘটনাটা। যথাক্রমে ১৯৬২ (চিলি), ১৯৯৪ (আমেরিকা
যুক্তরাষ্ট্র) ও ২০১০-এর (দক্ষিণ আফ্রিকা) আসরে। এর মধ্যে ১৯৬২-তে তো তালিকায় ছিল ছ’টা
নাম: গ্যারিঞ্চা ও ভাভা (ব্রাজিল), লিওনেল স্যাঞ্চেজ (চিলি), ফ্লুরিয়ান অ্যালবার্ট
(হাঙ্গেরি), ভ্যালেনটিন ইভানভ (সোভিয়েত ইউনিয়ন) ও দ্রেজান জারকোভিচ (যুগোস্লাভিয়া)।
হলে কী হয়, প্রত্যেকেই করতে পেরেছিলেন মোটে ৪-টি করে গোল। ১৯৯৪-এ যুগ্মভাবে সর্বোচ্চ
গোলদাতা (৬ গোল) হওয়ার নজির গড়েন হৃস্তো স্তোইচকভ (বুলগেরিয়া) ও ওলেগ সালেঙ্কো (রাশিয়া)।
আবার ২০১০-এ যে নজির (৫ গোল) ছিল থমাস মুলার (জার্মানি), ওয়েসলি স্নেইডার (নেদারল্যান্ডস),
দাভিদ ভিয়া (স্পেন) ও দিয়েগো ফোরলান (উরুগুয়ে)।
অনেক পরিসংখ্যানের কথা বলা হল।
শেষে বলি, ইউরোপের সীমানার বাইরে থেকে ইউরোপীয় দলের শেষ হাসি
হাসতে না পারার সেই পুরনো মিথ কিন্তু চুরমার হয়ে গিয়েছে তারপর। দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে
স্পেন এবং খোদ ব্রাজিল থেকেই জার্মানি কাপ ঘরে নিয়ে যায় (তা-ও আবার সেমিফাইনালে ব্রাজিলকেই
৭-১ গোলে চূর্ণ করে) যথাক্রমে ২০১০ ও ২০১৪-য়।
![]() |
| Lionel Messi এ আই সহায়তায় |
৫.
২০১৪-র বিশ্বকাপ থেকেই খেয়াল করছি ব্যাপারটা। বলার আগে জিজ্ঞাসা
করি। সেই কথাটা কি শুনেছ তোমরা? ইতিহাস নাকি নিজের প্রত্যাবর্তন ঘটায়। শুনতে একটু আশ্চর্যই
লাগার কথা। মানুষের সভ্যতা দিন দিন সামনের দিকে এগোয়। যা চলে যায় তার তো কালের স্রোতে
তামাদি হয়ে যাওয়ারই কথা। কিন্তু অন্যভাবে নাকি ফিরেই আসে সে।
সেই কথাটাই বলব এবার।
তার আগে বলি, সেই ১৯৯০ থেকে বড় হতে হতে চার বছরের ব্যবধানে
অনেকগুলো বিশ্বকাপই তো দেখলাম।
বদলটাও দেখেছি।
আমার দেখা সেই প্রথম বিশ্বকাপ একই সঙ্গে ছিল আমার দেখা একমাত্র
বিশ্বকাপও, যা সবাই মিলে রাত জেগে এক ঘরে বসে দেখেছি। এরপর আর কখনও ফিরে আসেনি সেই
দিনগুলো। আগেই বলেছি, ১৯৯৪ সালে ঘরে ঘরে ঢুকে পড়েছিল টিভি। সবার ঘরেই টিভি থাকলে আর
কে কার বাড়ি যায় খেলা দেখতে? সুতরাং, আস্তে আস্তে ইতিহাসের পাতায় ঢুকে পড়ল সেসব দিন।
সেই মিস করলে একসঙ্গেই রেগে ওঠা। গোল দিলে সারা ঘর মিলে হুল্লোড়। আবার কখনও ওই ঘরের
মধ্যেই দু’ দল হয়ে যেত মাঠের দুই প্রতিদ্বন্দ্বী দলের সমর্থকও। তখন একের হতাশায় অন্যের
উল্লাস। একের হাততালিতে অন্যের রক্তচক্ষু। সবই ছিল। ওই ঘরের মধ্যেই।
১৯৯৪ থেকে আর জো রইল না সেসবের। খেলা নিয়ে কাটাছেঁড়া, তর্কাতর্কি,
উল্লাস, ক্ষোভের সবটুকুই রইল। তবে পরদিন স্কুলের ক্লাসে, ক্লাবে ক্যারামবোর্ডের সামনে,
অফিসের টেবলে বা ট্রাম-বাসের ভিড়ে। বা পরবর্তী ক’ দিন ধরে। আমরা মুগ্ধ হয়েছি রোমারিও-য়।
বিস্মিত হয়েছি চিলাভার্টে। প্রশস্তি করেছি রোনাল্ডিনহোর। কষ্ট পেয়েছি মাথা গরম করে
জিদানের স্বপ্নভঙ্গে। আপশোশ করেছি তৃতীয়বারের চেষ্টাতেও নেদারল্যান্ডসের কাপ না পাওয়ায়।
কিন্তু খেলা চলতে চলতেই যেভাবে ঘটত আবেগের পারস্পরিক আদানপ্রদান,
সেসবের উপায় ছিল না ২০১০ অবধি আর।
২০১৪-য় এসে দেখি উলটে গিয়েছে আবার পাশার দান।
সেই ইতিহাসের প্রত্যাবর্তন।
সৌজন্যে সোশ্যাল মিডিয়া।
দেখি খেলা দেখতে দেখতেই সোশ্যাল মিডিয়ায় কথাও বলছে সবাই। অভিব্যক্তি
দিচ্ছে উল্লাসের। মাথা গরমও করছে রেগে গিয়ে। দূর মহাদেশে কিন্তু তখনও বাজেনি শেষ বাঁশি।
বল পায়ে ছুটছেন মেসি। নেইমার। এমবাপে। অথচ তার ফাঁকেই হোয়াটসঅ্যাপে, ফেসবুকে সমান তালে
