ধারাবাহিক কলাম

জলের মতন জলের খোঁজে ভেসে।। রাজেশ কুমার





পর্ব ৮ ।। ধার রয়ে যায়


প্রতিটি জন্ম এক একটি অসমাপ্ত হিসেব নিয়ে আসে। পাটিগণিত, বীজগণিতের সূত্র পেরিয়ে যত ডুব দিই জীবনের গভীরে ততই জটিল হতে থাকে হিসেবের খাতা। অপ্রয়োজনীয় আঁকি-বুকি, কাটাকুটিতে ভরে ওঠে অযথা। কালো কালির সংখ্যা কে যেন কেটে দেয় লাল কালির দুর্বোধ্য আঁচড়ে। দুটো অদৃশ্য চোখ চেয়ে থাকে অপলক। ভ্রুকুটি করে। প্রাথমিক স্কুলের শিক্ষক মহাশয়ের ছায়ার মতো বলে ওঠে, তেরোর নামতা মুখস্থ কর আবার। শুরু কর প্রথম থেকে।

ওটা সতেরো কিম্বা উনিশ-এর ও হতে পারে। অথবা অন্য যে কোনও কিছুর। সময় যত গড়ায় মানুষ আসলে গিয়ে পৌঁছায় আধো-ঘুম আধো-জাগরণের এক থকথকে জেলির মতো অবস্থায়। সে নামতা ভোলে, দুই ঘরের গুন ভোলে। আঙুলের কর গুনে গুনে অংক কষার চেষ্টা করে। ক্রমপর্যায়ে সে স্লেট-পেনসিল ছেড়ে কাগজ-কলম ধরে। তারপর খেরো খাতা। একে একে শেষ করে ফেলে সব। যেন খেয়ে ফেলে পৃথিবীর সমস্ত সাদা কাগজ। শেষমেশ এসে পৌঁছায় সমুদ্র তীরে, বালুকাবেলায়। অনভ্যস্ত আঙুলের টানে এক দুই লেখা শুরু করে আবার। ঢেউ এসে মুছে দেয়। জীবনের হিসেব এভাবেই অসমাপ্ত থেকে যায় তার। বারবার, প্রতিবার। পৌঁছানো হয় না ফলাফলে।

আমি ভাবি নিজের কথা। ধার বাকি কী কী রয়ে গেল এই পর্যন্ত এসে। তাক থেকে খাতা নামাই সময়-সুযোগ পেলে। ধুলো ঝাড়ি সবার অলক্ষ্যে। আতস কাচ দিয়ে হিসাব পরীক্ষা করি। মনে করার চেষ্টা করি সেই সব প্রাপ্তি যা কখনও পাওয়ার ছিল না আমার। অথচ কারা যেন জোর জবরদস্তি গুঁজে দিয়ে গেছে বকশিশের মতো জামার বাঁ-দিকের বুক পকেটে। বেশ কিছু আবছায়া মানুষের ভিড়ে ভেসে ওঠে এক অলস চা দোকানির মুখ। মাঝবয়সি, রোগা ছিপছিপে। গায়ের রঙ কালো। যদি অন্য কোনও ভাবে পরিচয় হতো, আমি নিশ্চয় তাকে সিনেমার সেটের স্পটবয় ভাবতাম। কিম্বা রেজিস্ট্রি অফিসের এক মাছি তাড়ানো দলিল লেখক। এমনই বৈশিষ্টহীন উপস্থিতি তার। দু-বছর আমি রোজ গেছি সেই ব্যক্তির দোকানে, সপ্তাহে রবিবার বাদে। দাঁড়িয়েছি, বসেছি, লাল প্লাস্টিকের জগে জল খেয়েছি। খুব তাড়া না থাকলে অবান্তর, অপ্রয়োজনীয় কিছু কথাও বলেছি। কিন্তু মানুষটার নামই জিজ্ঞাসা করিনি কখনও। মনে হয়নি করার কথা। অথচ উচিৎ ছিল জেনে রাখা, আজ এত বছর পরে তার কথা লিখতে এসে মনে হচ্ছে আবার। নামই তো ব্যক্তিসত্তার প্রথম পরিচায়ক। সেইটুকু উপেক্ষা করা মানে রক্তমাংসের আস্ত মানুষটাকেই উপেক্ষা করা! কে জানে!

