ধারাবাহিক কলাম
জলের মতন জলের খোঁজে ভেসে।। রাজেশ কুমার
![]() |
প্রতিদিন সকাল হত, দু’নম্বর বাস আসত আমাদের শহরে। ব্যস্ত সমস্ত হর্ন বাজিয়ে, কনডাক্টর দাদার দাপাদাপিতে। যেন বলে যেত, উঠুন উঠুন সকাল হয়ে গেছে। বেরিয়ে পড়ুন যে যার কাজে। তখনও অটো, টোটো আবিষ্কার হয়নি পৃথিবীতে। মানুষজন সোশ্যাল মিডিয়ায় ঠাট্টা করে লিখত না, পৃথিবীর তিন ভাগ জল, এক ভাগ টোটো। কথায় কথায় ডাউন পেমেন্ট করে গাড়ি কিনে ফেলার সুযোগও ছিল না সেই সময় মানুষের হাতে। ছেলেপুলের দল সন্ধান পায়নি উড়ন্ত বাইকের। শহরের যানজট বলতে বাজার এলাকা, সিনেমা হল, সাইকেল, রিকশা আর মানুষে টানা তিন চাকার ভ্যান। কারোর কোথাও যাওয়ার তাড়া ছিল না সেভাবে। বাড়ি থেকে বেরিয়েছি, ধীরে সুস্থে পৌঁছালেই হল। বড় জোর সাইকেলে একটু দ্রুত প্যাডেল করা। ঘন ঘন ক্রিং ক্রিং শব্দ করা। তাড়াতাড়ি চলো বলে রিকশাঅলাকে তাড়া দেওয়া এইটুকুই। তবুও বাস-কাকুদের কীসের যেন হুড়োহুড়ি। অহেতুক পৌঁছে দিতে চাইত তাড়াতাড়ি। যেন শহরটা কোনক্রমে পেরিয়ে যেতে পারলেই হয়। টার্মিনাসে পৌঁছে আরামে চা সিঙারা খাবে।
‘শহর’ বললাম বটে আসলে ছিল শহরতলি। মহানগরের পাদদেশেই, মহানগরের কর্কশতা, উদ্দামতা, জটিলতা মুক্ত চারদিক কী যেন এক নিশ্চয়তার ঘেরাটোপে মোড়া। ধীর, স্থির অনেকটা সান বাঁধান পুকুরের মতো। সিঁড়ি নেমে গেছে একটা-দুটো যার ওপর ঝুঁকে দাঁড়ালে জলের বুকে যেন ছায়া পড়ে নিজেরই। এইসব শহরতলি সত্তর, আশি কিম্বা নব্বইয়ের বছরগুলোয় পরস্পর জুড়ে থাকত ভারতীয় রেল কিম্বা সড়ক পথে হাতে গোণা কয়েকটি বাস রুট দ্বারা।
গঙ্গার পশ্চিম পাড়ে তেমনই ছিল আমাদের দু-নম্বর বাস। ঐতিহাসিক ড্যানিশ উপনিবেশ শ্রীরামপুর থেকে সদর শহর চুঁচুড়া অব্দি চলত। খুব ঘন ঘন। সম্ভবত আধ-ঘন্টা অন্তর অন্তর। একটা বাস চলে গেলে মানুষ অপেক্ষা করত আর একটার জন্য। আমরা যে বাসস্টপ থেকে বাস ধরতাম তার ঠিক আগেই রাস্তাটা বাঁক নিয়েছে সামান্য। শৈশবে বাবা-মা এর সঙ্গে গিয়ে দাঁড়াতাম যখন বারে বারে উঁকি মেরে দেখতাম বাঁকের সেই ওপারে। কান খাড়া করে থাকতাম হর্ন শোনা যাচ্ছে কিনা! আজকের মোবাইল, ইন্টারনেট এর যুগে এসে মনে হয় এই অপেক্ষাটাই ফুরিয়ে ফেলেছে মানুষ। সেকেন্ডে সেকেন্ডে চ্যানেল পাল্টানো, মোবাইল-স্ক্রিন অবিরাম স্ক্রল করে যাওয়া। একটি ইমেজের আয়ুষ্কাল মাথার ভেতর হয়তো কয়েক সেকেন্ডে এসে থেমেছে আজ, তারপর পুরোপুরিই বিস্মৃতির অন্ধকারে। এক গণ অ্যামনেশিয়া যেন গ্রাস করেছে মানব সভ্যতাকে। সবকিছুই এক ঝলক। মুহূর্তে জ্বলে উঠে মুহূর্তেই ফুরিয়ে যাওয়া। অপেক্ষার ভেতর যে এক অনাবিল আনন্দ আছে তা প্রায় ভুলতেই বসেছি আমরা। অথচ সামান্য সেই দু-নম্বর বাস, মাত্র আধ-ঘন্টার ব্যবধানে যা হাজির হত আমাদের সামনে কতই না আনন্দ দিত শহরতলির সেই ছাপোষা মানুষগুলোকে। হুড়মুড় করে বাস নয় যেন এসে পড়ত শহরের জীবনীশক্তি।