কথাও বলে চলেছে মানুষ। ঠিক যেমনটা ঘটত ১৯৯০ সালে। বা তার আগেও।
মনে হল ইতিহাস ফিরে এসেছে।
ফারাকটা স্রেফ সেদিন এক ঘরে বসেছিল সারা পাড়া। আর আজ যে যার
ঘরে বসেও প্রযুক্তির কল্যাণে পৌঁছে যাচ্ছে একে অন্যের কাছে।
তারপরও কিন্তু থেকে যায় ক’টা কথা।
১৯৯০ বা তার আগে এক ঘরে সমবেত সেই অনেক মানুষেরা হাসলে, কাঁদলে,
ক্ষোভে ফেটে পড়লেও তাদের চোখ আটকে থাকত টিভির পর্দায়। আজ যখন খেলা দেখতে দেখতে ফেসবুক
বা হোয়াটসঅ্যাপে কিছু টাইপ করছি আমরা, চোখ তখন হাতে ধরা যন্তরটার দিকে। ঠিক সেই মুহূর্তে
যা যা ঘটে যাচ্ছে মাঠে, হয়তো মুহূর্তের ভগ্নাংশেই, খুব তুচ্ছই হয়তো কিছু, চলে যাচ্ছে
চোখের আড়ালেই। আমরা মেতে উঠছি অন্যের কথার লাগসই জবাব দেওয়ায়। ব্যাঘাত ঘটছে পরিপূর্ণ
রসগ্রহণে। মাথায় আছে ঘরে চলছে টিভি। কানে আসছে শব্দ। তেমন তেমন কিছু ঘটলে, হয়তো গোল
হলে, বা কেউ দেখলে লাল কার্ড, কমেন্টেটরের কণ্ঠস্বরের ওঠাপড়ায় চোখ তুলে তাকালেই চলবে।
আর সেই পর্যায়ের ঘটনা তো আবার দেখানোই হবে রিপ্লেতে। এমনি করেই মাঠে চলছে খেলা। আর
আমাদের মনোযোগের অনেকটাই চলে যাচ্ছে কাউকে জবাব দেওয়ায়।
পুরনো দিনের মানুষগুলো, সেই যারা ১৯৮৬ সালে চোখের পলক না ফেলে
দেখেছিল মারাদোনাকে মাঝমাঠ থেকে পাঁচ-ছ’জনকে পরপর কাটিয়ে নিয়ে ইংরেজদের জালে গিয়ে জড়িয়ে
দিতে বলটাকে, তারাই তবে পরিপূর্ণ রস নিতে পারত খেলাটার?
এই প্রশ্নটার উত্তরও সোজা নয়।
তাদের অনেকেই আসলে আজও দেখছে খেলা। ১৯৯০ সালে যারা কথা বলতে
বলতেও চোখ রাখছিল টিভিতে, মাঝের অনেকটা সময় তর্কটাকে তুলে রাখছিল পরের দিনের জন্য,
তারাই আবার আজ একলা বা দোকলার ঘরে টিভি খুলে রেখে টাইপ করে চলেছে হাতের যন্তরটায়। আপশোশ
করছে ভারত কবে যেতে পারবে ওই আসরে।
আমিও এই ভিড়েরই একজন।
বিশ্বকাপের সঙ্গে সঙ্গে নিজেও তো পায়ে পায়ে পেরিয়ে এলাম সময়টা।
বুঝতে পারি, মাঝের ছত্রিশ বছরে আসলে সেই পুরনো মানুষগুলোই বদলে
গিয়েছে ভেতরে ভেতরে। ⚽
![]() |
| Lamine Yamal এ আই সহায়তায় |
হিহি
খুব
অন্ধকার। বৃষ্টি হয়ে গেছে। চারিদিকে জল জমেছে।বাদল হাঁটতে গিয়ে পড়ে গেল জলে।
ব্যাগের বইখাতা ভিজে গেছে মনে হল। নিজের জামা প্যান্টের তো কথা বলাই বাহুল্য। কোনো
মতে সামলে চলতে যাবে যেই, হি হি শব্দ শুনল।
খুব অপমানে লাগল। পা পিছলে মানুষ পড়ে যেতে পারে না? না হয় বাদল পড়ে গেছে তাই নিয়ে হাসি। মোটে ভালো কাজ নয়। এদিক ওদিক দেখল কাউকে
দেখতে না পেয়ে বাড়ির দিকে চলতে লাগল।
হঠাৎ একটা
ছেলে সাইকেলে নিয়ে প্রায় ছুটছিল, সেও রাস্তার উপর
নিচ না বুঝতে জলে পড়ে গেল। ওমনি শোনা গেল
হি হি আর হাত তালি।বাদল খুব বিরক্ত হল। কে এত অসভ্য! ভাবতে ভাবতেই বাদল ছুটে গেল
ছেলেটির কাছে। দেখল সে দোকান থেকে
সিঙ্গারা কিনে ফিরছিল। সাইকেল উল্টে প্যাকেটের খুব কঠিন অবস্থা। প্যাস্টিক ব্যবহার
বন্ধ হলেও এ যাত্রায় প্যাস্টিকের প্যাকেটে কাগজের ঠোঙা থাকায় সিঙ্গারারা বেঁচে
গেল।তবুও ছেলেটি কাঁচুমাচু মুখে দাঁড়িয়ে রইল আর বাদলকে বলল,‘এই নোংরা প্যাকেট দেখলে মা তো খুব বকবে। বাড়িতে কিছুজন
এসেছেন তাদের দিতে হবে তো। আর বাড়ি ঢুকতে হবে বসার ঘর দিয়েই। কী হবে ভাই’।
বাদল
তাড়তাড়ি করে ওর ব্যাগ থেকে আরকটি পাস্টিকের প্যাকেটবার করে দিল। ব্যাগ ভিজলেও
পাস্টিকে জল তেমন নেই। ছেলেটি বলল, ‘ধন্যবাদ ভাই। তুমি তো আমার মতোই ভিজে চুপসে গেছ। অনেক
ধন্যবাদ। আমি বিলু। বোস পাড়ায় থাকি। তুমি?’