মজা করে আমি তাকে কাকা ডাকতাম, আজকালকার প্রচলিত ভঙ্গিমায়। দোকানের কোনও সাইন বোর্ড ছিল না। দূর থেকে আলাদা করে চিহ্নিতকরণের কোনও উপায়ও না। পাশাপাশি হাত ধরাধরি করে হয়ত শখানেক দোকান। প্রতিটা যেন একে অপরের যমজ সত্তা। স্বাভাবিক কারণেই দোকানির মতো দোকানটাও ছিল আর পাঁচটার ভিড়ে মিশে। তবে ওই কাকা ডাকের সম্বোধনে কবে যেন আমাদের কাছে ওটা হয়ে উঠেছিল কাকার দোকান। আমাদেরমানে আমার আর আমার গাড়ি-চালকের কাছে।

প্রথম পর্যায়ের কোভিড তখন থিতিয়ে এসেছে সবে। মানুষজন, সমাজ-ব্যবস্থা, অর্থনীতি ফিরতে শুরু করেছে তাদের স্বাভাবিক ছন্দে। মানুষের মনে ভয় আছে, আবার সারভাইভালের একটা চোরা আনন্দও। সবকিছুই যেন নতুনভাবে শুরু হতে চাইছে তখন। বহু দিনের বাতিল হওয়া উড়ান, সন্ধের কফিশপ, মানুষের গল্পগাথা। রাস্তার পাশে বহুদিনের ধুলো জমা রোয়াকটা কে যেন ধুয়ে দিয়ে গেছে খানিক আগেই। সকালের রোদে ঝকঝক করছে তা।

আমি তখন সেক্টর ফাইভের একটা অফিসে। সব কাজ গুছিয়ে বেরোতে বেরোতে পেরিয়ে যেত সন্ধে। সারাদিন এল.ই.ডি আলোয় ভারি হয়ে থাকত চোখের পাতা। ঠিক ঘুম নয়, ক্লান্তি নয়। যেন এক অবসাদ জড়িয়ে থাকত সেখানে। প্রাকৃতিক আলো-বাতাসের অভাব আমার সমস্ত সত্তাকে করে তুলত ইঁট চাপা ঘাসের মতো হলদেটে। চিংড়িঘাটার জ্যাম, বাগুইহাটির ভিড় আর এয়ারপোর্টের যান-জট এক জটিল নক্ষত্রলোকের মতো অস্থির করে তুলত আমায়। মনে হত খোলা হাওয়ায় দাঁড়িয়ে থাকি কোথাও। অন্ধকার কোনও মাঠের ধারে। কিম্বা নির্জন কোনও পথের শেষে। খানিক বিরাম দিই দু-চোখের পিউপিল, আইরিস, কর্নিয়াকে। বিরাম দিই কর্মীসত্তাকে। চব্বিশ ঘন্টার মধ্যে যেন বেঁচে নিই দু-দশ মিনিট, শুধু নিজের জন্যে।

বেলঘড়িয়া এক্সপ্রেসওয়ের দু-ধারে সার সার অস্থায়ী চায়ের দোকান। এক ব্যস্ত, ছুটে চলা রাস্তার পাশে অপেক্ষারত বাসস্টপের মতো। বিমানবন্দর ফেরত মানুষজন, আই টি-এর অফিস ফেরত কর্মচারী, বাইপাশের হসপিটাল ফেরত রোগী-বাড়ির আত্মীয় স্বজন, আশপাশের হাওয়া খেতে আসা প্রেমিক-প্রেমিকা খানিক দাঁড়িয়ে যায় এক ভাঁড় চা কিম্বা সন্ধ্যাকালীন সামান্য খাবারের জন্য। ডিম টোস্ট, ম্যাগি, ঘুগনি-মুড়ি এইসব আর কী!