সকালে বাজারের ভিড়। একদল পুরুষ ফতুয়া কিম্বা আটপৌরে কোঁচ খাওয়া সুতিজামা গায়ে সেঁটে, হাতে বাজারের থলি ঝুলিয়ে বেরিয়ে পড়ত। হয়ত লক্ষ্মীগঞ্জ বাজার যাবে। দুই-তিন কিলোমিটার দূর। উঠে পড়ত বাসে। দেখা হয়ে যেত দুটো স্টপ আগে ওঠা কোনও সহকর্মী বা পুরনো বন্ধুর সঙ্গে। হাসি, ঠাট্টা, রঙ্গ, রসিকতা, ডিপার্টেমেন্টের খবর, দিনকাল কোন দিকে যাচ্ছে, আজকের ছেলে ছোকরা শুরু হয়ে যেত এইসব। বাজারে দরদাম করে সবজি নিয়ে আবার ঘর ফিরতে হত সময় মতো। তারপর দুটো ডাল ভাত খেয়ে বেরতে হবে অফিসের উদ্দেশে। শহরতলির সাধারণ মধ্যবিত্ত মানুষ অফিস বলতে তখন বুঝত দশটা-পাঁচটার নির্বিঘ্ন কেরানিগিরি। কলম পেষা আর নিশ্চিন্ত মাস মাহিনা। অবসর জীবনে মাসের মাস পেনশন, প্রভিডেন্ট ফান্ডের থোক টাকা। রেল, ব্যাংক স্কুল, মহাকরণ সর্বত্রই তখন এক রীতি। পোস্ট অফিসে ইন্দিরা বিকাশ, স্বল্প সঞ্চয়ে বছরে নির্দিষ্ট হারে সুদ, পাঁচ বছরে ডবল। মধ্যবিত্তের মাথার ছাতা বলতে এতটুকুই। এগুলোই ছিল মানুষের শেষ জীবনের বাড়ি, মেয়ের বিয়ে, ছেলের ব্যবসার বল ভরসা। কে যেন বলে যেত, বাঁচো একটা নির্দিষ্ট গন্ডির মধ্যে। সীমাহীন লোভ ভালো নয়।
শহরতলির রাস্তাঘাটে তখনও ছিল কিছু সামাজিক মূল্যবোধ। বিপদে আপদে মানুষের এগিয়ে আসা। প্রতিবেশীর পাশে দাঁড়ানো। এ বাড়ির আলু পোস্ত বাটি ভরে চলে যেত ও বাড়ির ভাতের থালায়। এ বাড়ির মেয়ের বিয়েতে কোমরে গামছা বেঁধে কাজে লাগত ও বাড়ির জোয়ান ছেলে। সব মিলিয়ে এক বেঁধে বেঁধে থাকার প্রচেষ্টা।
তখন ছিল বাংলা মিডিয়াম, ফ্রি এডুকেশনের দিন। জেলায় জেলায় মিউনিসিপ্যালিটির পলেস্তরা খসা, রঙ চটা স্কুলের রমরমা। ছাপোষা বাঙালি, কেরানি সম্প্রদায়ের হাতে তখন খুব বেশি টাকা নেই সৌখিনতার জন্য। তারা বিশ্বাস করত পরিশ্রমই সাফল্যের চাবিকাঠি। একটু বেশি সচ্ছ্বল পরিবারের ছেলে মেয়েরা স্কুলে যেত রিকশায় চেপে, মাসিক বন্দোবস্তে। তারা চাউমিন খেত টিফিনে। রোল কলের সময় উপস্থিত না বলে প্রেজেন্ট প্লিজ বলত। বাকিরা সাইকেলে কিম্বা হাঁটা পথে। দুপুরের টিফিনে রুটি, আলু চচ্চরি। তখনও সবজি বলার চল হয়নি বাংলা বাজারে। পরীক্ষার দিনগুলো গার্জেনরা নিয়ে যেত সঙ্গে করে। স্কুল টাইমে দু’নম্বর বাসগুলোয় ভিড় হত দেশলাই বাক্সের মতো। মাসের শুরু হলে তো আর কথাই নেই। ব্যাংক, পোস্ট অফিসের ভিড়ও জমা হত সেই সঙ্গে। স্কুল টাইম আর অফিস টাইম যে একই। ওই বেলা দশটার সময়ই। ধুতি পরা দাদুর দল যেত ব্যাংকের কাজে, পেনশনের টাকা তুলতে। সঙ্গে তুলনামূলক কমবয়সি বাড়ির লোক। অন লাইন ট্রানজাকশন, ইউ পি আই, ওয়ালেট তো দূরের কথা শহরতলির বুকে এ টি এম মেশিন পর্যন্ত বসেনি তখনও। মানুষ বিশ্বাস করত মাস শেষের ছোট ছোট সঞ্চয়ই একদিন সুদিন দেখাবে তাদের। ছোট ছোট প্রতিটা পদক্ষেপই পৌঁছে দেবে জীবন সায়াহ্নে ইপ্সিত লক্ষ্যের দিকে।
এই সমস্ত বাসগুলোতে তখনও লেখা থাকত, ‘তিন বৎসরের ঊর্দ্ধে সম্পূর্ণ ভাড়া লাগিবে’। ‘পকেটমার হইতে সাবধান’। কিম্বা ‘নিজ মাল নিজ দায়িত্বে রাখুন’। এইসব কথা আপাত দৃষ্টিতে মনে হয় ধ্রুব সত্য। মানুষের মধ্যে সেদিনও অসততা ছিল, আজও আছে। তফাৎ শুধু সময়ের নগ্নতায়। সত্তর, আশি এমনকি নয়ের দশকেও মানুষের কাছে পাপ-পুণ্য, ন্যায়-অন্যায়ের একটা সাদা-কালো বিভাজনরেখা ছিল। বিশেষত মফসসল শহরগুলোতে। ছোট ছোট চুরি-বাটপারি যে হত না তা নয়। মোটের ওপর ন্যায়, নীতি, পারিবারিক শিক্ষা এসবের একটা স্থান ছিল সমাজে। অনেকটা সেই তরুণ মজুমদার পরিচালিত বাংলা ছায়াছবি ‘সাহেব’ কিম্বা ‘দাদার কীর্তির’ মতো। অভিনেতা তাপস পালের ওই নিষ্পাপ মুখই যেন ছিল সেকালের শহরতলির প্রতিবিম্ব।