‘আমি বাদল।
দাস পাড়ায় থাকি। খেলতে আস তো গোবর ডাঙ্গার মাঠে? রবিবার এসো আমাদের ফুটবল খেলা আছে ।এসো কিন্তু দেখা হবে।’ বাদল বলল।
রবিবার
বেলা তিনটের থেকে খেলা। সবাই প্রায় এসে
গেছ কিন্তু বাদল ও বিলুর দেখা নেই। একটু পরেই বিলু তার দলবল মানে তার চারটে
কুকুরকে নিয়ে মাঠে ঢুকছে। ঠিক এই সময় আবার শোনা গেল ‘হি হি’। বাদল এদিক ওদিক তাকাল। কিন্তু কাউকে দেখতে পেল না। শুধু
বিলুর একটা কুকুর একটু ভৌ-ভৌ করল।
বিলুর দলের
সদস্যরা সবাই নেড়ি কুকুর। তাদের বাহারি নাম আছে। যা হল জন, রক, জিমি, জোরো। বিলু যেখানে গিয়ে বসল তারপাশে চারজন বসে পড়ল। খেলা
শুরু হয়েছে। কোনপক্ষই গোল করতে পারছে না। চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। এমন সময় জিমি ভৌ
ভৌ করে তাড়া করল একটা বিড়ালকে। বাদলদের খেলা প্রায় থেমে যায়। মাঠের মাঝখান দিয়ে
জিমি দৌড় দিচ্ছে।
এই সময় বাদল
আবার শুনল, ‘হিহি’। অবাক হল। কিন্তু ওতো গোলকিপার, গোল বাঁচাতে হবে, গোল ছেড়ে যেতেও পারছে না।
জিমি বিড়াল
ধরার জন্য ভৌ ভৌ করছিল। বিড়াল এক লাফে গাছে উঠে পড়েছে। জিমির চিৎকারে আশেপাশে লোক
জিমিকে লাঠি নিয়ে তেড়ে এল। জিমি বাড়িতে থাকে বলে চিৎকার বন্ধ করে কুঁই কুঁই করতে
করতে ফিরে আসতে লাগল।ঝড় উঠল হঠাৎ।আকাশ কালো হল। বৃষ্টি শুরু হল। খেলা বন্ধ হল।
বাদল আবার
শুনল ‘হি হি’। জিমি,
রক, জোরো ভৌ ভৌ করতে
শুরু করল। দেখা গেল মাঠের মাঝখানে সাদা জামা, সার্ট পরে, গলায় টাই বেঁধে চারপাঁচজন প্রাণী
নেমে এসেছে। আকাশ থেকে না গাছ থেকে বোঝার আগেই ওদের চেহারা দেখে তো সবাই হতবাক।খেলোয়াড়েরা
অনেকে দিল ছুট। তাদের আছে আবার লম্বা লেজ। লেজ দিয়ে একজন আরেকজনকে সুড়সুড়ি দিচ্ছে
আর হি হি করছে।
বিলু দেখছে
সাদা জামা পরা প্রাণিগুলো জিমিকে ধরে ধরে নিয়ে আসছে। পিছনে কয়েকটি লোক লাঠি নিয়ে
তাড়া করছে। জিমি কুঁইকুঁই
করছে। ব্যস্ রক, নোয়া দৌড় দিল
নিজেদের বন্ধুকে বাঁচাতে। খেলা গেল পণ্ড হয়ে। খেলোয়াররা দৌড় লাগাল। বাদল ও ভয়ে
দৌড়াতে যাবে তখনই প্রাণীরা বাদলের পিঠে চড়ে বসল। হিহি করতে লাগল। বাদল ঘাবড়ে গিয়ে
মাঠেই বসে পড়ল।
হঠাৎ দেখা
গেল দূর থেকে মৌমাছির মত সাদা সাদা কি যেন উড়ে উড়ে আসছে। বিলু তাকিয়ে দেখল মাঠের
প্রাণীর মত সাদা ছোটো ছোটো প্রাণীরা আকাশ থেকে উড়ে উড়ে নামছে। শুধু নামছে না ওদিকে
যে লোকগুলি জিমিকে তাড়া করেছিল তাদের নাকে মুখে চোখে লেগে যাচ্ছে। বিলু এবার বেশ
শংকিত হয়ে পড়ল। বুঝে উঠতে পারছে না কী করবে। কুকুরগুলোকে ধরতে যেতে পারছে না। হাত
পা যেন অবশ হয়ে যাচ্ছে। হঠাৎ একটা সাদা প্রাণী সামনে এসে বলল, ‘ভয় পেয়েছ কতই না,/জানো না মোর মাথার ব্যারাম —
বিলু ভাবতে লাগলো এরা কারা ? আবোল-তাবোলের দেশের লোক না কি?
বিলু শুনতে
পেল,
‘আমরা রামগোরুরের ছানা নই, তাই আমরা সব সময় হিহি করি। আমরা চলি আপন পথে আপন পথে। যাক
গে যা বলছিলাম জিমি ছুটে গেল তুমি হিহি বসে রইলে। অলস কোথাকার। সিঙ্গারা আনতে পড়ে
যাও,
বৃষ্টিতে পড়ে যাও। হিহি। তোমার কুকুরগুলিকে কি গোরু ভেবে
চড়তে ছেড়ে দিয়েছ? কী বোকা কী বোকা!’।
বিলু বলে উঠল, ‘বেশ আমি অলস, বোকা! তোমরাই বা কী
চালাক?
সাইকেল থেকে পড়ে গেলাম যখন, তখন তো হিহি করলে কিছু সাহায্য করলে না? করল তো বাদল। সেই বাদলদের খেলা মাটি করে দিলে?’
‘মাটি সে
কোথায়?