দু-এক দিন জরিপ করে ওখানেই প্রতিদিন থামার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। ড্রাইভারকে বলেছিলাম, একটাই দোকানে দাঁড় করাবে রোজ। নির্দিষ্ট সেলুনে চুল কাটানোর মতো নির্দিষ্ট দোকানে চা না খেলে শান্তি আসে না আমার। দশ দোকান ঘুরলে মনে হয় এই সামান্য কারণেও পৃথিবীতে থিতু হওয়ার উপায় নেই কোথাও। বলা যেতে পারে আমার ড্রাইভার সাহেবই আবিষ্কার করেছিল সেই কাকার দোকান। বলেছিল, দোকানের পাশে এই যে এক চিলতে ফাঁকা জায়গা এইখানে নিরুপদ্রব দাঁড়াতে পারবেন আপনি। দরকার পড়লে সিঁড়ি দিয়ে নেমে যাবেন নীচে, লোকালয়ের ভেতর চলে যাওয়া ওই স্বল্প ব্যস্ত রাস্তায়। কেউ ডিস্টার্ব করবে না। আওয়াজও নেই তেমন।

জায়গাটা আমার পছন্দই হয়েছিল। এক ভাঁড় চা আর একটা সিগারেট নিয়ে দাঁড়ানোর জন্য আদর্শ। সামনেই হাইওয়ে, অগণিত গাড়ি ছুটে চলেছে স্বপ্নের মতো। রাতের অন্ধকারে যেন হারিয়ে যাচ্ছে গভীর ঘুমের ভেতর। এই ধরণের দোকানে সাধারণত ফ্লাইং কাস্টমার বেশি। রোজকার খরিদ্দার প্রায় থাকে না বললেই চলে। সেই কারণেই হয়ত সামান্য কিছু দিনেই লোকটা চিনে গেছিল আমাদের। জেনে গেছিল আমার সিগারেটের ব্র্যান্ড। আমরা গেলেই সে ভিড় এড়িয়ে স্টিলের ফ্লাস্ক থেকে চটপট ঢেলে দিত গরম গরম চা। কথাও বলত দু-একটা। এই যেমন, বাড়ি কোথায়! ঠান্ডাটা আজ জমিয়ে পড়েছে কিন্তু! কিম্বা, সারাদিন হাতিবাজারেই কেটে গেল মার্কা নির্বিষ সব খেজুরে আলাপ। আগেই বলেছি, দিন শেষে চলার পথে এই বিরতি শুধুমাত্র নিজেকে সময় দেওয়ার জন্যই। তাই ওই সময়টুকু কারও সঙ্গে কথা বলতে কখনই আগ্রহী থাকতাম না আমি। মাঝে মধ্যে বিরক্তও হতাম হয়ত। দিনের শেষে দশ মিনিট সময় একা থাকব তারও উপায় নেই। এই লোককে এখনই কথায় পেতে হয়। প্রথম প্রথম খুব একটা পাত্তা দিতাম না। কিন্তু লোকটার মধ্যে কিছু একটা ছিল, এক রহস্যময় অলসতা যা আমাকে আকৃষ্ট করত অবচেতনে। মাঝে মধ্যেই দোকান বন্ধ রাখত সে। কিম্বা রাতের দিকে নির্দিষ্ট সময়ের আগেই গুটিয়ে নিত কেনাবেচা। আমার গাড়ি-চালক রসিকতা করে বলত, কাকা নিশ্চয় নেশা-টেশা করে। তাই সুযোগ পেলেই দোকান বন্ধ। যাদের মদের নেশা আছে, তাদের নাকি নির্দিষ্ট সময়ে ঠেকে হাজির না হলে হয় না। আমার অবশ্য এই বিষয়টা জানা নেই। তাছাড়া লোকটা যে নেশা করে এমন সন্দেহ করার মতোও চোখে পড়েনি কিছু।

একদিন জিজ্ঞেস করলাম কাকাকে, তুমি মাঝে মধ্যেই দোকান বন্ধ রাখো কেনো গো! আমাদের বুঝি অসুবিধা হয় না! কাকা বলেছিল, দু-মানুষে থাকি। কী হবে বেশি টাকা পয়সা করে! তার চাইতে মাঝে মধ্যে ঘরের কাজ করা ভালো। বুঝেছিলাম বেশি খিদে নেই লোকটার। জেনেছিলাম, বাড়ি থেকে যে চা বানিয়ে আনে সেটা পুরোটা বিক্রি হয়ে গেলেই ঝাঁপ বন্ধ। নেশা নয়, কাকার আসলে বউয়ের প্রতি টান বেশি। বিষয়টায় বেশ মজা লেগেছিল আমার। কারও বুক ফাটে চা-সিগারেটের নেশায়, কেউ ব্যস্ত থাকে বউয়ের সঙ্গে সংসার-ধর্ম করায়। ওপরওয়ালার যেমন মর্জি আরকি!