সিনেমার কথায় মনে আসে, তখন সব সিঙ্গল স্ক্রিন। চারটে হল ছিল আমাদের শহরে। আশপাশের শহরগুলোতেও দুটো-তিনটে করে। শো হত একটা, চারটে আর সাতটা। সিনেমা শুরুর আগে আর পরে বাসগুলোতে ভিড় হত খুব। মানুষ সপরিবারে অথবা বন্ধু-বান্ধব নিয়ে ঘর থেকে বের হত কিম্বা ঘরে ফেরার উদ্দেশ্যে বাস ধরত। তবে শেষ বাস হয়ত চলে যেত আটটা নাগাদ। রাতের শো ভাঙ্গার পর বাসে ফেরা সম্ভব হত না আর। তাই সপরিবারে সিনেমা দেখতে যেত যারা, অনেকেই এড়িয়ে যেত নাইট শো। তাছাড়াও তখন একটা কথা প্রচলিত ছিল বাবা কাকাদের মুখে, ভদ্র বাড়ির ছেলেপুলেরা বেশি রাত অব্দি বাইরে থাকে না। এরকম আরও অনেক কিছুই ছিল। যেমন হিন্দি সিনেমা লোফার ছেলেরা দেখে কিম্বা একটু স্টাইল করে চুল কাটলে ছেলেটার ভবিষ্যত অন্ধকার। আর মেয়েরা গোল্লায় যেত শালোয়ারের সঙ্গে বুকে ওড়না চাপা না দিলে কিম্বা ছেলে বন্ধু থাকলে।
আসলে শহরতলির এক নিজস্ব যাপন ছিল। লক্ষ্মণগণ্ডি কাটা জীবন। Do’s and Dont’s এর কখনও না ফুরানো তালিকা। তারা বিশ্বাস করত কারা যেন বসে আছে সর্বক্ষণ তাদেরই দিকে দৃষ্টি দিয়ে। তাদের সমস্ত ভালো, খারাপের দিকে নজর রেখে। কিন্তু সময়! সে তো পরিবর্তনশীল। সবকিছু কেমন পালটে গেল আমাদেরই চোখের সামনে। মাত্র এই কয়েকটা বছরে। রাষ্ট্র গুটিয়ে নিল তার কল্যাণকর হাতটি। রাষ্ট্রায়াত্ত সংস্থা ধীরে ধীরে বন্ধ করে দিল নিয়োগ প্রক্রিয়া। বিদেশী বিনিয়গে ভরে গেল বাজার। এক ধাক্কায় ভাসিয়ে দিল স্থানিকতা, আঞ্চলিকতার বেড়াজাল। শহরতলির লক্ষ্মণগণ্ডি কে যেন এসে মুছে দিয়ে গেল বালিকার চু-কিতকিত খেলার ছলে। কোনও এক অজ্ঞাত কারণে উঠে গেল আমাদের রুটের দু-নম্বর বাস। মানুষ ভুলে গেল গন্তব্যে পৌঁছানোর জন্য সামান্য অপেক্ষা করতে।
এইখানে এসে নটে গাছটি মুড়ালো। আমাদের শহরতলি হয়ে উঠল বৃহত্তর মহানগরের অঙ্গ।
(ব্যবহৃত ছবি - এ আই সহায়তায় রাজীব কুমার ঘোষ)পর্ব ৯ ।। এক অমীমাংসিত হত্যাকান্ড এবং সেই সংক্রান্ত
কোনও কোনও সকাল আসে নিঃশব্দ ঘাতকের মতো। কুয়াশা-চাদর মুড়ি দিয়ে সামনে এসে দাঁড়ায়। কিছু বলে না। কয়েক মুহূর্ত হিম-শীতল তাকিয়ে থেকে যেন ফিরে যায় আবার। মিশে যায় জন-অরণ্যে, হাজার ক্যাকোফনির মাঝে। ছড়িয়ে দিয়ে যায় এক অশরীরী আতঙ্ক। মনে পড়ে যায় তপন সিনহার ছবির সেই বিখ্যাত সংলাপ, মাস্টার মশাই আপনি কিন্তু কিছুই দেখেননি। এক বিস্তীর্ণ প্রন্তরে জীবনভর ফিরে ফিরে আসে সেই হুঁশিয়ারি। মানুষকে করে তোলে অথর্ব, পঙ্গু।
সেই পূর্বজন্মে হয়ত বা, কোনও এক শীতের সকাল আমার সামনেও এসে দাঁড়িয়েছিল ঠিক এমনি ভাবেই। কুয়াশা মুড়ি দিয়ে, চুপি সাড়ে। তখন কত হবে! মেরে কেটে বারো কী তেরো। ব্যাট, প্যাড গুছিয়ে ভোরের আলো ফুটলেই চলে যেতাম মাঠে। সাইকেল নিয়ে বাড়ি থেকে খানিক দূরে। শহরের আউটস্কার্টেই বলা যেতে পারে। সেখানে ক্রিকেট প্র্যাকটিস হত আমাদের ক্লাব টিমের, আন্ডার থার্টিন। বাবা মায়েদের তখন অত সঙ্গে যাওয়ার চল ছিল না। তখনও খেলা জিনিসটা আজকের মতো যুদ্ধ হয়ে ওঠেনি এতটা। বিরাট কোহলির অ্যাগ্রেসিভনেস সন্তান-সন্ততির কাছে হয়ে ওঠেনি অভিভাবকদের ছুঁড়ে দেওয়া লক্ষ্যমাত্রা। লড়াই বলতে বাঙালি বুঝত, ‘ফাইট কোনি ফাইট’। চারপাশ তখনও জটিল হয়ে ওঠেনি এতটা আজকালকার দিন-রাতের মতো। তখনও এগজিস্ট করছে পাড়া কালচার। মফস্বল শহর বিলং করছে তার ছোট ছোট একতলা, দোতলা বাড়িতে। মধ্যবিত্তের স্বপ্ন, খোলা ছাদ আর ঝুল বারান্দায়। ল্যাম্প পোষ্টের নিভু নিভু আলোয় আর ভোররাতে খবরের কাগজ বিলি করা লাইনম্যানদের ব্যস্ততায়।