জল বৃষ্টিতে সেদিন কাদা লেগেছিল? আজ কই?’ সাদা প্রাণী বলল।
‘বুঝেছি এই
বুদ্ধি নিয়ে আমাকে বলছ বোকা!’ বিলু বলে উঠল
বিলু শুনতে
পেল করুণসুরে বাদল ডাকছে, বি—লু, বি—লু’।
একটা প্রাণী
শুনে বলল,
‘যাও বন্ধু ডাকছে যে’।
বিলু অনেক
কষ্টে উঠল। বাদলের কাছে গেল। বাদলকে ঘিরে সাদা প্রাণীগুলি নাচছে। পাশে বিলুর কুকুর
গুলি ঘুরছে। আর বলছে ‘হাসছি মোরা হাসছি দেখ, হাসছি মোরা আহ্লাদী’। বিলু দেখে ওর কুকুর গুলিও বলছে আর ঘুরছে।
বাদল এতক্ষণ
চুপ করে ছিলহঠাৎ সে বলে উঠল,’ ছুটছে মোটর ঘটর ঘটর
ছুটছে গাড়ী জুড়ি;/ ছুটছে লোকে নানান
ঝোঁকে করছে হুড়োহুড়ি;’
সঙ্গে সঙ্গে
প্রাণীর দল বলে উঠল, ‘বাপরে কি ডান পিটে
ছেলে!’
বাদল বলল, ‘ডানপিটেরর আর কী দেখলে। তোমরা তো পান্তভূতের জ্যান্ত ছানার
দল। যেদিন রাস্তায় জলে ভিজে পড়ে গেলাম সেদিন শুধু হি হি। আজ তো খেলা দিলে গোলমাল
করে।
‘আমরা করি
নি। মেঘের দল নাচ করতে নেমে কালো বোতাম টিপে দিয়েছে যে। তাই তো বৃষ্টি আরম্ভ হল। আর
আমরা দেখলাম বাদল গোল রক্ষা করতে হিমসিম, আর তুমি বিলুর কুকুরকে মার খাচ্ছে দেখেও চুপ। তাই তো
রণক্ষেত্রে আমরা নামলাম’।
‘কী কথা
আমাদের রক্ষা করতে তোমরা নামলে হিহির দল? তোমরা হলে আমাদের বাঁদর নাচন আদর গেলা কোঁৎকার দল।
বিলু মনে জোর
এনে বলল,
‘তোমরা হলে আমাদের হোৎকার দল। তোমরা হলে বাদল
দিনের মিষ্টি মধুর হামান ছেঁচা যষ্টিমধুর’।
বাদল বলে
উঠল,
‘ না গো বিলু ওরা বৃষ্টিতে কাদা করে আমাদের খেলাকে বন্ধ করার জন্য দেড়ে
দেড়ে করে ছুটে এসেছে। দেখছ না হুকোমুখোর মতো লেজ দিয়ে মাছি তাড়াচ্ছে।
সাদা প্রাণী
থেকে একজন বলে উঠল,’ হাঁ হাঁ হাঁহাঁ!
রাগ করো না, করতে চাও কি বল না’?
বাদল, বিলু পাশাপাশি এসে দাঁড়াল।বলল, ‘সব মেঘ সরিয়ে ফেলে, মাঠের কাদা দূর করে, মাঠ সুন্দর করে দাও।
আমরা আবার খেলব’।
মুহূর্তের
মধ্যে সব সুন্দর হয়ে গেল, মাঠে খেলা শুরু হল।
।। । । ছবির পাতা।।। ।
আলোচক – বানীয়া সাহা, বেথুয়াডহরী, নদীয়া।
অনেক দিন পর ছোটোদের একটা পত্রিকা পড়লাম। মাননীয়া মৌসুমী ঘোষ সম্পাদিত "ছোটোদের সাইন্যাপস্" জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩। মনখারাপের জাল যখন নিজেকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরে তখন সেই জাল ছিঁড়ে বেরিয়ে আসা হয়তো সবসময় সহজ হয়না। কিন্তু সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে চলতে গেলে এই অব্যক্ত কাঠিন্যতাকে জয় তো করতেই হবে। তাই না? সেই কাঠিন্যতাকেই জয় করার চেষ্টায় যখন এই পত্রিকাটা সোশ্যাল মিডিয়ার চ্যাটবক্সে ভেসে উঠল অনায়াসেই স্পর্শ করে ফেললাম সেটা। পত্রিকাটা খোলার পর প্রথমেই চোখ গেলো বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের বসে থাকা প্রচ্ছদটির ওপর। লিনো কাট শৈলী তে বানানো Teal colour এর ব্যাকগ্রাউন্ডের ওপর সাদা কালো ছবিটা মনটাকে খানিকটা শান্ত করলো মনে হলো। পত্রিকার একদম ওপরের দিকে খুব ছোটো ছোটো অক্ষরে লেখা জীবনানন্দ দাশের সেই বিখ্যাত কবিতা"বনলতা সেন" এর দুটি লাইন "পৃথিবীর সব রঙ নিভে গেলে পাণ্ডুলিপি করে আয়োজন, তখন গল্পের তরে জোনাকির রঙে করে ঝিলমিল..." লেখাটা যেন হৃদয়ের মধ্যে নতুন এক আশার আলো দপ করে জ্বালিয়ে দিলো। আর সেই আলোর ছটায় পড়ে ফেললাম পত্রিকার সবটা।
শ্রদ্ধেয় লেখক পীযূষ প্রতিহার "ছোটোদের নজরুল" লেখাতে বিদ্রোহী কবির গল্প কবিতা গুলোকে যেভাবে সংক্ষেপে বর্ণনা করেছেন সেটা পড়ে বেশ ভালো লাগলো। ক্লাস ওয়ানে পড়া "কিশলয়" বইয়ের গল্প আর কবিতা গুলো মনে পড়ছিল খুব।