তা এই কাকার দোকানে ইউ.পি.আই পেমেন্ট এর ব্যবস্থা ছিল না তখনও। প্রতিদিনকার খরচ মিটিয়ে আসতে হত প্রতিদিন। আর তার জন্য যথেষ্ট পরিমাণ খুচরো পয়সা রাখতে হত পকেটে। ধার-বাকিতে বিশ্বাসী নই আমি। যদিও সে মানুষটা হাসিমুখেই বলত, না হলে থাক না, কাল দেবেন। আমি হেসে বলতাম, কাল বলে কিছু হয় না। কাল আসলে মহাকাল!

কিন্তু একদিন সেই কালই দেখতে হল আমায়। পকেটে পাঁচশ টাকার নোট। অথচ ভাঙানি নেই একটাও। পকেট হাতড়ে কাকা বলল, আজ থাক, কাল একবারে দুদিনের টাকা নিয়ে নেবো। আমিও ঘাড় নাড়লাম সৌজন্যের হাসি হেসে। পুরোটাই এমনভাবে ঘটল, যেন দুজনেই জানি কালকের দিনটাও স্বাভাবিক যাবে আজকের মতোই। একই রুটিনে সন্ধে ঠিক আটটা বাজলেই চলে আসব আমি। তারপর এক রাউন্ড চা-সিগারেট। মিটিয়ে দেবো দু-দিনের টাকা।

কিন্তু ওই একটা বাণী আছে- মানুষ চায় আর ভগবান হাসে। কোনও এক প্রবল শক্তিশালী আদেশ বলে পরদিন সকালেই পালটে গেল অফিস। সেক্টর ফাইভের পাঠ চুকিয়ে চলে আসতে হল টী-বোর্ডের কাছে। অন্য রাস্তা, অন্য ব্যবস্থা। বাকি থেকে গেল একদিন চা-সিগারেটের পয়সা। মাঝে মাঝেই মনে পড়ত সেটা। আক্ষেপ হত। ইস্ আর একটু আগে যদি জানতে পারতাম! জানলে কী করতাম জানি না। তবে একদিন সময় বের করে গেছিলাম। কিছুদিন দেরি হল তো কী হয়েছে! ধারটা তো পরিশোধ করা যাবে।

গিয়ে দেখলাম সে আর এক কান্ড। ভেঙে দেওয়া হয়েছে দু-ধারের সব দোকান। চওড়া করা হচ্ছে রাস্তা। যেখানে যা ছিল চিহ্নিতকরণের সূত্র মুছে ফেলা হয়েছে সব। অগত্যা ফিরে আসতে হয়েছিল পাওনাদারের খোঁজ না পেয়েই।

আজ এতদিন পর ধার বাকির লিস্ট নিয়ে যখনই বসি, ভেসে ওঠে মানুষটার মুখ। যেন বলে, ভাবছেন কেন! ধার থাকা ভালো। ধার থাকে বলেই আবার দেখা হয়ে যায় মানুষে মানুষে। আমি ঘাড় নাড়ি নিজের মনে। কোথায় যেন পড়েছিলাম, এ জন্মের ঋণ আগামী জন্মে শোধ করতে হয়। তখন মনে হয়, এক প্রকার ভালোই হয়েছে। সামান্য ধার শোধের বাহানায় আরও একবার আসা হবে। বেঁচে নেওয়া যাবে আস্ত একটা জীবন।

অদ্ভুত এক আমেজ ছড়িয়ে পড়ে মনে-প্রাণে। এক ভাঁড় গরম চা আর একটা আস্ত সিগারেট যেন জেগে ওঠে সব বিষণ্ণতা ছাড়িয়ে।    

পর্ব ১ থেকে ৭ আলাদাভাবে নিচের লিঙ্কগুলিতে ক্লিক করলে পড়া যাবে


নির্দিষ্ট পর্ব পড়ার জন্য ক্লিক করতে হবে 👇

পর্ব ১ ।। অদৃশ্য কালিতে লেখা


পর্ব ২ - মাঝরাতের কথাবার্তা

পর্ব ৩।। বাংলার মুখ ও কবি রতন দাস


পর্ব ৪।। না মেলা অঙ্কদের কথা

পর্ব ৫।। এক না লেখকের জীবন



পর্ব ৬।। ফেরিওয়ালা হতে চাওয়া ছেলেটার রূপকথা

পর্ব ৭।। এভারেস্ট ও হিন্দি সিনেমা