মফস্বলের অধিকাংশ বড় বড় মাঠগুলো তখনও খোলাই ছিল। খুব বেশি যত্ন-আত্তির বালাই ছিল না সেই সময়। বর্ষা মিটলে লোহার বিরাট রোলার চালিয়ে বড় জোর সমান করে নেওয়া হত মাঠের উপরিতল। মাটি ফেলে বোজানো হত খানা খন্দ। জন্তু জানোয়ার আর মানুষের পা। মাঝখানের বাইশ গজ ঘেরা থাকত বাঁশের অস্থায়ী বেড়া দিয়ে। প্র্যাকটিস না থাকলে গরু, ছাগল অবাধে ঘুরে বেড়াত সেই সব ফাঁকা মাঠে। বৃদ্ধ-বৃদ্ধারা আসত রোদ পোহাতে, আশপাশের ঝুপড়ি থেকে ভিজে জামা কাপড় শুকাতে দিতে।
রবিবার খুব সকাল সকাল আমরা পৌঁছে যেতাম মাঠে। রাতের ঘুমন্ত শহর আলস্য ঝেড়ে ঠিক মতো বিছানা ছাড়ার আগেই। কয়েক জন জড়ো হলে দৌড় শুরু করতাম। আনুমানিক প্রায় সত্তর ফুট লম্বা, পঞ্চাশ ফুট চওড়া। টানা দশ পাক দৌড়ানো ছিল যেন আমাদের প্রাথমিক এবং অবশ্য পালনীয় কর্তব্য। মাঝে মাঝে প্রতিযোগিতায়ও নামতাম, কে আগে শেষ করতে পারে দৌড়। সে যেন ছিল শৈশবে বুক ভরে অক্সিজেন নেওয়ার দিন। এক সুস্থ প্রতিযোগিতার মাধ্যমে নিজেকে গড়ে তোলার সময়। তখনও মফস্বল বাঁচত এক অদ্ভুত সারল্যে, সরলরৈখিক বিশ্বাসে আর একঝাঁক তাজা বাতাসে। দূষণের মাত্রা তখনও গ্রাস করে নেয়নি শহরতলির আকাশ। তখনও কোনও অশুভ শক্তি এতটা প্রকটভাবে তার বৃহৎ ডানার ছায়া ফেলে এসে দাঁড়ায়নি শিশির ভেজা মাটিতে।
আমরা সেই মাঠে পি.টি. করতাম। ফিল্ডিং প্র্যাকটিস করতাম পার্চমেন্ট ব্যাট আর পালিশ ওঠা বল নিয়ে। একে অপরকে চালের বস্তার মতো পিঠে তুলে নিয়ে দৌড় লাগাতাম অর্ধেক মাঠ অবধি। তারপর ক্লান্ত হয়ে শুয়ে পড়তাম ঘাসের ওপর। চিৎ সাঁতারের মতো আকাশ দেখতাম এক অনাবিল আনন্দে। যেন মাঠ নয় এইমাত্র জয় করে উঠেছি আস্ত এই পৃথিবীটাকেই। পরাজয় কী জিনিস সেই শৈশব জানত না। জানত না ভয় ভীতি। মাঠের প্রতিটা ঘাস যেন ছিল এক সমবেত আনন্দ সঙ্গীতের চির চেনা সুর, কান পাতলেই বেজে উঠত যা আমাদেরই অন্দরে।
তবে জীবন কখনই কমলা লেবু নয়। সাদা কালো কিম্বা কালো হলুদের ডোরা সেখানে থাকবেই। এই কঠিন সত্যি আমরা তখনও উপলব্ধি করতে শুরু করিনি। শুধু বুঝতে শিখেছি খেলায় হার জিত থাকে, ক্যাচ মিস হয়। প্রতি ম্যাচে টস জেতা সম্ভব নয়। জানতাম না এই একই নিয়ম মাঠের বাইরেও অপেক্ষা করে আছে আমাদের জন্য। বাকি জীবন, আমাদের সমস্ত কর্মকান্ডে। এমনকী আমাদের মননে, চেতনায় সব জায়গায় জুড়ে থাকবে এক স্বনির্ধারিত জয় পরাজয়ের ধারণা, সর্বক্ষণ আমাদের তাড়িয়ে নিয়ে বেরাবে যা। এক অন্ধ কুয়ার মতো সেখানে পাক খেয়ে খেয়ে উঠবে বিষাক্ত বাতাস, আমাদের অপারগতা। থেকে থেকে করে তুলবে অস্থির, অসহায়। ধীরে ধীরে আমরা বুঝে যাব এই পরাজয় কিম্বা পরাজিত হওয়ার ভয় আসলে এক ভাঙণ। নিঃশব্দে তা আমাদের মধ্যে ঢুকে পড়েছে কখন। ভাসিয়ে নিয়ে গেছে আমাদের দলিল দস্তাবেজ যাবতীয় যা ছিল সব।