কবিতা ও ছড়ার অংশটিতে মাননীয়া কবি মৌসুমী চট্টোপাধ্যায় দাস এবং শ্রদ্ধেয় স্বপনকুমার বিজলী মহাশয়ের কবিতা দুটি ভীষণ সুন্দর। অসাধারণ ছন্দ ও অন্ত্যমিলের বুনন আমার খুব ভালো লেগেছে। কবি কাজী নজরুল ইসলামের সাহিত্য কর্মকে দারুণ ভাবে স্মরণ করতে পারলাম কবিতাদুটির মধ্যে দিয়ে। অপর একজন কবি মাননীয় সন্দীপন রায়ের কবিতাটি ছোট্ট অথচ নজরুলের চরিত্র, লেখা, জীবন সবকিছু কি সুন্দর ভাবে একসঙ্গে গেঁথে দিয়েছেন তিনি। বেশ ভালো লাগলো পড়ে। ছোট্ট বোন অম্বিকার "বিদ্রোহী কবির বর্ণনা" বেশ সুন্দর। "যতদিন এই বাংলা ভাষার বয়ে যাবে ধারা/ ততদিন শ্রদ্ধায় স্মরণ করবো তোমায় আমরা" শেষের এই লাইনটি আমার হৃদয়ে কবির অস্তিত্বকে যেন আরও একবার মনে করিয়ে দিলো। ভবিষ্যতে তোমার আরও লেখা পড়ার অপেক্ষায় রইলাম বোন।
মাননীয় লেখক গৌরাঙ্গ দাস মহাশয়ের "রঙ্গন ও মৌমাছি" অসাধারণ একটি গল্প। এটা শুধু একটা শিশু আর মৌমাছির গল্প নয় এই গল্পে আমি খুঁজে পেয়েছি আমাদের সবুজ প্রকৃতির বিস্ময়কর বৈচিত্র্যকে। পরিবেশের প্রতি সচেতনতার আকুতি, পরিবেশ ও তার কোলে বেড়ে ওঠা প্রাণীজগতের প্রতি আমাদের দায়বদ্ধতা, শ্রমজীবী মানুষদের লড়াইয়ের ইতিহাস, পৃথিবীর বুকে জন্মানো মানুষ ও বাস্তুতন্ত্রের অন্তর্গত জীববৈচিত্র্যের টুকরো টুকরো ঝলক সব কিছু যেন অদ্ভুত ভাবে মিলেমিশে গেছে গল্পে। দারুণ উপভোগ করলাম গল্পটা।
মাননীয়া লেখিকা ভাস্বতী বন্দ্যোপাধ্যায়ের "উত্তরের জঙ্গলে" বেশ রোমাঞ্চকর
একটা গল্প। গল্পটা পড়তে পড়তে বারবার হারিয়ে যাচ্ছিলাম নিজের ছোটোবেলায়। বিকেল হলেই
পাড়ার বন্ধুদের সাথে কুমির ডাঙা, কানামাছি, চু-কিতকিত আরও কত কী যে খেলতাম! তার ঠিক
নেই। আর সন্ধে বেলায় উঠোনে মায়ের কাছে মাদুর পেতে পড়তে বসার সময় অপেক্ষা করতাম
কখন লোডশেডিং হবে আর আমাদের পড়তে হবে না। যেদিন যেদিন লোডশেডিং হতো সেদিন আমাদের আনন্দ
আর দেখে কে! বই খাতা ফেলে ছুটতাম ঠাকুমার ঘরে গল্প শুনতে। থুপিপিসি, রঘুদা, বিন্তি,
চন্ন, কানাবুড়ি সব চরিত্র গুলিই আমার খুব ভালো লেগেছে। থুপিপিসির মতো আমদের বাড়িতে
আমার আর আমার ভাইকে ছোটবেলায় দেখাশোনা করার জন্য এমনই একটা পিসি ছিলো। আমাদের আদর
যেমন করতেন তেমনি দুষ্টুমি করলে একটা নালিশও বাদ যেতো না মায়ের কানে পৌঁছাতে। লেখিকার
গল্প পড়তে পড়তে চোখের সামনে পুরোনো দিনগুলো ভেসে উঠছিল। ধন্যবাদ জানাই লেখিকাকে, আমাকে
আমার সোনালী শৈশবের কিছু মূল্যবান মুহূর্ত ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য।
চিত্রগুপ্তের ওয়াইল্ড লাইফ ফটোগ্রাফিতে শান্ত চারপেয়ে প্রাণীটির ছবিটি বেশ ভালো লেগেছে। প্রথমে আমিও বাইসন ভেবেছিলাম পরে নাম দেখে বুঝলাম যে এটা "গৌর"। ছোট্ট দেবাংশুর প্যাস্টেলে আঁকা ছবিটা খুব মিষ্টি। আমার খুব পছন্দ হয়েছে। অন্যদিকে, আকাশে ভাসমান মেঘ, পাখি, রাস্তা, সূর্য, ফুল, গাছ, পুকুর, পিঁপড়ে, হাঁস সবকিছু নিয়ে এত সুন্দর একটা ছবি এঁকেছে ঐন্দ্রী, আমি তাতে বিস্মিত। মনে হলো এ যেন জীবন্ত জীববৈচিত্র্যের এক অসাধারণ ক্ষুদ্র রূপ। আয়ুষ্মানের জলরঙে আঁকা শান্ত পরিবেশটিও খুব ভালো লেগেছে আমার। আশা রাখি, তোমাদের এই সৃজনশীল ও মৌলিক চিন্তা আগামী দিনেও রূপ পাবে নতুন কোনো ছবির মধ্য দিয়ে, নতুন কোনো সৃষ্টির হাত ধরে।
সবশেষে ধন্যবাদ জানাতে চাই মাননীয়া মৌসুমী ম্যাম কে, যার সুদক্ষ সম্পাদনা না থাকলে হয়তো পত্রিকাটি এত সুন্দর ভাবে সেজে উঠতে পারতো না, সাহস পেতাম না হৃদয়ের ব্যথার জাল গুলোকে ছিঁড়ে ফেলার। শুধুমাত্র শিশু নয় যেকোনো পাঠকই এই পত্রিকা থেকে যে নতুন জ্ঞানের ছোঁয়ায় নিজেদেরকে সমৃদ্ধ করতে পারবে একথা বলাই যায়। 🕑
পাঠপ্রতিক্রিয়া - ২
আলোচক – মানসী গাঙ্গুলী