ধীরে ধীরে আমার মনে পড়বে সেই এক অস্পষ্ট সকালের কথা। সেদিনও ছিল এক ছুটির সকাল। আরও পাঁচটা সাধারণ দিনের মতো শীতের আমেজ। খেঁজুর রস, কুয়াশা আর হলুদ আলোর ম্যাজিক। সেদিনও একটু তাড়াতাড়িই পৌঁছে গেছিলাম মাঠে। আমিই প্রথম। তখনও দলের আর কেউ উপস্থিত হয়নি এসে। কাউকে না কাউকে তো আগে আসতেই হয়! অভ্যাসবশত সাইকেল স্ট্যান্ড করেছিলাম মাঠের ধারে নির্দিষ্ট জায়গায়। তারপর মাথা তুলে চোখে পড়েছিল এক কল্পনাতীত দৃশ্য। সামান্য কিছু দূরে উলটে পড়ে রয়েছে একটা খাবারের ক্যান। ঢাকনা খুলে ছিটকে বেরিয়ে এসেছে গত রাতের না খাওয়া ঘুগনি। হলুদ মটর। কয়েকটা রুটি আর ছড়ানো ছেটানো এক হাত তাস। আর তারই পাশে অস্বাভাবিক ভাবে যেন ঘুমিয়ে আছে একটা মানুষ। সারা রাতের হিমে শরীরটা এলিয়ে গেছে ভেজা খড়ের আঁটির মতো। এগিয়ে গেছিলাম স্বাভাবিক উৎসাহে, কিছুমাত্র না ভেবে। কাছে গিয়ে দেখলাম গলায় দুই আঙুল কাটা দাগ। রক্ত বেরিয়ে এসেছে ফিনকি দিয়ে। পরনের পোশাকে ছিটছিটে দাগ। চোখ বন্ধ করে নিয়েছিলাম ভয়ে। পালিয়ে এসেছিলাম এক ছুটে।
সেই আমার প্রথম লাশ দেখা। তারপর আলোচনায় বহুবার শুনেছি, সাট্টার টাকা নিয়ে বিরোধ। লোকটির বাড়ি মাঠের কাছাকাছিই। কেউ বলে, তাস খেলতে খেলতে মাঠেই টেনে দিয়েছে। কেউ বলে অন্য কোথাও গলা কেটে ফেলে গেছে এখানে। সবই যদি, কিন্তু, অথবা। তবুও একটা বিষয় স্পষ্ট মনে আছে আজও। শুনতে ভয় পেতাম, আবার প্রতিদিন ওই বিষয়ে আলোচনা না করেও থাকতে পারতাম না। এ যেন এক অদ্ভুত রোলার কোস্টার রাইড। ভয়ের কারণে আমরা কেউ মাঠের ওই দিকটায় যেতাম না আর। এমনকি ম্যাচ চলাকালীন ফিল্ডিং করতেও রাজি হত না কেউ। লোকটার মুখ ঢেকে গেসল ধূসর কুয়াশায়। তবুও সবুজ ঘাসে পড়ে থাকা ওই হলুদ মটর, উলটানো ক্যান, ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা রুটি আর তাসের দৃশ্য কীভাবে যেন গেঁথে গেসল মনের ভেতর। চোখ বন্ধ করলে স্পষ্ট হয়ে উঠত আরও।
তখনও বুঝিনি ভয়েরা এভাবেই বাসা বাঁধে। ঘুণপোকার মতো। মানুষকে খেতে থাকে ভেতরে ভেতরে তার নিজেরই অজান্তে। প্রায় পনেরো-কুড়ি বছর পর শুনেছিলাম সেই হত্যাকান্ডের সঙ্গে জড়িত সন্দেহে পুলিশ গ্রেফতার করেছিল যাদের প্রত্যক্ষদর্শীর অভাবে কবে যেন বেকসুর খালাস হয়ে গেছে তারা। ছ্যাঁত করে উঠেছিল বুকের ভেতর। হত্যার অভিযোগে গ্রেফতার করা হয়েছিল যাদের তাদের আমি দেখিনি। তবুও মনে মনে একটা চেহারা কল্পনা করে এসেছিলাম এত দিন। কয়েক জোড়া চোখ যেন অদৃশ্য ঘুরে বেড়াতে শুরু করেছিল আমার চারপাশে। যত দিন গেছে সেগুলো আমার পিঠ ঘেঁষে এসে দাঁড়িয়েছে। রাস্তা-ঘাটে, বাজারে-দোকানে, ভিড় ট্রেনে। ধাক্কাধাক্কি, দর কষাকষিতে, চাঁদা চাওয়ার জুলুমবাজিতে, অফিস পলিটিক্সে আর তিন ইঞ্চির পাঁচিল তোলা নিয়ে প্রতিবেশীর সঙ্গে কথা কাটাকাটিতে। মনের ভেতর নিজের অজান্তেই ফুটে উঠেছে সেই উলটানো ক্যানের দৃশ্য, ঘাসের ওপর পড়ে থাকা হলুদ মটর আর ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা এক হাত তাসের অনুষঙ্গ। কারণে অকারণে ভয় পাইয়েছে বড়। জাগিয়ে রেখেছে সারা রাত। বুঝিয়েছে ভয় আসলে এক ধরণের ঘাতক। মানুষকে ভুলিয়ে ভালিয়ে নিয়ে যায় এক জীবন্মৃত অবস্থার দিকে। ভয় আসলে এক অঙ্কুরোদগম, নিঃশব্দে বেড়ে চলে অন্ধকার মানব জমিনে।
(ব্যবহৃত ছবি - এ আই সহায়তায় রাজীব কুমার ঘোষ)
প্রতিটি জন্ম এক একটি অসমাপ্ত হিসেব নিয়ে আসে। পাটিগণিত, বীজগণিতের সূত্র পেরিয়ে যত ডুব দিই জীবনের গভীরে ততই জটিল হতে থাকে হিসেবের খাতা। অপ্রয়োজনীয় আঁকি-বুকি, কাটাকুটিতে ভরে ওঠে অযথা। কালো কালির সংখ্যা কে যেন কেটে দেয় লাল কালির দুর্বোধ্য আঁচড়ে। দুটো অদৃশ্য চোখ চেয়ে থাকে অপলক। ভ্রুকুটি করে। প্রাথমিক স্কুলের শিক্ষক মহাশয়ের ছায়ার মতো বলে ওঠে, তেরোর নামতা মুখস্থ কর আবার। শুরু কর প্রথম থেকে।