ভোরবেলা ছাদে আধঘন্টা হাঁটার পর চিৎ হয়ে শুয়ে ব্যায়াম করতে করতে পড়ে ফেললাম 'ছোটদের সাইন্যাপস' পত্রিকাটি। বরাবরের মতোই মৌসুমীর সম্পাদকীয় অসাধারণ। নিজের জীবনের অভিজ্ঞতালব্ধ কিছু স্মৃতি তুলে ধরেছে সে ছোটদের সামনে।
আসি পীযূষ প্রতিহার মহাশয়ের 'ছোটদের নজরুল' গদ্যে। লেখক বাঙালির শৈশবে কাজী
নজরুল ইসলামের গান, কবিতা, নাটক ইত্যাদির প্রভাব নিয়ে ধরে ধরে বিশদে খুব সুন্দর আলোচনা
করেছেন। বিখ্যাত বিখ্যাত কবিতাগুলি যা আমাদের মজ্জায় মিশে আছে সেগুলির কথা উল্লেখ করেছেন।
লেখাটি পড়ে নিজেদের ছোটবেলায় পড়া এইসব ছড়াগুলি নতুন করে মনে পড়ে যাচ্ছে, মনে আলোড়ন
তুলছে। গান না শিখেও এইসব গান আমরা ছোটবয়সে সর্বদা গুনগুন করতাম।
কবিতা ও ছড়ায় আসা যাক।
সন্দীপন রায়ের লেখা 'প্রণাম নজরুল' কবিতায়
কবি তাঁর চারিত্রিক দৃঢ়তার কথা লিখেছেন। তিনি যে স্বভাবে উদার ছিলেন, কোনোরকম গোঁড়ামি
ছিল না তাঁর মধ্যে, তা-ও লিখতে কবি ভোলেননি।
'বিদ্রোহী নজরুল' কবিতায় কবি স্বপন কুমার
বিজলীও প্রায় একই কথা লিখেছেন তাঁর কবিতায়। ধর্মকে বড় করে না দেখে তিনি মানবতার জয়গান
গেয়েছেন। অত্যাচার, শোষণ, পীড়নের বিরুদ্ধে কাজী নজরুল ইসলাম প্রতিবাদীর ভূমিকা নেন।
ছোট্ট মেয়ে অম্বিকা কুন্ডু তার কবিতা 'বিদ্রোহী
কবির বন্দনা'য় কাজী নজরুল ইসলাম যে বিদ্রোহী কবি নামে পরিচিত ছিলেন তা কবিতার ছত্রে
ছত্রে প্রকাশ করে তাঁর বন্দনা করেছে। তিনি আর্তের সহায়, তিনি নির্ভীক, সত্যের পূজারী।
খুব সুন্দর বলেছে অম্বিকা, বাংলা ভাষা যতদিন থাকবে ততদিন সকলে তাঁকে শ্রদ্ধায় স্মরণ
করবে।
'মিলিয়ে গেলেন খুকুর দুখু' ছড়ায় মৌসুমী
চট্টোপাধ্যায় দাস কাজী নজরুলের বিভিন্ন গানের লাইন তুলে সুন্দর ছন্দ মিলিয়েছেন। সুর
করে পড়তে বেশ ভাল লাগছে।
ক্যামেরায় ভারতীয় গৌরের ছবিটি খুবই সুন্দর
প্রাণবন্ত হয়েছে।
'রঙ্গন ও মৌমাছি' গল্পে গৌরাঙ্গ দাস ছোটদের
উপযোগী খুব সুন্দর একটা গল্প লিখেছেন। সেখানে রঙ্গন নামের একটি ছেলে গাছে জল দেয়। এটা
ছোটদের কাছে একটা বার্তা। আবার ময়দার জিনিস খাওয়া ভাল নয়, এমন বার্তাও বাচ্চাদের কাছে
পৌঁছে যায়। মৌমাছিরা সকালে সূর্যের নরম আলো গায়ে লাগায়। আবার তারাই ১২ঘন্টা ডিউটির
পরিবর্তে ৮ঘন্টা ডিউটি করার জন্য শ্রমিক আন্দোলন করার কথা ভাবে। কামিনী ফুল সূর্যের
আলো পেলে ঝরে যায় বা ভারতবর্ষে ১৩০০ রকম পাখি আছে ইত্যাদি তথ্যও ছোটদের কাছে পৌঁছে
দেন তাঁর এই মিষ্টি গল্পের মাধ্যমে।
ভাস্বতী বন্দ্যোোপাধ্যায় তাঁর 'উত্তরের
জঙ্গলে' গল্পের মাধ্যমে নিজের ছোটবেলা বুনেছেন, সঙ্গে ছোটদের জন্য কিছু মেসেজও রেখেছেন।
কেন তাদের বাড়িকে সিংহবাড়ি বলা হয়। ছোটবয়সে যাতে বেশি দুষ্টুমি ছেলেপুলেরা না করে তার
জন্য তাদের ডাইনিবুড়ির ভয় দেখানো, এসব চলত সেসময়। ঠাকুমার আমলের বাড়ির পুরাতন চাকরানী
থুপিপিসির তাদের বাড়িতে যথেষ্ট দাপট ছিল। তার ছেলে রঘুর জন্য বাড়ির ছোটদের চিন্তা ভালবাসারই
নামান্তর। সেসময় কাজের মানুষেরা বাড়ির মানুষের মতোই হয়ে যেত। যৌথ পরিবারে সবার যেমন
ভালবাসার অধিকার ছিল তেমনই শাসন করারও অধিকার ছিল। গল্পের শেষে ডাইনিবুড়ির আসল পরিচয়
পাওয়া যায়, লেখিকার মা যখন বলেন, "মানুষ কখনও ডাইনি হয়?" বাচ্চারাও যে বড়দের
মতো দুশ্চিন্তা করে যখন মা, বাবা, রঘু কেউ ফেরে না লেখিকার লেখায় তা পরিস্ফুট হয়েছে।
ছবির পাতায় চারবছরের দেবাংশু ঋষিদাসের আঁকা
দেখলে অবাক হতে হয়। আগের দিনে পাঁচবছর বয়স হলে হাতেখড়ি হতো। তারপর আঁকা৷ লেখা। এটাই
মানা হতো যে পেন পেন্সিল ধরতে যে গ্রিপ করতে হয় তা পাঁচবছরের আগে সম্ভব নয়। তবে এখন
তো দুবছর বয়স থেকেই লিখতে শিখতে হয়।
৭বছরের ঐন্দ্রী সাহাও সুন্দর একটা দৃশ্য এঁকেছে।