ওটা সতেরো কিম্বা উনিশ-এর ও হতে পারে। অথবা
অন্য যে কোনও কিছুর। সময় যত গড়ায় মানুষ আসলে গিয়ে পৌঁছায় আধো-ঘুম আধো-জাগরণের এক
থকথকে জেলির মতো অবস্থায়। সে নামতা ভোলে, দুই ঘরের গুন ভোলে। আঙুলের কর গুনে গুনে অংক কষার চেষ্টা
করে। ক্রমপর্যায়ে সে স্লেট-পেনসিল ছেড়ে কাগজ-কলম ধরে। তারপর খেরো খাতা। একে একে
শেষ করে ফেলে সব। যেন খেয়ে ফেলে পৃথিবীর সমস্ত সাদা কাগজ। শেষমেশ এসে পৌঁছায়
সমুদ্র তীরে, বালুকাবেলায়। অনভ্যস্ত আঙুলের টানে এক দুই লেখা
শুরু করে আবার। ঢেউ এসে মুছে দেয়। জীবনের হিসেব এভাবেই অসমাপ্ত থেকে যায় তার।
বারবার, প্রতিবার। পৌঁছানো হয় না ফলাফলে।
আমি ভাবি নিজের কথা। ধার বাকি কী কী রয়ে গেল এই
পর্যন্ত এসে। তাক থেকে খাতা নামাই সময়-সুযোগ পেলে। ধুলো ঝাড়ি সবার অলক্ষ্যে। আতস
কাচ দিয়ে হিসাব পরীক্ষা করি। মনে করার চেষ্টা করি সেই সব প্রাপ্তি যা কখনও পাওয়ার
ছিল না আমার। অথচ কারা যেন জোর জবরদস্তি গুঁজে দিয়ে গেছে বকশিশের মতো জামার
বাঁ-দিকের বুক পকেটে। বেশ
কিছু আবছায়া মানুষের ভিড়ে ভেসে ওঠে এক অলস চা দোকানির মুখ। মাঝবয়সি, রোগা ছিপছিপে। গায়ের রঙ
কালো। যদি অন্য কোনও ভাবে পরিচয় হতো, আমি নিশ্চয় তাকে সিনেমার সেটের স্পটবয় ভাবতাম। কিম্বা
রেজিস্ট্রি অফিসের এক মাছি তাড়ানো দলিল লেখক। এমনই বৈশিষ্টহীন উপস্থিতি তার। দু-বছর আমি রোজ গেছি সেই
ব্যক্তির দোকানে, সপ্তাহে
রবিবার বাদে। দাঁড়িয়েছি, বসেছি, লাল প্লাস্টিকের জগে জল খেয়েছি। খুব তাড়া না
থাকলে অবান্তর, অপ্রয়োজনীয় কিছু কথাও বলেছি। কিন্তু মানুষটার
নামই জিজ্ঞাসা করিনি কখনও। মনে হয়নি করার কথা। অথচ উচিৎ ছিল জেনে রাখা, আজ এত বছর পরে তার কথা লিখতে এসে মনে হচ্ছে
আবার। নামই তো ব্যক্তিসত্তার প্রথম পরিচায়ক। সেইটুকু উপেক্ষা করা মানে রক্তমাংসের
আস্ত মানুষটাকেই উপেক্ষা করা! কে জানে!
মজা করে আমি তাকে কাকা ডাকতাম, আজকালকার প্রচলিত ভঙ্গিমায়। দোকানের কোনও সাইন
বোর্ড ছিল না। দূর থেকে আলাদা করে চিহ্নিতকরণের কোনও উপায়ও না। পাশাপাশি হাত
ধরাধরি করে হয়ত শ’খানেক দোকান। প্রতিটা যেন একে অপরের যমজ
সত্তা। স্বাভাবিক কারণেই দোকানির মতো দোকানটাও ছিল আর পাঁচটার ভিড়ে মিশে। তবে ওই
কাকা ডাকের সম্বোধনে কবে যেন আমাদের কাছে ওটা হয়ে উঠেছিল কাকার দোকান। ‘আমাদের’ মানে আমার আর আমার গাড়ি-চালকের কাছে।
প্রথম পর্যায়ের কোভিড তখন থিতিয়ে এসেছে সবে।
মানুষজন, সমাজ-ব্যবস্থা, অর্থনীতি ফিরতে শুরু করেছে তাদের স্বাভাবিক ছন্দে। মানুষের
মনে ভয় আছে, আবার সারভাইভালের একটা চোরা আনন্দও। সবকিছুই
যেন নতুনভাবে শুরু হতে চাইছে তখন। বহু দিনের বাতিল হওয়া উড়ান, সন্ধের কফিশপ, মানুষের গল্পগাথা। রাস্তার পাশে বহুদিনের ধুলো জমা রোয়াকটা
কে যেন ধুয়ে দিয়ে গেছে খানিক আগেই। সকালের রোদে ঝকঝক করছে তা।
আমি তখন সেক্টর ফাইভের একটা অফিসে। সব কাজ
গুছিয়ে বেরোতে বেরোতে পেরিয়ে যেত সন্ধে। সারাদিন এল.ই.ডি আলোয় ভারি হয়ে থাকত চোখের পাতা। ঠিক ঘুম নয়, ক্লান্তি নয়। যেন এক অবসাদ
জড়িয়ে থাকত সেখানে। প্রাকৃতিক আলো-বাতাসের অভাব আমার সমস্ত সত্তাকে করে তুলত ইঁট
চাপা ঘাসের মতো হলদেটে। চিংড়িঘাটার জ্যাম, বাগুইহাটির ভিড় আর এয়ারপোর্টের যান-জট এক জটিল নক্ষত্রলোকের
মতো অস্থির করে তুলত আমায়। মনে
হত খোলা হাওয়ায় দাঁড়িয়ে থাকি কোথাও। অন্ধকার কোনও মাঠের ধারে। কিম্বা নির্জন কোনও
পথের শেষে। খানিক বিরাম দিই দু-চোখের পিউপিল, আইরিস, কর্নিয়াকে। বিরাম দিই কর্মীসত্তাকে। চব্বিশ ঘন্টার মধ্যে
যেন বেঁচে নিই দু-দশ মিনিট, শুধু
নিজের জন্যে।
বেলঘড়িয়া এক্সপ্রেসওয়ের দু-ধারে সার সার
অস্থায়ী চায়ের দোকান। এক ব্যস্ত, ছুটে চলা রাস্তার পাশে অপেক্ষারত বাসস্টপের মতো। বিমানবন্দর
ফেরত মানুষজন, আই টি-এর অফিস ফেরত কর্মচারী, বাইপাশের হসপিটাল ফেরত রোগী-বাড়ির আত্মীয় স্বজন, আশপাশের হাওয়া খেতে আসা প্রেমিক-প্রেমিকা খানিক
দাঁড়িয়ে যায় এক ভাঁড় চা কিম্বা সন্ধ্যাকালীন সামান্য খাবারের জন্য। ডিম টোস্ট, ম্যাগি, ঘুগনি-মুড়ি এইসব আর কী!
দু-এক দিন জরিপ করে ওখানেই প্রতিদিন থামার
সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। ড্রাইভারকে বলেছিলাম, একটাই দোকানে দাঁড় করাবে রোজ। নির্দিষ্ট সেলুনে চুল কাটানোর মতো নির্দিষ্ট
দোকানে চা না খেলে শান্তি আসে না আমার। দশ দোকান ঘুরলে মনে হয় এই সামান্য কারণেও
পৃথিবীতে থিতু হওয়ার উপায় নেই কোথাও। বলা যেতে পারে আমার ড্রাইভার সাহেবই আবিষ্কার করেছিল সেই ‘কাকার দোকান’। বলেছিল, দোকানের পাশে এই যে এক চিলতে ফাঁকা জায়গা
এইখানে নিরুপদ্রব দাঁড়াতে পারবেন আপনি। দরকার পড়লে সিঁড়ি দিয়ে নেমে যাবেন নীচে, লোকালয়ের ভেতর চলে যাওয়া ওই স্বল্প ব্যস্ত
রাস্তায়। কেউ ডিস্টার্ব করবে না। আওয়াজও নেই তেমন।
জায়গাটা আমার পছন্দই হয়েছিল। এক ভাঁড় চা আর
একটা সিগারেট নিয়ে দাঁড়ানোর জন্য আদর্শ। সামনেই হাইওয়ে, অগণিত গাড়ি ছুটে চলেছে স্বপ্নের মতো। রাতের
অন্ধকারে যেন হারিয়ে যাচ্ছে গভীর ঘুমের ভেতর। এই ধরণের দোকানে সাধারণত ফ্লাইং
কাস্টমার বেশি। রোজকার খরিদ্দার প্রায় থাকে না বললেই চলে। সেই কারণেই হয়ত সামান্য
কিছু দিনেই লোকটা চিনে গেছিল আমাদের। জেনে গেছিল আমার
সিগারেটের ব্র্যান্ড। আমরা গেলেই সে ভিড় এড়িয়ে স্টিলের ফ্লাস্ক থেকে চটপট ঢেলে দিত
গরম গরম চা। কথাও বলত দু-একটা। এই যেমন, বাড়ি কোথায়! ঠান্ডাটা আজ জমিয়ে পড়েছে কিন্তু! কিম্বা, সারাদিন হাতিবাজারেই কেটে গেল মার্কা নির্বিষ
সব খেজুরে আলাপ। আগেই বলেছি, দিন শেষে চলার পথে এই বিরতি শুধুমাত্র নিজেকে সময় দেওয়ার
জন্যই। তাই ওই সময়টুকু কারও সঙ্গে কথা বলতে কখনই আগ্রহী থাকতাম না আমি। মাঝে মধ্যে
বিরক্তও হতাম হয়ত। দিনের শেষে দশ মিনিট সময় একা থাকব তারও উপায় নেই। এই লোককে এখনই
কথায় পেতে হয়। প্রথম প্রথম খুব একটা পাত্তা দিতাম না। কিন্তু লোকটার মধ্যে কিছু
একটা ছিল, এক রহস্যময় অলসতা যা আমাকে আকৃষ্ট করত অবচেতনে।
মাঝে মধ্যেই দোকান বন্ধ রাখত সে। কিম্বা রাতের দিকে নির্দিষ্ট সময়ের আগেই গুটিয়ে
নিত কেনাবেচা। আমার গাড়ি-চালক রসিকতা করে বলত, কাকা নিশ্চয় নেশা-টেশা করে। তাই সুযোগ পেলেই দোকান বন্ধ।
যাদের মদের নেশা আছে, তাদের
নাকি নির্দিষ্ট সময়ে ঠেকে হাজির না হলে হয় না। আমার অবশ্য এই বিষয়টা জানা নেই।
তাছাড়া লোকটা যে নেশা করে এমন সন্দেহ করার মতোও চোখে পড়েনি কিছু।
একদিন জিজ্ঞেস করলাম কাকাকে, তুমি মাঝে মধ্যেই দোকান বন্ধ রাখো কেনো গো!