এই ভাবনাটাই তো অসাধারণ। পাহাড়, মেঘ, গাছ, ঘর, রাস্তা, ফুল, পাখি, ঘাস, মৌমাছি যা যা
প্রয়োজন একটা প্রাকৃতিক দৃশ্যে সব আছে। অনেক আদর এদের জন্য।
নবম শ্রেণির আয়ুস্মান মন্ডল দক্ষিণ ভারতের
মন্দিরের আদলে যে ছবিটি এঁকেছে তা অসাধারণ। কী সূক্ষ্ম কারুকাজ।
ছোট বন্ধুরা তোমরা এভাবে এগিয়ে যাও। এই
বয়সেই তোমরা যা অসাধারণ আঁকছ, ভবিষ্যতে তোমরা অনেকটা পথ পাড়ি দেবে।
পরিশেষে বলতে হয় গুণমানে প্রথম থেকেই ছোটদের
সাইন্যাপস একটি অসাধারণ পত্রিকা হয়ে উঠেছে। এভাবে চলতে থাকলে বাংলা সাহিত্যে একদিন
এই পত্রিকা বিশেষ একটি জায়গা করে নেবে। ♬
পাঠপ্রতিক্রিয়া - ৩
আলোচক – নন্দিতা মিত্র
বিশেষ কারণে কয়েকদিন বাড়ির বাইরে থাকতে হয়েছিল। ফেরার পথে ট্রেন অত্যন্ত দেরি হওয়ার কারণে স্টেশনে বেশ কয়েক ঘন্টা থাকতে হয়। সময় কাটানোর জন্য পড়ে ফেললাম ছোটোদের ‘সাইন্যাপস’ পত্রিকার জ্যৈষ্ঠ সংখ্যা। প্রথম পাতা থেকেই অনুভব করলাম, ছোটদের জন্য প্রকাশিত হলেও এর বিষয়বৈচিত্র্য ও মান যেকোনও বয়সের পাঠকের মনোযোগ আকর্ষণ করতে সক্ষম।
ব্যক্তিগতভাবে মনে করি, ছোটদের জন্য লেখা সবচেয়ে কঠিন। কারণ তাদের জন্য লিখতে গেলে লেখককে একসঙ্গে অনেক কিছু বিষয় মাথায় রাখতে হয়। একই সঙ্গে লেখা যাতে তাদের পছন্দ হয় সেরকম বিষয়বস্তু তো থাকবেই, তার সঙ্গে মূল্যবোধের শিক্ষা, সমাজচেতনা, পরিবেশ চেতনা, দায়িত্ববোধ ইত্যাদি নানা ধরনের শিক্ষামূলক বার্তাও দিতে হয়। সাইন্যাপস পত্রিকা ছোটদের জন্য যে বিষয়বস্তু উপস্থাপন করে তার প্রতিটি বিভাগে ঠিক এই বিষয়টা লক্ষ্য করা যায়। প্রথম পাতা থেকেই বোঝা যায়, পত্রিকাটি কেবল শিশু-কিশোরদের জন্য একটি সাহিত্যপত্র নয়, বরং তাদের কল্পনা, অনুভূতি ও মননের এক উন্মুক্ত জানালা।
সম্পাদক মৌসুমী ঘোষের সম্পাদকীয় হৃদয়গ্রাহী। নিজের জীবনের অভিজ্ঞতালব্ধ কিছু স্মৃতি তিনি এমনভাবে ছোটদের সামনে তুলে ধরেছেন, যাতে তারা একই সঙ্গে যেমন আনন্দ পাবে, তেমনই জীবন সম্পর্কে কিছু মূল্যবান শিক্ষাও লাভ করবে।
লেখক পীযূষ প্রতিহারের প্রবন্ধ ‘ছোটদের নজরুল’ খুব ভালো লাগল। কাজী নজরুল ইসলামের গান, কবিতা, নাটক এবং সামগ্রিক সৃষ্টির যে গভীর প্রভাব আপামর বাঙালির শৈশবজুড়ে ছড়িয়ে আছে, লেখক তা অত্যন্ত সহজ, সরল ও সাবলীল ভাষায় তুলে ধরেছেন। পড়তে পড়তে যেন নিজের ছোটবেলার দিনগুলোতে ফিরে গেলাম। কত পরিচিত ছড়া, কত গান, কত আবৃত্তির কথা মনে পড়ে গেল। ছোট্ট বন্ধুরা অত্যন্ত সুখপাঠ্য এই প্রবন্ধটি তোমরা অবশ্যই পড়বে।
কবিতা বিভাগে কবি সন্দীপন রায় ‘প্রণাম নজরুল’ কবিতায় কবি নজরুলের চারিত্রিক দৃঢ়তা, উদারতা এবং অসাম্প্রদায়িক চেতনার প্রতি শ্রদ্ধার্ঘ্য নিবেদন করেছেন। কবি স্বপন কুমার বিজলীর ‘বিদ্রোহী নজরুল’ কবিতাতেও একই সুর ধ্বনিত হয়েছে। ধর্মীয় সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে উঠে তিনি মানবতার জয়গান গেয়েছেন এবং অত্যাচার-শোষণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর হিসেবে কাজী নজরুলকে তুলে ধরেছেন।
ছোট্ট বন্ধু অম্বিকা কুন্ডুর লেখা ‘বিদ্রোহী কবির বন্দনা’ কবিতাটি বিশেষভাবে প্রশংসার দাবি রাখে। অল্প বয়সেই সে নজরুলের বিদ্রোহী সত্তা, মানবপ্রেম এবং সত্যনিষ্ঠ চরিত্রকে হৃদয় দিয়ে উপলব্ধি করেছে। গোটা কবিতায় নজরুলের প্রতি তার আন্তরিক শ্রদ্ধা ফুটে উঠেছে। আসলে সত্যিই তো আমরা বিশ্বাস করি বাংলা ভাষা যতদিন বেঁচে থাকবে, নজরুলও ততদিন বাঙালির হৃদয়ে অমর হয়ে থাকবেন—এই বিশ্বাস কিশোরকবির কণ্ঠে বিশেষভাবে তাৎপর্য পেয়েছে।