আমাদের বুঝি অসুবিধা হয় না! কাকা বলেছিল, দু-মানুষে থাকি। কী হবে বেশি টাকা পয়সা করে! তার চাইতে মাঝে
মধ্যে ঘরের কাজ করা ভালো। বুঝেছিলাম বেশি খিদে নেই লোকটার। জেনেছিলাম, বাড়ি থেকে যে চা বানিয়ে আনে সেটা পুরোটা বিক্রি
হয়ে গেলেই ঝাঁপ বন্ধ। নেশা নয়, কাকার আসলে বউয়ের প্রতি টান বেশি। বিষয়টায় বেশ মজা লেগেছিল
আমার। কারও বুক ফাটে চা-সিগারেটের নেশায়, কেউ ব্যস্ত থাকে বউয়ের সঙ্গে সংসার-ধর্ম করায়। ওপরওয়ালার
যেমন মর্জি আরকি!
তা এই কাকার দোকানে ইউ.পি.আই পেমেন্ট এর
ব্যবস্থা ছিল না তখনও। প্রতিদিনকার খরচ মিটিয়ে আসতে হত প্রতিদিন। আর তার জন্য
যথেষ্ট পরিমাণ খুচরো পয়সা রাখতে হত পকেটে। ধার-বাকিতে বিশ্বাসী নই আমি। যদিও সে
মানুষটা হাসিমুখেই বলত, না
হলে থাক না, কাল দেবেন। আমি হেসে বলতাম, কাল বলে কিছু হয় না। কাল আসলে মহাকাল!
কিন্তু একদিন সেই কালই দেখতে হল আমায়। পকেটে
পাঁচশ টাকার নোট। অথচ ভাঙানি নেই একটাও। পকেট হাতড়ে কাকা বলল, আজ থাক, কাল একবারে দুদিনের টাকা নিয়ে নেবো। আমিও ঘাড় নাড়লাম
সৌজন্যের হাসি হেসে। পুরোটাই
এমনভাবে ঘটল, যেন দুজনেই জানি কালকের
দিনটাও স্বাভাবিক যাবে আজকের মতোই। একই রুটিনে সন্ধে ঠিক আটটা বাজলেই চলে আসব আমি।
তারপর এক রাউন্ড চা-সিগারেট। মিটিয়ে দেবো দু-দিনের টাকা।
কিন্তু ওই একটা বাণী আছে- মানুষ চায় আর ভগবান
হাসে। কোনও এক প্রবল শক্তিশালী আদেশ বলে পরদিন সকালেই পালটে গেল অফিস। সেক্টর
ফাইভের পাঠ চুকিয়ে চলে আসতে হল টী-বোর্ডের কাছে। অন্য রাস্তা, অন্য ব্যবস্থা। বাকি থেকে গেল একদিন
চা-সিগারেটের পয়সা। মাঝে মাঝেই মনে পড়ত সেটা। আক্ষেপ হত। ইস্ আর একটু আগে যদি
জানতে পারতাম! জানলে কী করতাম জানি না। তবে একদিন সময় বের করে গেছিলাম। কিছুদিন দেরি হল তো কী হয়েছে! ধারটা তো পরিশোধ
করা যাবে।
গিয়ে দেখলাম সে আর এক কান্ড। ভেঙে দেওয়া হয়েছে
দু-ধারের সব দোকান। চওড়া করা হচ্ছে রাস্তা। যেখানে যা ছিল চিহ্নিতকরণের সূত্র মুছে
ফেলা হয়েছে সব। অগত্যা ফিরে আসতে হয়েছিল পাওনাদারের খোঁজ না পেয়েই।
আজ এতদিন পর ধার বাকির লিস্ট নিয়ে যখনই বসি, ভেসে ওঠে মানুষটার মুখ। যেন বলে, ভাবছেন কেন! ধার থাকা ভালো। ধার থাকে বলেই আবার
দেখা হয়ে যায় মানুষে মানুষে। আমি ঘাড় নাড়ি নিজের মনে। কোথায় যেন পড়েছিলাম, এ জন্মের ঋণ আগামী জন্মে শোধ করতে হয়। তখন মনে
হয়, এক প্রকার ভালোই হয়েছে। সামান্য ধার শোধের
বাহানায় আরও একবার আসা হবে। বেঁচে নেওয়া যাবে আস্ত একটা জীবন।
অদ্ভুত এক আমেজ ছড়িয়ে পড়ে মনে-প্রাণে। এক ভাঁড়
গরম চা আর একটা আস্ত সিগারেট যেন জেগে ওঠে সব বিষণ্ণতা ছাড়িয়ে।
![]() |
| পর্ব ১ ।। অদৃশ্য কালিতে লেখা |
![]() |
| পর্ব ২ - মাঝরাতের কথাবার্তা |
![]() |
| পর্ব ৩।। বাংলার মুখ ও কবি রতন দাস |
![]() |
| পর্ব ৪।। না মেলা অঙ্কদের কথা |
![]() |
| পর্ব ৫।। এক না লেখকের জীবন |
![]() |
![]() |
| পর্ব ৭।। এভারেস্ট ও হিন্দি সিনেমা |
![]() |
| সাইন্যাপস্ স্টোর লিঙ্ক |
.png)













0 মন্তব্যসমূহ