মৌসুমী চট্টোপাধ্যায় দাসের ছড়া ‘মিলিয়ে গেলেন খুকুর দুখু’ তে নজরুলের বিভিন্ন গানের পঙ্ক্তিকে চমৎকারভাবে ছন্দের মালায় গেঁথে তিনি একটি সুমধুর এবং সুরেলা আবহ তৈরি করেছেন। ছড়াটি যদি তোমরা সুর করে পড়ো তাহলে ছড়ার আসল রস, সৌন্দর্য আরও স্পষ্ট হয়ে উঠবে।
আলোকচিত্র বিভাগে প্রকাশিত ভারতীয় গৌরের ছবিটি অত্যন্ত সুন্দর। ক্যামেরার মাধ্যমে বন্যপ্রাণীর স্বাভাবিক ভঙ্গি ও সৌন্দর্যকে এমন দক্ষতার সঙ্গে ধরা হয়েছে মনে হচ্ছে যেন জীবন্ত।
গৌরাঙ্গ দাসের ‘রঙ্গন ও মৌমাছি’ গল্পটি ছোটদের জন্য শিক্ষামূলক ও আনন্দদায়ক একটি রচনা। গাছে জল দেওয়া, স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, প্রকৃতির প্রতি মমত্ববোধ—এসব বিষয় গল্পের মধ্যে স্বাভাবিকভাবে মিশে গেছে। পাশাপাশি মৌমাছিদের শ্রমিক আন্দোলনের প্রসঙ্গ কিংবা কামিনী ফুল ও পাখিদের সম্পর্কে নানা তথ্য গল্পটিকে আরও আকর্ষণীয় করে তুলেছে। পাশাপাশি বেশ কিছু চমকপ্রদ তথ্য ও কল্পনার মেলবন্ধন এখানে লক্ষণীয়।
ভাস্বতী বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘উত্তরের জঙ্গলে’ গল্পটি মূলত স্মৃতিচারণমূলক। লেখিকা নিজের শৈশবের অভিজ্ঞতার সঙ্গে এক যৌথ পরিবারের আবহ, স্নেহ-শাসনের সম্পর্ক এবং মানুষের প্রতি মানুষের আন্তরিকতার চিত্র তুলে ধরেছেন। ডাইনিবুড়ির ভয়, থুপিপিসির কর্তৃত্ব, রঘুর প্রতি ছোটদের উদ্বেগ, একান্নবর্তী পরিবারের সকলের ভালোবাসা, মায়া, স্নেহ, মমত্ববোধ—সব মিলিয়ে গল্পটি এক উষ্ণ মানবিক পরিমণ্ডল নির্মাণ করেছে। গল্পের শেষে লেখিকার মায়ের সংলাপ—“মানুষ কখনও ডাইনি হয়?”—শিশুমনে মানবিকতার এক গভীর বীজ বপন করে দিয়েছে যাতে শিশুরা কখনোই মানুষকে ঘৃণা করতে না শেখে।
চিত্রাঙ্কন বিভাগও যথেষ্ট সমৃদ্ধ। মাত্র চার বছরের দেবাংশু ঋষিদাসের আঁকা ছবি বিস্মিত হলাম। এত অল্প বয়সে রং ও রেখার এমন আত্মবিশ্বাস সত্যিই প্রশংসনীয়। সাত বছরের ঐন্দ্রী সাহার আঁকা প্রকৃতির দৃশ্যটিও অত্যন্ত সুন্দর। মেঘ, পাহাড়, গাছ, ফুল, ঘর, পাখি-সহ বিভিন্ন বিষয় এঁকে একটি সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক পরিবেশকে সে শিশুসুলভ কল্পনার রঙে রঙিন করে প্রাণবন্ত করে তুলেছে।
নবম শ্রেণির আয়ুস্মান মণ্ডলের আঁকা দক্ষিণ ভারতীয় মন্দিরের ছবিটি খুব ভালো লাগল। দক্ষিণের মন্দির শৈলীর সূক্ষ্ম কাজ, রঙের ব্যবহার এবং পুরো ছবিটা আঁকার জন্য যে ধৈর্যের পরিচয় ছোট্ট বন্ধুটি দিয়েছে তার জন্য তাকে অনেক ভালোবাসা। এভাবেই আঁকতে থাকো ভবিষ্যতে অনেক দূর এগিয়ে যাবে এই শুভকামনা রইল।
পাঠ-প্রতিক্রিয়া বিভাগটিও খুব ভালো লাগল। অনেকেই খুব সুন্দরভাবে পূর্ববর্তী সংখ্যা নিয়ে তাঁদের মতামত ব্যক্ত করেছেন। সেখান থেকেও তোমরা অনেক কিছু শিখতে পারবে।
ছোট বন্ধুদের উদ্দেশে বলতে চাই তোমরা এগিয়ে যাও। এই বয়সেই তোমরা যেভাবে সৃজনশীলতার পরিচয় দিচ্ছ, তা ভবিষ্যতের জন্য অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক।
সবশেষে বলি সম্পাদক এবং পত্রিকার সঙ্গে যুক্ত সবাইকে অসংখ্য ধন্যবাদ। তাঁরা যেভাবে ছোটদের মধ্যে সাহিত্যচেতনা গড়ে তুলছেন তা যথেষ্ট প্রশংসার দাবি রাখে। বর্তমান পরিস্থিতিতে যেভাবে শিশুদের জীবন যন্ত্রবন্দী হয়ে পড়ছে সেখান থেকে সাময়িক মুক্তিদানের জন্য তারা যদি নিজেদের এভাবে সাহিত্যযাপন এবং সৃজনশীল কাজের সঙ্গে যুক্ত থাকে তাহলে সাময়িক মুক্তি পেতে পারে। এই ধারাবাহিকতা বজায় থাকলে বাংলা শিশুসাহিত্যের পরিসরে একদিন ছোটোদের সাইন্যাপস অবশ্যই একটি স্বতন্ত্র ও সম্মানজনক স্থান অধিকার করবে এই আশা রাখি।🕣
------------------------------------
ছবিটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে বানানো।
.png)





















